সাম্প্রতিকভাবে পাকিস্তান গভীর রাতে আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে একাধিক বিমান হামলা পরিচালনা করেছে, যা সীমান্ত সংকটকে নতুন করে তীব্র করে তুলেছে। এই হামলাগুলি মূলত আফগানিস্তানের নানগারহার, পাকতিকা ও সীমান্তবর্তী অন্যান্য প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হয়েছে, যেখানে পাকিস্তানিরা দাবি করেছে তারা তেহরিক‑ই‑তালেবান পাকিস্তান (TTP) ও সংশ্লিষ্ট অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি ও লুকিয়ে থাকা জঙ্গি আস্তানা লক্ষ্য করে এ অভিযান পরিচালনা করেছে। পাকিস্তানের সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হামলাগুলি “গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত লক্ষ্যস্থলগুলিকে নিশানা করে” এবং এগুলোকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক আত্মঘাতী বোমা হামলার সঙ্গেও যুক্ত করা হচ্ছে; পাকিস্তান দাবি করেছে যে উঠে আসে এমন বেশ কয়েকটি হামলায় তারা হতাহতের শিকার হয়েছে, যার জন্য তারা আফগানিস্তানের ভূখণ্ডে সক্রিয় জঙ্গিদের *উৎস ও সহায়তাকারীদের দায়ী করছে। অন্যদিকে আফগান সরকার ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, এই বিমান হামলায় অন্তত দশsো মানুষ নিহত ও বহু আহত হয়েছে; নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু সহ বেসামরিক লোক রয়েছে বলে সংবাদএ প্রকাশিত হয়েছে। আফগান পক্ষের দাবি অনুযায়ী, বারমাল জেলার একটি মাদ্রাসা পর্যন্ত নিশানা করা হয়েছে এবং বেসামরিক বাড়িঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিও হয়েছে।
২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার মধ্যরাতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকা পুনরায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, যখন পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী একাধিক এয়ারস্ট্রাইক বিমান হামলা পরিচালনা করেছে। এই হামলার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, সরকারি সূত্র এবং আফগান কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক প্রতিবেদনে দৃঢ়ভাবে এসেছে এবং তা সমস্তটির প্রভাব ও প্রেক্ষাপট বহুমাত্রিক।
পাকিস্তান জানায় যে তারা আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলিতে তেহরিক‑ই‑তালেবান পাকিস্তান (TTP), আইএস‑কে (ISKP) ও সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীর আস্তানা, ঘাঁটি ও অপারেশনাল কেন্দ্র লক্ষ্য করে বিমান হামলা পরিচালনা করেছে, যেখানে তাদের দাবি সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হামলার প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিমান হামলায় অন্তত সাতটি ক্যম্প ও সন্ত্রাসী আশ্রয়স্থান লক্ষ্য করা হয়েছে এবং “ইন্টেলিজেন্স‑ভিত্তিক নির্দিষ্ট লক্ষ্যভুক্ত হামলা” চালানো হয়েছে। পাকিস্তান মনে করে, আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী কার্যক্রম তাদের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ও হামলার দায়ী সত্ত্বা হিসেবে দায়ী। তাদের মতে, এসব হামলা সীমান্তবর্তী নানগারহার ও পক্তিকা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় হয়েছিল।
তবে আফগান পক্ষ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে যে পাকিস্তান বেসামরিক বসতি ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছে, যা তাদের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট লঙ্ঘন। আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বলেছেন, “পাকিস্তানি বিমান বাহিনী আমাদের নারী ও শিশু সহ বেসামরিক নাগরিকদেরকে নিশানা করেছে”, এবং এই হামলায় ডজনখানেক মানুষ নিহত ও বহু আহত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় আফগান সূত্রগুলো জানিয়েছে যে এই বিমান হামলা সীমান্তের কাছাকাছি নানগারহার ও পক্তিকা প্রদেশের বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত হয়েছে, যেখানে অন্তত ১৭ থেকে ১৯ জনের বেশি লোক নিহত হয়েছে এবং আরও অনেকেই আহত হয়েছেন। মৃতদের মধ্যে নারী ও শিশুদেরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, এবং একটি ধর্মীয় মাদ্রাসা / শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে বলে রিপোর্ট এসেছে।
স্থানীয় সংবাদ সংস্থার মতে, বিমান হামলা পক্তিকার বারমাল ও উরগুন, এবং নানগারহারের খোগ্যানি, বেহসুদ ও গনিখেল জেলায় হয়েছিল, যেখানে ফরিদ, শাহাবউদ্দিন বা অন্যান্য পরিবারের সদস্যসহ বেসামরিক লোকেরা নিহত হয়েছেন। হামলার ফলে গৃহহারা পরিবার ও স্থানীয় অসহায় মানুষের মানবিক পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়ে উঠেছে, যেমন স্থানীয় হাসপাতালে ভিড় বাড়ছে ও দুর্গত এলাকায় অস্থিরতা ছড়াছড়ি করছে।
এই ঘটনা আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীন পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে, যেখানে ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিশীলতার অভাব দেখা দিয়েছে। সীমান্তবর্তী জনবসতি ব্যতীত ওই এলাকায় বহু মানুষ কৃষি ও বাণিজ্যে নিয়োজিত ছিল, এবং হঠাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতি এলাকা ও বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের জীবন অনেকটাই অচল হয়ে পড়েছে
