Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

‘৬ মাস ধরে ও পরিশ্রম করে, তার পরেও বাদ দেওয়া হয়’, সুশান্তকে নিয়ে বিস্ফোরক শেখর কপূর

প্রযোজনা সংস্থার এই ঘোষণার পরে শেখর কপূর নিজেও দেশ ছেড়ে চলে যান। পরে ফিরে আসেন। এই ছবির জন্য সুশান্তের আগ্রহও প্রবল ছিল বলে তিনি জানান।সুশান্ত সিংহ রাজপুতের মৃত্যুর পরে তাঁকে নিয়ে নানা খবর উঠে এসেছিল। এমনও জানা গিয়েছিল, বিভিন্ন প্রযোজনা সংস্থা থেকে নাকি তাঁকে বয়কট করা হয়েছিল। তাঁর পরিচালনায় প্রস্তাবিত ‘পানি’ ছবিটি নিয়েও হয়েছিল বিতর্ক, জানালেন শেখর কপূর।

২০১৪ সালে ‘পানি’ ছবির কথা ঘোষণা হয়েছিল। ছবিটি শেখর কপূরের পরিচালনা করার কথা ছিল। ২০৫০-এর ভারতে কল্পিত একটি বিষয়কে ধরে তৈরি হয়েছিল এই ছবির চিত্রনাট্য। ১২ বছর হয়ে গিয়েছে। তা-ও এই ছবির কথাবার্তা আর কেন এগোয়নি? ছবির কাজ মাঝপথে থেমে গিয়েছিল, এমন নয়। কাজ নাকি শুরুই হয়নি। শেখর কপূর সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমি ‘পানি’ ছবির কাজ শুরুই করতে পারিনি। এক দিন প্রযোজনা সংস্থা সিদ্ধান্ত নিল, ওরা সুশান্তকে এই ছবিতে নেবে না। অথচ, তত দিনে সুশান্ত ছবির চরিত্রের জন্য ছয় মাস ধরে মহড়া দিয়ে ফেলেছে।”

প্রযোজনা সংস্থার এই ঘোষণার পরে শেখর কপূর নিজেও দেশ ছেড়ে চলে যান। পরে ফিরে আসেন। তাঁর কথায়, “এক মাত্র ‘পানি’ ছবি করার জন্যই ফিরে আসি আমি। আমি কিন্তু ওই কাজ থেকে হাত থেকে হাত তুলে দিইনি।” যদিও আর ‘পানি’ ছবির কাজ এগোয়নি।উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১৪ জুন বান্দ্রার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় সুশান্তের দেহ। শেখর সেই সময়ে ছিলেন উত্তরাখণ্ডে। অভিনেতার মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। সুশান্তের মধ্যে নাকি প্রবল অভিনয়ের খিদে ছিল, জানান পরিচালক। তিনি বলেন, “সুশান্ত নিজেকে ‘পানি’ ছবির চরিত্রের সঙ্গেও জড়িয়ে ফেলেছিল। তবে আমি ওর মধ্যে কোনও পার্থক্য লক্ষ করিনি। অভিনয়ের প্রতি ওর নিষ্ঠা ছিল দেখার মতো। ওর মধ্যে কোনও অস্বাভাবিকতা আমি কখনওই দেখেনি। হয়তো ব্যক্তিগত স্তরে ওর সঙ্গে সে ভাবে মিশিনি বলেই আমি জানতাম না কিছুই।”

সুশান্ত সিং রাজপুত: এক প্রতিভাবান অভিনেতার অসমাপ্ত গল্প

২০২০ সালের ১৪ জুন ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের জন্য একটি অত্যন্ত শোকাবহ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই দিনেই মুম্বইয়ের বান্দ্রায় নিজের বাসভবন থেকে উদ্ধার করা হয় বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের নিথর দেহ। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবর মুহূর্তের মধ্যেই গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভক্ত, সহকর্মী, বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যরা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে এত অল্প বয়সে, এত প্রতিভাবান একজন শিল্পী এইভাবে চলে যেতে পারেন।

সুশান্ত সিং রাজপুত ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যিনি শুধুমাত্র বলিউডের তারকা নন, বরং একাধারে ছিলেন একজন চিন্তাশীল মানুষ, স্বপ্নবাজ যুবক এবং বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী একজন কৌতূহলী মনের অধিকারী। তাঁর জীবনের গল্প অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। একটি ছোট শহর থেকে উঠে এসে নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করা খুব সহজ কাজ ছিল না। কিন্তু সুশান্ত সেটাই করে দেখিয়েছিলেন।

