Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে নয়া সমীকরণ মোদীর সম্মতির দাবি ট্রাম্পের, শুল্ক ১৮ শতাংশে নামানোসহ একাধিক শর্ত সামনে

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, শুল্ক সমঝোতার উদ্যোগ আসে মোদীর দিক থেকেই। মার্কিন শুল্ক কমানোর বদলে আমেরিকার একাধিক পণ্য বেশি করে কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত—এমনটাই দাবি প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্টের।ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, শুল্ক সমঝোতার উদ্যোগ আসে মোদীর দিক থেকেই। মার্কিন শুল্ক কমানোর বদলে আমেরিকার একাধিক পণ্য বেশি করে কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত—এমনটাই দাবি প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্টের।

রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে নয়া সমীকরণ মোদীর সম্মতির দাবি ট্রাম্পের, শুল্ক ১৮ শতাংশে নামানোসহ একাধিক শর্ত সামনে
International Affairs

আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক হঠাৎ কমে যাওয়ার ঘোষণায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। এতদিন যেখানে ভারতের উপর কার্যকর শুল্কের হার কার্যত ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল, সেখানে তা কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা। এই আচমকা সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump নিজেই যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক ও কূটনৈতিক জল্পনা।

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই শুল্ক সমঝোতার মূল সূত্রপাত প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi-র অনুরোধেই। তাঁর বক্তব্য, বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে এবং দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করতে মোদী নিজেই উদ্যোগী হন। সেই আলোচনার ফলেই ভারতের উপর চাপানো ‘পারস্পরিক শুল্ক’ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামানো হয়েছে।

রাশিয়ার তেল ও শুল্ক ছাড় সংযোগ কোথায়?

ট্রাম্পের ব্যাখ্যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল তেল আমদানির প্রশ্ন। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী মোদী রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন। পরিবর্তে ভারত আমেরিকা থেকে অনেক বেশি পরিমাণে তেল আমদানি করবে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে ভেনেজুয়েলা থেকেও তেল কেনার পথে হাঁটতে পারে ভারত—এমন ইঙ্গিতও দেন ট্রাম্প।

রুশ ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাশিয়ার উপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে পশ্চিমী দেশগুলি। সেই পরিস্থিতিতে ভারতের রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণে সস্তা তেল কেনা ওয়াশিংটনের চোখে দীর্ঘদিন ধরেই অস্বস্তির কারণ ছিল। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই একাধিকবার অভিযোগ করেছিলেন, যুদ্ধের সময় রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনে ভারত কার্যত মস্কোর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। এই বিষয়টিকেই ভারতের উপর চড়া হারে শুল্ক চাপানোর অন্যতম যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি।

‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ট্রাম্পের পোস্ট

সোমবার রাতে মোদীর সঙ্গে ফোনে কথোপকথনের পর ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম Truth Social-এ একটি দীর্ঘ পোস্ট করেন। সেখানে তিনি জানান, বাণিজ্য, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং রুশ ইউক্রেন যুদ্ধ এই তিনটি বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। তাঁর পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, “তিনি (মোদী) রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন। ভারত আমেরিকার কাছ থেকে আরও অনেক বেশি তেল কিনবে।”

এই ঘোষণার পরই স্পষ্ট হয়ে যায়, শুল্ক হ্রাসের সঙ্গে জ্বালানি কূটনীতির একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

মোদীর প্রতিক্রিয়া: ধন্যবাদ, কিন্তু নীরবতা

ট্রাম্পের পোস্টের কিছুক্ষণ পরেই সমাজমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তের জন্য ১৪০ কোটি ভারতবাসীর পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। তবে লক্ষণীয় বিষয় হল—রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করা বা আমেরিকা থেকে বেশি করে তেল কেনার বিষয়ে তিনি কোনও সরাসরি মন্তব্য করেননি।

এই নীরবতাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, মোদীর বক্তব্যে সচেতনভাবেই কৌশলগত অস্পষ্টতা রাখা হয়েছে। কারণ, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক বিষয়, যা কোনও একক দেশের উপর নির্ভর করে পরিচালিত হয় না।

৫০ হাজার কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে ভারত আমেরিকা থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলারের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৫ লক্ষ ২৫ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। এই তালিকায় রয়েছে শক্তি, প্রযুক্তি, কয়লা, কৃষিজ পণ্য এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক সামগ্রী।

ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকার রপ্তানি বাড়বে এবং মার্কিন অর্থনীতি উপকৃত হবে। তাঁর মতে, এতদিন ভারতীয় বাজারে মার্কিন পণ্যের উপর অতিরিক্ত শুল্ক ও নানা বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা ছিল। নতুন সমঝোতায় ভারত সেই বাধাগুলি ধীরে ধীরে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে।