এই বিমান হামলা শুধুই সামরিক ঘটনা নয় এটি দীর্ঘদিনের পাকিস্তান‑আফগানিস্তান সম্পর্কের উত্তেজনা ও নিরাপত্তা সমস্যার একটি অংশ। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ক্রমেই টানাপোড়েনপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করেছে যে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তানি তালেবান (TTP) এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাদের ঘাঁটি গড়ে তুলছে এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে। আফগান রাষ্ট্র ও কর্মকর্তারা এই অভিযোগ সাধারণত অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে তারা নিজেদের সীমাবদ্ধ সামর্থ্যের মধ্যে রেখেই নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
এই নতুন বিমান হামলার ঘটনাটি আসতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটে যা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক আত্মঘাতী হামলাগুলোর সাথে জড়িত। যেমন বাজৌর ও বান্নু অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা বাংলাদেশ সময় ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে পাকিস্তান দাবি করেছে এসব হামলার জন্য TTP ও সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীরা দায়ী।
উভয় পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট ভিন্নতা মানবিক ও কূটনৈতিক স্তরেও প্রতিফলিত হয়েছে। আফগান সরকার এই বিমান হামলাকে আক্রমণ ও লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরছে। পাকিস্তান পক্ষ তার সেনাবাহিনীর পদক্ষেপকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রতিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
এই বিরোধ থাকা সত্ত্বেও, কাতার ও অন্যান্য দেশ মধ্যস্থতায় সীমান্ত সংঘর্ষ রোধ ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার জন্য কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই বিমান হামলা এরই মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি ও বিশ্বাস পুনর্নির্মাণকে কঠিন করে দিয়েছে।
আফগানিস্তান‑পাকিস্তান সীমান্তীয় উত্তেজনা শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এটির আঞ্চলিক নিরাপত্তা, শরণার্থী পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপরে ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সাধারণত সীমান্তের মধ্যে সংঘর্ষ কমাতে ও মানবিক পরিস্থিতি উন্নত করতে সহায়তার আহ্বান জানায়, কিন্তু যখন এক দেশ অন্য দেশের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালায়, তখন তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে।
যদিও পাকিস্তান দাবি করছে তারা শুধু সন্ত্রাসী ঘাঁটি ও অপারেশনাল স্থান লক্ষ্য করেছে, আফগান পক্ষ ও নানারকম মানবাধিকার গ্রুপ মনে করেন এই ধরনের হামলা বেসামরিক লোকের প্রতি নিরাপত্তা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাপ, তদন্ত ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
ওদিকে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে গেছে। তালেবান নেতৃত্বাধীন আফগান প্রশাসন ও পাকিস্তান উভয়ই নিজেদের নিরাপত্তা দাবিতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, এবং এ ধরনের বিমান হামলা ভয়াবহ প্রতিশোধমূলক কর্মসূচি ও সীমান্ত সংঘর্ষের নতুন চক্র সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে দু’পক্ষের সামরিক ও বেসামরিক লোকজন লক্ষ্যভুক্ত হতে পারে।
যদিও কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সীমান্তবর্তী সাধারণ নাগরিকদের উপর। বেসামরিক লোকেরা বিশেষত শিশুরা, দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতের মাঝে বসবাস করছে তারা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে না। স্থানীয় হাসপাতালে আহত লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং বহু পরিবার নিজেদের ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানের দিকে যাচ্ছেন বলে প্রতিবেদন এসেছে। বেসামরিক নাগরিকদের জীবন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবই এই পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই মানবিক বিপর্যয় শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে সীমান্ত পার হওয়া পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিপুল লোক শরণার্থী হয়ে যেতে পারে, যার ফলে আঞ্চলিক মানবিক সহায়তার চাপ বাড়বে।
পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আফগান পক্ষ কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা জানিয়ে বলছে, আফগান ঘরোয়া ঘটনায় তাদের ভূমিকা নেই এবং এই হামলা তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন; পাশাপাশি তারা উত্তরের বিভিন্ন পক্ষকে সতর্ক করেছে যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ধরনের অভিযান দু দেশের সম্পর্ককে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে এবং সীমান্তীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, মানবাধিকার সমস্যাসহ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে, বিশেষত যখন বেসামরিক লোকের প্রাণহানি যুক্ত হচ্ছে।