অফিসপাড়ায় অতি সহজে ও কম দামে মেলে মোমো। ফলে অনেকেই রোজকার নাশতা বা দুপুরের খাবারেই ভরসা করেন এই স্টিমড স্ন্যাকসের উপর। কিন্তু লোকমুখে ‘স্বাস্থ্যকর’ তকমা পাওয়া এই মোমো আদৌ কতটা হেলদি? নিয়মিত খাওয়া কি সত্যিই নিরাপদ?
কলকাতার খাবারের মানচিত্রে মোমোর অবস্থান এখন একেবারে অটল। পাহাড়ি অঞ্চলের তিব্বতি ও নেপালি সম্প্রদায়ের হাত ধরে এই সহজ-সরল খাবারটি যখন প্রথম সমতলে পৌঁছয়, তখন কেউই ভাবেননি যে একদিন তা শহরের অন্যতম জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড হয়ে উঠবে। সময়ের সঙ্গে মোমো এমন ভাবে কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতিতে মিশে গিয়েছে যে আজ শহরের প্রত্যেক প্রান্তেই ছোট-বড় মোমো স্টলের দেখা মেলে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই চোখে পড়ে ফুটপাতের ধারে সারি সারি স্টিমার—তার ভেতর থেকে ওঠা গরম ধোঁয়া যেন দূর থেকেই ডেকে আনে খিদে। সেই ধোঁয়ার আড়ালেই দেখা যায় সদ্যসেদ্ধ, নরম মোমো। পাশে থাকে টক-ঝাল লাল চাটনি কিংবা হালকা স্যুপ, যা এখন শহরতলি থেকে শুরু করে মফস্বলের দোকানেও সহজেই মেলে।
মোমোর এই জনপ্রিয়তার পিছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ। প্রথমত, দাম তুলনায় বেশ কম—ফলে ছাত্রছাত্রী হোক বা অফিসকর্মী, সকলের কাছেই এটি সহজলভ্য। দ্বিতীয়ত, তেলে ভাজা নয় বলে অনেকেই মনে করেন মোমো তুলনামূলকভাবে ‘স্বাস্থ্যকর’। বিশেষ করে ভাজাভুজির পরে যেমন অম্বল বা অস্বস্তি হয়, সেদ্ধ মোমো খেলে তা সাধারণত হয় না। ফলে নিয়মিত বাইরে খাওয়া-দাওয়া করেন এমন লোকেরাও অনেক সময় মোমোকে অপেক্ষাকৃত হালকা বিকল্প বলে ধরে নেন।
শুধু সেদ্ধ মোমো নয়, এর জনপ্রিয়তা বাড়তে বাড়তে তৈরি হয়েছে নানা পদ—তন্দুরি মোমো, ফ্রায়েড মোমো, চিকেন চিজ মোমো, গন্ধরাজ মোমো, এমনকি ভেটকি মাছের মোমোও এখন বাজারে দারুণ সাড়া পাচ্ছে। শহরের মানুষ স্বাদের পরিবর্তন পছন্দ করে, আর মোমো সেই জায়গাটাই দখল করেছে সহজেই। যাঁরা প্রতিদিন অফিসপাড়ায় যান, তাঁদের জন্য মোমো তো আরও বেশি সুবিধাজনক। স্টলের সামনে পাঁচ মিনিট দাঁড়ালেই গরম ধোঁয়া ওঠা একটি প্লেট মোমো পাওয়া যায়, তাও কম দামে।
সব মিলিয়ে, শহরের দ্রুতগামী জীবনযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মোমো আজ একাধারে স্বাদ, সুবিধা এবং সাশ্রয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে কলকাতায়।
মোমোর জনপ্রিয়তার বড় কারণ এর সহজলভ্যতা। অফিসপাড়া, কলেজ ক্যাম্পাস, হাসপাতালের সামনে, বাজারের মোড়—কোথায় নেই মোমো? দামও তুলনায় কম, তাই পকেটে বাড়তি চাপ ফেলে না। অনেকে অফিস থেকে বেরিয়েই বা দুপুরের বিরতিতে ঝটপট প্লেটে তুলে নেন মোমো। বিশেষত সেদ্ধ মোমো ‘স্বাস্থ্যকর’ বলে যে ধারণা জনমানসে তৈরি হয়েছে, সেটিও এর প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়েছে বহুগুণে। তেলে ভাজা খাবারের মতো তেলচুপচুপে নয়, খেতে হালকা, এবং সহজপাচ্য—এই ভাবনা থেকেই অনেকেই প্রতিদিন মোমো খাওয়া শুরু করেন। আর তার ফলেই রাস্তাঘাটে নিত্যনতুন বৈচিত্র্য দেখা যায়—ফ্রায়েড মোমো, তন্দুরি মোমো, চিকেন চিজ মোমো, গন্ধরাজ লেবুর সুগন্ধে ভরপুর বিশেষ মোমো, এমনকি ফিশ মোমোও মিলছে এখন।
