নিউ টাউনে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার হলেন বিডিও প্রশান্ত বর্মন। পশ্চিম মেদিনীপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনকাণ্ডে আগেই অভিযুক্ত ছিলেন তিনি। ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
নিউ টাউনের সায়েন্স সিটির কাছে সারচী সিগন্যাল এলাকায় গভীর রাতে ঘটে গেল চাঞ্চল্যকর ঘটনা। মদ্যপ অবস্থায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে পথচারী ও বাইক আরোহীদের ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হলেন রাজগঞ্জের অপসারিত ও পলাতক বিডিও প্রশান্ত বর্মন। দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন বিতর্ক ও গুরুতর অভিযোগে শিরোনামে থাকা এই সরকারি আধিকারিককে অবশেষে স্থানীয় মানুষের তৎপরতায় আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে নিউ টাউন ও প্রশাসনিক মহলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার গভীর রাতে নিউ টাউনের সায়েন্স সিটির সংলগ্ন সারচী সিগন্যাল এলাকায় একটি দ্রুতগতির গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় চলাচলকারী কয়েকজন পথচারী ও বাইক আরোহীর খুব কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়। অভিযোগ, গাড়িটি বারবার লেন পরিবর্তন করছিল এবং অত্যন্ত বেপরোয়া ভাবে চালানো হচ্ছিল। কিছু দূর এগিয়ে একটি বাইককে ধাক্কা মারার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে থাকা মানুষজন গাড়িটিকে থামানোর চেষ্টা করেন। প্রথমে চালক পালানোর চেষ্টা করলেও স্থানীয়দের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত তাঁকে আটক করা সম্ভব হয়।
পরে জানা যায়, গাড়ির চালক আর কেউ নন, রাজগঞ্জের অপসারিত বিডিও প্রশান্ত বর্মন। তাঁকে ঘিরে আগেও একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। পশ্চিম মেদিনীপুরের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনকাণ্ডেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল বলে দাবি তদন্তকারী সূত্রের। সেই ঘটনার পর থেকেই তিনি কার্যত পলাতক ছিলেন বলে জানা যায়। ফলে নিউ টাউনের রাস্তায় তাঁকে হঠাৎ দেখতে পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও চাঞ্চল্য তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গাড়ি থেকে নামার সময় প্রশান্ত বর্মনের আচরণ ছিল অস্বাভাবিক। তাঁর কথাবার্তা অসংলগ্ন ছিল বলেও অভিযোগ। স্থানীয়দের অনেকেই দাবি করেন, তিনি মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। পরে খবর দেওয়া হলে বিধাননগর ইকো পার্ক থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
পুলিশ সূত্রে খবর, আটক করার পর অভিযুক্তের শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, জনসাধারণের নিরাপত্তা বিপন্ন করা এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগে মামলা রুজু করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে আগের বিভিন্ন মামলার তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা জানতে চেষ্টা করছেন, দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর তিনি কীভাবে নিউ টাউনে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এবং কার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল।
এই ঘটনায় প্রশাসনিক মহলেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। একজন প্রাক্তন বিডিওর বিরুদ্ধে এভাবে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে প্রশাসনিক নজরদারি নিয়েও। সাধারণ মানুষের বক্তব্য, সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনও ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কখনওই প্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে যখন তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকেই গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তখন তাঁর অবাধে ঘোরাফেরা করা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, যদি স্থানীয় মানুষজন দ্রুত পদক্ষেপ না নিতেন, তাহলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। কারণ গাড়িটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলছিল এবং বারবার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিল। রাতের ব্যস্ত রাস্তায় এমন বেপরোয়া ড্রাইভিং যে কোনও সময় ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত বলেও মত স্থানীয়দের।
অন্যদিকে, এই ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই অভিযুক্ত দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন। যদিও পুলিশ জানিয়েছে, আইন অনুযায়ী সমস্ত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং তদন্তের স্বার্থে সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নতুন নয়। এর আগেও তাঁর নাম ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পশ্চিম মেদিনীপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী খুনকাণ্ডে তাঁর যোগসূত্র নিয়ে তদন্ত চলছিল বলেই জানা যায়। সেই মামলার তদন্ত এখনও চলছে। ফলে নিউ টাউনে তাঁর গ্রেফতারি সেই তদন্তেও নতুন মোড় আনতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
পুলিশ এখন সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছে। ঘটনার সময় গাড়ির গতিবিধি, দুর্ঘটনার মুহূর্ত এবং অভিযুক্তের আচরণ সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আহত বাইক আরোহী ও পথচারীদের বক্তব্যও নথিভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি অভিযুক্তের গাড়িটিও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
