অভিষেক জানালেন, তাঁর কেরিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন শাহরুখ খান। শুধু দায়িত্বই নেননি, বাদশা তাঁকে দিয়েছেন এমন এক বিশেষ পরামর্শ, যা এখনও মনে রেখেছেন অভিষেক।
অভিনেতা অভিষেক বচ্চনের কেরিয়ারে শাহরুখ খানের ভূমিকা যে বিশেষ, তা নিয়ে বহু বারই কথা বলেছেন তিনি। তবে অভিনয়ে পা রাখার আগেই শাহরুখের কাছ থেকে পাওয়া একটি সহজ অথচ গভীর পরামর্শ যে তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র হয়ে উঠেছে, সম্প্রতি সেই কথাই জানালেন অভিষেক। বছরের পর বছর ধরে নিজের কাজের ক্ষেত্রে শাহরুখের সেই পরামর্শ মেনে চলেছেন তিনি। বর্তমানে ‘কিং’ ছবিতে শাহরুখের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করছেন অভিষেক। সেই ছবির প্রসঙ্গেই পুরনো দিনের স্মৃতি এবং শাহরুখের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের নানা কথা উঠে এসেছে অভিনেতার সাক্ষাৎকারে।
অভিষেক জানিয়েছেন, অভিনয় জগতে প্রবেশ করার আগে থেকেই শাহরুখের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। সেই সময় দু’জনের সম্পর্ক শুধুমাত্র পেশাগত ছিল না। বরং ধীরে ধীরে শাহরুখ তাঁর কাছে অনেকটা বড় দাদার মতো হয়ে উঠেছিলেন। অভিনয়ে আসার আগে অভিষেক নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন এবং সেই সূত্রেই শাহরুখের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়। যশরাজ ফিল্মসের কর্ণধার আদিত্য চোপড়ার বাড়িতে প্রায় প্রতি রবিবার ক্রিকেট খেলার আসর বসত। সেখানে অভিষেকের সঙ্গে থাকতেন উদয় চোপড়া, হৃতিক রোশন, সিকন্দর খের-সহ আরও অনেকে। সেই আড্ডা ও ক্রিকেটের আসরে শাহরুখ খানও থাকতেন।
সেই সময় থেকেই শাহরুখকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন অভিষেক। অভিনেতার বক্তব্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাহরুখ তাঁদের দলের কাছে বড় দাদার মতো হয়ে ওঠেন। শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, কর্মজীবনেও শাহরুখ তাঁকে একাধিক বার সাহায্য করেছেন। অভিষেকের কথায়, তাঁর কেরিয়ার নিয়ে শাহরুখ ব্যক্তিগত ভাবে বেশ কয়েক বার দায়িত্ব নিয়েছেন। এমনকি বর্তমানে যে ‘কিং’ ছবিতে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করছেন, সেই ছবির ক্ষেত্রেও শাহরুখ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন বলে জানিয়েছেন অভিষেক।
তবে শাহরুখের কাছ থেকে পাওয়া যে কথাটি অভিষেক আজও মনে রেখেছেন, সেটি কোনও জটিল কেরিয়ার মন্ত্র নয়। বরং খুব সাধারণ একটি কথা। কিন্তু সেই কথার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে একজন অভিনেতার কাজের প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগী থাকার দর্শন। অভিষেকের কথায়, অভিনয়ে আসার আগে এক দিন তিনি শাহরুখকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাঁর প্রিয় ছবি কোনটি। সেই প্রশ্নের উত্তরেই শাহরুখ তাঁকে এমন একটি কথা বলেছিলেন, যা অভিষেকের মনে গভীর ভাবে দাগ কেটে যায়।
শাহরুখ বলেছিলেন, তিনি যে ছবিতে সেই মুহূর্তে কাজ করছেন, সেটিই তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছবি। কারণ কোনও ছবিতে কাজ করার সময় যদি সেই ছবিটিকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বলে মনে না হয়, তা হলে সেই ছবিতে কাজ করার অর্থই বা কী? অর্থাৎ একজন শিল্পী যখন কোনও একটি কাজ করছেন, তখন তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ সেই কাজটির উপরেই থাকা উচিত। অতীতে কী হয়েছে, আগের ছবি কেমন ছিল, আগের সাফল্য বা ব্যর্থতা কী—সেসব নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা না করে বর্তমান কাজটিকেই গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
