Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আনন্দপুরের গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, একের পর এক গাফিলতির অভিযোগ

নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাশাপাশি দুইটি গোডাউন সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুন লাগার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব ও একাধিক গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন।

নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি এক ভয়ঙ্কর অবহেলার প্রতিচ্ছবি। ই এম বাইপাসের ধারে অবস্থিত পাশাপাশি দুইটি গোডাউনে বিধ্বংসী আগুনে মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গোডাউন দুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সময় যত এগোচ্ছে, মৃতের সংখ্যা তত বাড়ছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এগারোতে, নিখোঁজ রয়েছেন আরও একাধিক ব্যক্তি। নরেন্দ্রপুর থানায় ইতিমধ্যেই সতেরো জনের পরিবারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ ডায়েরি দায়ের করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে এবং মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই ভয়াবহ ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এত বড় বিপর্যয় ঘটল কেন। কোথায় ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কেন আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। কেন এত মানুষের প্রাণ গেল। তদন্ত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে একের পর এক ভয়ঙ্কর তথ্য, যা গোডাউন পরিচালনার ক্ষেত্রে মারাত্মক গাফিলতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল গোডাউনে প্রবেশ ও বেরোনোর জন্য ছিল মাত্র একটি রাস্তা। কোনও বিকল্প বেরোনোর পথ ছিল না। অর্থাৎ আগুন লাগার মুহূর্তে কর্মীদের পালানোর কোনও সুযোগই ছিল না। আগুন যখন ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেই একমাত্র দরজাই কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভিতরে আটকে পড়েন বহু কর্মী। আগুনের ধোঁয়া এবং তীব্র তাপের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে এবং দগ্ধ হয়ে একের পর এক মানুষের মৃত্যু ঘটে। যারা কোনওভাবে বাইরে বেরোতে পেরেছিলেন, তারাও পাশের গোডাউনের আগুনের কারণে শেষরক্ষা পাননি।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল গোডাউনে কোনও অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা ছিল না। এত বিপুল পরিমাণ দাহ্য বস্তু থাকা সত্ত্বেও আগুন নেভানোর জন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কোনও ফায়ার এক্সটিংগুইশার, কোনও জল সরবরাহ ব্যবস্থা, কোনও অগ্নিনির্বাপন সরঞ্জাম ছিল না। ফলে আগুন লাগার পর তা নিয়ন্ত্রণ করার কোনও উপায় ছিল না। সময় যত গিয়েছে, আগুন তত ভয়াবহ আকার নিয়েছে এবং গোডাউন দুটি সম্পূর্ণ গ্রাস করেছে।

দমকল বিভাগের ডিজি রণবীর কুমার জানিয়েছেন, এই দুই গোডাউনের কোনওটিতেই ফায়ার অডিট হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গোডাউনগুলির কোনও ফায়ার ক্লিয়ারেন্স ছিল না। অর্থাৎ আইন অনুযায়ী যে সমস্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল, তার কোনওটাই সেখানে ছিল না। দমকল বিভাগের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, এই ঘটনায় আইন অনুযায়ী সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিশ্চিতভাবে এফআইআর দায়ের করা হবে। কারণ এখানে একাধিক নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে।

তবে ঘটনার পর থেকেই নিজেদের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন গোডাউন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। ডেকরেটর্স সংস্থার মালিক দাবি করছেন, সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাকি ছিল। কিন্তু দমকল বিভাগের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। দমকলের ডিজির বক্তব্য অনুযায়ী, গোডাউনে কোনও অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা ছিল না। এই দুই পক্ষের বিপরীত বক্তব্য গোটা ঘটনার রহস্য আরও গভীর করছে।

এই ঘটনায় ডেকরেটর্স সংস্থার বিরুদ্ধে নরেন্দ্রপুর থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারী আধিকারিকরা ইতিমধ্যেই গোডাউনের নকশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অনুমতি সংক্রান্ত নথি এবং পরিচালনার যাবতীয় তথ্য খতিয়ে দেখা শুরু করেছেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর তথ্য। সন্দেহ করা হচ্ছে, ডেকরেটর্স গোডাউনের কর্মীরা রান্না করছিলেন। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। রান্নার আগুন থেকেই দাহ্য বস্তুতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং তা দ্রুত পাশের গোডাউনে পৌঁছে যায়।

