নিউজিল্যান্ডের মাটিতে দুর্দান্ত ব্যাটিং করেও মাত্র এক রানের জন্য দ্বিশতরান হাতছাড়া করলেন দেবদত্ত পাড়িক্কল। ভারত ‘এ’ ও নিউজিল্যান্ড ‘এ’-এর প্রথম আনঅফিশিয়াল টেস্টে ২৪৮ বলে ১৯৯ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলেন বাঁহাতি এই ব্যাটার। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ২৪টি চার ও ৩টি ছয়। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১৩ রানে অলআউট হওয়া ভারতীয় দল ঘুরে দাঁড়িয়ে তৃতীয় দিনের শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৮ উইকেটে ৪৮৮ রান তোলে। ভারতের লিড দাঁড়ায় ২৮৪ রানে। পাড়িক্কলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন সাই সুদর্শন ও ওয়াশিংটন সুন্দর।
ক্রিকেটে কখনও কখনও একটি রানই হয়ে ওঠে আনন্দ আর আক্ষেপের মধ্যে পার্থক্য। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারত ‘এ’ দলের হয়ে এমনই এক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলেন তরুণ ভারতীয় ব্যাটার দেবদত্ত পাড়িক্কল। অসাধারণ ব্যাটিং, দুর্দান্ত ধৈর্য এবং একের পর এক আকর্ষণীয় শটের সাহায্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন ১৯৯ রানে। কিন্তু দ্বিশতরানের জন্য প্রয়োজনীয় শেষ রানটি আর করা হল না।
সোমবার, ২৬ অক্টোবর, নিউজিল্যান্ডের লিঙ্কনের বার্ট সাটক্লিফ ওভালে প্রথম আনঅফিশিয়াল টেস্টের তৃতীয় দিনে এই ঘটনা ঘটে। ২৪৮ বলের ইনিংসে ২৪টি চার এবং ৩টি ছয় মারেন পাড়িক্কল। দিনের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স করেও ২০০ রানের মাইলফলক ছুঁতে না পারায় তাঁর আক্ষেপ স্বাভাবিক। তবে ব্যক্তিগত দ্বিশতরান হাতছাড়া হলেও ভারত ‘এ’ দলের লড়াইয়ে এই ইনিংসের গুরুত্ব অপরিসীম।
ম্যাচের শুরুটা মোটেই ভালো হয়নি ভারত ‘এ’ দলের। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১৩ রানে অলআউট হয়ে যায় ভারত। অন্যদিকে নিউজিল্যান্ড ‘এ’ প্রথম ইনিংসে ৩১৭ রান সংগ্রহ করে।
ফলে ২০৪ রানের বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামতে হয় ভারতীয় দলকে। এমন পরিস্থিতিতে ম্যাচে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজন ছিল বড় ইনিংস এবং দীর্ঘ পার্টনারশিপের।
কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসেও শুরুতে সমস্যায় পড়ে ভারত। ওপেনার যশস্বী জয়সওয়াল এবং কেএল রাহুল দ্রুত ফিরে যাওয়ায় মাত্র ১০ রানে ২ উইকেট হারায় দল।
এরপরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন দেবদত্ত পাড়িক্কল ও সাই সুদর্শন। দুই বাঁহাতি ব্যাটার প্রথমে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দেন। বোলারদের ভালো বল সম্মান করার পাশাপাশি রান সংগ্রহের সুযোগও কাজে লাগান তাঁরা।
এই পার্টনারশিপ ভারতকে বিপর্যয় থেকে বের করে এনে প্রতিযোগিতায় ফেরার রাস্তা তৈরি করে।
ভারতের দ্বিতীয় ইনিংসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল পাড়িক্কল ও সাই সুদর্শনের তৃতীয় উইকেটে ২১৫ রানের পার্টনারশিপ।
এই জুটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করা। প্রথমদিকে ভারতীয় দলের লক্ষ্য ছিল আর কোনও উইকেট না হারিয়ে ম্যাচে টিকে থাকা। কিন্তু ক্রিজে থিতু হওয়ার পর ধীরে ধীরে রান তোলার গতি বাড়ান দুই ব্যাটার।
সুদর্শন ৯২ রানের কার্যকর ইনিংস খেলেন। অন্যদিকে পাড়িক্কল নিজের ইনিংসকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান।
যে ভারতীয় দল প্রথম ইনিংসে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ব্যর্থ হয়েছিল, তারাই দ্বিতীয় ইনিংসে নতুন আত্মবিশ্বাস দেখাতে শুরু করে।
এই পার্টনারশিপ প্রমাণ করে, দীর্ঘ ফরম্যাটের ক্রিকেটে একটি ভালো জুটি কীভাবে ম্যাচের পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
তৃতীয় দিনের শুরুতে পাড়িক্কল অপরাজিত ছিলেন ৫৬ রানে। সেখান থেকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যাটিং চালিয়ে যান তিনি।
১২৮ বলে শতরান পূর্ণ করেন এই তরুণ ব্যাটার। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ছক্কা মেরে শতরানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।
শতরান করার পরেও থেমে থাকেননি পাড়িক্কল। বরং আরও বড় ইনিংস খেলার দিকে মনোযোগ দেন। নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রিত আক্রমণ চালিয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্কোর ১৫০ পার করে ফেলেন।
একসময় মনে হচ্ছিল, দ্বিশতরান শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু ক্রিকেটের অনিশ্চয়তা আবারও সামনে চলে আসে।
ম্যাচের ৮৯তম ওভারে ঘটে সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দলের বোলার জ্যাক গিবসনের লেগ স্টাম্পের বাইরের দিকে যাওয়া একটি বল খেলতে গিয়ে কট বিহাইন্ড হন পাড়িক্কল।
