রাজনীতি থেকে ক্রমশ দূরত্ব বাড়ছে অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীর। সদ্য মুক্তি পেয়েছে তাঁর ছবি ‘সে তো আজও বোঝে না’। অভিনয়, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবন—সব মিলিয়ে কেমন কাটছে তাঁর বর্তমান সময়? নানা প্রসঙ্গে নিজের ভাবনার কথা জানালেন অভিনেতা।
অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীকে নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানেও সক্রিয় থেকেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর অভিনয় বা প্রযোজনার কাজের তুলনায় রাজনৈতিক জীবন এবং বিভিন্ন বিতর্কের প্রসঙ্গই বেশি উঠে আসছে আলোচনায়। এই পরিস্থিতিতে আপাতত রাজনীতির চেয়ে সিনেমায় বেশি মনোযোগ দিতে চান অভিনেতা। সদ্য মুক্তি পেয়েছে তাঁর ছবি ‘সে তো আজও বোঝে না’। ছবিতে মৈনাকের চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। নতুন ছবি, নিজের ভাবমূর্তি, রাজনীতি থেকে দূরত্ব এবং বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি—সবকিছু নিয়েই খোলামেলা কথা বলেছেন সোহম।
তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ অনেক বেশি বিচারপ্রবণ হয়ে উঠেছে। কোনও অভিনেতার অভিনয়ের বাইরের জীবন নিয়েও দ্রুত মতামত তৈরি হয়ে যায়। আর সেই কারণেই অভিনেতারা অনেক সময় সহজ নিশানা হয়ে ওঠেন। সোহমের কথায়, ‘অভিনেতারা বরাবরই সফট টার্গেট।’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবন, জনপরিসরে তাঁর ভাবমূর্তি এবং বিনোদন জগতের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
একজন অভিনেতার পরিচয় সাধারণত তাঁর অভিনয়, ছবি এবং দর্শকের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। কিন্তু কোনও অভিনেতা যখন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তাঁর পরিচয়ের পরিসর আরও বড় হয়ে যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক বক্তব্য, কর্মকাণ্ড এবং বিতর্কও জনসমক্ষে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
সোহম চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি প্রাসঙ্গিক। তাঁর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়ও দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় রয়েছে। তবে অভিনেতার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে গুগলে তাঁর অভিনয় বা প্রযোজনার কাজের চেয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের খবরই বেশি সামনে আসছে। এই পরিস্থিতি তাঁর কাছে কতটা অস্বস্তিকর, সেই প্রশ্নের উত্তরে সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের বিচার করার প্রবণতার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।
সোহমের বক্তব্য, মানুষ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে অনেক বেশি বিচারপ্রবণ হয়ে গিয়েছে। কোনও ঘটনা সামনে এলেই তার বিভিন্ন দিক বিবেচনা করার আগেই অনেকে নিজেদের মতামত তৈরি করে ফেলেন। বিশেষ করে পরিচিত ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও বেশি চোখে পড়ে।
একজন অভিনেতার কাজ এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেই বিষয়টিও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। অভিনয়ের বাইরে কোনও ব্যক্তি কী করবেন, কোথায় যাবেন কিংবা কীভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করবেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার বলেই মনে করেন সোহম।
তবে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের সীমারেখা সব সময় স্পষ্ট থাকে না। তাঁদের সিদ্ধান্ত, বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড নিয়ে জনসাধারণের আগ্রহ থাকেই। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অভিনেতাদের ক্ষেত্রে এই আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। ফলে অভিনয়ের পরিচয় কখনও কখনও রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যেতে পারে।