এই গোডাউনে রাখা ছিল প্রচুর দাহ্য বস্তু। ডেকরেটর্সের গোডাউনে ছিল বিভিন্ন ধরনের দাহ্য সামগ্রী। পাশের গোডাউনে রাখা ছিল মোমোর কাঁচামাল, যা অত্যন্ত দাহ্য। এত বিপুল পরিমাণ দাহ্য বস্তু থাকা সত্ত্বেও কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় আগুন মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নেয়।

আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে এই গোডাউন দুটি বেআইনি ভাবে নির্মিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জলাজমি বুজিয়ে এই গোডাউন তৈরি করা হয়েছে। যদি এই অভিযোগ সত্যি হয়, তবে এটি শুধুমাত্র অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নয়, বরং একটি বড় প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রমাণ। প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে এই ধরনের বেআইনি নির্মাণ বছরের পর বছর ধরে চলতে পারল। কোন কর্তৃপক্ষ এই গোডাউন নির্মাণের অনুমতি দিল। কীভাবে কোনও ফায়ার অডিট ছাড়াই এই গোডাউন পরিচালিত হচ্ছিল।

গোডাউনের পাশেই ছিল ডেকরেটর্সের অফিস। সেই অফিসেই থাকতেন কর্মীরা। অর্থাৎ কর্মীরা একই জায়গায় কাজ করতেন এবং থাকতেন। কর্মীদের থাকার জায়গায় ছিল মাত্র একটি দরজা। আগুন লাগার পর সেই দরজাই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভিতরে আটকে পড়েন বহু কর্মী। যারা কোনওভাবে বাইরে বেরোতে পেরেছিলেন, তারাও পাশের গোডাউনের আগুনের কারণে বেরোতে পারেননি। একের পর এক কর্মী দগ্ধ হয়ে মারা যান।

news image
আরও খবর

ঘটনাস্থলে এখনও উদ্ধারকাজ চলছে। ভাঙা কারশেডের নিচে আরও কেউ আটকে আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পাওয়া যাচ্ছে দেহাংশ। এই দৃশ্য যে কোনও মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর। প্রতিটি মৃতদেহের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি পরিবারের কান্না, একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প।

এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। কেন এই গোডাউনগুলির ফায়ার অডিট হয়নি। কেন কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। কেন একটি মাত্র রাস্তা রেখে গোডাউন পরিচালিত হচ্ছিল। কেন দাহ্য বস্তু থাকা সত্ত্বেও কোনও সতর্কতা নেওয়া হয়নি। কেন বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল। শিল্পাঞ্চল এবং শহরতলির বহু গোডাউনে একই ধরনের নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি রয়েছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিয়ম মেনে ফায়ার অডিট করা হয় না, অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা রাখা হয় না, একাধিক বেরোনোর পথ রাখা হয় না। প্রশাসনের নজরদারির অভাব এবং মালিকদের অবহেলার ফলে এই ধরনের বিপর্যয় ঘটে।

এই ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে গোডাউন এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, অবিলম্বে সমস্ত গোডাউনে ফায়ার সেফটি অডিট বাধ্যতামূলক করা উচিত। বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা ছাড়া কোনও গোডাউন পরিচালনার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।

এই ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে। পুলিশ, দমকল বিভাগ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত করছে। তদন্তের মাধ্যমে আরও তথ্য সামনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট, এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি প্রশাসনিক গাফিলতি, মালিকদের অবহেলা এবং নিয়ম লঙ্ঘনের ভয়ঙ্কর পরিণতি।

নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি এলাকার ঘটনা নয়, বরং এটি গোটা সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। মানুষের জীবন নিয়ে এই ধরনের অবহেলা আর চলতে পারে না।

এই ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের কাছে কোনও ভাষাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি মৃত্যুর পিছনে রয়েছে একটি পরিবারের গল্প, একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। এই মৃত্যু শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং সমাজের জন্য এক গভীর ক্ষতি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি সংবাদ নয়, বরং এটি একটি বড় প্রশ্ন। প্রশ্ন প্রশাসনের কাছে, প্রশ্ন গোডাউন মালিকদের কাছে, প্রশ্ন গোটা ব্যবস্থার কাছে। এই প্রশ্নের উত্তর যদি সময়মতো না দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করে থাকবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ঘটনার বিচার যেন শুধুমাত্র কয়েকটি ফাইল আর তদন্ত রিপোর্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটবে। মানুষের জীবন নিয়ে খেলা চলতেই থাকবে। তাই নাজিরাবাদের অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা যদি আমরা এখনই গুরুত্ব দিয়ে না শুনি, তাহলে আগামী দিনে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় আমাদের সামনে দাঁড়াবে।

Preview image