মুকেশের পরামর্শেই বদলাল বোলিং পরিকল্পনা, আর সেই সিদ্ধান্তেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিল বাংলার পেসারের দুরন্ত স্পেল।
ইরানি কাপের মঞ্চে আবারও নিজের জাত চেনালেন বাংলার পেসার মুকেশ কুমার। অবশিষ্ট ভারতকে ইরানি কাপের ট্রফি জেতানোর পিছনে তাঁর অবদান নিঃসন্দেহে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় ইনিংসে দুরন্ত বোলিং করে একের পর এক উইকেট তুলে নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের ব্যাটিং লাইন-আপকে কার্যত তছনছ করে দেন মুকেশ। তাঁর দুরন্ত স্পেলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি প্রতিপক্ষ। দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ঝুলিতে আসে ছয়টি উইকেট। আর সেই ছয় উইকেটই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গতিপথ পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেয়।
তবে মুকেশের এই ছয় উইকেটের গল্পটা শুধুই পরিসংখ্যানের নয়। এর মধ্যে রয়েছে অধিনায়কের সঙ্গে তাঁর ছোট্ট কথোপকথন, নিজের উপর বিশ্বাস এবং সঠিক সময়ে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের গল্প। এমনকি ম্যাচের একটি পর্যায়ে মুকেশকে বোলিং থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়ক সরফরাজ় খান। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই মুকেশ নিজেই এগিয়ে এসে আরও একটি ওভার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর সেই অনুরোধ যে এত বড় পার্থক্য গড়ে দেবে, তা হয়তো তখন মাঠে থাকা কেউই ভাবেননি।
ঋষভ পন্থের অনুপস্থিতিতে এই ম্যাচে অধিনায়কের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন সরফরাজ় খান। জম্মু-কাশ্মীরের দ্বিতীয় ইনিংসে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বোলিং পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছিলেন তিনি। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে ১৩তম ওভারের আগে বোলার পরিবর্তনের কথা ভাবেন সরফরাজ়। ঠিক তখনই নজরে আসে মুকেশকে। তিনি অধিনায়কের কাছে গিয়ে কিছু একটা বলছেন। দূর থেকে তাঁর হাতের ইশারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তিনি আরও একটি ওভার বল করতে চাইছেন।
মুকেশের সেই অনুরোধ মেনে নেন সরফরাজ়। আর তারপর যা হল, তা কার্যত ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
সেই ওভারের শুরু থেকেই মুকেশের বোলিংয়ে ছিল বাড়তি আগ্রাসন। ব্যাটারদের উপর চাপ তৈরি করে যাচ্ছিলেন তিনি। ওভারের চতুর্থ বলেই শুভম পুন্ডিরকে আউট করেন মুকেশ। একটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের উপর আরও চাপ বাড়িয়ে দেন তিনি। কিন্তু আসল ধাক্কাটা আসে তার পরের বলেই।
পরের বলেই ক্রিজে ছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের অধিনায়ক পরশ ডোগরা। প্রথম ইনিংসে দলের হয়ে সর্বাধিক রান করেছিলেন তিনি। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছিল গুরুত্বপূর্ণ ৭৫ রান। ফলে দ্বিতীয় ইনিংসেও তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল জম্মু-কাশ্মীর। ম্যাচকে নিজেদের দিকে টেনে নেওয়ার জন্য তাঁর উইকেট যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন ছিল না।
মুকেশও সেই সুযোগ নষ্ট করেননি।