শাহরুখের এই দর্শনই অভিষেকের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন, একজন অভিনেতার কাছে প্রতিটি নতুন কাজই একটি নতুন সুযোগ। একটি ছবি শেষ হয়ে গেলে সেটি অতীতের অংশ হয়ে যায়। তার পরের কাজের জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া, নতুন চরিত্রকে বোঝা এবং সেই ছবির প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া—এটাই একজন শিল্পীর দায়িত্ব। শাহরুখের কাছ থেকে পাওয়া সেই পরামর্শই নিজের কর্মজীবনে অনুসরণ করে চলেছেন অভিষেক।
অভিষেকের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—শাহরুখ খানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধুমাত্র একই ইন্ডাস্ট্রির দুই অভিনেতার সম্পর্ক নয়। দীর্ঘ দিনের পরিচয় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গা থেকেই তাঁদের বন্ধন তৈরি হয়েছে। অভিনয়ে আসার আগে শাহরুখকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন অভিষেক। পরে দু’জনেই একই পেশায় নিজেদের জায়গা তৈরি করেন। সময়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হয়েছে।
অভিষেক যখন বলছেন, “আমার কেরিয়ার নিয়ে শাহরুখ বেশ কয়েক বার ব্যক্তিগত ভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন”, তখন সেই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, তাঁর জীবনে শাহরুখের প্রভাব কতটা গভীর। সাধারণত বলিউডে তারকাদের মধ্যে বন্ধুত্ব বা পেশাগত সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। কিন্তু অভিষেকের বক্তব্যে উঠে এসেছে একজন সিনিয়র সহকর্মীর কাছ থেকে পাওয়া ব্যক্তিগত পরামর্শ ও সহযোগিতার কথা।
বর্তমানে শাহরুখ খান ও অভিষেক বচ্চন দু’জনেই ‘কিং’ ছবির সঙ্গে যুক্ত। এই ছবিকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সিদ্ধার্থ আনন্দ পরিচালিত এই ছবিতে শাহরুখের সঙ্গে অভিনয় করছেন অভিষেক। ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ শাহরুখের সঙ্গে তাঁর কন্যা সুহানা খানের উপস্থিতি। এই ছবির মাধ্যমেই বড়পর্দায় সুহানার গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি দেখা যাবে।
‘কিং’ ছবিতে শাহরুখ ও সুহানা ছাড়াও রয়েছেন দীপিকা পাড়ুকোন, রানি মুখোপাধ্যায়, অভয় বর্মা, জয়দীপ অহলাওয়াত এবং অরশদ ওয়ারসী। ফলে ছবিটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ এর বড় তারকা-সমাবেশ। এর পাশাপাশি শাহরুখ ও সুহানার একসঙ্গে অভিনয়ও ছবিটিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে।
অভিষেকের জন্যও ‘কিং’ একটি বিশেষ ছবি। কারণ এই ছবিতে তিনি আবারও শাহরুখের সঙ্গে কাজ করছেন। দীর্ঘ দিনের সম্পর্কের পরে একই ছবিতে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সাক্ষাৎকারে পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাই শুধু শাহরুখের পরামর্শ নয়, তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের কথাও উঠে এসেছে।
শাহরুখের সেই পুরনো পরামর্শের দিকে তাকালে বর্তমান সময়ের অভিনেতাদের জন্যও তার গুরুত্ব রয়েছে। একটি ছবির সাফল্য বা ব্যর্থতা একজন অভিনেতার কেরিয়ারের একটি অধ্যায় মাত্র। কিন্তু সেই ফলাফলকে আঁকড়ে না থেকে পরবর্তী কাজের দিকে মন দেওয়া একজন শিল্পীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাহরুখের দর্শনও অনেকটা সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। যে কাজটি বর্তমানে করছেন, সেটিই যেন সেই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অভিষেক জানিয়েছেন, অতীতে কী হয়েছে তা নিয়ে না ভেবে বর্তমানে যে কাজটি করছেন, তার প্রতিই মন দেওয়া উচিত। এই ভাবনাই তাঁর কাছে শাহরুখের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষাগুলির একটি। একজন অভিনেতা হিসাবে দীর্ঘ কেরিয়ারে নানা ধরনের ছবি, চরিত্র, সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি হলেও প্রতিটি নতুন কাজের ক্ষেত্রে নতুন করে নিজেকে উজাড় করে দেওয়াই আসল।
