রবীনা টন্ডনের মা বীণা টন্ডনের সোনা-হিরের গয়না এবং ভাই রাজীব টন্ডনের দুটি দামি ঘড়ি চুরির অভিযোগে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সিন্দুক ভেঙে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকার সামগ্রী উধাও হওয়ার ঘটনায় তদন্তে নেমে এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বলিউড অভিনেত্রী রবীনা টন্ডনের পরিবারে ঘটে যাওয়া একটি চুরির ঘটনা ফের শিরোনামে উঠে এসেছে। গত বছর মুম্বইয়ের জুহু এলাকায় অবস্থিত রবীনার মায়ের বাড়িতে ঘটে যাওয়া এই চুরিকাণ্ড ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ, অভিনেত্রীর মা বীণা টন্ডনের সোনা ও হিরের গয়না এবং ভাই রাজীব টন্ডনের দুটি দামি ঘড়ি রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে পুলিশ এবং শেষ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয় পরিবারের দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিচারিকা রাশি ছাবরিয়াকে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রাশি ছাবরিয়া প্রায় ২০২০ সাল থেকে টন্ডন পরিবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মূলত রবীনা টন্ডনের ৮৬ বছর বয়সি মা বীণা টন্ডনের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতেন তিনি। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে পরিবারের সঙ্গে কাজ করার ফলে তিনি পরিবারের আস্থা অর্জন করেছিলেন। শুধু কর্মচারী হিসেবেই নয়, বরং পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যের মতোই তাঁকে বিশ্বাস করতেন বীণা টন্ডন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও।
এই বিশ্বাসের কারণেই বাড়ির এমন কিছু অংশে তাঁর প্রবেশাধিকার ছিল, যেখানে সাধারণত বাইরের কারও প্রবেশের অনুমতি থাকে না। তদন্তকারীদের মতে, এই বিশেষ সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে অভিযুক্ত চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, বাড়িতে থাকা একটি লকার বা সিন্দুক ভেঙে সেখান থেকে মূল্যবান গয়না এবং অন্যান্য সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন বীণা টন্ডন একটি বিশেষ উৎসব উপলক্ষে নিজের গয়না বের করতে যান। তখনই তিনি লক্ষ্য করেন যে লকারটি ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। প্রথমে বিষয়টি দেখে তিনি হতবাক হয়ে যান। পরে বিস্তারিত খতিয়ে দেখে বোঝা যায়, লকারে রাখা একাধিক মূল্যবান গয়না আর সেখানে নেই। খবর দেওয়া হয় পরিবারের অন্য সদস্যদের। এরপরই বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
রাজীব টন্ডনের দায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী, চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর। সেদিনই পরিবার প্রথম জানতে পারে যে বহু মূল্যবান সামগ্রী নিখোঁজ। চুরি যাওয়া জিনিসগুলির তালিকা তৈরি করতে গিয়ে দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে সোনার চুড়ি, সোনার নেকলেস, আংটি, কানের দুল, একটি হিরে বসানো মঙ্গলসূত্র এবং আরও একাধিক হিরের অলঙ্কার। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্র প্রযোজক রাজীব টন্ডনের দুটি দামি হাতঘড়িও খোয়া যায়।
পরিবারের দাবি, সমস্ত গয়না ও ঘড়ির মোট মূল্য প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা। এত বড় অঙ্কের সম্পত্তি চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে যাঁর উপর ভরসা করা হয়েছিল, সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই অভিযোগ ওঠায় তাঁরা আরও বেশি বিস্মিত হন।
পুলিশ তদন্ত শুরু করার পর প্রথমেই বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তদন্তকারীরা পরিবারের সদস্য, নিরাপত্তারক্ষী, পরিচারক-পরিচারিকা এবং অন্যান্য কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পাশাপাশি বাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং বিভিন্ন নথিও খতিয়ে দেখা হয়।
তদন্তে ধীরে ধীরে সন্দেহের তির গিয়ে পড়ে রাশি ছাবরিয়ার দিকে। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাড়িতে কাজ করতেন এবং বাড়ির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার সঙ্গে ভালভাবেই পরিচিত ছিলেন। কোথায় কী রাখা আছে, কার ঘরে কী ধরনের মূল্যবান জিনিস রয়েছে—এসব সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল বলে তদন্তকারীদের অনুমান।
পুলিশ সূত্রে খবর, বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের পর রাশিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়। পরে তদন্তে কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়ায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। যদিও আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনত অভিযুক্ত হিসেবেই বিবেচিত হবেন।
