তদন্তে জানা গেছে জঙ্গিদলে নিয়োগের পদ্ধতি এখন আগের তুলনায় পুরোপুরি বদলে গেছে এবং নতুন কৌশলে সদস্য বেছে নেওয়া হচ্ছে
পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন জইশ ই মহম্মদ যে বহু দিন ধরে ভারতে একটি সুসংগঠিত স্লিপার সেল গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছিল তা নতুন নয় কিন্তু দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডের তদন্তে উঠে আসা নতুন তথ্য গোটা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই আরও সতর্ক করে তুলেছে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন যে এই স্লিপার সেল গঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল একজন চিকিৎসকের হাতে যাঁর নাম উমর উন নবি এবং এই তথ্য সামনে আসতেই গোটা তদন্তের দিকটাই বদলে গেছে কারণ একজন উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসক এ ধরনের কাজে যুক্ত থাকতে পারেন তা প্রশাসন প্রথমে কল্পনাই করতে পারেনি
তদন্তকারী সূত্র জানিয়েছে যে উমর উন নবির ব্যক্তিগত ফোন এবং ডিজিটাল ডিভাইস খতিয়ে দেখতেই উঠে এসেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সেখানে দেখা গেছে যে উমর দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষিত তরুণ তরুণীদের খুঁজে বের করতেন এবং তাঁদের সম্পর্কে নানান তথ্য সংগ্রহ করতেন এমন মানুষদেরই তিনি বেছে নিতেন যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনও অপরাধের অভিযোগ নেই যাঁদের পরিবারেও অপরাধের রেকর্ড নেই এবং যাঁদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার সন্দেহ হওয়ার কোনও সুযোগ থাকে না এই কারণে তাঁদের স্লিপার সেল তৈরির জন্য সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে করা হত এবং এই কৌশল গত বিশ বছর আগের সন্ত্রাসবাদী নিয়োগের ধরন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন
সূত্রের দাবি অনুযায়ী উমর প্রথমে সমাজমাধ্যমে বিভিন্ন তরুণ তরুণীর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতেন তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করতেন আর সেই সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর ধীরে ধীরে তাঁদের মনোজগতে প্রভাব ফেলতেন প্রথমে সাধারণ আলাপচারিতার মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করা হত তারপর ধীরে ধীরে এমন বিষয় তুলে ধরা হত যা একজন মনের দিক থেকে স্থিতিশীল মানুষকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে এবং সেখান থেকেই শুরু হত মগজধোলাইয়ের প্রক্রিয়া উমরের কাজ ছিল এই তরুণ তরুণীদের মানসিকভাবে দুর্বল করে এমন পথে নিয়ে যাওয়া যেখানে তারা ভাবতে শুরু করবে যে কোনও হিংসাত্মক কাজই তাদের কর্তব্য এমন ভাবনা জাগিয়ে তুলতে পারলে সংগঠিত সন্ত্রাসবাদী দল তাঁদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে
তদন্তকারীদের আরও দাবি যে উমর একা কাজ করতেন না তিনি সংগঠনের বেশ কয়েকজন হ্যান্ডলারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং তাঁদের নির্দেশ অনুযায়ীই নিয়োগ প্রক্রিয়া চলত এই যোগাযোগের সবটাই হতো ডিজিটাল মাধ্যমে যাতে সহজে কারও নজরে না পড়ে এবং কোনও থাবা না পড়ে এই সমস্ত আলাপচারিতা পরিকল্পনা এবং আদানপ্রদান সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে করা হত যার ফলে বাহ্যিকভাবে কোনও অপরাধের চিহ্ন ধরা পড়ত না
সূত্র জানিয়েছে যে উমরের টার্গেট মূলত জম্মু কাশ্মীরের উচ্চশিক্ষিত তরুণ তরুণীরা কিন্তু বিষয়টি শুধুই জম্মু কাশ্মীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না নিয়োগের জাল ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষত উত্তর ভারতের কিছু রাজ্যে উমরের কথা বার্তায় তৈরি হওয়া সম্পর্কের ফাঁদে পড়ে অনেক তরুণ মানসিকভাবে তাঁর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন তাঁরা বুঝতে পারতেন না কীভাবে তাঁদের চিন্তাধারা বদলে যাচ্ছে এবং তাঁরা ধীরে ধীরে কট্টরপন্থার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন
হরিয়ানায় ডক্টর টেরর মডিউল নামের একটি সেলের সদস্যদের একের পর এক গ্রেপ্তারের পর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এই সম্পূর্ণ চক্রটির নেপথ্যে ছিল উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজকে ব্যবহার করার একটি বড় পরিকল্পনা সূত্র জানায় যে এই নয়া কৌশল তৈরি হয়েছে গত দু দশকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলির ব্যর্থতার পর আগের সময়ে বেশি পড়াশুনা না জানা যুবকদের সহজেই দলে টানা যেত কিন্তু তাদের উপর নজর রাখা নিরাপত্তা সংস্থার জন্য সহজ ছিল আজকের দিনে সেই পদ্ধতি পালটে গেছে এখন বেছে নেওয়া হচ্ছে এমন মানুষদের যাঁদের সমাজে সম্মান আছে যাঁদের সম্পর্কে কোনও সন্দেহ তৈরি হয় না এবং যাঁরা তাঁদের পরিবার বা পেশার কারণে পুলিশের স্ক্যানারে সহজে আসেন না
দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডে যাঁদের নাম সামনে এসেছে তাঁদের অধিকাংশই পেশায় চিকিৎসক এবং এই একটি তথ্যই গোটা তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কারণ তদন্তকারীরা প্রথম থেকেই দেখছেন যে এঁদের অতীতে কোনও ধরনের অপরাধমূলক রেকর্ড নেই তাঁদের বিরুদ্ধে আগে কখনও থানায় বা আদালতে কোনও অভিযোগ দায়ের হয়নি তাঁদের পরিবারও সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করত এই কারণেই নিরাপত্তা সংস্থাগুলির দৃষ্টিতে তাঁরা কখনও সন্দেহজনক বলে মনে হয়নি একজন ডাক্তার সাধারণত মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্বে থাকেন ফলে সমাজে এই পেশার মানুষের প্রতি এক ধরনের বাড়তি সম্মান এবং বিশ্বাস কাজ করে আর সেই বিশ্বাসকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে ধারণা তদন্তকারী মহলের
উমর উন নবি আদিল রাথর মুজফফর রাথর এবং মুজাম্মিল গনাই সকলেই দীর্ঘ দিন ধরে চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁদের পড়াশোনা পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং কর্মজীবনের দিকে তাকালে কোথাও কোনও সন্ত্রাস যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায় না তাঁদের প্রতিবেশী সহকর্মী এবং পরিচিতদের অনেকেই বিষয়টি জানার পর চরম বিস্ময় এবং ধাক্কা প্রকাশ করেছেন কারণ তাঁদের চোখে এই চিকিৎসকেরা ছিলেন শান্ত স্বভাবের দায়িত্বশীল এবং সাধারণ মানুষ কিন্তু তদন্তে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে আর এক ছবি যেখানে দেখা যাচ্ছে শিক্ষিত পেশাজীবীদের ব্যবহার করে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন ধরণের এক হোয়াইট কলার টেরর মডিউল
এই মডিউল তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যা দেশের বড় বড় শহরে চুপচাপ ছড়িয়ে থাকতে পারবে এবং কোনও ধরনের সন্দেহ না জাগিয়ে নানান তথ্য সংগ্রহ বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজে লাগতে পারবে কারণ একজন চিকিৎসক যখন হাসপাতালে যান রোগী দেখেন বা চিকিৎসা করেন তখন কেউ ভাবতেই পারেন না যে সেই মানুষটি নেপথ্যে কোনও ভয়ঙ্কর চক্রান্তের অংশ হতে পারেন এই আড়ালই এই ধরনের মডিউলকে আরও বেশি ভয়ঙ্কর করে তুলেছে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে
তদন্তকারী সংস্থাগুলি বলছে যে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি গত কয়েক দশকে কড়া নজরদারি এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে তাদের পুরোনো কৌশল বদলে ফেলেছে আগে যেখানে অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত এবং অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা যুবকদের প্রলোভন দেখিয়ে দলে টানা হত এখন সেখানে টার্গেট হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত এবং পেশাগত ভাবে স্থিতিশীল মানুষ এই শিক্ষিত যুব সমাজকে নানা আদর্শিক কথা ধর্মীয় ব্যাখ্যা রাজনৈতিক অসন্তোষ কিংবা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বেছে নেওয়া কিছু অংশ দেখিয়ে ধীরে ধীরে মানসিক ভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে সেই প্রভাবের ফলেই কেউ কেউ এমন চরম পথে হাঁটতে রাজি হয়ে যাচ্ছে