সাক্ষাৎকারে সোহমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্তব্যগুলির একটি হল, ‘অভিনেতারা বরাবরই সফট টার্গেট।’ তাঁর মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার বর্তমান পরিবেশে অভিনেতাদের সহজেই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু নিয়েই দ্রুত আলোচনা এবং বিচার শুরু হয়ে যায়।
অভিনেতাদের কাজের মূল্যায়ন হওয়া স্বাভাবিক। দর্শক তাঁদের অভিনয় পছন্দ করতে পারেন, আবার কোনও চরিত্র বা ছবি নিয়ে অসন্তোষও প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু অভিনয়ের বাইরে কোনও ব্যক্তির প্রতিটি সিদ্ধান্তকে একইভাবে বিচার করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সোহমের বক্তব্যে সেই অস্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাঁর মতে, অভিনেতারা শুধু পর্দার চরিত্রের জন্যই পরিচিত নন; তাঁদের বাস্তব জীবন নিয়েও মানুষের কৌতূহল রয়েছে। সেই কৌতূহল অনেক সময় সমালোচনা বা বিতর্কের রূপ নেয়।
তবে সোশ্যাল মিডিয়া অভিনেতাদের জন্য শুধু চাপের জায়গা নয়, দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও। নতুন ছবির প্রচার, কাজের খবর ভাগ করে নেওয়া এবং দর্শকের প্রতিক্রিয়া জানার সুযোগও তৈরি হয়েছে এই প্ল্যাটফর্মগুলির মাধ্যমে। কিন্তু একই সঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্য, অসম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের প্রবণতা পরিচিত ব্যক্তিত্বদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সোহমের বক্তব্য সেই বৃহত্তর পরিস্থিতির দিকেও ইঙ্গিত করে। জনপরিসরে পরিচিত কোনও ব্যক্তির কাজের মূল্যায়ন এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের উপর অতিরিক্ত নজরদারির মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে নিজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই সোহমের কাছে জানতে চাওয়া হয়, নিজের ড্যামেজ কন্ট্রোলে তিনি কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
এর উত্তরে তিনি কোনও নির্দিষ্ট প্রচারকৌশল বা জনসংযোগ পরিকল্পনার কথা বলেননি। বরং তাঁর বক্তব্য, তিনি ভালো সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান এবং ভালো চরিত্রে অভিনয় করতে চান।
এই উত্তর থেকে বোঝা যায়, আপাতত অভিনয়ের কাজকেই নিজের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন অভিনেতা। নতুন চরিত্র, ভালো গল্প এবং মানসম্মত ছবির মাধ্যমে দর্শকের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক আরও মজবুত করার দিকেই তাঁর নজর।
একজন অভিনেতার দীর্ঘমেয়াদি পরিচয় গড়ে ওঠে তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা থেকে। কোনও একটি ছবি দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে পারে, আবার পরপর ভালো কাজ একজন শিল্পীর প্রতি দর্শকের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করে। সেই জায়গা থেকেই সোহমের বক্তব্যকে দেখা যেতে পারে।
তবে জনপরিসরে তৈরি হওয়া কোনও বিতর্কের প্রভাব শুধুমাত্র অভিনয়ের মাধ্যমে কতটা বদলানো সম্ভব, তা নির্ভর করে নানা বিষয়ের উপর। দর্শকের প্রত্যাশা, ছবির মান, চরিত্রের গ্রহণযোগ্যতা এবং অভিনেতার সামগ্রিক জনপরিচয়—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সোহম আপাতত যে ভালো কাজের উপর জোর দিতে চাইছেন, তা তাঁর নিজের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট। কিন্তু সেই প্রচেষ্টা তাঁর ভাবমূর্তিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে।
সোহমের সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘সে তো আজও বোঝে না’ নিয়েও সাক্ষাৎকারে আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্কের আবহে এই ছবি কি তাঁর ভাবমূর্তি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা? এমন প্রশ্নের উত্তরে অভিনেতা জানিয়েছেন, ছবির মৈনাক চরিত্রটি তাঁর ভালো লেগেছিল। পাশাপাশি পরিচালক রণ রাজের গল্প বলার ধরন এবং অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও তাঁকে আকৃষ্ট করেছে।
অর্থাৎ, সোহমের বক্তব্য অনুযায়ী, ছবিতে যুক্ত হওয়ার পিছনে মূল কারণ ছিল চরিত্র, গল্প এবং সহ-অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজের সুযোগ। ছবিটিকে নিজের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার বিষয়টি তিনি সমর্থন করেননি।
