বাংলা সাহিত্যের দুই জনপ্রিয় গোয়েন্দা ফেলুদা ও ব্যোমকেশের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। এবার তাঁকে ঘিরে জল্পনা, নতুন এক গোয়েন্দা চরিত্রে আবারও রহস্যভেদের অভিযানে দেখা যেতে পারে অভিনেতাকে।
বাংলা সাহিত্যের গোয়েন্দা চরিত্রের জগৎ বরাবরই বাঙালি পাঠক ও দর্শকের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। যুগে যুগে নানা লেখকের কলমে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গোয়েন্দা চরিত্র, যাঁদের রহস্যভেদ, বুদ্ধিমত্তা এবং সাহসিকতার কাহিনি পাঠকদের মুগ্ধ করেছে। সেই দীর্ঘ তালিকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় নামগুলির মধ্যে রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি ফেলুদা এবং শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টি ব্যোমকেশ বক্সী। সাহিত্য থেকে সিনেমা, টেলিভিশন থেকে ওয়েব সিরিজ— এই দুই চরিত্রের জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে। আর এই দুই কিংবদন্তি গোয়েন্দার চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা ও ভালবাসা অর্জন করেছিলেন অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়।
গোয়েন্দা চরিত্রের সঙ্গে পরমব্রতের সম্পর্ক নতুন নয়। অভিনয় জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি একাধিক রহস্যকাহিনি এবং থ্রিলারধর্মী কাজে যুক্ত থেকেছেন। শুধু অভিনেতা হিসাবেই নয়, পরিচালক হিসাবেও গোয়েন্দা গল্পের জগতে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ফলে নতুন কোনও গোয়েন্দা চরিত্রে তাঁকে দেখা যেতে পারে— এমন খবর প্রকাশ্যে আসতেই বাংলা বিনোদন জগতে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে বর্তমানে যে জল্পনা চলছে, তাতে জানা যাচ্ছে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় নাকি আবারও এক নতুন গোয়েন্দার ভূমিকায় ফিরতে চলেছেন। তবে এবার আর বড়পর্দায় নয়, বরং ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে হাজির হবেন তিনি। যদিও এখনও পর্যন্ত নির্মাতা, প্রযোজনা সংস্থা বা সংশ্লিষ্ট ওটিটি প্ল্যাটফর্মের তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি, তবু বিভিন্ন সূত্রে খবর, নতুন এই সিরিজে পরমব্রতকে দেখা যেতে পারে গোয়েন্দা আদিত্যনাথ মজুমদারের চরিত্রে।
বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের ইতিহাসে ফেলুদা এবং ব্যোমকেশের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি প্রদোষচন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন ষাটের দশকে। বুদ্ধি, যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং অসাধারণ স্মৃতিশক্তির জোরে ফেলুদা খুব দ্রুতই পাঠকদের প্রিয় চরিত্রে পরিণত হন। তাঁর সঙ্গে তোপসে এবং জটায়ুর ত্রয়ী বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। অন্যদিকে ব্যোমকেশ বক্সীকে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও গোয়েন্দা বলেননি, বরং ‘সত্যান্বেষী’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। সত্যের অনুসন্ধানই তাঁর প্রধান কাজ। সমাজ, মানুষ এবং অপরাধের গভীরে প্রবেশ করে সত্য উদঘাটনের ক্ষমতা ব্যোমকেশকে অন্য সব গোয়েন্দার থেকে আলাদা করেছে।
