পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোর ঐতিহ্যে রয়েছে নানা বৈচিত্র্য। কোথাও প্রাচীন জমিদারবাড়ির পুজো, কোথাও বিশেষ আচার-অনুষ্ঠান, আবার কোথাও পুরাণের নির্দিষ্ট বিধান মেনে চলে দেবীর আরাধনা। আলিপুরদুয়ারের জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। বিশুদ্ধ নান্দিকিশোর পুরাণের বিধানের কথা মেনে এই বাড়িতে দেবী উমার পুজোয় মোষের উপস্থিতি থাকে না। প্রচলিত দুর্গাপুজোর চেনা রীতির বাইরে এই বিশেষ প্রথা স্থানীয় মানুষের কাছে কৌতূহল ও আকর্ষণের বিষয়। পুরাণ, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো দুর্গোৎসবের বৈচিত্র্যকে নতুনভাবে তুলে ধরে।
শারদোৎসব মানেই বাঙালির আবেগ, ভক্তি, আনন্দ এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। আশ্বিনের আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, কাশফুলের দোলা, ঢাকের আওয়াজ এবং দেবী দুর্গার আগমনের অপেক্ষায় বাংলার প্রতিটি প্রান্তে তৈরি হয় উৎসবের পরিবেশ। কলকাতার বিখ্যাত বারোয়ারি পুজো থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার প্রাচীন বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব—প্রতিটি পুজোর মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, বিশ্বাস এবং স্বতন্ত্র আচার-অনুষ্ঠান। কোথাও দেবীকে সাজানো হয় সোনার গয়নায়, কোথাও পুজোর বিশেষ আকর্ষণ প্রাচীন প্রতিমার রূপ, আবার কোথাও কয়েকশো বছরের পারিবারিক রীতি আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন উত্তরসূরিরা।
এই বৈচিত্র্যময় দুর্গোৎসবের জগতে বিশেষভাবে নজর কাড়ে আলিপুরদুয়ারের জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো। এখানে দেবী উমার আরাধনায় রয়েছে এমন একটি বিশেষ রীতি, যা প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার পরিচিত রূপ থেকে আলাদা। এই বাড়িতে দেবী উমার পুজোয় মোষের উপস্থিতি থাকে না। বিশুদ্ধ নান্দিকিশোর পুরাণের বিধানের কথা উল্লেখ করে এই প্রথা মেনে চলা হয় বলে জানা যায়। ধর্মীয় বিশ্বাস, পুরাণের ব্যাখ্যা এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এই বিশেষ রীতি জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গাপুজোকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
দেবী দুর্গার পরিচিত রূপের সঙ্গে মহিষাসুরের কাহিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। হিন্দু ধর্মীয় আখ্যান অনুযায়ী, অসুরের অত্যাচারে বিপর্যস্ত দেবতারা যখন মুক্তির পথ খুঁজছিলেন, তখন দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দেবী অসুরকে পরাজিত করে ধর্ম ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। এই কাহিনি থেকেই মহিষাসুরমর্দিনী রূপে দেবীর পরিচিতি বিস্তার লাভ করেছে। বাংলার বহু দুর্গাপ্রতিমায় দেবীকে মহিষাসুর বধ করতে দেখা যায়। সিংহ, ত্রিশূল এবং অসুরের সঙ্গে দেবীর যুদ্ধের দৃশ্য প্রতিমার অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
কিন্তু দেবীর আরাধনার সমস্ত রীতি যে সব জায়গায় একরকম, তা নয়। বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা, পারিবারিক উপাসনার ধারা এবং স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানে নানা পার্থক্য দেখা যায়। কোনও পরিবারে দেবীকে উমা হিসেবে কন্যারূপে আরাধনা করা হয়, কোথাও আবার দেবীর বিশেষ কোনও রূপকে কেন্দ্র করে পুজোর আয়োজন করা হয়।