কিন্তু এই সবের মধ্যেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হল—মোমো আসলে কতটা স্বাস্থ্যকর? যে খাবারটি বহু মানুষ রোজকার অভ্যাসে পরিণত করেছেন, তা শরীরের জন্য ভাল না মন্দ? পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিকের বক্তব্য অনুযায়ী, মোমোর প্রধান উপাদান ময়দা। ময়দা হল আটার এমন এক রূপ, যেটি পরিশোধনের বিভিন্ন ধাপের মাধ্যমে গঠিত হয়। এতে ফাইবারের পরিমাণ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে ময়দা-ভিত্তিক খাবার নিয়মিত খেলে শরীর যে সমস্যায় পড়তে পারে, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। মোমো দেখতে যতই সাধাসিধে হোক না কেন, নিয়মিত খেলে তার প্রভাব শরীরে স্পষ্ট হতে সময় লাগে না।
মোমোর এই নিয়মিত খাওয়া সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার জন্ম দেয়, তা হল হজমের গোলযোগ। ফাইবারহীন ময়দা অন্ত্রের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করতে পারে। হজম ধীর হয়ে যাওয়ায় দেখা দিতে পারে অম্বল, গ্যাস, পেটফাঁপা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা। অনেক সময় দেখা যায়, সকালের নাশতায় মোমো খাওয়ার পর সারাদিন পেট ভার ভার লাগে, খিদে লাগে না, বা অস্বস্তিবোধ সৃষ্টি হয়। তবে শুধু এটুকুই নয়—স্ট্রিট ফুড হিসেবে মোমো যে পরিবেশে তৈরি হয়, তার পরিচ্ছন্নতাও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কোন তেল ব্যবহার হচ্ছে, কী পরিমাণে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, সবজি বা মাংস কতটা তাজা—এসব নিয়েই থাকে প্রশ্ন। তার সঙ্গে থাকে লাল ঝাল চাটনির বাড়তি ঝাল, যা রোজ খেলে অম্বল বা অ্যাসিডিটির সমস্যা বাড়তে পারে।
শরীরের ওজন বাড়ার ক্ষেত্রেও মোমো একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও সেদ্ধ মোমো দেখতে হালকা, কিন্তু ময়দা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। বিশেষত যারা সপ্তাহে বহুবার খেয়ে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে রক্তে গ্লুকোজ লেভেল বাড়তে বাড়তে একসময় প্রি–ডায়াবিটিস বা ডায়াবিটিস তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন কেউ ফ্রায়েড, চিজ মোমো বা তন্দুরি মোমো খেতে শুরু করেন। এগুলিতে থাকে উচ্চমাত্রার ফ্যাট ও ক্যালোরি। রাস্তার দোকানে মোমো ভাজা হয় বহুবার ব্যবহার করা পুড়ে যাওয়া তেলে, যা শরীরে খারাপ ফ্যাট জমিয়ে ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে। বাড়তি কোলেস্টেরল হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ায়, রক্তনালির উপর বাড়তি চাপ ফেলে, আর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হাইপারটেনশন বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