এই দুই কিংবদন্তি চরিত্রে অভিনয় করা কোনও অভিনেতার পক্ষেই সহজ কাজ নয়। কারণ দর্শকদের মনে আগে থেকেই চরিত্রগুলির একটি স্পষ্ট চেহারা এবং ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। সেই প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অভিনয় করা সব সময়ই বড় চ্যালেঞ্জ। পরমব্রত সেই চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেছিলেন। তাঁর অভিনয়ে ব্যোমকেশ যেমন আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছিল, তেমনই চরিত্রের মূল বৈশিষ্ট্যও অটুট ছিল। ফলে দর্শকদের একটি বড় অংশ তাঁর অভিনয়কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছিলেন।
ফেলুদার জগতের সঙ্গেও পরমব্রতের সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘সাবাশ ফেলুদা’ সিরিজের পরিচালক ছিলেন তিনি। এই সিরিজে সত্যজিৎ রায়ের জনপ্রিয় দুটি কাহিনি ‘গ্যাংটকে গন্ডগোল’ এবং ‘ভূস্বর্গ ভয়ঙ্কর’-কে নতুনভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। পরিচালনার ক্ষেত্রে পরমব্রত চেষ্টা করেছিলেন মূল গল্পের আবহ বজায় রেখে সমসাময়িক দর্শকদের উপযোগী একটি উপস্থাপনা তৈরি করতে। ফলে পরিচালক হিসাবেও গোয়েন্দা কাহিনির ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই।
এবার সেই অভিজ্ঞতা এবং জনপ্রিয়তার ভিত্তিতেই নতুন এক গোয়েন্দা চরিত্রে তাঁর প্রত্যাবর্তনের জল্পনা আরও জোরদার হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছে, নতুন সিরিজে গোয়েন্দা আদিত্যনাথ মজুমদারের ভূমিকায় দেখা যেতে পারে তাঁকে। যদিও চরিত্রটি সম্পর্কে এখনও খুব বেশি তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও ধারণা করা হচ্ছে এটি হবে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি গোয়েন্দা সিরিজ, যেখানে রহস্য, মনস্তত্ত্ব, অপরাধ তদন্ত এবং আধুনিক প্রযুক্তির মিশ্রণ দেখা যেতে পারে।
পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে অরিত্র সেন। বাংলা ওটিটি দুনিয়ায় অরিত্র ইতিমধ্যেই নিজের কাজের মাধ্যমে একটি আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন। তাঁর পরিচালনায় তৈরি বিভিন্ন প্রজেক্ট দর্শকদের নজর কেড়েছে। ফলে তাঁর সঙ্গে পরমব্রতের জুটি তৈরি হলে তা নিঃসন্দেহে দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি ঘোষণা না হওয়ায় সবটাই আপাতত জল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
খবর অনুযায়ী, সিরিজটি নাকি মুক্তি পেতে পারে জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই-এ। গত কয়েক বছরে বাংলা ওয়েব সিরিজের বাজারে হইচই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে রহস্য, থ্রিলার এবং গোয়েন্দা ঘরানার সিরিজগুলির ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মটির সাফল্য উল্লেখযোগ্য। ব্যোমকেশ, একেনবাবু, শবর, ইন্দুবালা থেকে শুরু করে একাধিক জনপ্রিয় সিরিজ ইতিমধ্যেই দর্শকদের মন জয় করেছে। ফলে নতুন কোনও গোয়েন্দা চরিত্র নিয়ে হইচই যদি সত্যিই এগিয়ে আসে, তাহলে তা দর্শকদের আগ্রহ আরও বাড়াবে।
প্রযোজনার দায়িত্বে ‘রোড শো প্রোডাকশন’ থাকতে পারে বলেও খবর শোনা যাচ্ছে। তবে প্রযোজনা সংস্থার তরফেও এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। বিনোদন জগতের নানা প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে এমন গোপনীয়তা বজায় রাখা নতুন কিছু নয়। অনেক সময় চিত্রনাট্য, কাস্টিং বা শুটিং সংক্রান্ত কাজ এগিয়ে যাওয়ার পরেই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়। তাই এই প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সেই পথই অনুসরণ করা হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
