মুর্শিদাবাদ জেলার রেজিনগর এলাকায় স্থগিত তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) বিধায়ক হুমায়ূন কবিরের দ্বারা Babri Masjid আকৃতির একটি বৃহৎ মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ঘিরে জেলাজুড়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার হাজার হাজার মানুষ সেখানে জমায়েত হন, যার ফলে NH12 এর প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ হয়ে যায়। হাতে ইট, পাথর ও ধর্মীয় পতাকা নিয়ে মানুষ জমায়েত হওয়ায় এলাকা উচ্ছ্বাস ও উত্তেজনায় ভরে ওঠে। পুরো অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও RAF মোতায়েন ছিল,কারণ পরিস্থিতি সংবেদনশীল হয়ে উঠার সম্ভাবনা ছিল।
মুর্শিদাবাদ—বাংলার সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং ধর্মীয়ভাবে মিশ্র জনবসতিপূর্ণ একটি জেলা। বহু দশক ধরেই এই অঞ্চল রাজনৈতিক টানাপড়েন, দলবদল, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এবং সামাজিক ভারসাম্যের জায়গা থেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। ঠিক সেই জায়গাতেই নতুন করে উত্তেজনার সঞ্চার ঘটিয়েছেন স্থগিত বিধায়ক হুমায়ূন কবির, যখন তিনি ঘোষণা করেন—মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে তিনি গড়ে তুলবেন Babri Masjid আকৃতির একটি মসজিদ এবং তার ভিত্তিপ্রস্তর তিনি স্বয়ং স্থাপন করেছেন।
এই ঘোষণা এবং কার্যক্রম, দুই–ই মুহূর্তের মধ্যে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এমন এক সময়, যখন রাজ্য নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক বিভাজন তুঙ্গে, এবং রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটব্যাংক নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত—এই ঘটনা নিছক একটি ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের চেয়ে অনেক বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
একদিকে প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মিছিল, হাজার হাজার মানুষের জমায়েত, জাতীয় সড়ক বন্ধ হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে ঘটনাটি শুধু প্রতীকী ধর্মীয় পরিকল্পনা নয়; বরং বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহে নতুন উত্তেজক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ঘটনার শুরু হয় এক ঘোষণা দিয়ে—হুমায়ূন কবির প্রকাশ্যে বলেন যে তিনি মুর্শিদাবাদে একটি “Babri Masjid replica” নির্মাণ করবেন। তাঁর দাবি—
“এটি শুধু একটি মসজিদ নয়, এটি হবে স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ। মসজিদের সঙ্গে হাসপাতাল, অতিথিশালা ও কমিউনিটি হলও তৈরি হবে।”
ঘোষণার পর থেকেই জেলাজুড়ে এই উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা বাড়তে থাকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর আত্মবিশ্বাসী বিবৃতি ভাইরাল হয়—
“আমাকে কেউ থামাতে পারবে না। আমি সংবিধানসম্মত কাজ করছি।”
ঘোষণা যেমনই হোক, বাস্তবে এই ধরনের সংবেদনশীল ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনই যথেষ্ট বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারণ এটি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে নয়, ভারতের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথেও যুক্ত—Babri Masjid দেশের অন্যতম সংবেদনশীল ও বিতর্কিত অধ্যায়।
তবুও ৬ ডিসেম্বরের সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ জড় হতে থাকেন রেজিনগরে। এলাকার পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রশাসন RAF, পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এদিন NH-12–এর একটি বড় অংশ দুপুরের দিকে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়, কারণ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে কয়েক হাজার মানুষ শামিল হন। হাতে ইট, পাথর, পতাকা নিয়ে তাঁরা একে একে জমায়েত হন। বহু মানুষ বিভিন্ন গ্রাম থেকে পদযাত্রা করে পৌঁছান।
স্থানীয়রা জানান—
“এত লোক আমরা আগে কখনো দেখিনি। রাস্তা পুরো বন্ধ হয়ে গেছিল।”
অনেকে ধর্মীয় স্লোগান দেন, আবার অনেকে হুমায়ূন কবিরের সমর্থনে রাজনৈতিক স্লোগানও তোলেন। পরিবেশ ছিল উত্তেজিত হলেও তুলনামূলক শান্ত, কারণ প্রশাসন আগে থেকেই বিশাল পুলিশ মোতায়েন করে রেখেছিল।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—ধর্মীয় সংবেদনশীলতার জায়গায় এত বড় জমায়েত অনুমতি নিয়ে হয়েছিল কি না?