আম্পায়ার আউট দেওয়ার পর কিছুটা বিস্মিত দেখায় তাঁকে। ঠিক দ্বিশতরানের আগে এমনভাবে আউট হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন ভারতীয় ব্যাটার।
২৪৮ বলে ১৯৯ রান করে শেষ হয় তাঁর ইনিংস। মাত্র একটি রান না পাওয়ার কারণে ব্যক্তিগত দ্বিশতরানের সুযোগ হাতছাড়া হলেও ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এই ইনিংস বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তবে আউটের সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা থাকলেও স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে নিশ্চিতভাবে দাবি করা ঠিক নয়।
দ্বিশতরান মিস করলেও পাড়িক্কলের এই ইনিংস তাঁর ক্রিকেটজীবনে উল্লেখযোগ্য অর্জন।
ভারত ‘এ’ দলের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১,০০০ রান পূর্ণ করেছেন তিনি। মাত্র ১৬টি ম্যাচে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন। এটি ভারত ‘এ’ দলের হয়ে তাঁর তৃতীয় শতরান এবং এই দলের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর।
এর আগে ২০২৬ সালের রঞ্জি ট্রফিতে কর্ণাটকের হয়ে উত্তরাখণ্ডের বিরুদ্ধে ২৩২ রান করেছিলেন পাড়িক্কল।
অর্থাৎ বড় ইনিংস খেলার ক্ষমতা তাঁর আগে থেকেই রয়েছে। নিউজিল্যান্ডের পরিবেশে এবার সেই দক্ষতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ পাওয়া গেল।
পাড়িক্কলের ইনিংস ভারতকে শক্ত অবস্থানে পৌঁছে দিলেও ম্যাচের তৃতীয় দিনে আরও কয়েকজন ভারতীয় ব্যাটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যশ রাঠোড় ৭২ বলে ৬৬ রানের কার্যকর ইনিংস খেলেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে আটটি চার।
এছাড়া আনশুল কাম্বোজ করেন ২৩ রান এবং আউকিব নবি করেন ৩৮ রান।
দিনের শেষে ওয়াশিংটন সুন্দর ৭৫ বলে ৫১ রানে অপরাজিত থাকেন। তাঁর ইনিংসে ছিল ছয়টি চার। সুন্দর নিজের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটজীবনের ১৩তম অর্ধশতরানও পূর্ণ করেন।
এই অবদানগুলির ফলে তৃতীয় দিনের শেষে ভারত ‘এ’ দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৯ ওভারে ৮ উইকেটে ৪৮৮ রান তুলে ফেলে।
সেই সময় ভারতীয় দলের মোট লিড দাঁড়ায় ২৮৪ রানে।
তৃতীয় দিনের শেষে ভারত ‘এ’ ভালো অবস্থানে থাকলেও ম্যাচের ফল এখনও নিশ্চিত নয়।
চতুর্থ দিনে ভারতীয় দল চাইলে আরও কিছু রান যোগ করতে পারে। আবার দ্রুত ইনিংস ঘোষণা করে নিউজিল্যান্ডকে দ্বিতীয়বার ব্যাট করানোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
দুই ক্ষেত্রেই কিছু সুবিধা এবং ঝুঁকি রয়েছে।
যদি ভারত আরও বেশি রান তোলে, তাহলে নিউজিল্যান্ডের জন্য লক্ষ্য কঠিন হয়ে উঠবে। কিন্তু অতিরিক্ত সময় ব্যাট করলে প্রতিপক্ষের দশটি উইকেট নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ওভার হাতে না-ও থাকতে পারে।
তার উপর চতুর্থ দিনে বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ফলে ভারতের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে সময় ও রানের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
ভারত ‘এ’ দলের হয়ে বিদেশের মাটিতে ভালো পারফরম্যান্স তরুণ ক্রিকেটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
বিশেষত যখন কোনও ব্যাটার বিপর্যয়ের মধ্যে ক্রিজে এসে দীর্ঘ সময় ধরে বড় ইনিংস খেলেন, তখন তাঁর টেকনিক, মানসিক দৃঢ়তা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী খেলার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
পাড়িক্কলের ১৯৯ রানের ইনিংস এমনই একটি উদাহরণ।
যদিও একটি দুর্দান্ত ইনিংসের ভিত্তিতে জাতীয় দলে সুযোগ নিশ্চিত হয়ে যায় না, ধারাবাহিকভাবে এই ধরনের পারফরম্যান্স নির্বাচকদের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে লাল বলের ক্রিকেটে ভালো করার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের বড় প্রতিযোগিতার জন্য একজন ব্যাটারকে আরও প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।
ক্রিকেট ইতিহাসে অনেক সময় ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ম্যাচের পরিস্থিতিতে কোনও ইনিংসের অবদান।
পাড়িক্কলের ক্ষেত্রেও সেটাই প্রযোজ্য।
প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১৩ রানে শেষ হয়ে যাওয়া ভারত ‘এ’ দল যে দ্বিতীয় ইনিংসে বড় লিড তৈরি করতে পেরেছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ তাঁর অসাধারণ ব্যাটিং।
১৯৯ রান হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত আক্ষেপের কারণ হয়ে থাকবে। কিন্তু দলের বিপর্যয় সামলে ম্যাচে ফিরে আসার এই লড়াই ভবিষ্যতে তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, চতুর্থ দিনে ভারত ‘এ’ দল এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে ম্যাচ জিততে পারে কি না। ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর থাকবে সেই ফলাফলের দিকেই।