ধুরন্ধর ২ এর প্রথম ঝলক প্রকাশ্যে আসতেই দর্শকের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো তবে একই সময়ে টক্সিক এর ঝলক ঘিরে তুমুল আলোচনা শুরু হওয়ায় বক্স অফিসে সম্ভাব্য প্রতিযোগিতা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে।
বলিউডে বড় বাজেটের ছবি মানেই উত্তেজনা, প্রতীক্ষা এবং বক্স অফিসের সমীকরণ নিয়ে বিশাল আলোচনা। সাম্প্রতিক সময়ে সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ধুরন্ধর এবং তার সিক্যুয়েল ধুরন্ধর ২। প্রথম ছবিটি যেভাবে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিল, তাতে দ্বিতীয় পর্ব নিয়ে প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই তুঙ্গে।
গত কয়েক বছরের সমস্ত নজির ভেঙে দিয়ে আদিত্য ধর পরিচালিত ‘ধুরন্ধর’ শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যই পায়নি, সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছে। গুপ্তচর-থ্রিলারের মোড়কে দেশপ্রেম, আবেগ ও অ্যাকশনের মিশেলে তৈরি এই ছবি দর্শকের মনে বিশেষ জায়গা করে নেয়। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯ মার্চ মুক্তি পেতে চলেছে ‘ধুরন্ধর ২’।
তবে মুক্তির আগেই শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। কারণ একই সময়ে আলোচনায় রয়েছে আর একটি বড় বাজেটের ছবি— টক্সিক। দুই তারকার দুই বড় ছবি একই সময় মুক্তি পেলে বক্স অফিসে তার প্রভাব কেমন হতে পারে? সেই প্রশ্ন নিয়েই সরব পরিচালক সঞ্জয় গুপ্ত।
‘ধুরন্ধর’ মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়েছিল। প্রথম সপ্তাহেই ছবির আয় কয়েকশো কোটির গণ্ডি পেরোয়। আন্তর্জাতিক বাজারেও ছবির দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো।
পরিচালক আদিত্য ধর-এর পরিচালনায় ছবিটি পেয়েছিল শক্তিশালী চিত্রনাট্য, নিখুঁত অ্যাকশন দৃশ্য এবং আবেগঘন মুহূর্তের সুষম মিশ্রণ। বিশেষ করে গুপ্তচর ‘হামজ়া’ চরিত্রে রণবীর সিংহ-এর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল দর্শক ও সমালোচক মহলে।
এই সাফল্যের পর ‘ধুরন্ধর ২’ নিয়ে প্রত্যাশা যে আকাশছোঁয়া হবে, তা বলাই বাহুল্য।
দ্বিতীয় পর্বে হামজ়ার অতীত, তার মানসিক দ্বন্দ্ব, এবং কীভাবে সে এক সাধারণ যুবক থেকে দক্ষ গুপ্তচর হয়ে ওঠে—সেই যাত্রাপথ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। ট্রেলার ও প্রথম ঝলক ইতিমধ্যেই দর্শকের মধ্যে আলোড়ন তুলেছে।
অ্যাকশন দৃশ্য আরও বড়, লোকেশন আরও আন্তর্জাতিক, এবং গল্পে রয়েছে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত। সব মিলিয়ে নির্মাতারা এটিকে আগের চেয়েও বৃহত্তর ক্যানভাসে তৈরি করেছেন।
অন্য দিকে, ‘টক্সিক’ নিয়েও উত্তেজনা কম নয়। দক্ষিণী তারকা যশ অভিনীত এই ছবি প্রথম ঝলকেই নজর কাড়ে। তবে সেই ঝলক ঘিরে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে—বিশেষ করে গল্পের প্রেক্ষাপট ও চরিত্রের উপস্থাপনা নিয়ে।
তবু বিতর্ক কখনও কখনও ছবির প্রচারে সাহায্য করে—এমন মত অনেক বিশ্লেষকের। ফলে মুক্তির আগে থেকেই ‘টক্সিক’ দর্শকের কৌতূহলের কেন্দ্রে।
পরিচালক সঞ্জয় গুপ্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, একই সময়ে দু’টি বড় ছবি মুক্তি পেলে দু’টির ব্যবসাতেই প্রভাব পড়ে। তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে তিনি তুলে ধরেন একটি উদাহরণ—
২০১৭ সালে তাঁর পরিচালিত কাবিল মুক্তি পেয়েছিল রইস-এর সঙ্গে। ‘রইস’-এ অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান। সেই সংঘর্ষের ফলে ‘কাবিল’-এর আয় প্রভাবিত হয়েছিল বলে দাবি করেন সঞ্জয়।
তাঁর কথায়,
“আমাদের দেশের মানুষের হাতে এত টাকা নেই যে, একই সময়ে দু’টি বড় ছবি হলে দুটোই দেখবেন। অনেকেই মাসে একটি ছবিই দেখতে পারেন না। তাই একই সময়ে দু’টি বড় ছবির মুক্তি আদর্শ নয়।”