ছোট শহর থেকে বলিউডের যাত্রা

সুশান্ত সিং রাজপুতের জন্ম ১৯৮৬ সালের ২১ জানুয়ারি বিহারের পাটনায়। তাঁর পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলেন। বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি দিল্লি কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং (বর্তমানে ডিটিইউ) তে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ধীরে ধীরে এতটাই বাড়তে থাকে যে শেষ পর্যন্ত তিনি পড়াশোনা ছেড়ে অভিনয়ের জগতে পা রাখেন।

প্রথমদিকে তিনি থিয়েটার এবং নাচের মাধ্যমে নিজের অভিনয় দক্ষতা বাড়াতে শুরু করেন। বিখ্যাত কোরিওগ্রাফার শ্যামক দাভারের নাচের দলে যোগ দিয়ে তিনি বিভিন্ন স্টেজ পারফরম্যান্সে অংশ নেন। এরপর তিনি টেলিভিশনের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

টেলিভিশনে জনপ্রিয়তা

টেলিভিশন সিরিয়াল “কিস দেশ মে হ্যায় মেরা দিল” দিয়ে সুশান্ত প্রথম অভিনয় জগতে প্রবেশ করেন। তবে তিনি প্রকৃত জনপ্রিয়তা পান “পবিত্র রিস্তা” সিরিয়ালের মাধ্যমে। এই সিরিয়ালে মানভ চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

“পবিত্র রিস্তা” শুধুমাত্র একটি সিরিয়াল ছিল না, এটি সুশান্তের ক্যারিয়ারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়ায়। দর্শকরা তাঁর অভিনয় এবং সরল ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে যান। এই সিরিয়ালের সাফল্যের পর তিনি বড় পর্দায় কাজ করার সুযোগ পান।

বলিউডে অভিষেক

২০১৩ সালে পরিচালক অভিষেক কাপুরের চলচ্চিত্র “কাই পো চে” দিয়ে সুশান্ত সিং রাজপুত বলিউডে আত্মপ্রকাশ করেন। এই সিনেমায় তাঁর অভিনয় সমালোচক এবং দর্শক—উভয়ের কাছেই প্রশংসা পায়। একজন নতুন অভিনেতা হিসেবে তিনি যে গভীরতা এবং বাস্তবতা নিয়ে চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা অনেককে অবাক করেছিল।

এরপর তিনি একের পর এক উল্লেখযোগ্য সিনেমায় অভিনয় করেন। “শুদ্ধ দেশি রোমান্স”, “ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী”, “এম.এস. ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি”, “ছিছোরে”, “কেদারনাথ” ইত্যাদি চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

বিশেষ করে “এম.এস. ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি” সিনেমায় ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির চরিত্রে অভিনয় করে তিনি অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন। এই চরিত্রের জন্য তিনি দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন—ক্রিকেট অনুশীলন থেকে শুরু করে ধোনির শরীরী ভাষা পর্যন্ত সবকিছু নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছিলেন।

অভিনয়ের প্রতি অসাধারণ নিষ্ঠা

অনেক পরিচালক এবং সহ-অভিনেতা বারবার বলেছেন যে সুশান্ত সিং রাজপুত অভিনয়ের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ছিলেন। পরিচালক শেখর কাপুরও এমনটাই বলেছেন। তাঁর মতে, সুশান্তের মধ্যে অভিনয়ের প্রতি এক ধরনের প্রবল ক্ষুধা ছিল। তিনি সবসময় নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করতেন এবং নিজের চরিত্রকে আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য প্রচুর সময় ব্যয় করতেন।

শেখর কাপুর একটি সাক্ষাৎকারে জানান যে তিনি “পানি” নামের একটি চলচ্চিত্রে সুশান্তকে নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করেছিলেন। যদিও নানা কারণে সেই সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি, তবুও সেই সময়কার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন যে সুশান্ত চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে ফেলেছিলেন।