পরপর দ্বিতীয় বলে পরশ ডোগরাকে বোল্ড করে দেন বাংলার পেসার। মাত্র দুই বলের ব্যবধানে দু’টি উইকেট। আর সেই দুই উইকেটের মধ্যে ছিল প্রতিপক্ষ অধিনায়কের গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। মুকেশের সেই দুরন্ত ওভারেই জম্মু-কাশ্মীরের ইনিংসের ভিত নড়ে যায়।
ক্রিকেটে অনেক সময় একটি উইকেট পুরো ম্যাচের পরিস্থিতি বদলে দেয়। আর কখনও কখনও পরপর দু’টি উইকেট একটি গোটা ইনিংসকে ধসিয়ে দিতে পারে। এই ম্যাচে ঠিক সেটাই ঘটেছে। শুভম পুন্ডিরের পর পরশ ডোগরার উইকেট জম্মু-কাশ্মীরের ব্যাটিং অর্ডারের উপর প্রবল চাপ তৈরি করে। দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার এবং অধিনায়ক দু’জনই দ্রুত ফিরে যাওয়ায় বাকি ব্যাটারদের উপর চাপ আরও বেড়ে যায়।
এখানেই মুকেশ কুমারের বোলিংয়ের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ম্যাচের আগে বা ম্যাচের মাঝামাঝি সময়ে হয়তো কেউই ভাবেননি যে একটি ওভার নিয়ে এমন নাটক তৈরি হবে। সরফরাজ় বোলিং পরিবর্তনের কথা ভাবছিলেন। মুকেশ নিজের হাতে বল রাখতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, সেই মুহূর্তে তাঁর বোলিংয়ে উইকেট আসতে পারে। নিজের উপর সেই বিশ্বাস থেকেই অধিনায়কের কাছে আরও একটি ওভার চেয়েছিলেন তিনি।
এটি একজন বোলারের মানসিক দৃঢ়তারও উদাহরণ। একজন বোলার কখন বুঝতে পারেন যে তিনি ছন্দে রয়েছেন? কখন বুঝতে পারেন যে আরও একটি ওভার করলে ম্যাচে বড় প্রভাব ফেলতে পারবেন? মুকেশ সেই মুহূর্তটি বুঝেছিলেন বলেই হয়তো সরফরাজ়ের কাছে গিয়ে নিজের কথা জানিয়েছিলেন।
আর তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসের ফল মিলল হাতেনাতে।
প্রথমে শুভম পুন্ডির এবং তার পরের বলেই পরশ ডোগরা—দুই গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। এর ফলে জম্মু-কাশ্মীরের ব্যাটিং লাইন-আপে বড়সড় ধাক্কা লাগে। বিশেষ করে পরশ ডোগরার উইকেট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথম ইনিংসে তিনিই দলের হয়ে সর্বাধিক ৭৫ রান করেছিলেন। অর্থাৎ, তিনি শুধু অধিনায়কই ছিলেন না, ব্যাট হাতেও ছিলেন দলের অন্যতম প্রধান ভরসা।
পরশ যদি ক্রিজে আরও কিছুটা সময় কাটাতে পারতেন, তাহলে ম্যাচের পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। তাঁর অভিজ্ঞতা এবং প্রথম ইনিংসের পারফরম্যান্স জম্মু-কাশ্মীরকে আশা দেখাচ্ছিল। কিন্তু মুকেশের বলে তাঁর বোল্ড হওয়া সেই আশায় বড় আঘাত করে।
এর পরেই কার্যত ভেঙে পড়ে জম্মু-কাশ্মীরের ইনিংস।
অবশিষ্ট ভারতের বোলিং আক্রমণের সামনে একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে তারা। মুকেশ নিজেও থামেননি। দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর বোলিংয়ের সামনে প্রতিপক্ষ ব্যাটাররা বার বার সমস্যায় পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত ছয়টি উইকেট নিয়ে ম্যাচের অন্যতম প্রধান নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি।
এই ছয় উইকেট শুধু একজন বোলারের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দলের সাফল্য, অধিনায়কের সঙ্গে বোঝাপড়া এবং ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের উপর আস্থা রাখার গল্প।
বিশেষ করে ১৩তম ওভারের আগের ঘটনাটি তাই আলাদা করে নজর কাড়ছে। একজন অধিনায়ক যখন বোলিং পরিবর্তনের কথা ভাবছেন, তখন একজন বোলার নিজেই গিয়ে বলছেন, তাঁকে আরও একটি ওভার দেওয়া হোক। অধিনায়ক তাঁর কথা মেনে নিচ্ছেন। তারপর সেই ওভারেই দুই উইকেট। ক্রিকেটে এর চেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আর কী হতে পারে!
মুকেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার এই পেসার দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। নতুন বলে সুইং, লাইন-লেন্থ ধরে রাখা এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁর অন্যতম শক্তি। ইরানি কাপের এই ম্যাচেও সেই গুণগুলিই দেখা গেল।
জম্মু-কাশ্মীরের ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে মুকেশ বারবার চাপ তৈরি করেছেন। ব্যাটারদের ভুল করতে বাধ্য করেছেন। তাঁর বোলিংয়ে ছিল ধৈর্য এবং আক্রমণ—দুটিরই সুন্দর মিশেল। আর যখন প্রয়োজন হয়েছে, তখন গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়েছেন তিনি।
ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ছয় উইকেট নেওয়ার ফলে মুকেশের পারফরম্যান্স স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। কিন্তু তাঁর পারফরম্যান্সের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকতে পারে সেই ছোট্ট অনুরোধ—‘আর একটা ওভার’।
কারণ ক্রিকেটের ইতিহাসে অনেক সময় বড় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে এমন ছোট ছোট সিদ্ধান্তই। একটি বল, একটি ক্যাচ, একটি অধিনায়কত্বের সিদ্ধান্ত অথবা একজন বোলারের আত্মবিশ্বাস—যে কোনও একটি মুহূর্ত বদলে দিতে পারে গোটা ম্যাচের চিত্র। এই ম্যাচেও তেমনই একটি মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল ১৩তম ওভারের আগে।
সরফরাজ় যদি তখন বোলিং পরিবর্তন করে দিতেন, তাহলে হয়তো মুকেশ সেই ওভারটি করতে পারতেন না। আর সেই ওভারেই যে পরপর দুই উইকেট আসবে, সেটিও নিশ্চিত ছিল না। কিন্তু ক্রিকেটে ‘যদি’ বা ‘কিন্তু’র কোনও জায়গা নেই। বাস্তবতা হল, মুকেশ নিজের উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন, অধিনায়ক তাঁর কথায় আস্থা রেখেছিলেন এবং ফল এসেছিল অবিশ্বাস্য দ্রুততায়।
একদিকে শুভম পুন্ডিরের উইকেট, অন্যদিকে পরশ ডোগরার বোল্ড—দুই বলের ব্যবধানে জম্মু-কাশ্মীরের ব্যাটিংয়ে বড়সড় ধাক্কা। বিশেষ করে পরশের উইকেটের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে যায় তাদের জন্য।
প্রথম ইনিংসে ৭৫ রান করা ব্যাটারকে দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুত হারানো মানে দলের জন্য বড় ধাক্কা। পরশ ডোগরা শুধু রান করার ক্ষমতাই রাখতেন না, তাঁর উপস্থিতি অন্য ব্যাটারদেরও আত্মবিশ্বাস দিত। তিনি মাঠে থাকলে জম্মু-কাশ্মীরের লড়াইটা আরও কিছুটা দীর্ঘ হতে পারত। কিন্তু মুকেশ তাঁকে সুযোগই দিলেন না।
তাঁর নিখুঁত বল এসে আঘাত করল স্টাম্পে। আর সেই মুহূর্ত থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে চলে গেল অবশিষ্ট ভারতের হাতে।
শেষ পর্যন্ত মুকেশের ছয় উইকেটের দাপটে জম্মু-কাশ্মীরকে হারিয়ে ইরানি কাপ জিতে নেয় অবশিষ্ট ভারত। ম্যাচের ফলাফলের দিকে তাকালে হয়তো দেখা যাবে একজন বোলার ছয় উইকেট নিয়েছেন এবং দল জয় পেয়েছে। কিন্তু সেই সংখ্যার পিছনে রয়েছে অনেক বড় একটি গল্প।
এটি একজন বোলারের নিজের উপর বিশ্বাস রাখার গল্প।
এটি একজন অধিনায়কের নিজের বোলারের উপর আস্থা রাখার গল্প।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ওভারের গল্প।
আর সর্বোপরি, এটি দেখিয়ে দেয় যে ক্রিকেটে ম্যাচের গতিপথ বদলানোর জন্য সবসময় বড় কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও শুধু ‘আর একটা ওভার’-এর অনুরোধই যথেষ্ট।
মুকেশ কুমারের জন্য এই ইরানি কাপ তাই নিছক আর একটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতার ম্যাচ নয়। ছয় উইকেটের পারফরম্যান্স তাঁকে ম্যাচের অন্যতম প্রধান নায়ক করেছে। কিন্তু তার থেকেও বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে সেই মুহূর্ত, যখন বোলিং থেকে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনার মধ্যেও তিনি নিজেই এগিয়ে এসে বলেছিলেন, আরও একটি ওভার করতে চান।
অধিনায়ক সরফরাজ় খান সেই অনুরোধ রেখেছিলেন। আর মুকেশ সেই আস্থার মর্যাদা দিয়েছেন বল হাতে।
এক ওভারে দুই উইকেট। তার মধ্যে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটার এবং অধিনায়ক। তারপর ধীরে ধীরে জম্মু-কাশ্মীরের ইনিংসের পতন। শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট ভারতের হাতে ইরানি কাপ।
তাই এই ম্যাচের নায়ক হিসেবে মুকেশ কুমারের নাম উঠে আসাটা একেবারেই স্বাভাবিক। তাঁর ছয় উইকেট পরিসংখ্যানের পাতায় জায়গা করে নেবে। কিন্তু ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে হয়তো আরও বেশি দিন থেকে যাবে সেই ছোট্ট দৃশ্যটি—সরফরাজ় বোলার বদলানোর কথা ভাবছেন, আর মুকেশ তাঁর কাছে গিয়ে হাতের ইশারায় চাইছেন, আর একটা ওভার।
সেই একটা ওভারই শেষ পর্যন্ত ম্যাচের গল্প বদলে দিল।
মুকেশ চেয়েছিলেন আরও একটি ওভার। সরফরাজ় দিয়েছিলেন সেই সুযোগ। আর বাংলার পেসার সেই সুযোগকে পরিণত করেছিলেন ইরানি কাপ জয়ের মঞ্চে।