বাংলা বিনোদন জগতে বর্তমানে গোয়েন্দা কাহিনির জনপ্রিয়তা আবারও তুঙ্গে। একদিকে যেমন পুরনো জনপ্রিয় চরিত্রদের নতুন রূপে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন গোয়েন্দা চরিত্রও তৈরি হচ্ছে। দর্শকদের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গোয়েন্দা গল্পের ধরনও বদলাচ্ছে। এখন শুধু খুনের রহস্য নয়, সাইবার অপরাধ, মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার, আন্তর্জাতিক চক্র, কর্পোরেট ষড়যন্ত্র— নানা বিষয় গোয়েন্দা গল্পে জায়গা করে নিচ্ছে। ফলে নতুন গোয়েন্দা আদিত্যনাথ মজুমদার যদি সত্যিই পর্দায় আসেন, তাহলে তাঁকে ঘিরে দর্শকদের প্রত্যাশাও থাকবে অনেক বেশি।
পরমব্রতের অভিনয় জীবনের দিকে তাকালেও বোঝা যায়, তিনি সব সময় নিজেকে নতুন নতুন চরিত্রে ভাঙতে পছন্দ করেন। বাণিজ্যিক ছবি, আর্ট ফিল্ম, থ্রিলার, ওয়েব সিরিজ, আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট— সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। ফলে নতুন কোনও গোয়েন্দা চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখার জন্য দর্শকদের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক।
তবে এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষের তরফে চূড়ান্ত ঘোষণা না আসায় বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের খবর এবং ক্রমবর্ধমান জল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলা ওটিটি জগৎ খুব শীঘ্রই হয়তো আরও এক নতুন গোয়েন্দার সঙ্গে পরিচিত হতে চলেছে। ফেলুদা, ব্যোমকেশ কিংবা সোনাদার মতো জনপ্রিয় চরিত্রদের ভিড়ে আদিত্যনাথ মজুমদার নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
বাংলা দর্শক বরাবরই ভালো গোয়েন্দা গল্পকে সাদরে গ্রহণ করেছে। তাই যদি সত্যিই এই নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাংলা ওয়েব সিরিজের জগতে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হতে পারে। আর সেই যাত্রার কেন্দ্রে থাকবেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়— এমন এক অভিনেতা, যিনি ইতিমধ্যেই বাংলা গোয়েন্দা চরিত্রের ইতিহাসে নিজের নাম লিখে ফেলেছেন।
এদিকে বাংলা ওটিটি দুনিয়ায় গোয়েন্দা সিরিজের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা নির্মাতাদের নতুন নতুন চরিত্র নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করছে। দর্শকরাও এখন পরিচিত চরিত্রের পাশাপাশি একেবারে নতুন গোয়েন্দার গল্প দেখতে আগ্রহী। সেই কারণেই আদিত্যনাথ মজুমদার চরিত্রকে ঘিরে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। চরিত্রটির পটভূমি, তদন্তের ধরন কিংবা ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এখনও কোনও তথ্য প্রকাশ্যে না এলেও, অনেকেই মনে করছেন এটি প্রচলিত গোয়েন্দা চরিত্রগুলির থেকে কিছুটা আলাদা হতে পারে।
পরমব্রতের অভিনয় দক্ষতা এই চরিত্রকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে বলেই ধারণা দর্শকদের একাংশের। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে জটিল এবং বহুস্তরীয় চরিত্রে অভিনয় করার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট পারদর্শী। ফলে নতুন এই রহস্যভেদী চরিত্র যদি সত্যিই তাঁর ঝুলিতে আসে, তাহলে দর্শকরা নিঃসন্দেহে একটি পরিণত এবং আকর্ষণীয় অভিনয় উপহার পাবেন। এখন শুধু অপেক্ষা আনুষ্ঠানিক ঘোষণার। প্রযোজনা সংস্থা, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম কিংবা অভিনেতার তরফে সবুজ সংকেত মিললেই স্পষ্ট হবে, বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির ভাণ্ডারে সত্যিই কি আরও এক নতুন নাম যুক্ত হতে চলেছে, নাকি আপাতত সবটাই রয়ে যাবে জল্পনার গণ্ডিতে।