পরিচালকের ভাষায়, সুশান্ত নিজের চরিত্রকে শুধুমাত্র অভিনয় করতেন না, বরং সেই চরিত্রের মতো করে ভাবতে এবং অনুভব করতে চেষ্টা করতেন। এই ধরনের নিষ্ঠা একজন প্রকৃত শিল্পীর মধ্যেই দেখা যায়।

news image
আরও খবর

ব্যক্তিত্ব এবং কৌতূহলী মন

সুশান্ত শুধু অভিনেতা ছিলেন না। তিনি বিজ্ঞানের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। মহাকাশ, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে জানার প্রতি তাঁর গভীর কৌতূহল ছিল। তিনি একটি শক্তিশালী টেলিস্কোপ কিনেছিলেন যাতে রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

এছাড়াও তিনি নাসার বিভিন্ন প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন এবং মহাকাশ ভ্রমণের স্বপ্নও দেখতেন। তিনি প্রায়ই সামাজিক মাধ্যমে মহাকাশ এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পোস্ট করতেন।

তাঁর একটি “৫০টি স্বপ্নের তালিকা”ও ছিল, যেখানে তিনি জীবনে করতে চান এমন নানা কাজের কথা লিখেছিলেন। যেমন—উড়োজাহাজ চালানো শেখা, মহাকাশ সম্পর্কে আরও জানা, কোডিং শেখা, এবং বিভিন্ন নতুন দক্ষতা অর্জন করা।

মৃত্যুর ঘটনা এবং প্রতিক্রিয়া

২০২০ সালের ১৪ জুন যখন তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসে, তখন গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। মুম্বইয়ের বান্দ্রায় তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর দেহ। পুলিশ জানায় যে এটি আত্মহত্যার ঘটনা হতে পারে, তবে পরে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক তদন্ত এবং বিতর্কও সৃষ্টি হয়।

এই ঘটনার সময় পরিচালক শেখর কাপুর ছিলেন উত্তরাখণ্ডে। খবরটি শুনে তিনিও গভীরভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, সুশান্তের মধ্যে তিনি কখনও কোনও অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেননি। বরং তিনি সবসময় একজন উদ্যমী এবং কাজের প্রতি নিবেদিত মানুষ হিসেবেই তাঁকে দেখেছেন।

শেখর কাপুর আরও বলেন, হয়তো ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের মধ্যে খুব গভীর বন্ধুত্ব ছিল না, তাই সুশান্তের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাগুলো সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না।

ভক্তদের ভালোবাসা

সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর পর তাঁর ভক্তরা সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করতে শুরু করেন। অনেকেই মনে করেন, তিনি ছিলেন এমন একজন অভিনেতা যিনি নিজের পরিশ্রম এবং প্রতিভার মাধ্যমে বলিউডে জায়গা তৈরি করেছিলেন।

তাঁর সিনেমা “ছিছোরে” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ সেই সিনেমার মূল বার্তা ছিল—জীবনে ব্যর্থতা এলেও কখনও হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। অনেক ভক্ত মনে করেন, এই বার্তাটিই সুশান্তের জীবনের সঙ্গে এক ধরনের গভীর সংযোগ তৈরি করে।

অসমাপ্ত সম্ভাবনা

সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যু ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তিনি এমন একজন অভিনেতা ছিলেন, যার মধ্যে ভবিষ্যতে আরও অনেক বড় কাজ করার সম্ভাবনা ছিল। তাঁর অভিনয়ের দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

অনেকেই বিশ্বাস করেন, যদি তিনি আরও কিছু বছর বেঁচে থাকতেন, তবে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজের প্রতিভা প্রমাণ করতে পারতেন।

উপসংহার

সুশান্ত সিং রাজপুতের জীবন আমাদের অনেক কিছু শেখায়। তিনি দেখিয়েছেন যে একটি ছোট শহর থেকেও বড় স্বপ্ন দেখা সম্ভব। কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকলে সাফল্য অর্জন করা যায়।

তাঁর মৃত্যু যতটা দুঃখজনক, তাঁর জীবন ততটাই অনুপ্রেরণামূলক। একজন শিল্পী হিসেবে তিনি দর্শকদের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

আজও যখন তাঁর সিনেমা দেখা হয়, তখন মনে হয় তিনি যেন এখনও আমাদের মাঝে আছেন। তাঁর হাসি, তাঁর অভিনয় এবং তাঁর স্বপ্ন—সবকিছুই ভক্তদের মনে অমলিন হয়ে থাকবে।

সুশান্ত সিং রাজপুত হয়তো আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর প্রতিভা, তাঁর কাজ এবং তাঁর স্মৃতি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

Preview image