দিল্লি বিস্ফোরণ মামলার ক্ষেত্রে তদন্তে দেখা গেছে যে এই চিকিৎসকদের উপর ভরসা করে তৈরি করা হচ্ছিল এমন একটি স্তর যেখানে প্রথম নজরে কোনওভাবে অপরাধের গন্ধ পাওয়া যাবে না তাঁদের নাম কোনও পুরোনো নজরদারি তালিকায় ছিল না তাঁদের বিরুদ্ধে পূর্ব অপরাধের কোনও তথ্য না থাকায় গোয়েন্দা সংস্থার সফটওয়্যার বা ডাটাবেসও তাঁদের সম্পর্কে কোনও সতর্কবার্তা দেয়নি ফলে তাঁরা খুব সহজেই নজর এড়িয়ে চলাফেরা করতে পেরেছেন এবং এই বিষয়টাই নিরাপত্তা সংস্থাকে সবচেয়ে বেশি চিন্তায় ফেলেছে কারণ এর ফলে বোঝা যাচ্ছে সামনের দিনে সন্ত্রাসবাদের রূপ আরও জটিল এবং গোপন আকার নিতে পারে
হোয়াইট কলার টেরর মডিউল বলতে বোঝানো হচ্ছে এমন এক ধরনের সন্ত্রাস নেটওয়ার্ক যেখানে সদস্যরা সমাজের চোখে সম্মানিত পেশাজীবী এবং প্রশিক্ষিত মানুষ তাঁরা অফিস আদালত হাসপাতাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন বাইরে থেকে দেখতে তাঁরা পুরোপুরি স্বাভাবিক নাগরিক কিন্তু গোপনে তাঁরা কোনও না কোনওভাবে সন্ত্রাসী সংগঠনের হয়ে কাজ করেন কেউ তথ্য জোগাড় করে কেউ যোগাযোগ রক্ষা করে কেউ আবার অর্থের লেনদেন কিংবা নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার ভূমিকা নেয় এই ধরনের নেটওয়ার্ক ধরা পড়লে তার প্রভাব শুধু নিরাপত্তা অঙ্গনেই নয় বরং সাধারণ মানুষের মনে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য বলে ধরা পেশাগুলির প্রতি ভরসার উপরও আঘাত হানে
তদন্তকারী সংস্থাগুলি এখন খতিয়ে দেখছে এই চিকিৎসকদের মধ্যে কার ভূমিকা কতটা ছিল কে সরাসরি বিস্ফোরণের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল কে শুধু যোগাযোগের কাজ করত আর কে বা নিজে পুরো বিষয়টি কতটা বুঝে জড়িয়েছিল এও যাচাই করা হচ্ছে কেউ কি কেবল মানসিকভাবে প্রভাবিত হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে নাকি কেউ সচেতন ভাবে আর্থিক বা আদর্শিক লাভের আশায় অংশ নিয়েছে পাশাপাশি তাঁরাও খুঁজছেন এদের সঙ্গে যুক্ত আরও কারা কোথায় কোথায় এই নেটওয়ার্কের শেকড় বিস্তার করেছে এবং আর কতজন উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী এই চক্রের সঙ্গে যোগ দিয়েছে বা যোগ দেওয়ার পথে আছে
পুরো ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে ভবিষ্যতে সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় নিরাপত্তা নীতি তৈরি করতে গেলে শুধু সীমান্ত বা সীমান্তঘেঁষা অঞ্চল নয় বরং বড় শহরের উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবী সমাজের মধ্যেও নজরদারির সূক্ষ্ম ও প্রাযুক্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে তবে এটাও সত্য যে এতে যেন নিরীহ মানুষ অকারণে হয়রানির শিকার না হন সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে তাই এই মামলাটি হয়ে উঠেছে একদিকে যেমন গুরুতর আইনগত চ্যালেঞ্জ অন্যদিকে তেমনই গোটা দেশের নিরাপত্তা এবং সামাজিক মানসিকতা বোঝার একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র
এই নেটওয়ার্ক গঠনের পেছনে লক্ষ্য ছিল নিরাপত্তা সংস্থার নজরকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করা এই ধরনের সদস্যদের মাধ্যমে কোনও সন্ত্রাসী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে তা চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে যায় কারণ তাদের পেশা জীবনযাপন এবং দৈনন্দিন কার্যকলাপ সবই সাধারণ মানুষের মত তদন্তকারীদের মতে এইই ছিল জইশ সংগঠনের নতুন কৌশল মূল লক্ষ্য উচ্চশিক্ষিত মানুষদের প্রলুব্ধ করে ব্যবহার করা এবং তাঁদের এমন অবস্থানে দাঁড় করানো যেখানে তাঁরা নিজেরাই বুঝতে না পেরে ধ্বংসাত্মক ভাবনায় বিশ্বাস করতে শুরু করেন
যদিও তদন্ত এখনও চলছে তথাপি বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল তথ্য জব্দ হওয়ায় তদন্তকারীরা আশা করছেন যে এই নেটওয়ার্কের আরও অনেক রূপ সামনে আসবে উমরের সঙ্গে যুক্ত আরও বেশ কিছু সন্দেহভাজনের তালিকাও পাওয়া গেছে তাঁদের সবার যোগাযোগ এবং মানসিক প্রভাবের ধরন খতিয়ে দেখা হচ্ছে যাতে বোঝা যায় এই স্লিপার সেল কতটা গভীরভাবে দেশের মধ্যে শেকড় বিস্তার করেছিল