শাহরুখ নিজেও তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কখনও রোম্যান্টিক নায়ক, কখনও অ্যাকশন চরিত্র, আবার কখনও একেবারে ভিন্ন ধরনের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে তাঁকে। প্রতিটি ছবির ক্ষেত্রেই নিজেকে নতুন ভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন তিনি। সম্ভবত সেই অভিজ্ঞতা থেকেই অভিষেককে দেওয়া তাঁর পরামর্শের গুরুত্ব আরও বাড়ে।
অভিষেকের কথায়, সেই সহজ উত্তর তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। বছরের পর বছর পরেও তিনি সেই কথাটি ভুলে যাননি। বরং নিজের কাজের ক্ষেত্রে সেটিকে একটি নীতির মতো মেনে চলেছেন। কোনও একটি ছবিতে কাজ করার সময় সেই ছবিটিকেই নিজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা—এই মানসিকতা তাঁকে নিজের কাজের প্রতি আরও মনোযোগী হতে সাহায্য করেছে।
অভিনেতার এই স্বীকারোক্তি থেকেই বোঝা যায়, একজন তারকার দেওয়া একটি ছোট পরামর্শও কখনও কখনও অন্য একজন শিল্পীর কেরিয়ারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অভিষেকের ক্ষেত্রে শাহরুখের সেই কথাই তেমন একটি উদাহরণ। বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা এবং পেশাগত সহযোগিতার পাশাপাশি তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে এমন একটি শিক্ষার জায়গাও রয়েছে, যা অভিষেক এখনও বহন করে চলেছেন।
‘কিং’ ছবিকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নানা খবর সামনে এসেছে। ছবিতে শাহরুখ ও সুহানার পাশাপাশি একাধিক পরিচিত অভিনেতার উপস্থিতি দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। সম্প্রতি শাহরুখের সঙ্গে করীনা কপূর খানের ফের পর্দায় দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, ছবিতে শাহরুখের সঙ্গে একটি নাচের দৃশ্যে দেখা যেতে পারে করীনা কপূর খানকে। যদিও এই ধরনের খবর নিয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের অপেক্ষা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘কিং’ শুধুমাত্র শাহরুখের নতুন ছবি নয়, অভিষেকের জন্যও এটি একটি বিশেষ কাজ। কারণ এই ছবির সূত্রেই পুরনো সম্পর্ক, কেরিয়ারের স্মৃতি এবং শাহরুখের কাছ থেকে পাওয়া সেই বিশেষ পরামর্শ আবার সামনে এসেছে। একজন অভিনেতার জীবনে কোন মানুষ কখন কী প্রভাব ফেলবেন, তা আগে থেকে বলা যায় না। অভিষেকের ক্ষেত্রে শাহরুখের ভূমিকা যে এমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছে, তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে।
শাহরুখের সেই বক্তব্যের মূল শিক্ষা খুব সহজ—বর্তমান কাজটিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতের সাফল্য নিয়ে আত্মতুষ্ট হয়ে থাকা যেমন ঠিক নয়, তেমনই অতীতের ব্যর্থতা নিয়েও আটকে থাকা উচিত নয়। একজন শিল্পীকে প্রতিটি নতুন কাজের সঙ্গে নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করতে হয়। অভিষেক বচ্চনও নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনে সেই কথাটিই মনে রেখেছেন বলে জানিয়েছেন।
এখন ‘কিং’ ছবিতে শাহরুখ ও অভিষেককে একসঙ্গে দেখার অপেক্ষায় দর্শক। সিদ্ধার্থ আনন্দ পরিচালিত এই ছবিতে শাহরুখের সঙ্গে সুহানা খানের উপস্থিতি যেমন বিশেষ আকর্ষণ, তেমনই অভিষেকের সঙ্গে তাঁর পুরনো সম্পর্কও ছবিটিকে ঘিরে আলাদা কৌতূহল তৈরি করেছে। আগামী ২৪ ডিসেম্বর বিশ্ব জুড়ে প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা।
অভিষেকের এই বক্তব্য তাই শুধুমাত্র শাহরুখের একটি পুরনো পরামর্শের গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে একজন অভিনেতার কেরিয়ারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, একজন সিনিয়র শিল্পীর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বের স্মৃতি। শাহরুখের সেই সহজ কথাই আজও অভিষেকের কাছে মূল্যবান—যে কাজটি এখন করছেন, সেটিকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসুন এবং সেটির প্রতিই সম্পূর্ণ মন দিন।