চলচ্চিত্রে কোনও অভিনেতার কাছে চরিত্র নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। জনপ্রিয়তা ধরে রাখা, নতুন ধরনের চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরা এবং দর্শকের কাছে অভিনয়ের নতুন দিক তুলে ধরা—সবকিছুর জন্যই উপযুক্ত চিত্রনাট্য বেছে নেওয়া জরুরি।
সোহমের কথায়, মৈনাক চরিত্রটি তাঁর ভালো লেগেছিল। পাশাপাশি পরিচালক রণ রাজ গল্পটিকে ভালোভাবে সাজিয়েছেন বলেও মনে করেন তিনি। কোনও চরিত্রের প্রতি অভিনেতার আগ্রহ তৈরি হলে সেই চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তাঁর কাছে স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে একটি ছবিকে তার গল্প, নির্মাণ এবং অভিনয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। সোহমের বক্তব্যও সেই দিকেই নজর টানে। তাঁর কাছে ছবিটি মূলত অভিনয়ের সুযোগ, কোনও নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি ফেরানোর পরিকল্পনা নয়।
‘সে তো আজও বোঝে না’ ছবিতে প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও সোহমের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, অনেকদিন পর তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। প্রিয়াঙ্কাকে একজন বলিষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
বাংলা ছবিতে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পর্দার রসায়ন দর্শকের আগ্রহের অন্যতম কারণ। আগে একসঙ্গে কাজ করা শিল্পীরা দীর্ঘ বিরতির পর ফের জুটি বাঁধলে দর্শকের কৌতূহল বাড়ে। তাঁদের অভিনয়ের ধরন, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং নতুন ছবিতে চরিত্রের বিন্যাস—সবকিছু নিয়েই আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
তবে কোনও ছবির সাফল্য শুধু পরিচিত অভিনেতাদের একসঙ্গে কাজ করার উপর নির্ভর করে না। গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালনা, সম্পাদনা, সংগীত এবং সামগ্রিক নির্মাণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দর্শকের কাছে ছবির গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে এই সব উপাদানের সম্মিলিত প্রভাব।
সোহমের বক্তব্যে বোঝা যায়, ‘সে তো আজও বোঝে না’ ছবিতে কাজ করার সিদ্ধান্তের পিছনে চরিত্রের পাশাপাশি সহ-অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগও ভূমিকা রেখেছে।
সাক্ষাৎকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সোহমের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন। এই মুহূর্তে কি রাজনীতি তাঁর কাছে দ্বিতীয় সারিতে চলে গিয়েছে? প্রশ্নটি শুনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অভিনেতা জানান, এখন তিনি পুরোপুরি সিনেমায় মনোনিবেশ করতে চান।
এই বক্তব্যে আপাতত তাঁর অগ্রাধিকারের একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাজনৈতিক কাজকর্মের চেয়ে অভিনয়ের উপর বেশি মনোযোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে এই মন্তব্যের ভিত্তিতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। তিনি রাজনীতি ছেড়ে দিচ্ছেন, এমন ঘোষণা সাক্ষাৎকারে করেননি।
অভিনয় এবং রাজনীতি—দুটি ক্ষেত্রেই সময়, পরিশ্রম এবং জনসংযোগের প্রয়োজন রয়েছে। একজন শিল্পী যখন একই সঙ্গে দুই ক্ষেত্রে সক্রিয় থাকেন, তখন সময়ের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। সিনেমার কাজের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে শুটিং, চরিত্রের প্রস্তুতি এবং প্রচারের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নিয়মিত উপস্থিতি ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ জরুরি।
এই দুই দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা যে সহজ নয়, তা বলাই যায়। সোহমের বর্তমান বক্তব্য অনুযায়ী, আপাতত সিনেমার কাজকে অগ্রাধিকার দিতে চান তিনি।
আগামী দিনে তিনি কীভাবে দুই ক্ষেত্রের মধ্যে ভারসাম্য রাখবেন, তা সময়ই বলবে। আপাতত নতুন ছবি এবং অভিনয়ের কাজের মধ্য দিয়েই নিজের পেশাগত পরিচয়কে সামনে রাখতে চাইছেন অভিনেতা।
