বিশ্ব অর্থনীতি যখন প্রবল অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে, তখন জেপি মরগ্যান চেজ-এর সিইও জেমি ডাইমন এক চাঞ্চল্যকর সতর্কবার্তা দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছেন। তাঁর বক্তব্য—“আমেরিকা যদি দ্রুত ভুল নীতি ঠিক না করে, তাহলে আগামী ৩০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের মতো ধীরগতির অর্থনীতিতে পরিণত হবে।” ডাইমনের এই মন্তব্য কেবল মার্কিন অর্থনীতির ওপরেই নয়, বরং গ্লোবাল বাজার, ভারতীয় অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। জেমি ডাইমন বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যাংকিং নেতৃত্ব। বিগত তিন দশক ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি, গ্লোবাল ব্যাংকিং, বিনিয়োগ এবং বাজারের পরিবর্তনশীল হালচালের ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ করে আসছেন। তাই তাঁর মন্তব্য হালকাভাবে নেওয়ার মতো নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী—করনীতি, প্রশাসনিক জটিলতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাব এবং বহু শহরের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া—এই চারটি বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ডাইমন উল্লেখ করেছেন, নিউ ইয়র্ক, স্যান ফ্রান্সিসকো, শিকাগো বা লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো মার্কিন বড় শহরগুলিতে ব্যবসার পরিবেশ ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। অতিরিক্ত ট্যাক্স, কঠোর নিয়ম, প্রশাসনিক ধীরগতি, অপরাধবৃদ্ধি, বাড়ির খরচ বৃদ্ধি এবং কর্মীদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ প্রবণতার কারণে বড় বড় কোম্পানি এই শহরগুলো থেকে সরে গিয়ে কম নিয়ন্ত্রণ, কম কর এবং সস্তা শ্রমের রাজ্য বেছে নিচ্ছে। এর ফলে বহু শহরেই ব্যবসার বিস্তার থমকে গেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন সুদের হার, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যনীতির অস্থিরতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং জনসংখ্যাগত চাপের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে—তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাংক জেপি মরগ্যান চেজ-এর সিইও জেমি ডাইমন (Jamie Dimon) এক বিস্ফোরক সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর মতে:
“আমরা যদি এখনই কিছু ভুল নীতি ঠিক না করি, তাহলে আগামী ৩০ বছরে আমেরিকা ইউরোপের পথেই হাঁটবে—ধীর গতির অর্থনীতি, কম উৎপাদনশীলতা এবং কম প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ।”
একজন বিশিষ্ট ব্যাংকিং নেতার এমন সতর্কবার্তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমেরিকার নীতি ও অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা সরাসরি প্রভাব ফেলে—
বিশ্ববাজারে,
ভারতীয় শেয়ারবাজারে,
ডলার-রুপির বিনিময়ে,
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে,
এবং প্রযুক্তি–স্টার্টআপ খাতে।
ডাইমনের সতর্কবার্তার মূল কারণ
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সংকট কোথায়
কেন তিনি ‘ইউরোপের পতন’-এর উদাহরণ দিচ্ছেন
মার্কিন শহরগুলির অবস্থা
ব্যবসাবান্ধব নীতির সংকট
আমেরিকার করনীতি ও অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ
বৈশ্বিক অর্থনীতির উপর এর প্রভাব
ভারত কোন সুযোগ বা ঝুঁকিতে
ভবিষ্যৎ পথনকশা
এবং শেষ পর্যন্ত বাজারের প্রতিক্রিয়া
তিনি সতর্ক করেছেন—যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তাহলে আমেরিকা সেই একই পথে যাবে, যেই পথে এখন ইউরোপ চলছে। ইউরোপ গত দুই দশকে প্রবৃদ্ধি হারিয়েছে, নতুন শিল্প কমেছে, উদ্ভাবন কমেছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে গেছে, বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা বেড়েছে এবং উৎপাদন ব্যয় অতিরিক্ত হয়ে গেছে। ডাইমন বলছেন—“আমেরিকার অবস্থাও ৩০ বছর পর ঠিক এমনই হতে পারে।”
