একসময় হারিয়ে যেতে বসা কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্রাম পরিষেবা ফের শহরের রাস্তায় দেখা যাচ্ছে। নতুন উদ্যোগে শহরের নস্টালজিয়া ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হয়েছে।
কলকাতা মানেই ইতিহাস, সংস্কৃতি, পুরনো দিনের আবেগ আর ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। আর সেই ঐতিহ্যের অন্যতম বড় প্রতীক হল ট্রাম। বহু দশক ধরে কলকাতার রাস্তায় ধীরগতিতে চলা ট্রাম শুধুমাত্র একটি যানবাহন নয়, এটি শহরের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন দেশের প্রায় সব শহর আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে গিয়েছে, তখনও কলকাতা নিজের ঐতিহ্য ধরে রেখেছিল ট্রামের মাধ্যমে। তবে গত কয়েক বছরে সেই ট্রাম পরিষেবা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছিল। একের পর এক রুট বন্ধ হয়ে যায়, কমতে থাকে ট্রামের সংখ্যা, আর শহরের মানুষও প্রায় ভুলতেই বসেছিল সেই পুরনো শব্দ, লোহার চাকার ছন্দ আর বৈদ্যুতিক তারের নিচে ধীরে চলা ট্রামের দৃশ্য।
কিন্তু সম্প্রতি কলকাতার রাস্তায় আবারও দেখা যাচ্ছে ট্রাম। নতুন উদ্যোগে শহরের এই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হয়েছে। আর সেই দৃশ্য ঘিরেই আবেগে ভাসছেন বহু কলকাতাবাসী। দীর্ঘদিন পর আবার ট্রামকে শহরের রাস্তায় দেখতে পেয়ে নস্টালজিয়ায় ডুব দিচ্ছেন প্রবীণ থেকে তরুণ— সকলেই।
কলকাতার ট্রামের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ব্রিটিশ আমলে শুরু হওয়া এই পরিষেবা ধীরে ধীরে শহরের পরিবহণ ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। একসময় কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে ট্রাম চলত। ধর্মতলা, গড়িয়াহাট, শ্যামবাজার, খিদিরপুর, বেলগাছিয়া, পার্ক সার্কাস, টালিগঞ্জ— শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে সংযুক্ত করত ট্রাম পরিষেবা। অফিসযাত্রী থেকে সাধারণ মানুষ, ছাত্রছাত্রী থেকে ব্যবসায়ী— সকলের কাছেই ট্রাম ছিল একটি সস্তা, আরামদায়ক এবং নির্ভরযোগ্য যাতায়াতের মাধ্যম।
ট্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার বহু স্মৃতি। বহু মানুষের শৈশব, কলেজ জীবন, প্রেমের গল্প, অফিস যাওয়ার ক্লান্ত দুপুর কিংবা বর্ষার বিকেলের আবেগ মিশে আছে এই ট্রামকে ঘিরে। তাই ট্রাম শুধুমাত্র পরিবহণ নয়, এটি কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অংশ।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরের যানজট, দ্রুতগতির পরিবহণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক নগর পরিকল্পনার চাপে ট্রাম পরিষেবা সংকুচিত হতে শুরু করে। একের পর এক রুট বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই বলতে শুরু করেন, ট্রাম হয়তো আর কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ ইতিহাস হয়ে যাবে। শহরের নতুন প্রজন্মের একাংশ তো ট্রামে চড়ার অভিজ্ঞতাই পায়নি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আবার ট্রাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ শহরে নতুন আলোচনা শুরু করেছে। শহরের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অনেকেই। বিশেষ করে যাঁরা ছোটবেলা থেকে ট্রাম দেখে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে এই উদ্যোগ অত্যন্ত আবেগের।
বর্তমানে শহরের কিছু নির্দিষ্ট রুটে আবার ট্রাম চলতে শুরু করেছে। অনেক এলাকায় ট্রামলাইন সংস্কারের কাজও চলছে। পুরনো ট্রামগুলিকে নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। কোথাও নতুন রং করা হচ্ছে, কোথাও আধুনিক আলো ও বসার ব্যবস্থা যোগ করা হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই — ঐতিহ্য বজায় রেখেও ট্রামকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বহু উন্নত শহর নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পরিবহণ ব্যবস্থাকে পর্যটনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে পুরনো ট্রাম আজ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। কলকাতার ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। কারণ এশিয়ার মধ্যে কলকাতাই একমাত্র শহর যেখানে এখনও ঐতিহ্যবাহী ট্রাম পরিষেবা টিকে রয়েছে।