এছাড়াও, মোমোতে সাধারণত সয়া সস বা এমএসজি—মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট—ব্যবহার করা হয় স্বাদ বাড়ানোর জন্য। এগুলোর মধ্যে নুনের পরিমাণ প্রচুর। যারা প্রতিদিন বা সপ্তাহে বহুদিন মোমো খান, তারা অজান্তেই শরীরে বাড়তি সোডিয়াম জমাচ্ছেন। এই বাড়তি নুন রক্তচাপের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, যার ফলে উচ্চ রক্তচাপ বা মাথাব্যথা, অস্বস্তি বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় কম বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যেও এই ধরনের সমস্যা দেখা যায় শুধু অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত নুনযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাসের কারণে।
মোমো তেলে ভাজা না হলেও, এতে তেল একেবারে থাকে না তা নয়। বিশেষ করে স্ট্রিট ফুড হিসেবে নিম্নমানের তেল ব্যবহারের সম্ভাবনা বেশি। খারাপ মানের তেল লিভারের উপর বাড়তি চাপ ফেলে। লিভার সুস্থ না থাকলে তার প্রভাব ত্বকেও পড়ে—ব্রণ, র্যাশ, বা নিস্তেজ হয়ে যাওয়া ত্বক এই সব সমস্যাই দেখা দিতে পারে। অনেকেই জানেন না যে ত্বকের প্রকৃত স্বাস্থ্য আসে মূলত পেট ও লিভারের সুস্থতা থেকে। তাই ঘনঘন মোমোর মতো খাবার খেলে শুধু ভেতর থেকেই সমস্যা নয়, বাইরের ত্বকেও তার চিহ্ন ফুটে ওঠে।
মোমো খেতে গেলে আরও একটি বিষয় বড় ভূমিকা রাখে—শরীরের ডোপামিন রিওয়ার্ড সিস্টেম। ময়দা, নুন, ফ্যাট এবং মশলার এই মিশ্রণ এমনভাবে কাজ করে যে খেতে বেশ আনন্দ লাগে এবং সেই আনন্দই মস্তিষ্কে পুরস্কারের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। অনন্যা ভৌমিকের মতে, এই কারণেই মানুষ বারবার মোমো খেতে চায়। তা হাতের কাছে থাকলে আরও সহজেই খাওয়া হয়ে যায়। ফলে খাবারটির উপর একধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়, যা ধীরে ধীরে বিপদ ডেকে আনতে পারে।
তাহলে কি মোমো খাওয়া একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেমন নয়। যে কোনও খাবারই পরিমাণের বিচারে ভালো বা খারাপ হয়। যদি কেউ সপ্তাহে একবার বা মাসে দু’তিন দিন মোমো খান, এবং তা পরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি সেদ্ধ মোমো হয়, তবে তেমন ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। মোমোকে যদি স্বাস্থ্যকর করে তুলতে চান, তবে ময়দার বদলে আটা বা মিলেট দিয়ে তৈরি মোমো বেছে নেওয়া যেতে পারে। এর সঙ্গে ভাজা নয়, সেদ্ধ মোমোর দিকেই ঝোঁকা উচিত। চাটনি খুব ঝাল হলে তা কম খাওয়া ভালো, আর সস বা এমএসজি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল—পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া।
সুতরাং, মোমো সুস্বাদু, জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য, এই সত্যে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু ‘স্বাস্থ্যকর’ বলেই তা প্রতিদিন খাওয়া যাবে—এ ধারণা ভুল। রোজকার খাদ্যতালিকায় এটি রাখলে শরীরের বিপাকক্রিয়া থেকে শুরু করে হজম, ওজন, ত্বক—সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই মোমোকে উপভোগ করতে হলে প্রয়োজন সংযম, সঠিক নির্বাচন এবং সচেতনতা। তখনই এই পাহাড়ি খাবারের স্বাদ উপভোগ করেও সুস্থ থাকা সম্ভব।