Madras High Court সম্প্রতি মন্তব্য করেছে যে ১৬ বছরের কম বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন। আদালতের মতে, Australia যেভাবে এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, India-কেও সেই দিকেই ভাবা উচিত। তাই শিশুদের সুরক্ষা ও সঠিক ব্যবহারের জন্য কেন্দ্রের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
ভারতে কিশোর-কিশোরীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক এবং সমাজবিজ্ঞানীরা। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের দ্রুত বিস্তারের ফলে বর্তমানে খুব অল্প বয়সেই শিশুরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে একদিকে যেমন তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটছে, তেমনই অন্যদিকে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাবও দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম বড় রাজ্য কর্নাটক।
কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী Siddaramaiah শুক্রবার ঘোষণা করেছেন যে রাজ্য সরকার ১৬ বছরের কম বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিষয়ে উদ্যোগ নিচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ভারতের মধ্যে কর্নাটকই প্রথম রাজ্য হবে যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়ার মতে, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, শিশুরা দিনের অনেকটা সময় মোবাইল স্ক্রিনে কাটাচ্ছে। এর ফলে তাদের পড়াশোনা, সামাজিক আচরণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুতর প্রভাব পড়ছে।
সিদ্দারামাইয়া বলেছেন, সমাজমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের আচরণে পরিবর্তন আনছে। তারা বাস্তব সামাজিক সম্পর্কের চেয়ে ভার্চুয়াল সম্পর্কের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। এতে করে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে এবং একাকিত্বের সমস্যা বাড়ছে।
তিনি আরও জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশের ফলে শিশুরা অনেক সময় এমন কিছু বিষয়বস্তুর মুখোমুখি হচ্ছে যা তাদের বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়। এর মধ্যে রয়েছে সহিংসতা, পর্নোগ্রাফি, মাদক সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক বিষয়। এই ধরনের বিষয়বস্তু শিশুদের মানসিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যেই শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলিতে শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিয়ে বড় আকারে আলোচনা চলছে।
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে Australia ১৬ বছরের কম বয়সীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আইন কার্যকর করেছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার মনে করে যে অল্প বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক দেশ এখন এই মডেল অনুসরণ করার কথা ভাবছে। কর্নাটক সরকারও সেই পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ভারতে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট বয়সসীমা কঠোরভাবে কার্যকর করা হয় না। যদিও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম তাদের নিজস্ব নীতিমালায় ১৩ বছরের নিচে ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে উল্লেখ করে, বাস্তবে এই নিয়ম অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না।
এই পরিস্থিতিতে কর্নাটকের সিদ্ধান্ত নতুন করে একটি জাতীয় আলোচনার সূচনা করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, শিশুদের সুরক্ষার জন্য দেশে একটি সুস্পষ্ট নীতি থাকা জরুরি।
এই বিষয়ে সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছে Madras High Court। আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে কেন্দ্রের ভাবা উচিত।
আদালতের মতে, অস্ট্রেলিয়া যেভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, ভারতও সেই দিকটি বিবেচনা করতে পারে। আদালত আরও বলেছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এই সংক্রান্ত একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল বিচারপতি Justice G Jayachandran এবং Justice KK Ramakrishnan-এর বেঞ্চে। সেখানে আবেদন করা হয়েছিল যে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলির জন্য কেন্দ্র সরকার যেন বিশেষ নির্দেশিকা জারি করে।
রিট পিটিশনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয় যে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারীদের একটি ‘প্যারেন্টাল উইন্ডো’ চালু করতে বাধ্য করা উচিত। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিভাবকরা সহজেই তাদের সন্তানের অনলাইন কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালু করা হলে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পর্নোগ্রাফি বা অন্যান্য ক্ষতিকারক বিষয়বস্তুর থেকে শিশুদের দূরে রাখা সহজ হবে।
ভারতের অন্যান্য রাজ্যও শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ আনার বিষয়ে ভাবছে। এর আগে Goa এবং Andhra Pradesh সরকার জানিয়েছিল যে তারা অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সীদের সমাজমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
তবে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। সেই দিক থেকে কর্নাটকের সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নানা ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে শিশুরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করে। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে এবং হতাশার অনুভূতি বাড়তে পারে।
এছাড়া সাইবার বুলিং বা অনলাইন হয়রানির ঘটনাও শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় এই ধরনের ঘটনার ফলে শিশুদের মধ্যে উদ্বেগ, ভয় এবং হতাশা তৈরি হয়।
শিক্ষাবিদদের মতে, স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার পড়াশোনার উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না কারণ তারা বারবার মোবাইল চেক করার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এই সমস্যার কারণে অনেক স্কুল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
বর্তমান যুগে ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তাই পুরোপুরি প্রযুক্তি থেকে শিশুদের দূরে রাখা সম্ভব নয়। বরং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতনতার মাধ্যমে প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানোই বেশি কার্যকর।
এই ক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানরা কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে, কত সময় অনলাইনে কাটাচ্ছে এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে—এই বিষয়গুলির উপর নজর রাখা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কর্নাটকের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে ভারতের জাতীয় পর্যায়েও নতুন নীতির পথ দেখাতে পারে। যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে অন্য রাজ্যগুলোও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে।
এছাড়া কেন্দ্র সরকারও শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আইন বা নির্দেশিকা আনতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শিশুদের সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে বর্তমানে বিশ্বজুড়েই একটি বড় আলোচনা চলছে। কর্নাটক সরকারের এই সিদ্ধান্ত সেই আলোচনাকে আরও জোরদার করেছে।
প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে বর্তমান প্রজন্মের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন সমাজমাধ্যম এখন দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের উপর। অল্প বয়সেই তারা ডিজিটাল দুনিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়ে পড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা তাদের অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির সুবিধা ও ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে শিশুরা যেমন নতুন তথ্য জানতে পারে, তেমনই তারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও পায়। কিন্তু একই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তাদের মধ্যে আসক্তি তৈরি করতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, শিশুরা পড়াশোনা বা খেলাধুলার বদলে দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছে। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই কারণেই অনেক শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানী মনে করছেন, শিশুদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল নীতি থাকা প্রয়োজন। যেখানে প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার শেখানো হবে, পাশাপাশি ক্ষতিকারক বিষয় থেকে তাদের দূরে রাখার ব্যবস্থা থাকবে। কর্নাটক সরকারের সিদ্ধান্ত সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই উদ্যোগ শুধু একটি রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যও একই ধরনের নীতি গ্রহণ করতে পারে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্তরেও শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করার বিষয়ে নতুন নির্দেশিকা বা আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাই কর্নাটকের এই সিদ্ধান্ত ভারতের ডিজিটাল ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।