সারা বছর সামাজিক অবজ্ঞা ও প্রশাসনিক অবহেলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে দুর্গাপুজোর মাটি দান করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন কলকাতার সোনাগাছির যৌনকর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, বছরের অন্য সময়ে সমাজের একাংশ তাঁদের দূরে সরিয়ে রাখলেও দুর্গাপুজোর সময় তাঁদের বসতির মাটির গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বৈপরীত্যের প্রতিবাদেই পুজোর উদ্যোক্তাদের মাটি দিতে রাজি নন তাঁরা। ঘটনাটি ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে যৌনকর্মীদের সামাজিক মর্যাদা, অধিকার, প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা এবং অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন।
কলকাতা: দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিকতা, মিলন এবং সাম্যের বার্তাও বহন করে। দেবী দুর্গার আরাধনাকে ঘিরে প্রতি বছর নতুন করে উঠে আসে সমাজের নানা স্তরের মানুষের অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ। কিন্তু উৎসবের এই সর্বজনীনতার মধ্যেও সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা কতটা সম্মান ও মর্যাদা পান, সেই প্রশ্ন বারবার সামনে আসে। এবার সেই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই আলোচনায় কলকাতার সোনাগাছি।
সারা বছর সামাজিক অবজ্ঞা ও প্রশাসনিক অবহেলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে দুর্গাপুজোর জন্য নিজেদের বসতির মাটি দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন সোনাগাছির যৌনকর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, বছরের অন্য সময়ে সমাজের একাংশ তাঁদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করে। অথচ দুর্গাপুজোর সময় তাঁদের বসতির মাটির প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। এই বৈপরীত্যের প্রতিবাদ জানাতেই কোনও পুজো উদ্যোক্তাকে মাটি দিতে রাজি নন তাঁরা বলে জানা যাচ্ছে।
এই অবস্থানকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে সামাজিক সম্মান, সমান অধিকার এবং প্রান্তিক মানুষের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে সংশ্লিষ্ট যৌনকর্মীদের নির্দিষ্ট বক্তব্য, প্রতিবাদের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
কলকাতার সোনাগাছি দীর্ঘদিন ধরেই যৌনকর্মীদের বসতি হিসেবে পরিচিত। এই এলাকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জীবিকা, সামাজিক বাস্তবতা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, অধিকার এবং পুনর্বাসন-সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যৌনকর্মীদের জীবন নিয়ে সমাজে বহু আলোচনা হলেও তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দাবিকে সব সময় সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যৌনকর্মীদের অভিযোগ, দৈনন্দিন জীবনে তাঁদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাব, অসম্মান এবং অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়। সমাজের একাংশ তাঁদের পেশার কারণে দূরে সরিয়ে রাখে বলে তাঁদের বক্তব্য। অথচ ধর্মীয় উৎসবের সময় তাঁদের বসতির মাটিকে ঘিরে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিকে তাঁরা বৈপরীত্য হিসেবে দেখছেন।
এই প্রেক্ষাপটে দুর্গাপুজোর মাটি দান না করার অবস্থানকে শুধু একটি ধর্মীয় রীতির সঙ্গে যুক্ত ঘটনা হিসেবে দেখলে বিষয়টির সামাজিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মর্যাদা, স্বীকৃতি এবং সারা বছর সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন।
বাংলার দুর্গাপুজোর সঙ্গে মাটির সম্পর্ক গভীর। প্রতিমা নির্মাণে মাটি অন্যতম প্রধান উপাদান। কুমোরটুলির শিল্পীদের হাত ধরে খড়, কাঠামো, মাটি, রং ও অলংকরণের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয় দেবী দুর্গার প্রতিমা। সেই প্রতিমাকে কেন্দ্র করেই কয়েক দিন ধরে চলে পুজো, উৎসব এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন।
বাংলার কিছু প্রচলিত ধর্মীয় রীতি ও জনবিশ্বাসে যৌনপল্লির মাটির বিশেষ প্রতীকী গুরুত্বের কথা বলা হয়। তবে এই বিষয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও লোকাচার রয়েছে। সব পুজো কমিটি একইভাবে এই রীতি পালন করে না, এবং প্রতিমা নির্মাণের জন্য যৌনপল্লির মাটি সংগ্রহ করাও সর্বত্র বাধ্যতামূলক নয়।
এই প্রেক্ষাপটে সোনাগাছির যৌনকর্মীদের মাটি দিতে অস্বীকার করার অবস্থান নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে পারে। কারণ এখানে মাটির প্রশ্নটি কেবল প্রতিমা তৈরির উপাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সেই মানুষগুলির আত্মসম্মান, যাঁদের বসতির মাটি নিয়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আলোচনা হলেও তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়।
সোনাগাছির যৌনকর্মীদের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সমাজ যদি তাঁদের প্রতিদিনের জীবনে সম্মান দিতে না পারে, তাহলে বিশেষ উৎসবের সময় তাঁদের বসতির মাটিকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ কী?