পরিবেশবিদদের একাংশও ট্রাম পরিষেবার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, ট্রাম একটি পরিবেশবান্ধব যান। এটি বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় দূষণ তুলনামূলক কম হয়। বর্তমান সময়ে যখন দূষণ এবং পরিবেশের সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন ট্রামের মতো পরিবহণ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
কলকাতার রাস্তায় আবার ট্রাম দেখা যাওয়ায় পর্যটকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বহু মানুষ ট্রামের ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছেন। অনেক বিদেশি পর্যটকও ট্রামে চড়ার অভিজ্ঞতাকে বিশেষভাবে উপভোগ করছেন। কারণ আধুনিক শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও এমন ঐতিহ্যবাহী পরিবহণ ব্যবস্থা খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।
তবে ট্রাম ফিরিয়ে আনার পথে চ্যালেঞ্জও কম নয়। শহরের বর্তমান যানজটপূর্ণ পরিস্থিতিতে ট্রামের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করা সহজ নয়। অনেকেই মনে করেন, ধীরগতির ট্রামের কারণে যান চলাচলে সমস্যা তৈরি হতে পারে। আবার অন্য একটি অংশের মত, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ট্রাম এবং আধুনিক যানব্যবস্থা একসঙ্গে চলতে পারে।
শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ট্রামকে শুধুমাত্র পুরনো দিনের স্মৃতি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে আধুনিক নগর পরিবহণ ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও ভাবতে হবে। নির্দিষ্ট রুট, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উন্নত পরিষেবার মাধ্যমে ট্রামকে আবার জনপ্রিয় করা সম্ভব।
কলকাতার প্রবীণ নাগরিকদের অনেকেই বলছেন, ট্রামের ঘণ্টার শব্দ শুনলেই যেন পুরনো কলকাতাকে ফিরে পাওয়া যায়। তাঁদের মতে, শহরের দ্রুত পরিবর্তনের ভিড়ে ট্রামই ছিল সেই শেষ চিহ্ন, যা কলকাতার ঐতিহ্যকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছিল।
তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও ট্রাম নিয়ে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এখন ট্রামে চড়ে ছবি তুলছেন, ভিডিও বানাচ্ছেন এবং কলকাতার ঐতিহ্য নিয়ে নতুনভাবে ভাবছেন। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ট্রাম আবার শহরের সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে উঠে আসছে।
বর্তমানে ট্রামকে কেন্দ্র করে নতুন পর্যটন প্রকল্পের কথাও ভাবা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। শহরের ঐতিহাসিক এলাকাগুলিকে ট্রামের মাধ্যমে যুক্ত করে বিশেষ হেরিটেজ রাইড চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে পর্যটনের পাশাপাশি শহরের ঐতিহ্যও আরও বেশি করে তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু পরিবহণ নয়, ট্রাম কলকাতার আবেগ। শহরের সাহিত্য, সিনেমা, গান, ছবি — সর্বত্র ট্রামের উপস্থিতি রয়েছে। সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে বহু শিল্পীর কাজে ট্রাম উঠে এসেছে কলকাতার প্রতীক হিসেবে। তাই ট্রামকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, শহরের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের অংশ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