ভারতের সিনেমা বাজার বিশাল হলেও দর্শকের ক্রয়ক্ষমতা সীমাহীন নয়। মাল্টিপ্লেক্সের টিকিটের দাম, খাবারের খরচ, যাতায়াত—সব মিলিয়ে একটি ছবি দেখা এখন বেশ ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতা।
ফলে একই সপ্তাহে দুই বড় তারকার ছবি মুক্তি পেলে দর্শককে বেছে নিতে হয়। এতে দু’টি ছবিই সম্ভাব্য আয় হারাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সলো রিলিজ পেলে যে ছবিটি ৩০০-৪০০ কোটির ব্যবসা করতে পারত, ক্ল্যাশের কারণে তা কমে যেতে পারে উল্লেখযোগ্যভাবে।
এক দিকে রণবীরের অ্যাকশন-থ্রিলার ‘ধুরন্ধর ২’, অন্য দিকে যশের বহুল প্রতীক্ষিত ‘টক্সিক’। দু’টি ছবির ঘরানা আলাদা হলেও তারকাখ্যাতি এবং ফ্যানবেস—দু’টিই শক্তিশালী।
রণবীরের অনুরাগীরা হামজ়ার গল্পের পরবর্তী অধ্যায়ের জন্য অপেক্ষায়। অন্য দিকে, যশের ভক্তরা তাঁর নতুন অবতারের ঝলক দেখার জন্য উৎসুক।
এই পরিস্থিতিতে বক্স অফিসে কে এগিয়ে থাকবে, তা নির্ভর করবে—
গল্পের শক্তি
মুখে মুখে প্রচার (Word of Mouth)
প্রথম সপ্তাহের কালেকশন
সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া
ধরা যাক, দুই ছবিই প্রথম সপ্তাহে মুক্তি পেল। প্রেক্ষাগৃহের স্ক্রিন ভাগ হয়ে যাবে। ফলে শো-এর সংখ্যা কমবে।
প্রথম তিন দিন (ওপেনিং উইকএন্ড) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়েই ছবি বড় অংশের আয় তুলে নেয়। যদি দর্শক বিভক্ত হয়, তবে প্রত্যাশিত আয় কমে যেতে পারে।
এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব পড়তে পারে, কারণ বড় রিলিজের সময় বিদেশি ডিস্ট্রিবিউটররা স্ক্রিন বরাদ্দ নিয়ে হিসেব কষে।
পরিচালক সঞ্জয় গুপ্ত স্পষ্ট ভাষাতেই তাঁর আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, একই সময়ে দু’টি বড় বাজেটের, তারকাখচিত ছবি মুক্তি পেলে স্বাভাবিক ভাবেই ব্যবসায় প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন,
“দু’টি ছবির মধ্যেই বক্স অফিস কাঁপানোর ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এক সময়ে মুক্তি পাওয়ার কারণে যতটা ভাল করার কথা, ততটা করবে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক।”
সঞ্জয়ের বক্তব্যে হতাশার সুর থাকলেও তাতে অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। বহু বছর ধরে বলিউডে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন—মুক্তির সময় নির্বাচন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছবির ভাগ্য অনেকাংশেই নির্ভর করে তার সলো রিলিজের উপর। কারণ প্রথম সপ্তাহেই একটি ছবি তার মোট আয়ের বড় অংশ তুলে নেয়। সেই সময় যদি দর্শক বিভক্ত হয়ে যায়, তাহলে সম্ভাব্য আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
তবে সঞ্জয় এ-ও স্বীকার করেছেন যে প্রযোজক ও পরিচালকেরা নিশ্চয়ই সমস্ত হিসেব-নিকেশ করেই মুক্তির তারিখ স্থির করেন। বড় তারকা, ছুটির মরসুম, প্রেক্ষাগৃহের প্রাপ্যতা, আন্তর্জাতিক বাজার—সব কিছু মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই তিনি সরাসরি কোনও পক্ষকে দোষারোপ করেননি। বরং বাস্তব পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন।
ধুরন্ধর ইতিমধ্যেই বক্স অফিসে ইতিহাস গড়েছে। মুক্তির পর থেকেই ছবিটি একের পর এক রেকর্ড ভেঙেছে। দেশপ্রেমের আবেগ, টানটান অ্যাকশন, আর শক্তিশালী অভিনয়—সব মিলিয়ে ছবিটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে গুপ্তচর হামজ়া চরিত্রে রণবীর সিংহ-এর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল।