আলিপুরদুয়ারের জামতলার ভট্টাচার্য বাড়িতেও দেবী উমার আরাধনায় রয়েছে এমনই একটি স্বতন্ত্র রীতি। বিশুদ্ধ নান্দিকিশোর পুরাণে দেবী উমার সঙ্গে অসুরের ক্ষেত্রে মোষ না রাখার বিধান রয়েছে বলে এই পরিবারের পুজোয় সেই প্রথা অনুসরণ করা হয়। ফলে প্রচলিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপের সঙ্গে এই পুজোর উপস্থাপনায় পার্থক্য লক্ষ করা যায়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, পুরাণের বিভিন্ন পাঠ, আঞ্চলিক ব্যাখ্যা এবং প্রতিমার রীতিতে পার্থক্য থাকতে পারে। তাই এই বিশেষ প্রথাকে সংশ্লিষ্ট পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস ও পুজোর নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রেক্ষাপটে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা-বাগান, বনাঞ্চল এবং বহুমাত্রিক সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। এই অঞ্চলের সামাজিক জীবনে দুর্গাপুজো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপে যেমন আধুনিকতার ছোঁয়া দেখা যায়, তেমনই বহু পরিবারে আজও টিকে রয়েছে পুরনো দিনের পারিবারিক পুজোর রীতি।
জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো সেই ঐতিহ্যেরই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এই পুজোর বিশেষত্ব কেবল দেবীর আরাধনায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং পুজোর সঙ্গে যুক্ত ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও নিজস্ব প্রথাও একে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।
বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো মানেই সাধারণত সপরিবারে দেবী দুর্গার আগমন। দেবীর সঙ্গে থাকেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। পাশাপাশি প্রচলিত প্রতিমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা যায় মহিষাসুরকে। তবে সব বনেদি বাড়ির প্রতিমা বা পুজোর রীতি একই রকম হয় না। কোনও পরিবারে দেবীর একক রূপ, কোথাও চালচিত্র, কোথাও বিশেষ অলংকরণ, আবার কোথাও শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী প্রতিমার গঠনে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে।
ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোয় মোষ ছাড়াই দেবী উমার আরাধনা এই বৈচিত্র্যেরই একটি দিক। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, দুর্গোৎসবের ঐতিহ্য কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিমার রূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভক্তির প্রকাশ এবং দেবীর উপাসনার পদ্ধতি বিভিন্ন পরিবারে বিভিন্নভাবে বিকশিত হয়েছে।
দেবী দুর্গার আরেক পরিচিত নাম উমা। বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় উমা শুধু অসুরবিনাশিনী দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে। শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে প্রচলিত বহু গান, কবিতা ও লোককথায় উমার বাপের বাড়ি ফিরে আসার কাহিনি ফুটে উঠেছে। এই কল্পনায় দেবী দুর্গা কৈলাস থেকে কয়েক দিনের জন্য মর্ত্যে আসেন, তাঁর সঙ্গে থাকেন সন্তানরা, আর তাঁকে ঘিরে আনন্দে মেতে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা।
এই উমা-ভাবনা বাঙালির দুর্গাপুজোকে বিশেষ আবেগময় করে তুলেছে। দেবীকে কখনও দেখা হয় মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে, কখনও শক্তির প্রতীক হিসেবে, আবার কখনও স্নেহময়ী কন্যা ও জননীরূপে। একই দেবীর বিভিন্ন রূপ এবং ব্যাখ্যা হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতার পরিচয় বহন করে।