কলকাতার রাস্তায় আবার ট্রাম দেখা যাওয়া শুধুমাত্র একটি পরিবহণ পরিষেবা ফের চালু হওয়ার ঘটনা নয়, এটি শহরের ঐতিহ্য, আবেগ এবং পরিচয়কে নতুন করে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা। বহু বছর ধরে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্য আবার নতুনভাবে মানুষের মনে জায়গা করে নিচ্ছে।
আধুনিকতার দৌড়ে পুরনো অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু জিনিস শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতি নয়, সেগুলি একটি শহরের আত্মপরিচয়। কলকাতার ট্রাম ঠিক তেমনই এক প্রতীক। তাই এই পরিষেবা যদি সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিকীকরণ এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতেও ট্রাম কলকাতার গর্ব হিসেবেই থেকে যাবে।
আজ যখন শহরের রাস্তায় আবার ট্রামের ঘণ্টার শব্দ শোনা যাচ্ছে, তখন বহু মানুষের মনেই যেন ফিরে আসছে পুরনো কলকাতার ছবি — ধীর গতির ট্রাম, জানালার ধারে বসে শহর দেখা, আর এক অন্যরকম সময়ের স্মৃতি। কলকাতা আবার যেন নিজের হারিয়ে যাওয়া এক অংশকে ফিরে পাচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিকতার দৌড়ে যখন শহরের চেহারা বদলাতে শুরু করল, তখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছিল এই ঐতিহ্যবাহী ট্রাম পরিষেবা। একের পর এক রুট বন্ধ হয়ে যায়, ট্রামের সংখ্যা কমে আসে, বহু ডিপো কার্যত নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। শহরের নতুন প্রজন্মের বড় অংশ ট্রামে নিয়মিত যাতায়াত করার অভিজ্ঞতা থেকেই বঞ্চিত হতে শুরু করে। অনেকেই মনে করেছিলেন, হয়তো আর কিছুদিনের মধ্যেই ট্রাম শুধু বইয়ের ছবি বা পুরনো সিনেমার দৃশ্য হিসেবেই থেকে যাবে।
কিন্তু সম্প্রতি কলকাতার রাস্তায় আবারও ট্রামের উপস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবার ট্রাম চলতে দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর ট্রামের ঘণ্টার শব্দ শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন বহু মানুষ। নতুন উদ্যোগে শহরের এই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু হওয়ায় কলকাতাবাসীর এক বড় অংশের মধ্যেই তৈরি হয়েছে নস্টালজিয়া ও আনন্দের মিশ্র অনুভূতি।
কলকাতার সঙ্গে ট্রামের সম্পর্ক প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো। ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৩ সালে কলকাতায় প্রথম ট্রাম পরিষেবা চালু হয়। প্রথমদিকে ঘোড়ায় টানা ট্রাম চললেও পরে বিদ্যুৎচালিত ট্রাম চালু হয় এবং ধীরে ধীরে তা শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহণ ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
একসময় কলকাতার বহু গুরুত্বপূর্ণ রুটে ট্রাম চলত। ধর্মতলা, শ্যামবাজার, গড়িয়াহাট, টালিগঞ্জ, পার্ক সার্কাস, খিদিরপুর, রাজাবাজার, বেলগাছিয়া — শহরের প্রায় সর্বত্রই দেখা মিলত ট্রামের। অফিস টাইমে ট্রাম ভর্তি যাত্রী নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেত শহরের ব্যস্ত রাস্তায়।
ট্রামের জানালার ধারে বসে শহর দেখা, বৃষ্টির দিনে ট্রামের টিনের ছাদে পড়া বৃষ্টির শব্দ, বিকেলের আলোয় ধীরে চলা ট্রাম — এসবই বহু কলকাতাবাসীর স্মৃতির অংশ। এমনকি বাংলা সাহিত্য, সিনেমা ও সংগীতেও ট্রাম বারবার উঠে এসেছে কলকাতার প্রতীক হিসেবে।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার পরিবহণ ব্যবস্থাও বদলাতে থাকে। বাস, মেট্রো, ট্যাক্সি, অ্যাপ ক্যাব এবং দ্রুতগতির অন্যান্য যানবাহনের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। শহরের যানজটও ক্রমশ বাড়তে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রামকে অনেকেই “ধীরগতির” পরিবহণ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। বহু রুটে ট্রাম পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিছু জায়গায় ট্রামলাইন তুলে ফেলা হয়। ধীরে ধীরে শহরের রাস্তায় ট্রামের সংখ্যা এতটাই কমে যায় যে নতুন প্রজন্মের কাছে এটি কার্যত বিরল দৃশ্য হয়ে দাঁড়ায়।