বাংলা চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল সোহমকে। ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন প্রবণতা, দর্শকের রুচির বদল এবং কাজের ধরন নিয়ে আলোচনা এখন প্রায় নিয়মিত বিষয়। এই পরিস্থিতিতে সব নতুন ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কতটা জরুরি, তা নিয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন অভিনেতা।
সোহমের বক্তব্য, ‘সব ঢেউতেই যে গা ভাসাতে হবে, তার তো কোনও মানে নেই। দেখা যাক...।’
এই মন্তব্যে নিজের কাজের ক্ষেত্রে বেছে চলার প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চলচ্চিত্র জগতে সময়ের সঙ্গে দর্শকের পছন্দ বদলায়। কখনও নির্দিষ্ট ধরনের গল্প জনপ্রিয় হয়, কখনও নতুন ঘরানার ছবি আলোচনায় আসে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারও ছবির নির্মাণ এবং দর্শকের দেখার অভ্যাসে পরিবর্তন এনেছে।
কিন্তু কোনও নতুন প্রবণতা জনপ্রিয় হলেই সব শিল্পীকে সেই পথে হাঁটতে হবে, এমন নয়। অভিনেতা বা নির্মাতার নিজস্ব পছন্দ, কাজের ধরন এবং সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক শিল্পীকে নিজের শক্তির জায়গা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সোহমের বক্তব্য সেই ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। তিনি ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তনকে অস্বীকার করছেন না, আবার প্রতিটি প্রবণতার সঙ্গে তাল মেলানোও বাধ্যতামূলক বলে মনে করছেন না। বরং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষেই তাঁর ইঙ্গিত।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সোহম। তাঁর মতে, বাংলা ছবির সংখ্যা কমে যাওয়া, হলের সংখ্যা হ্রাস এবং প্রযোজকদের বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যথেষ্ট চিন্তার।
তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘চূড়ান্ত ওয়ার্নিং’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রযোজকরা আগের তুলনায় ভরসা হারাচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের টাকা ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সব ছবির স্যাটেলাইট স্বত্ব বিক্রি হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
এই মন্তব্য বাংলা চলচ্চিত্রের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। একটি ছবি তৈরির জন্য প্রযোজককে চিত্রনাট্য, শিল্পী, কলাকুশলী, শুটিং, পোস্ট-প্রোডাকশন, প্রচার এবং বিতরণে অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু ছবি মুক্তির পর সেই অর্থ কতটা ফেরত আসবে, তা নিশ্চিত নয়।
বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য না এলে প্রযোজকের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে, স্যাটেলাইট স্বত্ব বা ডিজিটাল স্বত্ব বিক্রি থেকেও সব ছবির ক্ষেত্রে সমান আয় হয় না। ফলে ছবির ব্যবসায়িক সাফল্যের হিসাব ক্রমশ জটিল হয়ে উঠেছে।
প্রযোজকদের বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়লে নতুন ছবি তৈরির সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে নতুন পরিচালক, নতুন অভিনেতা বা ভিন্নধর্মী গল্পের ক্ষেত্রে অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু সমস্যার দিক নয়, সম্ভাবনার দিকও বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভালো গল্প, দক্ষ নির্মাণ, কার্যকর বিপণন এবং দর্শকের সঙ্গে ছবির সংযোগ তৈরি করতে পারলে নতুন কাজের জন্য জায়গা তৈরি হতে পারে।
সোহমও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিস্থিতি কঠিন হলেও এই অবস্থার মধ্যেই সারভাইভ করতে হবে। অর্থাৎ, সমস্যার কথা তুলে ধরার পাশাপাশি বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেছেন অভিনেতা।
সোহমের বক্তব্যে হলের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সিনেমা হল চলচ্চিত্র ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দর্শক হলে গিয়ে ছবি দেখলে টিকিট বিক্রি থেকে আয় তৈরি হয়, যা ছবির বাণিজ্যিক ফলাফলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