জামতলার ভট্টাচার্য বাড়িতে দেবী উমার পুজোর ক্ষেত্রে যে বিশেষ রীতির কথা উঠে এসেছে, তা এই বৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখানে মোষের উপস্থিতি না থাকা শুধুমাত্র প্রতিমার বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য নয়; পরিবারের বিশ্বাস অনুযায়ী, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরাণের বিধান অনুসরণের বিষয়টিও।
দেবী উমার আরাধনায় এই বিশেষ রীতি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে গেলে স্থানীয় পারিবারিক উপাসনার ইতিহাস, প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং পুজোর ধারাবাহিকতা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কারণ বহু বনেদি বাড়ির পুজোয় এমন কিছু নিয়ম রয়েছে, যা সাধারণ দর্শনার্থীদের কাছে অপরিচিত হলেও পরিবারের কাছে গভীরভাবে অর্থবহ।
বাংলার দুর্গাপুজোর প্রতিমায় মহিষাসুরমর্দিনী রূপ বিশেষভাবে পরিচিত। পুরাণের কাহিনিতে মহিষাসুর এমন এক অসুর, যার শক্তি ও অত্যাচারে দেবতারা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে এবং দীর্ঘ যুদ্ধের পর তিনি অসুরকে পরাজিত করেন। এই কাহিনি শুভশক্তির কাছে অশুভশক্তির পরাজয় এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিল্পীরা এই কাহিনিকে প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরেন। দেবীর হাতে অস্ত্র, অসুরের সঙ্গে যুদ্ধের দৃশ্য এবং সিংহের উপস্থিতি মিলিয়ে তৈরি হয় পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপ। তবে প্রতিমাশিল্পের ইতিহাসে আঞ্চলিক রীতি ও পারিবারিক পুজোর প্রভাবও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে দেবীর রূপ নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পারিবারিক নির্দেশ বা দীর্ঘদিনের প্রথা অনুসরণ করা হয়। কোথাও প্রতিমার মুখের গড়ন, কোথাও সাজসজ্জা, কোথাও দেবীর অবস্থান কিংবা চালচিত্রে থাকে বিশেষত্ব। এই পার্থক্যগুলি বাংলার প্রতিমাশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোয় মোষ ছাড়াই দেবী উমার আরাধনা সেই বিশেষ বৈচিত্র্যের একটি উদাহরণ। সাধারণভাবে যে প্রতিমার সঙ্গে মহিষাসুরের দৃশ্য জড়িয়ে থাকে, এই বাড়ির পুজোয় তার পরিবর্তে অন্যরকম উপস্থাপনার কথা সামনে আসে। ফলে ধর্মীয় আচার এবং প্রতিমার রূপ—দুই ক্ষেত্রেই এই পুজো আলাদা আগ্রহ তৈরি করে।
তবে প্রতিমার সঠিক গঠন, অন্যান্য দেবদেবীর উপস্থিতি এবং পুজোর সম্পূর্ণ আচার সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া অতিরিক্ত কোনও বিবরণ ধরে নেওয়া উচিত নয়। যে তথ্য জানা রয়েছে, তা হল পুরাণের বিধান মেনে এখানে মোষ ছাড়াই দেবী উমার পুজো করা হয়।
বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে ইতিহাস ও পারিবারিক স্মৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেক পরিবারে পুজোর সূচনা হয়েছিল বহু প্রজন্ম আগে। সময়ের সঙ্গে সামাজিক কাঠামো বদলেছে, পরিবার ছোট হয়েছে, মানুষের পেশা ও জীবনযাত্রায় এসেছে পরিবর্তন। তবুও বহু বাড়িতে পুজোর মূল নিয়মগুলি আজও ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।
বনেদি বাড়ির পুজো বলতে শুধু প্রাচীন প্রতিমা বা বড় আয়োজনকে বোঝায় না। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক মিলন, আত্মীয়স্বজনের ফিরে আসা, পুরোহিতের নির্দিষ্ট আচার, পুজোর উপকরণ সংগ্রহ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধর্মীয় বিশ্বাস। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা নতুন প্রজন্মকে পুজোর নিয়ম শেখান। এর ফলে উৎসব হয়ে ওঠে সংস্কৃতি সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আলিপুরদুয়ারের জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও পুরাণের বিধান অনুসরণের বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই প্রথা পুজোর নিজস্ব পরিচয়কে আলাদা করে তুলে ধরে। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, বাংলার প্রতিটি বনেদি বাড়ির পুজোর নিজস্ব ইতিহাস থাকতে পারে, যা বৃহত্তর দুর্গোৎসবের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে।
