বৃহস্পতিবার দুপুরে জম্মু-কাশ্মীরের ডোডা জেলার ভদ্রওয়াহ এলাকায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় ২০০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যায় ভারতীয় সেনার একটি গাড়ি। সেনা সূত্রে খবর, দুর্ঘটনার সময় ওই গাড়িটিতে অন্তত ১৭ জন জওয়ান ছিলেন।
জম্মু ও কাশ্মীর, ডোডা: দেশের সুরক্ষায় যারা সর্বদা নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করে সীমান্তে পাহারায় থাকেন, প্রকৃতির রোষ এবং দুর্গম পথের ভয়াবহতায় ফের প্রাণ গেল সেই বীর সন্তানদের। বৃহস্পতিবার দুপুরে জম্মু ও কাশ্মীরের ডোডা জেলায় ঘটে যাওয়া এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় কেঁপে উঠল গোটা দেশ। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় ২০০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যায় ভারতীয় সেনার একটি গাড়ি। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেছেন ১০ জন বীর জওয়ান এবং গুরুতর আহত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন আরও অন্তত ১০ জন।
ভদ্রওয়াহ-চম্বা সড়কের উপর খন্নী টপ এলাকায় যখন এই দুর্ঘটনাটি ঘটে, তখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর গড়িয়েছে। আচমকাই পাহাড়ি নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে ঘটে যায় এই বিপর্যয়। এই ঘটনায় শোকস্তব্ধ গোটা দেশ। সেনার তরফে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করা হলেও দুর্গম এলাকা এবং গভীর খাদের কারণে উদ্ধারকাজে প্রবল বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়।
সংবাদসংস্থা পিটিআই এবং সেনা সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার একটি কনভয় বা সেনার গাড়ির বহর বিশেষ অভিযানের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। ওই নির্দিষ্ট ট্রাকটিতে (সেনার বিশেষ যান) চালক এবং সহযোগী মিলিয়ে মোট ২০ জন সেনাকর্মী ছিলেন। ডোডা জেলার ভদ্রওয়াহ এলাকাটি পাহাড়ি এবং আঁকাবাঁকা রাস্তার জন্য পরিচিত। বিশেষ করে ভদ্রওয়াহ-চম্বা সড়কটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গাড়িটি যখন খন্নী টপ (Khanni Top) এলাকা অতিক্রম করছিল, তখনই ঘটে বিপত্তি। পাহাড়ি রাস্তায় আচমকাই গাড়ির চাকা পিছলে যায় বা চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, চোখের পলকে বিশাল সেনার গাড়িটি রাস্তা থেকে ছিটকে গিয়ে সোজা প্রায় ২০০ ফুট গভীর খাদে গিয়ে আছড়ে পড়ে। ২০০ ফুট গভীরতা—অর্থাৎ প্রায় ২০ তলা বাড়ির সমান উচ্চতা থেকে নিচে পড়ার ফলে গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়। পাথুরে জমিতে আছড়ে পড়ার অভিঘাতে ঘটনাস্থলেই অনেকের মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং ভারতীয় সেনার নিকটবর্তী ইউনিটগুলি দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। তবে দুর্ঘটনাস্থলটি এতটাই দুর্গম ছিল যে সেখানে পৌঁছানোই ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ। খাদের গভীরতা এবং খাড়া ঢাল উদ্ধারকারীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সেনা সূত্রে খবর, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেনার 'কুইক রিঅ্যাকশন টিম' (QRT) এবং জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের একটি যৌথ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। শুরু হয় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ। স্থানীয় গ্রামবাসীরাও আওয়াজ পেয়ে ছুটে আসেন এবং প্রাথমিক উদ্ধারকাজে হাত লাগান। দড়ির সাহায্যে এবং পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে জওয়ানদের উদ্ধার করার চেষ্টা করা হয়।
দুর্ভাগ্যবশত, গাড়ির নিচে চাপা পড়ে এবং পাথরের আঘাতে ঘটনাস্থলেই ১০ জন জওয়ানের মৃত্যু হয়। তাঁদের দেহগুলি ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বাকি ১০ জনকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের শরীরের বিভিন্ন হাড় ভেঙে গিয়েছে এবং অনেকের মাথায় গুরুতর চোট রয়েছে।
আহত জওয়ানদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের সড়কপথে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নেওয়া হয়নি। সেনার চপার বা হেলিকপ্টারের মাধ্যমে তাঁদের দ্রুত 'এয়ারলিফ্ট' করা হয়। সেখান থেকে তাঁদের উধমপুর কমান্ড হাসপাতালে (Udhampur Command Hospital) নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উধমপুরের এই হাসপাতালটি সেনার নর্দান কমান্ডের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র, যেখানে উন্নতমানের ট্রমা কেয়ার বা জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক। তাঁদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (ICU) রাখা হয়েছে। চিকিৎসকদের একটি বিশেষ দল তাঁদের চিকিৎসার দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
দুর্ঘটনার পর পরই ভারতীয় সেনার 'হোয়াইট নাইট কোর' (White Knight Corps)-এর তরফে একটি বিবৃতি জারি করা হয়েছে। সেনার তরফে জানানো হয়েছে, ওই জওয়ানরা একটি রুটিন অপারেশনাল টাস্ক বা অভিযানের অংশ হিসেবে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছিলেন।