এই ঘটনার জেরে ফের একবার সামনে উঠে এল মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর ভয়াবহতা। প্রতি বছরই বেপরোয়া ড্রাইভিং এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে বহু দুর্ঘটনা ঘটে। প্রশাসন বারবার সতর্কতা জারি করলেও অনেক ক্ষেত্রেই সেই নিয়ম মানা হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না, সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
নিউ টাউনের এই ঘটনা সেই বার্তাকেই আবার সামনে এনে দিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেছেন অনেকেই। তাঁদের উপস্থিত বুদ্ধি ও দ্রুত পদক্ষেপের ফলেই অভিযুক্তকে আটক করা সম্ভব হয়েছে বলে মত পুলিশেরও একাংশের।
এখন গোটা ঘটনার তদন্ত এগোচ্ছে। আদালতে তোলা হলে অভিযুক্তকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হতে পারে বলে সূত্রের খবর। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এই গ্রেফতারির পর আগের মামলাগুলির তদন্তেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে। ফলে আগামী দিনে এই মামলায় আরও বড় তথ্য প্রকাশ্যে আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ঘটনার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নিউ টাউনের মতো ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন ঘটনা ঘটায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে জানান, প্রথমে তাঁরা বুঝতেই পারেননি গাড়ির চালক কে। তবে গাড়ি থামানোর পর অভিযুক্তের পরিচয় সামনে আসতেই এলাকায় শোরগোল পড়ে যায়। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, অভিযুক্তকে আটক করার সময় তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং নিজেকে নির্দোষ বলেও দাবি করেন। কিন্তু উপস্থিত মানুষজন তাঁর আচরণে অসঙ্গতি লক্ষ্য করেন। এরপরই পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
স্থানীয় দোকানদার ও পথচারীদের বক্তব্য, সারচী সিগন্যাল এলাকা রাতের দিকেও যথেষ্ট ব্যস্ত থাকে। বহু মানুষ অফিস শেষে বা অন্য কাজে ওই রাস্তা ব্যবহার করেন। ফলে সেখানে বেপরোয়া গাড়ি চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। অভিযোগ, গাড়িটি একাধিকবার অন্য গাড়ির খুব কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং কয়েকজন পথচারী অল্পের জন্য রক্ষা পান। ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন আশেপাশের মানুষজনও।
পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। অভিযুক্তকে থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ওই রাতে তিনি কোথা থেকে আসছিলেন এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। পাশাপাশি তাঁর গাড়িতে অন্য কেউ ছিলেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্তের মোবাইল ফোন ও অন্যান্য নথিও পরীক্ষা করা হতে পারে।
এই ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়াতেও শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত এবং দীর্ঘদিন পলাতক থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে প্রকাশ্যে শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠছে। যদিও তদন্তকারী আধিকারিকদের দাবি, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলছিল এবং এই গ্রেফতারির পর তদন্ত আরও গতি পাবে।
এদিকে, আহতদের শারীরিক অবস্থার দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। যদিও গুরুতর আহতের খবর মেলেনি, তবুও ধাক্কা লাগার ফলে কয়েকজন বাইক আরোহী ও পথচারী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ প্রাথমিক চিকিৎসাও নিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। পুলিশ প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সংগ্রহ করছে যাতে পুরো ঘটনাটির স্পষ্ট চিত্র উঠে আসে।
প্রশান্ত বর্মনের গ্রেফতারি ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও ক্রমশ বাড়ছে। বিরোধী দলগুলি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে। তাঁদের বক্তব্য, একজন পলাতক অভিযুক্ত কীভাবে এতদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন, তার উত্তর প্রশাসনকে দিতে হবে। অন্যদিকে শাসকদলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন আইনের পথেই চলবে এবং তদন্তে কোনও রকম হস্তক্ষেপ করা হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনা বা ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে। সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ সমাজে বড় প্রভাব ফেলে। তাই তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে হওয়া প্রয়োজন বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের।
নিউ টাউনের ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়ে গেল, সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও তৎপরতা অনেক সময় বড় দুর্ঘটনা রুখে দিতে পারে। স্থানীয়দের দ্রুত পদক্ষেপ না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত বলেও মনে করছেন অনেকে। এখন নজর আদালতের দিকে। আগামী শুনানিতে তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং অভিযুক্তকে নিয়ে আরও কী তথ্য সামনে আসে, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সকলেই।