এই ঘটনা সামনে আসার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিনের পরিচিত বা বিশ্বস্ত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কঠোর হওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করলেও মূল্যবান সামগ্রী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। অনেক সময় অতিরিক্ত বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অপরাধ সংঘটিত হতে পারে।
বলিউড জগতেও এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ রবীনা টন্ডন শুধু জনপ্রিয় অভিনেত্রীই নন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ। তাঁর পরিবারের সঙ্গে জড়িত এই ধরনের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
এছাড়া এই ঘটনা প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বীণা টন্ডনের বয়স বর্তমানে ৮৬ বছর। তাঁর মতো বয়স্ক মানুষের দেখাশোনার জন্য পরিচারক বা কেয়ারগিভারের উপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সেই ব্যবস্থার মধ্যেই যদি বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়।
তদন্তকারীরা বর্তমানে চুরি যাওয়া সমস্ত গয়না এবং ঘড়ি উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। কোথাও সেগুলি বিক্রি করা হয়েছে কি না, অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে কি না, অথবা কোনও চক্রের সঙ্গে এই ঘটনার যোগ রয়েছে কি না—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলেও জানা গিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বাসভঙ্গ, চুরি এবং মূল্যবান সম্পত্তি আত্মসাতের মতো অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
ঘটনার পর টন্ডন পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি মন্তব্য না করা হলেও পরিবার যে মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছে, তা স্পষ্ট। কারণ শুধুমাত্র আর্থিক ক্ষতিই নয়, দীর্ঘদিনের বিশ্বাস নষ্ট হওয়ার ঘটনাও তাঁদের কাছে বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে।
এই চুরিকাণ্ড প্রমাণ করে যে অপরাধ সব সময় বাইরের কারও দ্বারাই ঘটে না। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী হতে পারে সেই ব্যক্তি, যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করা হয়েছিল। তাই মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে মামলার তদন্ত চলমান। পুলিশের দাবি, সমস্ত তথ্যপ্রমাণ বিচার করে দ্রুত চার্জশিট পেশ করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। একই সঙ্গে চুরি যাওয়া সম্পত্তি উদ্ধারের দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর রাখছে টন্ডন পরিবারসহ গোটা বলিউড মহল।
সব মিলিয়ে রবীনা টন্ডনের মায়ের বাড়িতে ২৫ লক্ষ টাকার গয়না ও মূল্যবান সামগ্রী চুরির ঘটনা শুধু একটি সাধারণ অপরাধের ঘটনা নয়, বরং এটি বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং পারিবারিক আস্থার প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে। তদন্ত শেষ হলে এই মামলায় আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। ফলে এই চাঞ্চল্যকর চুরিকাণ্ডের দিকে এখনও কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে অনেকেই।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের মতে, এই ধরনের চুরির ঘটনা সাধারণত পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয়। কারণ লকার বা সিন্দুকে রাখা মূল্যবান সামগ্রীর অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। সেই কারণেই তদন্তের শুরু থেকেই বাড়ির অভ্যন্তরে যাতায়াতকারী ব্যক্তিদের উপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণ, কল রেকর্ড এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্যও খতিয়ে দেখছে বলে জানা গিয়েছে। চুরি যাওয়া গয়না ও ঘড়ির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য মুম্বইয়ের একাধিক জুয়েলারি দোকান ও পুরনো সামগ্রী কেনাবেচার কেন্দ্রেও নজরদারি চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বাড়িতে মূল্যবান গয়না বা গুরুত্বপূর্ণ নথি রাখার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ডিজিটাল লকার, সিসিটিভি নজরদারি এবং নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনা ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
রবীনা টন্ডনের পরিবারের জন্য এই ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি কঠিন অভিজ্ঞতা। তবে পুলিশি তদন্তে দ্রুত অগ্রগতি এবং অভিযুক্তের গ্রেফতারি পরিবারকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন সবার নজর চুরি যাওয়া মূল্যবান গয়না ও ঘড়ি উদ্ধারের দিকে এবং আদালতে মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে। তদন্ত শেষ হলে এই বহুল আলোচিত চুরিকাণ্ডের সম্পূর্ণ সত্য সামনে আসবে বলেই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।