সেনার প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, খারাপ আবহাওয়া এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হতে পারে। গত কয়েকদিন ধরেই জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টিপাত এবং তুষারপাতের খবর পাওয়া গিয়েছে। পাহাড়ি রাস্তায় সামান্য বৃষ্টিতেই পিচ্ছিল হয়ে যায়, যা ভারী সেনার গাড়ি চালনার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "খারাপ আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে বিপদসঙ্কুল পাহাড়ি পথ ধরে যাওয়ার সময় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ধারের গভীর খাদে পড়ে যায়।"
সেনার তরফে এখনও নিহত জওয়ানদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ্যে আনা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে নিহতদের পরিবারকে খবর দেওয়া হয় এবং তারপর সরকারিভাবে নাম ঘোষণা করা হয়। তবে এই ঘটনা সেনার মনোবল এবং সাধারণ মানুষের আবেগে গভীর আঘাত হেনেছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের ডোডা জেলা বা চেনাব উপত্যকা (Chenab Valley) এলাকাটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য যেমন বিখ্যাত, তেমনই কুখ্যাত তার বিপজ্জনক রাস্তার জন্য। পীর পাঞ্জাল রেঞ্জের পাদদেশে অবস্থিত এই এলাকার রাস্তাগুলি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং খাড়া।
ভদ্রওয়াহ-চম্বা সড়ক: এই রাস্তাটি জম্মু ও কাশ্মীরকে হিমাচল প্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এটি একটি অত্যন্ত কৌশলগত রুট হলেও, এর গঠনশৈলী চালকদের জন্য সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং।
খন্নী টপ: দুর্ঘটনাস্থল খন্নী টপ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচুতে অবস্থিত। এখানে প্রায়শই কুয়াশা থাকে এবং রাস্তা পিচ্ছিল থাকে। সামান্য অসতর্কতা বা যান্ত্রিক গোলযোগ এখানে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ব্লাইন্ড কার্ভ: এই রাস্তায় অজস্র 'ব্লাইন্ড কার্ভ' বা অন্ধ বাঁক রয়েছে, যেখানে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ি দেখা যায় না বা রাস্তার কিনারা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনার গাড়িগুলি সাধারণত অত্যন্ত মজবুত হয় এবং চালকরাও বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। কিন্তু পাহাড়ি রাস্তায় প্রকৃতির খেয়ালের কাছে অনেক সময় সব প্রস্তুতিই হার মানে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় রাজনৈতিক মহলেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন দলের নেতারা জওয়ানদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং শোক প্রকাশ করেছেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন:
‘‘ডোডায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমাদের সাহসী জওয়ানদের মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত। কর্তব্যপালন করতে গিয়ে ১০ জন বীর জওয়ান প্রাণ দিয়েছেন এবং আরও কয়েক জন আহত হয়েছেন। এই ঘটনা আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দেয় যে, দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে আমাদের জওয়ানদের প্রতি দিন কত বিপদের সন্মুখীন হতে হয়। নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই।’’
অভিষেকের এই বার্তাটি কেবল রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, বরং এটি আপামর ভারতবাসীর মনের কথা। তিনি সঠিকভাবে উল্লেখ করেছেন যে, জওয়ানরা প্রতিদিন যে ঝুঁকির সম্মুখীন হন, তা সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত।
এই দুর্ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, একজন সৈনিকের জীবন কতটা অনিশ্চয়তায় ভরা। আমরা যখন নিশ্চিন্তে ঘুমাই, তখন এই মানুষগুলো দুর্গম পাহাড়ে, বরফের স্তূপে কিংবা তপ্ত মরুভূমিতে পাহারায় থাকেন। শত্রুর গুলির চেয়েও অনেক সময় বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে প্রকৃতি।
প্রতিকূল আবহাওয়া: জিরো ডিগ্রি তাপমাত্রায় কিংবা প্রবল বৃষ্টিতে তাঁদের ডিউটি করতে হয়।
দুর্গম পথ: এমন সব রাস্তায় তাঁদের গাড়ি চালাতে হয়, যেখানে একচুল এদিক-ওদিক হলেই মৃত্যু নিশ্চিত।
মানসিক চাপ: পরিবারের থেকে দূরে থেকে, মৃত্যুভয়কে জয় করে তাঁদের কর্তব্যে অবিচল থাকতে হয়।
বৃহস্পতিবারের এই দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অতীতেও লাদাখ, সিকিম কিংবা অরুণাচলের পাহাড়ি রাস্তায় সেনার গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। প্রতিটি মৃত্যুই দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ১০টি পরিবার আজ তাদের সন্তান, স্বামী বা বাবাকে হারাল। যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কোনো ক্ষতিপূরণ দিয়ে ভরাট করা সম্ভব নয়।
আপাতত সবার নজর উধমপুর কমান্ড হাসপাতালের দিকে। দেশবাসী প্রার্থনা করছেন, আহত ১০ জন জওয়ান যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। একইসঙ্গে নিহতদের মরদেহ সসম্মানে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সেনাবাহিনী। যখন কফিনবন্দী হয়ে এই বীর সন্তানেরা তাঁদের গ্রামের বাড়িতে ফিরবেন, তখন আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠবে কান্নায়।
এই বীর জওয়ানদের আত্মত্যাগ জাতি সর্বদা মনে রাখবে। ডোডায় ঝরে যাওয়া এই ১০টি প্রাণ আমাদের ঋণী করে গেল। তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি জানাই গভীর সমবেদনা।