আজকের দিনে দুর্গাপুজো ক্রমশ বৃহৎ সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। থিমের মণ্ডপ, আলোকসজ্জা, শিল্পনির্ভর প্রতিমা এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই আধুনিকতার মধ্যেও পারিবারিক পুজোর স্বতন্ত্র রীতি বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে পুরাণের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরাণের কাহিনি, দেবদেবীর বিভিন্ন রূপ, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত প্রতীক এবং উপাসনার নানা ব্যাখ্যা বহু শতাব্দী ধরে মানুষের ধর্মীয় জীবনকে প্রভাবিত করেছে। তবে পুরাণের বিভিন্ন গ্রন্থ ও পাঠে বর্ণনা, নামকরণ এবং আচারসংক্রান্ত ব্যাখ্যায় পার্থক্য থাকতে পারে।
এই কারণে কোনও একটি পরিবারের পুজোর রীতিকে বুঝতে হলে সেই পরিবারের নিজস্ব ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং ঐতিহ্যের দিকটিও বিবেচনা করতে হয়। জামতলার ভট্টাচার্য বাড়িতে বিশুদ্ধ নান্দিকিশোর পুরাণের বিধানের কথা উল্লেখ করে মোষ ছাড়াই দেবী উমার পুজোর যে রীতির কথা বলা হয়েছে, তা সেই নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিচয় দেয়।
এখানে পুরাণের নাম বা বিধান সম্পর্কে আরও বিশদ আলোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রন্থের নির্ভরযোগ্য সংস্করণ, শ্লোক এবং স্থানীয় পুজোর প্রচলিত ব্যাখ্যা যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ ধর্মীয় সাহিত্যের নাম, পাঠভেদ কিংবা অনুবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া কোনও নির্দিষ্ট বিধানকে সর্বজনস্বীকৃত বলে ঘোষণা করা ঠিক নয়।
তবে দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—দেবীর উপাসনা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নানা রূপে পালিত হয়। কোথাও শক্তির আরাধনা প্রধান, কোথাও উমার পারিবারিক আবেগ, আবার কোথাও প্রাচীন আচারই পুজোর মূল আকর্ষণ। এই বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের কারণেই বাংলার দুর্গোৎসব এত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়।
দুর্গাপুজোর সময়ে মানুষ শুধু প্রতিমা দর্শন বা মণ্ডপসজ্জা দেখতেই বের হন না। অনেকেই খোঁজ করেন প্রাচীন পুজোর ইতিহাস, স্থানীয় লোককথা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ব্যতিক্রমী ধর্মীয় রীতির। কোনও পুজোর বিশেষত্ব সম্পর্কে জানতে পারলে সেই পুজোকে দেখার অভিজ্ঞতাও আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
আলিপুরদুয়ারের জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোয় মোষ ছাড়াই দেবী উমার আরাধনার বিষয়টি তেমনই একটি আকর্ষণ। প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে পরিচিত দর্শনার্থীদের কাছে এই বিশেষ রীতি স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল তৈরি করতে পারে। কেন এই রীতি অনুসরণ করা হয়, তার সঙ্গে পুরাণের কী সম্পর্ক রয়েছে এবং পারিবারিক বিশ্বাস কীভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে রয়েছে—এসব প্রশ্ন দর্শনার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে।
