ইসকন কলকাতায় ভক্তি, আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে মহাপ্রভু শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উৎসবের শুভ সূচনা হয়েছে। হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে কীর্তন, পূজা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই পবিত্র মহোৎসব।
ভক্তি, আনন্দ, উচ্ছ্বাস এবং উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে ইসকন কলকাতায় মহাপ্রভু শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের পবিত্র রথযাত্রা উৎসবের শুভ সূচনা হয়েছে। হাজার হাজার ভক্ত, দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীর উপস্থিতিতে কলকাতার বুকে তৈরি হয় এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশ। হরিনাম সংকীর্তন, পূজা-পাঠ, মন্ত্রোচ্চারণ, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং ভক্তদের সম্মিলিত প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত এই মহোৎসব।
রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ইসকন কলকাতা প্রাঙ্গণ এবং সংলগ্ন এলাকায় ভক্তদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ একাই মহাপ্রভু শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেব, বলভদ্র দেব এবং দেবী সুভদ্রার দর্শন ও আশীর্বাদ গ্রহণের জন্য উপস্থিত হন। ভক্তদের মুখে শোনা যায় ‘হরে কৃষ্ণ, হরে রাম’, ‘জয় জগন্নাথ’ এবং মহামন্ত্রের ধ্বনি। খোল, করতাল, মৃদঙ্গ ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সুরে চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে।
ইসকন কলকাতার রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি ভক্তি, মানবতা, সম্প্রীতি ও সর্বজনীন ভালোবাসার এক বিরাট মিলনমেলা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা ও সামাজিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অসংখ্য মানুষ এই মহোৎসবে অংশগ্রহণ করেন। রথযাত্রার মূল বার্তা হলো—ভগবান সকলের এবং তাঁর কৃপা লাভের অধিকারও সকল মানুষের রয়েছে। এই কারণেই রথযাত্রা উৎসবকে সর্বজনীন ভক্তি ও মানবিকতার উৎসব হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
রথযাত্রা উপলক্ষে মহাপ্রভু শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথকে ফুল, রঙিন কাপড়, আলোকসজ্জা, ধর্মীয় প্রতীক এবং ঐতিহ্যবাহী নকশায় সুসজ্জিত করা হয়। রথের সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। রথে অধিষ্ঠিত শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেব, বলভদ্র দেব ও দেবী সুভদ্রার মনোমুগ্ধকর রূপ দর্শন করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বহু ভক্ত।
ভক্তদের বিশ্বাস, রথযাত্রার দিন রথে অধিষ্ঠিত মহাপ্রভুর দর্শন করলে জীবনের বহু দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং ভগবানের বিশেষ কৃপা লাভ করা যায়। সেই বিশ্বাস ও ভক্তিকে হৃদয়ে ধারণ করে অসংখ্য মানুষ রথের সামনে প্রণাম করেন, ফুল অর্পণ করেন এবং নিজের পরিবার, সমাজ ও দেশের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা জানান।
রথের দড়ি স্পর্শ করা এবং রথ টানার জন্য ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যায়। বহু মানুষের ধারণা, মহাপ্রভুর রথের দড়ি স্পর্শ করাও অত্যন্ত পুণ্যের কাজ। তাই রথ এগিয়ে চলার সময় ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে রথের দড়ি টানতে অংশ নেন। তবে বিপুল জনসমাগমের কারণে স্বেচ্ছাসেবক ও নিরাপত্তাকর্মীরা শৃঙ্খলা বজায় রেখে ভক্তদের রথ টানার সুযোগ করে দেন।
রথযাত্রার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল হরিনাম সংকীর্তন। ইসকনের দেশি-বিদেশি ভক্তরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে খোল, করতাল ও মৃদঙ্গ সহযোগে নৃত্য ও কীর্তনে অংশ নেন। ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে’—এই মহামন্ত্রের ধ্বনিতে উৎসবস্থল এবং রথযাত্রার পথ আধ্যাত্মিক আবহে ভরে ওঠে।
বয়স নির্বিশেষে ছোট শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ ভক্তরাও কীর্তনের তালে নৃত্য করেন। অনেক দর্শনার্থী প্রথমবার ইসকনের রথযাত্রা দেখতে এসে এই ভক্তিময় পরিবেশে মুগ্ধ হন। কেউ মোবাইলে ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন, আবার কেউ সমস্ত কিছু ভুলে মহামন্ত্র জপ ও কীর্তনে অংশগ্রহণ করেন।
কীর্তনের মাধ্যমে ভগবানের নাম মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া ইসকনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। ইসকনের বিশ্বাস অনুযায়ী, হরিনাম সংকীর্তন মানুষের মনকে শান্ত করে, নেতিবাচক চিন্তা দূর করে এবং আত্মিক উন্নতির পথ খুলে দেয়। রথযাত্রার মতো বৃহৎ উৎসবে সম্মিলিতভাবে মহামন্ত্র উচ্চারণের ফলে ভক্তদের মধ্যে এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