৫০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশ—শুল্কের দীর্ঘ যাত্রাপথ

এই ঘোষণার আগে পর্যন্ত আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর কার্যত ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ ছিল ‘পারস্পরিক শুল্ক’ এবং রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ছিল ‘জরিমানা শুল্ক’। সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, পারস্পরিক শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হচ্ছে।

প্রথমে এই প্রশ্ন উঠেছিল যে, অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ জরিমানা শুল্ক বহাল থাকবে কি না। পরে হোয়াইট হাউসের আধিকারিক সূত্রে Reuters জানায়, রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য যে ২৫ শতাংশ জরিমানা শুল্ক চাপানো হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে মোট শুল্কের বোঝা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমল।

news image
আরও খবর

রুশ ইউক্রেন যুদ্ধ ও ট্রাম্পের কৌশল

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে রুশ–ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে পারেন। এই যুদ্ধ বন্ধ করার কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবেই তিনি বিভিন্ন দেশের উপর বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগ করছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতের উপর উচ্চ হারে শুল্ক চাপানোর পেছনেও সেই কৌশলের ছাপ স্পষ্ট ছিল।

এখন শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন ট্রাম্পের বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। ভারতের মতো বড় অর্থনীতিকে নিজের পক্ষে টানতে পারলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমেরিকার অবস্থান আরও শক্ত হবে এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। 

এই শুল্ক হ্রাস একদিকে যেমন ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য স্বস্তির খবর, তেমনই কিছু জটিল প্রশ্নও সামনে আনছে। রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করা ভারতের পক্ষে বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আবার আমেরিকা থেকে বেশি দামে তেল কিনলে দেশের জ্বালানি ব্যয় ও মূল্যবৃদ্ধির উপর কী প্রভাব পড়বে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে বলা যায়, শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্যিক নয়, গভীর কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে। ট্রাম্পের দাবির কতটা বাস্তবায়ন হবে এবং মোদী সরকার শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটে সেদিকেই এখন তাকিয়ে আন্তর্জাতিক মহল।  

এই শুল্ক হ্রাস একদিকে যেমন ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বড় স্বস্তির খবর, তেমনই এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক জটিল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন। দীর্ঘ সময় ধরে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর কার্যত ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক কার্যকর থাকায় ভারতের রপ্তানি খাত চাপের মুখে পড়েছিল। ওষুধ, বস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, কৃষিজ সামগ্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ভারতীয় সংস্থাগুলিকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছিল। সেই জায়গায় শুল্ক কমে ১৮ শতাংশে নামা নিঃসন্দেহে রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিচ্ছে।

তবে এই স্বস্তির পাশাপাশি উঠে আসছে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। রুশ ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে যখন ব্যাপক ওঠানামা চলছে, তখন রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল কিনে ভারত অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ অনেকটাই সামাল দিতে পেরেছিল। সেই সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হলে বা হঠাৎ কমে গেলে বিকল্প উৎসের উপর নির্ভরতা বাড়বে, যা খরচ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।

বিশেষ করে আমেরিকা থেকে বেশি দামে তেল আমদানি করলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়লে পরিবহণ খরচ বাড়বে, শিল্প উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ যেখানে ইতিমধ্যেই সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে জ্বালানি ব্যয় বাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল ভারসাম্য রক্ষা করা। একদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুবিধা আদায় করে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ সহজ করা, অন্যদিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের উপর অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে রাখা এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে পূরণ করাই সরকারের জন্য কঠিন পরীক্ষা। কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ভারত সম্ভবত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ না করে ধীরে ধীরে পরিমাণ কমানোর কৌশল নিতে পারে, যাতে হঠাৎ করে জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা না লাগে।

এই শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্তের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণও। রুশ ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি এখন স্পষ্ট ভাবে বিভক্ত। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত এতদিন ধরে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর নীতি মেনে একাধিক শক্তিধর দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এই শুল্ক সমঝোতা সেই নীতির উপর দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য যেমন সুযোগ নিয়ে এসেছে, তেমনই ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। সুযোগ এই অর্থে যে, আমেরিকার বাজারে রপ্তানি বাড়িয়ে ভারত তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও গতি দিতে পারে। আবার ঝুঁকি এই কারণে যে, জ্বালানি আমদানি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের সিদ্ধান্ত এখন আরও বেশি নজরদারির মধ্যে চলে এসেছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্ত নিছক কোনও বাণিজ্যিক চুক্তি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। Donald Trump-এর দাবির কতটা বাস্তবায়ন হয় এবং Narendra Modi সরকার শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটে সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক মহল।

 

 

Preview image