রথযাত্রা উপলক্ষে রাজ্যের ৬০টি আয়োজক কমিটিকে সরকারি সহায়তা হিসেবে ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই উদ্যোগে উৎসবের আয়োজন ও পরিকাঠামো আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রথযাত্রা উপলক্ষে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের আয়োজক কমিটিগুলির জন্য বড় আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের মোট ৬০টি রথযাত্রা আয়োজক কমিটিকে সরকারি সহায়তা হিসেবে ৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, এই উদ্যোগের আওতায় মোট ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা উৎসবের আয়োজন, পরিকাঠামো, নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার মান আরও উন্নত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজ্যের বহু জেলায় রথযাত্রা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবেও পালিত হয়। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন। বহু স্থানে কয়েক দিন ধরে মেলা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি, প্রসাদ বিতরণ এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ফলে রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে আয়োজক কমিটিগুলির উপর বিপুল আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব এসে পড়ে। সরকারি অনুদান সেই দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করতে পারে।
ঘোষণা অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিটি রথযাত্রা কমিটি ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে। মোট ৬০টি কমিটির জন্য সরকারি সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ কোটি টাকা। এই অর্থ কীভাবে খরচ করা যাবে, কমিটি নির্বাচনের পদ্ধতি কী হবে, অনুদান পাওয়ার জন্য কোন কোন নথি জমা দিতে হবে এবং অর্থ ব্যবহারের হিসাব কীভাবে দিতে হবে—এসব বিষয়ে প্রশাসনের বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
তবে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, এই অর্থ রথযাত্রার পথ প্রস্তুত করা, অস্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণ, আলো, পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা, পরিচ্ছন্নতা, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। বড় আকারের রথযাত্রার ক্ষেত্রে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়।
সরকারি সহায়তা পাওয়ার ফলে আয়োজক কমিটিগুলি আরও পরিকল্পিতভাবে উৎসব পরিচালনা করতে পারবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, দমকল, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং পুরসভা বা পঞ্চায়েতের সঙ্গে সমন্বয় রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হতে পারে।
রথযাত্রা ভারতীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। ভগবান জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার রথে আরোহণ করে মাসির বাড়ি যাত্রার কাহিনিকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালিত হয়। পুরীর রথযাত্রা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হলেও পশ্চিমবঙ্গের বহু এলাকায় কয়েকশো বছর ধরে নিজস্ব ঐতিহ্য ও রীতিনীতি মেনে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
মাহেশের রথযাত্রা থেকে শুরু করে কলকাতা, হুগলি, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদসহ বিভিন্ন জেলার ছোট-বড় রথযাত্রায় বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। কোথাও প্রাচীন কাঠের রথ, কোথাও আধুনিকভাবে নির্মিত সুসজ্জিত রথ, আবার কোথাও গ্রামীণ ঐতিহ্যকে সামনে রেখে উৎসবের আয়োজন করা হয়।
রথের দড়ি টানাকে ভক্তরা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ বলে মনে করেন। ফলে রথযাত্রার দিন সকাল থেকেই মন্দির ও রথের সামনে ভক্তদের ভিড় জমতে শুরু করে। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বহু মানুষ এই উৎসবে অংশ নেন। স্থানীয় মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক কর্মসূচির কারণে রথযাত্রা একটি সর্বজনীন মিলনোৎসবের রূপ নেয়।
বড় আকারের রথযাত্রা আয়োজন করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। রথের মেরামত, রং করা, সাজসজ্জা, বিদ্যুৎ, আলো, মাইক, ব্যারিকেড, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্বেচ্ছাসেবকদের পোশাক, মেডিক্যাল ক্যাম্প, পানীয় জল, অস্থায়ী শৌচাগার এবং পরিচ্ছন্নতার জন্য কমিটিগুলিকে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এর পাশাপাশি উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসলে দোকানগুলির জন্য নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি, বিদ্যুৎ সংযোগ, অগ্নিনিরাপত্তা, আবর্জনা অপসারণ এবং যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করতে হয়। অনেক সময় স্থানীয় মানুষের অনুদান এবং ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার উপর নির্ভর করেই এসব খরচ বহন করা হয়।