রথযাত্রার শুভ সূচনার আগে শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী একাধিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। মঙ্গল আরতি, বিশেষ পূজা, ভোগ নিবেদন, মন্ত্রোচ্চারণ এবং মহাপ্রভুর আরতির মধ্য দিয়ে রথযাত্রার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়। ইসকনের সন্ন্যাসী, পুরোহিত ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বরা বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের আশীর্বাদ কামনা করেন।
পূজার সময় উপস্থিত ভক্তরা গভীর মনোযোগের সঙ্গে প্রার্থনায় অংশ নেন। অনেকেই হাতে ফুল, তুলসীপাতা ও প্রসাদ নিয়ে মহাপ্রভুকে নিবেদন করেন। রথযাত্রার আগে রথেরও বিশেষ পূজা সম্পন্ন করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, মহাপ্রভু তাঁর মন্দির থেকে বেরিয়ে রথে করে সাধারণ মানুষের মাঝে আসেন এবং সকলকে দর্শন ও আশীর্বাদ প্রদান করেন।
ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হওয়ার পর জয়ধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে রথযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। সেই মুহূর্তে ভক্তদের উচ্ছ্বাস চরমে পৌঁছায়। চারদিকে ‘জয় জগন্নাথ’, ‘জয় বলদেব’, ‘জয় সুভদ্রা মহারানি’ এবং ‘হরে কৃষ্ণ’ ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
হিন্দু ধর্ম ও বৈষ্ণব দর্শনে রথযাত্রার বিশেষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, মহাপ্রভু শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেব তাঁর ভাই বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে রথে চড়ে মাসির বাড়ি বা গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পুরীর ঐতিহাসিক রথযাত্রাকে অনুসরণ করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইসকনের উদ্যোগে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়।
রথযাত্রার গভীর দর্শন হলো ভগবান নিজেই মন্দিরের গণ্ডি ছেড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এসে উপস্থিত হন। যাঁরা কোনও কারণে মন্দিরে যেতে পারেন না, তাঁরাও রাস্তায় দাঁড়িয়ে মহাপ্রভুর দর্শন লাভ করতে পারেন। অর্থাৎ ভগবানের কৃপা কোনও নির্দিষ্ট স্থান, ব্যক্তি অথবা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বৈষ্ণব দর্শনে মানুষের দেহকে রথ এবং আত্মাকে রথের যাত্রী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। সৎকর্ম, ভক্তি, জ্ঞান ও আত্মসংযমের মাধ্যমে জীবনের রথকে সঠিক পথে পরিচালনা করাই মানুষের অন্যতম কর্তব্য। রথযাত্রা তাই কেবল বাহ্যিক উৎসব নয়; এটি মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে সত্য, প্রেম, শান্তি ও ভক্তির পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
রথযাত্রায় অংশ নেওয়া বহু ভক্ত মহাপ্রভুর দর্শন পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ হাত জোড় করে প্রার্থনা করেন, কেউ চোখ বন্ধ করে মহামন্ত্র জপ করেন, আবার কারও চোখে আনন্দাশ্রু দেখা যায়। বহু মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যা, পরিবারের সুস্থতা, সন্তানের মঙ্গল এবং সমাজের শান্তির জন্য মহাপ্রভুর কাছে প্রার্থনা জানান।
অনেক ভক্ত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে রথযাত্রায় অংশ নিতে আসেন। তাঁদের কাছে এই দিনটি বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। সকাল থেকেই উপবাস, নামজপ এবং পূজা-পাঠের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের প্রস্তুত করেন। রথযাত্রার সময় মহাপ্রভুর এক ঝলক দর্শনই তাঁদের কাছে পরম প্রাপ্তি।
ভক্তদের বক্তব্য অনুযায়ী, রথযাত্রার পরিবেশে অংশ নিলে মন থেকে সমস্ত দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায়। কীর্তন, মহামন্ত্র এবং মহাপ্রভুর দর্শন তাঁদের মনে এক বিশেষ শান্তি ও ইতিবাচক শক্তির সৃষ্টি করে। অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের ধর্মীয় উৎসব মানুষের মানসিক চাপ কমাতে এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইসকন কলকাতার রথযাত্রায় শুধুমাত্র কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গের ভক্তরাই নন, দেশের বিভিন্ন রাজ্য এবং বিদেশ থেকেও বহু ভক্ত অংশগ্রহণ করেন। বিদেশি ভক্তদের অনেকেই ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে কীর্তন ও নৃত্যে অংশ নেন। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ একসঙ্গে মহামন্ত্র উচ্চারণ করেন।
এই বহুজাতিক অংশগ্রহণ রথযাত্রাকে আরও বিশেষ করে তোলে। ভাষা এবং সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও ভক্তি ও মহাপ্রভুর প্রতি ভালোবাসা সকলকে একই বন্ধনে আবদ্ধ করে। ইসকনের উদ্যোগে ভগবদ্গীতা ও বৈষ্ণব দর্শনের শিক্ষা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই কারণে ইসকনের রথযাত্রা বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বিদেশি ভক্তদের কীর্তন, নৃত্য এবং মহাপ্রভুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা উপস্থিত দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। অনেকেই তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ইসকনের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।