কিন্তু কেন এই সতর্কবার্তা এত গুরুত্বপূর্ণ? কারণ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। আমেরিকার অর্থনীতি ধীর হলে—
গ্লোবাল ট্রেড কমে যায়
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংকুচিত হয়
ভারতের মতো দেশগুলিতে রপ্তানি কমে যায়
ডলার দুর্বল হলে রুপি শক্তিশালী হয়, ফলে ভারতীয় বাজার অস্থির হয়
প্রযুক্তি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ কমলে ভারতীয় IT সেক্টর ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে
ডাইমন আরও বলেন, মার্কিন সরকারের বর্তমান করনীতি ব্যবসাকে উৎসাহিত করার বদলে অনেক সময় নিরুৎসাহিত করছে। ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি, দুর্বল অবকাঠামো, কর্মসংস্থান সঙ্কট এবং রাজনৈতিক বিভাজন মিলিয়ে আমেরিকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত ধীরগতির। তাঁর মতে—“প্রয়োজন দ্রুত সংস্কার—ট্যাক্স কমাতে হবে, নিয়ম সহজ করতে হবে, অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং ব্যবসার জন্য আরও শক্তিশালী পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
মার্কিন সরকারের ঋণও তাঁর উদ্বেগের অন্যতম কারণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ GDP-র প্রায় ১২৩ শতাংশ—যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এই ঋণ ভবিষ্যতে করবৃদ্ধি, ব্যয় সংকোচন এবং অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
গ্লোবাল বাজারে এই সতর্কবার্তার প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন নীতিনির্ধারণে স্থিতিশীলতা খুঁজছেন। শেয়ারবাজারে ভোলাটিলিটি বেড়েছে, বন্ড মার্কেট অস্থির, এবং সোনার দাম বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকছে—যা বোঝায় যে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ খুঁজছেন।
এদিকে ভারতের জন্য ঝুঁকি যেমন আছে, তেমনি সুযোগও রয়েছে।
মার্কিন কোম্পানিগুলো ব্যয় কমাতে চাইলে ভারতের আইটি, সার্ভিস এবং প্রযুক্তি খাত লাভবান হতে পারে।
ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে ভারতের প্রতি মনোযোগ বাড়তে পারে কারণ আমেরিকা ও ইউরোপ উৎপাদন খাতে পিছিয়ে পড়ছে।
চীন–প্লাস–ওয়ান নীতি ভারতকে ভবিষ্যতের গ্লোবাল উৎপাদন কেন্দ্র করতে পারে।
এনার্জি, ডিফেন্স এবং প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব বাড়তে পারে।
তবে বিপরীত দিকে—
যুক্তরাষ্ট্র যদি মন্দার দিকে যায় ভারতও অর্থনৈতিক ধাক্কা খেতে পারে
মার্কিন স্টার্টআপ বিনিয়োগ কমলে ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হবে
ডলার দুর্বল হলে ভারতীয় রপ্তানিতে সমস্যা হবে
সুতরাং ডাইমনের সতর্কবার্তা শুধু একটি বক্তব্য নয়—এটি গ্লোবাল অর্থনীতি, মার্কিন প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসার সামনে এক স্পষ্ট আয়না ধরে দিয়েছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন কোথায় কোথায় দুর্বলতা তৈরি হয়েছে এবং যদি দ্রুত সংশোধন না করা হয়, তাহলে আমেরিকার অর্থনৈতিক নেতৃত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাঁর বার্তার মূল কথা—“সময় থাকতেই ঠিক করো, নাহলে ভবিষ্যৎ বিপজ্জনক।”
জেমি ডাইমন শুধু একটি ব্যাংকের সিইও নন—তিনি
ওয়াল স্ট্রিটের সবচেয়ে সফল,
সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা,
এবং গ্লোবাল মার্কেটের সবচেয়ে প্রভাবশালী নির্বাহীদের একজন।
তাঁর কথার ওজন আছে, কারণ—
১৯৯০ এবং ২০০৮-এর সংকট আগেই তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন,
এবং পরে সেই সতর্কবার্তা সত্য হয়েছিল।
তাই তাঁর নতুন সতর্কবার্তা—“আমেরিকা ইউরোপের মতো পতনের দিকে যাচ্ছে”—বিশ্ববাজারকে ভাবিয়ে তুলেছে।
Economic Times–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডাইমন স্পষ্ট বলেছেন—
“আমাদের করনীতি, ব্যবসায়িক নিয়মনীতি এবং শহরগুলির কার্যক্ষমতা দ্রুত ঠিক করতে হবে। না হলে ৩০ বছরের মধ্যে আমেরিকা ইউরোপের মতো হবে—যেখানে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, প্রতিযোগিতাশক্তি হ্রাস পাচ্ছে, এবং উৎপাদন কমছে।”
ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
অতিরিক্ত নিয়ম ও প্রশাসনিক জটিলতা
বিপুল করভার (High tax burden)
বড় শহরগুলিতে শিল্পপ্রবৃদ্ধির অনুপস্থিতি
রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে নীতিহীনতা
দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতার পতন
সরকারি অদক্ষতা ও নীতিনির্ধারণের দেরি
ডাইমনের মতে, এইসব সমস্যার সমাধান না হলে মার্কিন অর্থনীতি ধীরে ধীরে সেই স্থানে পৌঁছাবে, যেখানে ইউরোপ এখন আছে—
ডাইমনের বক্তব্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যর্থতার দিকটি স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
২০ বছর ধরে GDP গ্রোথ ধীর
জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম
বয়স্ক নাগরিকের সংখ্যা বাড়ছে
ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে নিয়ন্ত্রণ ও জটিলতা বেশি
স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনে পিছিয়ে
চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে অপারগ
প্রযুক্তি জগতে নজরকাড়া উদ্ভাবন নেই
করভার অত্যন্ত বেশি
ডাইমনের মতে—“এটাই আমেরিকার ভবিষ্যৎ হতে পারে যদি ভুলগুলো না ঠিক করা হয়।”
ডাইমন সতর্ক করেছেন, অনেক মার্কিন শহর—
নিউ ইয়র্ক
স্যান ফ্রান্সিসকো
শিকাগো
লস অ্যাঞ্জেলেস
এগুলো এখন ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
১. অতিরিক্ত ট্যাক্স
বড় কোম্পানির উপর বেশি কর আরোপ করলে তারা অন্য রাজ্যে চলে যায়।
২. অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতা
একাধিক শহরে অপরাধ বাড়ায় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত।
৩. দুর্বল অবকাঠামো
রাস্তাঘাট, ট্রান্সপোর্ট, হাউজিং—সব ক্ষেত্রেই সমস্যা বাড়ছে।
৪. হোম–ওয়ার্ক ট্রেন্ড
অফিসে মানুষ কমে গেলে শহরের ব্যবসা কমে যাচ্ছে।
ডাইমন বোঝাতে চেয়েছেন—
অর্থনীতির গতি কমে যাওয়া
উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া
কর্মসংস্থান কমে যাওয়া
ব্যবসার খরচ বেড়ে যাওয়া
উদ্ভাবন কমে যাওয়া
করভার অত্যধিক হয়ে যাওয়া
প্রশাসনিক অদক্ষতা
সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক বিভাজন
এগুলো বজায় থাকলে আমেরিকা ৩০ বছর পর ধীরগতির উচ্চকর–ভিত্তিক ইউরোপীয় অর্থনীতির মতো হয়ে যাবে।
ফেডারেল রিজার্ভ বহুবার সুদের হার বাড়িয়েছে, যার ফলে—
বিনিয়োগ কমছে
ঋণ নেওয়া কঠিন
ব্যবসা সম্প্রসারণ কমে যাচ্ছে
এটি দীর্ঘমেয়াদে বিশাল ঝুঁকি।
উন্নত অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
চীন ও ভারতের উৎপাদনশক্তির সামনে আমেরিকা চাপে।
বিল পাশ করতে সমস্যা, বাজেট সমস্যা, সরকার বারবার শাটডাউনের মুখে যায়।
আমেরিকার পতন মানে—
রপ্তানি কমবে
ডলার দুর্বল হবে
ভারতীয় আইটি কোম্পানিগুলো বড় ক্ষতির মুখে পড়বে
মিউচুয়াল ফান্ডে অস্থিরতা বাড়বে
চীন হয়তো তার উৎপাদনশক্তিকে আরও শক্তিশালী করবে।
ইউরোপ হয়তো আরেক ধাপ পিছিয়ে পড়বে।
শেয়ারবাজারে ভয় ছড়াবে
সোনা বাড়বে
বন্ড মার্কেট অস্থির হবে
ডাইমনের সতর্কবার্তা ভারতকেও নতুন সুযোগ দিচ্ছে।
চীন–প্লাস–ওয়ান নীতি ভারতের জন্য বড় সুযোগ।
মার্কিন কোম্পানিগুলো ব্যয় কমাতে ভারতীয় টেক সাপোর্ট চাইবে।
আমেরিকার উচ্চ করভার মানে কোম্পানি ভারতকে বেছে নেবে।
ভারত–আমেরিকার অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পাবে।
ভারত হতে পারে নতুন বাণিজ্য কেন্দ্র।
ডাইমন তিনটি বিষয়ের উপর জোর দিয়েছেন—
কর কমানো, নিয়ম সহজ করা।
শিক্ষা, অবকাঠামো, শ্রমবাজার আধুনিকীকরণ।
AI, টেক, চিপ, ডেটা—এই ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে—
বাজার এখন সতর্ক
ডাইমনের মন্তব্য ভবিষ্যৎ উদ্বেগ তুলে ধরেছে
ডলার অস্থির হতে পারে
শেয়ারবাজারে ভোলাটিলিটি বাড়তে পারে
তবে ইতিবাচক দিকও আছে—
নীতিনির্ধারকরা এখন সমস্যাগুলিকে গুরুত্ব দেবে
ব্যবসা ও বাজারে সংস্কার আসবে