ছোট ও মাঝারি আয়োজক কমিটিগুলির পক্ষে এত বড় খরচ সামলানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অনেক সময় নিরাপত্তা বা জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রে আপস করতে হয়। সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে এই কমিটিগুলি উৎসবের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরিতে বেশি গুরুত্ব দিতে পারবে।
বিশেষ করে বহু বছরের পুরনো রথের কাঠামো পরীক্ষা এবং মেরামতের জন্য দক্ষ কারিগর নিয়োগ করা জরুরি। রথের চাকা, দড়ি, ব্রেকিং ব্যবস্থা এবং কাঠামো যথাযথভাবে পরীক্ষা না করা হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। অনুদানের একটি অংশ এ ধরনের কারিগরি ও নিরাপত্তামূলক কাজে ব্যয় করা হলে উৎসব আরও সুরক্ষিত হতে পারে।
রথযাত্রায় সরকারি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বড় রথযাত্রাগুলিতে একসঙ্গে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে পড়েন। রথের দড়ি ধরার জন্য ভক্তদের মধ্যে উৎসাহ থাকে। অতিরিক্ত ভিড়, হুড়োহুড়ি বা নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল থেকে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য রথযাত্রার পথের দু’পাশে ব্যারিকেড, নির্দিষ্ট প্রবেশ ও প্রস্থান পথ এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রাখা জরুরি। রথের খুব কাছে যাতে শিশু, প্রবীণ বা অসুস্থ ব্যক্তিরা না চলে যান, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ মোড় এবং জনবহুল এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো যেতে পারে। কন্ট্রোল রুম থেকে গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হলে কোনও এলাকায় অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। মাইকিংয়ের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের নিয়মিত নির্দেশ দেওয়া এবং হারিয়ে যাওয়া শিশু বা পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাওয়ার জন্য সহায়তা কেন্দ্র চালু করাও জরুরি।
রথের সামনে ও পিছনে পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের নির্দিষ্ট দল রাখা যেতে পারে। রথের গতি নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুতের তার বা নিচু সেতুর মতো প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা এবং যাত্রাপথে কোনও ঝুঁকি রয়েছে কি না তা আগেই পরীক্ষা করা দরকার।
রথযাত্রার সময় প্রচণ্ড ভিড় এবং গরমের কারণে বহু দর্শনার্থী অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ নাগরিক এবং আগে থেকেই অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। তাই গুরুত্বপূর্ণ রথযাত্রা কেন্দ্রগুলিতে অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন করা যেতে পারে।
মেডিক্যাল ক্যাম্পে চিকিৎসক, নার্স, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, ওষুধ, খাবার স্যালাইন এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা থাকা দরকার। জরুরি পরিস্থিতিতে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্স প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
রথযাত্রার পথে একাধিক প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র থাকলে ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়া ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবক দলের সঙ্গে এমন কয়েকজন সদস্য রাখা যেতে পারে, যাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সিপিআর দেওয়ার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
সরকারি সহায়তার একটি অংশ স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হলে উৎসবে অংশগ্রহণকারী মানুষ আরও নিরাপদ বোধ করবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিকেও আগাম সতর্ক রাখা যেতে পারে।
বড় উৎসবে বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু মানুষ দীর্ঘ সময় রথযাত্রার পথে থাকেন। গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়ায় পর্যাপ্ত জল না পেলে শরীর খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আয়োজক কমিটিগুলি রথযাত্রার পথে নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর পানীয় জলের কাউন্টার তৈরি করতে পারে। জল বিতরণের সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পুনর্ব্যবহারযোগ্য গ্লাস বা পরিবেশবান্ধব পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
মেলা প্রাঙ্গণ এবং জনসমাগমের এলাকায় নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা অস্থায়ী শৌচাগার নির্মাণ করা দরকার। সেগুলি নিয়মিত পরিষ্কার করার জন্য কর্মী নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত জল সরবরাহের ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
খাবারের দোকান এবং প্রসাদ বিতরণ কেন্দ্রগুলিতেও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। নষ্ট বা অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি রোধ করতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি প্রয়োজন। উৎসব শেষে দ্রুত আবর্জনা পরিষ্কার করা এবং এলাকা জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থাও পরিকল্পনার মধ্যে রাখা যেতে পারে।