হলের সংখ্যা কমে গেলে কোনও ছবির দর্শকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগও সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে ছোট বাজেটের বাংলা ছবির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রদর্শনের সুযোগ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বড় ছবির পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি বাজেটের ছবির জন্যও হলে জায়গা থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, দর্শকের বিনোদনের অভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। টেলিভিশন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি স্মার্টফোনে বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট দেখার সুযোগ বেড়েছে। ফলে দর্শককে সিনেমা হলে নিয়ে আসতে ছবির বিষয়বস্তু, প্রচার এবং দর্শকের আগ্রহ—সবকিছুর উপর গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
প্রযোজকদের জন্য তাই শুধু ছবি তৈরি করাই যথেষ্ট নয়। কী ধরনের দর্শকের কাছে ছবিটি পৌঁছবে, মুক্তির সময় কী হবে, প্রচারের কৌশল কীভাবে সাজানো হবে এবং অন্যান্য মাধ্যমে ছবির স্বত্ব বিক্রি থেকে কতটা আয় হতে পারে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সোহমের উদ্বেগের জায়গাটি মূলত এই আর্থিক অনিশ্চয়তা। প্রযোজকরা যদি বিনিয়োগের বিষয়ে আস্থা হারান, তাহলে নতুন ছবির সংখ্যা এবং কাজের সুযোগ দুটিই প্রভাবিত হতে পারে।
বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সোহমের বক্তব্যে হাল ছেড়ে দেওয়ার মনোভাব নেই। বরং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি।
একটি চলচ্চিত্রশিল্পের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা, কলাকুশলী, পরিবেশক এবং প্রদর্শকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি দর্শকের আস্থা অর্জন করাও জরুরি। ছবির গল্প ও নির্মাণে নতুনত্ব থাকলে এবং তা দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারলে ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
তবে সব ছবি একই রকম সাফল্য পাবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। চলচ্চিত্র নির্মাণে ঝুঁকি থাকবেই। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি ভিন্নধর্মী এবং নতুন ভাবনার ছবিও তৈরি হওয়ার সুযোগ পাবে।
সোহমের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তিত। একই সঙ্গে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন।
রাজনৈতিক বিতর্ক, জনসমক্ষে তৈরি হওয়া ভাবমূর্তি এবং বাংলা চলচ্চিত্রের আর্থিক অনিশ্চয়তা—সবকিছুর মাঝেও সোহম চক্রবর্তী আপাতত নিজের অভিনয়ের কাজেই মন দিতে চান। তাঁর নতুন ছবি ‘সে তো আজও বোঝে না’ তাঁকে নতুন করে দর্শকের সামনে আসার সুযোগ দিয়েছে।
ছবির মৈনাক চরিত্রটি তাঁর ভালো লেগেছে। পরিচালক রণ রাজের গল্প এবং প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও ছবিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন তিনি।
নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে কোনও বড় পরিকল্পনার কথা না বলে ভালো সিনেমা ও ভালো চরিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন অভিনেতা। পাশাপাশি জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে তিনি পুরোপুরি সিনেমায় মনোনিবেশ করতে চান।
তবে বাংলা ছবির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও তাঁর উদ্বেগ স্পষ্ট। হলের সংখ্যা কমা, প্রযোজকদের বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ছবির স্বত্ব বিক্রি থেকে আয় নিশ্চিত না হওয়ার মতো সমস্যাগুলিকে তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
সব মিলিয়ে সোহম চক্রবর্তীর বক্তব্যে দুটি দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের অভিনয়কে সামনে রাখার ইচ্ছা; অন্যদিকে, বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। আগামী দিনে তাঁর নতুন কাজ দর্শকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হয় এবং তিনি কীভাবে নিজের পেশাগত পথ এগিয়ে নিয়ে যান, সেটাই এখন দেখার।