তবে কোনও বনেদি বাড়ির পুজো দেখতে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের অনুমতি, দর্শনার্থীদের প্রবেশের নিয়ম এবং স্থানীয় নির্দেশ মেনে চলা জরুরি। ব্যক্তিগত পুজোর ক্ষেত্রে সব সময় সর্বসাধারণের প্রবেশের সুযোগ থাকে না। তাই পুজো দর্শনের পরিকল্পনা করলে আগে থেকে স্থানীয়ভাবে তথ্য জেনে নেওয়াই ভালো।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্গাপুজোর আয়োজনেও পরিবর্তন এসেছে। শহরের বড় পুজোগুলিতে নতুন প্রযুক্তি, আধুনিক আলোকসজ্জা, পরিবেশবান্ধব উপকরণ এবং শিল্পকলার নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখা যায়। অন্যদিকে বহু পারিবারিক পুজো এখনও নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অনুষ্ঠিত হয়। এই দুই ধারাই বাংলার দুর্গোৎসবের অংশ।
প্রাচীন রীতি ধরে রাখার অর্থ শুধু অতীতকে আঁকড়ে থাকা নয়। এর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক স্মৃতি সংরক্ষণ, ধর্মীয় পরিচয়ের ধারাবাহিকতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা। বিশেষ করে যখন নতুন প্রজন্মের জীবনযাত্রা দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন পারিবারিক পুজোর মতো অনুষ্ঠান ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ভট্টাচার্য বাড়ির পুজোয় মোষ ছাড়াই দেবী উমার আরাধনা এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পুজোর এই নিজস্ব রীতি অন্যদের থেকে আলাদা পরিচয় তৈরি করে। একই সঙ্গে এটি বাংলার ধর্মীয় সংস্কৃতির বহুমাত্রিক চরিত্রকে সামনে নিয়ে আসে।
বাংলার দুর্গাপুজো একদিকে যেমন বৃহৎ সামাজিক উৎসব, অন্যদিকে তেমনই অসংখ্য ছোট-বড় পারিবারিক ঐতিহ্যের সমষ্টি। প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব সংস্কৃতি, প্রতিমার রীতি, পুজোর আচার এবং স্থানীয় বিশ্বাস এই উৎসবকে নতুন মাত্রা দেয়। তাই দুর্গাপুজোর ইতিহাস জানতে গেলে শুধু বিখ্যাত শহুরে পুজোর দিকে তাকালে চলে না; গ্রাম, মফস্সল এবং বনেদি বাড়ির পুজোগুলির দিকেও নজর দিতে হয়।
আলিপুরদুয়ারের জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো সেই বৃহত্তর ঐতিহ্যের একটি অংশ। এখানে মোষ ছাড়াই দেবী উমার আরাধনা করা হয় বলে যে বিশেষ প্রথার কথা জানা যায়, তা পুরাণের বিধান অনুসরণ এবং পারিবারিক ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। এই পুজোর বৈশিষ্ট্য দেখিয়ে দেয়, দুর্গোৎসবের পরিচিত কাঠামোর মধ্যেও নানা রকম স্বতন্ত্র ধারা বেঁচে রয়েছে।
দেবী দুর্গা কখনও মহিষাসুরমর্দিনী, কখনও শক্তির প্রতীক, আবার কখনও বাঙালির ঘরের মেয়ে উমা। এই নানা রূপের মধ্যেই নিহিত রয়েছে দেবীর উপাসনার বহুমাত্রিকতা। আর সেই বৈচিত্র্যের সূত্র ধরেই আলিপুরদুয়ারের জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, পুরাণের বিধান, পারিবারিক বিশ্বাস এবং বাংলার দীর্ঘদিনের পুজো-সংস্কৃতির মেলবন্ধনে জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির দুর্গোৎসব এক স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। প্রচলিত রীতির বাইরে থাকা এই বিশেষ উপাসনাপদ্ধতি মনে করিয়ে দেয়, দুর্গাপুজোর সৌন্দর্য শুধু জাঁকজমক বা প্রতিমার আকারে নয়—তার আসল শক্তি নিহিত রয়েছে বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান সংস্কৃতির মধ্যে।
আলিপুরদুয়ারের এই পুজো তাই কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলার দুর্গোৎসবের বৈচিত্র্যকে বুঝে নেওয়ারও একটি সুযোগ। দেবী উমার আরাধনার এই ব্যতিক্রমী রীতি পুরাণ ও পারিবারিক ঐতিহ্যের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। আর সেই কারণেই জামতলার ভট্টাচার্য বাড়ির পুজো দুর্গাপুজোর বিস্তৃত সাংস্কৃতিক মানচিত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হয়ে রয়েছে।