সরকার এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি, তবে হাইকোর্ট পূর্বেই পুলিশকে “আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা” দিয়েছে।
এর আগের দিন, হাইকোর্ট মুর্শিদাবাদ জেলার SP ও DM–কে নির্দেশ দেয়—
“জেলা শান্তি বজায় রাখুন, কোনও রকম উত্তেজনা সৃষ্টি হতে দেবেন না। প্রয়োজনে কঠোর পদক্ষেপ নিন।”
এই নির্দেশের কারণ ছিল—
এলাকায় বাড়তে থাকা জনমত উত্তেজনা
রাজনৈতিক অভিযোগ–পাল্টা অভিযোগ
সামাজিক বিভেদের আশঙ্কা
পুলিশ তাই নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে চায়। RAF মোতায়েন ছিল, ড্রোন নজরদারি ছিল, এবং সম্ভাব্য যেকোনো উত্তেজনার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠান শেষ হয়, তবে প্রশাসন স্পষ্ট করে দেয়—
“অনুমতি ছাড়া এ ধরনের বড় জমায়েত বা নির্মাণ রাজ্য আইন অনুযায়ী চলবে না।”
হুমায়ূন কবির TMC–র MLA ছিলেন, কিন্তু দল তাঁকে কিছুদিন আগে স্থগিত করে।
তাঁর বিরুদ্ধে দলের অভিযোগ—
সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনীতি করা
দলীয় নির্দেশ অমান্য করা
অযোধ্যা বিতর্ককে উসকে দিয়ে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত করা
TMC সূত্র জানায়—
“মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে দল সাম্প্রদায়িক বিরোধ চায় না।
যে কোনও কাজ যা ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়ায়, দল তা সমর্থন করে না।”
হুমায়ূন কবির অবশ্য বলেন—
“আমাকে দল থেকে স্থগিত করা অন্যায়। আমি সংবিধান অনুযায়ী ধর্মস্থল নির্মাণ করছি। এর সঙ্গে রাজনীতি জড়ানোর প্রয়োজন নেই।”
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—এই ইস্যুটি স্পষ্টতই রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে।
বিজেপি তীব্র সমালোচনা করে বলেছে—
“এটি ভোটের রাজনীতি। মমতা ব্যানার্জি সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করে সংখ্যালঘু রাজনীতি করছেন।”
তাদের অভিযোগ—TMC বাইরে থেকে নিন্দা করলেও ভিতরে ভিতরে এর সমর্থন করছে।
মুর্শিদাবাদ কংগ্রেস নেতৃত্ব বলছে—
“এটি এলাকায় অশান্তির পরিবেশ তৈরি করবে। তৃণমূল MLA ইচ্ছাকৃতভাবে Babri বিতর্ক ব্যবহার করছেন।”
“ধর্ম নিয়ে ভোট চাইতে কেউই বাদ যাচ্ছে না। মানুষ আবেগে ভাসছে, রাজনীতিবিদরা সে আবেগ ব্যবহার করছে।”
ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৬ ডিসেম্বর তারিখটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯২ সালের আজকের দিনেই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল Babri Masjid, যা ভারতীয় রাজনীতির এক বড় মাইলফলক এবং উত্তপ্ত অধ্যায়।
ঠিক এই দিনেই মুর্শিদাবাদে “Babri আকৃতির মসজিদ”-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হওয়ায় দেশজুড়ে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—
একই তারিখ কেন বেছে নেওয়া হল?
এতে কি রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে?
সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নেই?
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত মিশ্র—
“মসজিদ হবে, হাসপাতাল হবে—এটা এলাকার উন্নয়ন।”
“হুমায়ূন সাহেব সাহস দেখিয়েছেন, তিনি আমাদের নেতা।”
“এই প্রকল্প সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিতে পারে।”
“এখানে Babri–র নাম আনা ঠিক হয়নি।”
“রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
অনেকে আশঙ্কা করছেন—এটি ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
হুমায়ূন কবির জানিয়েছেন—
একটি বৃহৎ মসজিদ
একটি ১০০ শয্যার হাসপাতাল
একটি কমিউনিটি হল
একটি গেস্টহাউস
একটি ইসলামিক গবেষণা কেন্দ্র
তিনি দাবি করছেন—এটি শুধুই ধর্মীয় নয়, বরং সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প।
তবে প্রশাসনের প্রশ্ন—
প্রকল্পের অনুমোদন কি নেওয়া হয়েছে?
ভূমি–আইন, পৌরসভার ছাড়পত্র কোথায়?
এত বড় জমায়েতের অনুমতি কি ছিল?
গভীর বিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
মুর্শিদাবাদ একটি মুসলিম–প্রধান জেলা।
এই স্থাপনা সেই জনবসতির আবেগকে কাজে লাগাতে পারে।
এটি সরাসরি জাতীয় রাজনীতির দিকে সঙ্কেত করে।
অনেকের মতে এটি পরিকল্পিত।
তিনি হয়তো পরবর্তীতে নিজস্ব সংগঠন বা নতুন জোট গড়তে পারেন।
মুর্শিদাবাদে হুমায়ূন কবির–এর এই পদক্ষেপ—
ধর্মীয়
রাজনৈতিক
সামাজিক
প্রশাসনিক
সব পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন—
প্রকল্পটি কি আদৌ অনুমোদন পাবে?
রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়বে কি?
প্রশাসন কি কঠোর ব্যবস্থা নেবে?
নাকি এটি ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে একটি প্রতীকী শক্তি–প্রদর্শন?
পরিস্থিতি এখনো জটিল।
শান্তি বজায় রাখতে প্রশাসন চোখ খোলা রেখে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
নিশ্চিত যে—
এই ঘটনা আগামী কয়েক সপ্তাহ রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।