এই বিপুল সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা বেড়েছে ধুরন্ধর ২-কে ঘিরে। সিক্যুয়েলের ক্ষেত্রে সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ থাকে—প্রথম ছবির সাফল্যকে অতিক্রম করা। দর্শক নতুনত্ব চান, কিন্তু একই সঙ্গে আগের আবেগও ফিরে পেতে চান। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখাই নির্মাতাদের কাছে সবচেয়ে বড় কাজ।
‘ধুরন্ধর ২’-এ হামজ়ার অতীত এবং তার গুপ্তচর হয়ে ওঠার গল্প আরও গভীরভাবে দেখানো হবে বলে জানা গিয়েছে। ফলে চরিত্রের মানসিক দিক, দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তিগত যাত্রাপথ—সবই বড় পরিসরে ফুটে উঠতে পারে। এই দিকটি ছবির অন্যতম আকর্ষণ হতে চলেছে।
অন্য দিকে, একই সময়ে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে টক্সিক। দক্ষিণী তারকা যশ-এর উপস্থিতি ছবিটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। প্রথম ঝলক প্রকাশের পর থেকেই দর্শকের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যদিও কিছু বিতর্কও সামনে এসেছে, কিন্তু অনেক সময় বিতর্ক ছবির প্রচারকেই বাড়িয়ে দেয়।
যশের আগের সাফল্য তাঁকে সর্বভারতীয় তারকায় পরিণত করেছে। ফলে ‘টক্সিক’ শুধু একটি আঞ্চলিক ছবি নয়, বরং সর্বভারতীয় দর্শকের লক্ষ্যেই তৈরি। এই পরিস্থিতিতে ‘ধুরন্ধর ২’ এবং ‘টক্সিক’-এর সংঘর্ষ নিঃসন্দেহে বক্স অফিসের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
ভারতের মতো দেশে সিনেমা এখনও বড় বিনোদনের মাধ্যম হলেও দর্শকের আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মাল্টিপ্লেক্সের টিকিটের দাম, পারিবারিক খরচ—সব মিলিয়ে অনেকেই মাসে একটির বেশি ছবি হলে গিয়ে দেখতে পারেন না।
এই বাস্তবতায় একই সময়ে দুই বড় ছবি মুক্তি পেলে দর্শককে বেছে নিতে হয়। কেউ হয়তো প্রথম সপ্তাহে একটি দেখবেন, অন্যটি পরে ওটিটি-তে। কেউ হয়তো তারকা-প্রীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন। আবার কেউ সমালোচনার ভিত্তিতে পছন্দ করবেন।
ফলে দুই ছবিরই সম্ভাব্য আয় কিছুটা হলেও কমতে পারে। বিশেষ করে প্রথম সপ্তাহের কালেকশন, যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।
সিনেমা একদিকে শিল্প, অন্যদিকে বড় ব্যবসা। প্রযোজকেরা শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। তাই মুক্তির তারিখ নির্ধারণ অত্যন্ত কৌশলগত বিষয়। কখনও উৎসবের মরসুম, কখনও ছুটির সময়—সব হিসেব করেই পরিকল্পনা হয়।
তবে একই সময়ে দুই বড় ছবি এলে স্ক্রিন ভাগ হয়ে যায়। এতে শো-এর সংখ্যা কমে, এবং প্রতিটি ছবির প্রদর্শনীর সুযোগ সীমিত হয়। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ছবির মোট আয়ে প্রভাব পড়ে।
সঞ্জয় গুপ্তর বক্তব্য সেই ব্যবসায়িক বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। তাঁর মতে, দু’টি ছবিই হয়তো আলাদা সময়ে মুক্তি পেলে আরও বড় সাফল্য পেতে পারত।
১৯ মার্চ মুক্তির পরই বোঝা যাবে কোন ছবি দর্শকের মন জয় করতে পারল। প্রথম তিন দিনের আয় অনেকটাই ইঙ্গিত দেবে ছবির ভবিষ্যৎ নিয়ে। মুখে মুখে প্রচার (Word of Mouth) এখানে বড় ভূমিকা নেবে।
যদি দুই ছবিই ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়, তাহলে হয়তো দু’টিই দীর্ঘ দৌড়ে ভালো ব্যবসা করবে। তবে শুরুটা যে চ্যালেঞ্জিং হবে, তা বলাই যায়।
সব মিলিয়ে, বলিউডে আসন্ন এই সংঘর্ষ শুধু দুই ছবির নয়, বরং দুই দর্শক-শিবিরেরও। একদিকে রণবীরের ‘ধুরন্ধর ২’, অন্যদিকে যশের ‘টক্সিক’।
সঞ্জয় গুপ্ত এটিকে “দুর্ভাগ্যজনক” বললেও শেষ কথা বলবেন দর্শকরাই। তাঁরা কি দুই ছবিকেই সমান সুযোগ দেবেন? নাকি একটিকে এগিয়ে রাখবেন?
উত্তর মিলবে মুক্তির পর। তবে এখনই স্পষ্ট—এই দ্বৈরথ ঘিরে উত্তেজনার পারদ চরমে, আর বলিউডের বক্স অফিস অপেক্ষা করছে এক রুদ্ধশ্বাস ফলাফলের জন্য