এই প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে সামাজিক সম্পর্কের এক জটিল বাস্তবতা। কোনও গোষ্ঠীর সঙ্গে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক প্রতীক যুক্ত থাকলেই যে সেই গোষ্ঠীর মানুষ বাস্তব জীবনে সমান মর্যাদা পাবেন, তার নিশ্চয়তা নেই। উৎসবের সময় প্রতীকী গুরুত্ব দেওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়।
যৌনকর্মীদের অভিযোগ যদি তাঁদের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হয়, তাহলে সেই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা জরুরি। কারণ সামাজিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত অপমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা কর্মসংস্থান, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, নিরাপত্তা এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
মাটি দানের প্রশ্নে তাঁদের আপত্তি সেই বৃহত্তর অভিজ্ঞতারই প্রতিবাদ হিসেবে উঠে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁদের অবস্থান সমাজের সামনে এমন একটি আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে উৎসবের আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মানুষের মর্যাদা ও অধিকার নিয়েও কথা বলা দরকার।
দুর্গাপুজোকে প্রায়ই সর্বজনীন উৎসব বলা হয়। পুজোর মণ্ডপে নানা শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষ একসঙ্গে ভিড় করেন। পুজোর আনন্দে অংশ নেন শহর ও গ্রামের অসংখ্য মানুষ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিমা দর্শন, আলোকসজ্জা এবং সামাজিক মিলন—সব মিলিয়ে এই উৎসব বাংলার জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু সর্বজনীনতার প্রকৃত অর্থ শুধু উৎসবে সবার উপস্থিতি নয়। এর অর্থ, সমাজের প্রতিটি মানুষ যেন নিজের পরিচয় বা পেশার কারণে অসম্মানিত না হন এবং সমান মর্যাদায় বাঁচতে পারেন।
যৌনকর্মীদের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। উৎসবের সময় তাঁদের কাছ থেকে কোনও প্রতীকী উপাদান সংগ্রহ করা হলে তাঁদের মতামত, সম্মতি এবং অবস্থানকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কোনও ধর্মীয় রীতি পালনের নামে কারও উপর চাপ সৃষ্টি করা বা তাঁদের সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
মাটি দান করবেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কোনও পুজো কমিটি বা সামাজিক গোষ্ঠীর প্রত্যাশা থাকলেও সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে তাঁদের বাধ্য করা যায় না। সম্মানজনক আলোচনার ভিত্তিতেই এই ধরনের বিষয়ের সমাধান হওয়া উচিত।
যৌনকর্মীদের নিয়ে সামাজিক আলোচনায় প্রায়ই তাঁদের পেশাকে কেন্দ্র করে নানা ধারণা ও পূর্বধারণা সামনে আসে। এর ফলে তাঁদের ব্যক্তিগত পরিচয়, অভিজ্ঞতা এবং অধিকার অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়। অথচ তাঁরাও সমাজের অংশ এবং তাঁদেরও নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, আইনি সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
ভারতের আইনি ও সামাজিক বাস্তবতায় যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। যৌনকর্মী হওয়ার কারণে কাউকে অপমান, হেনস্থা বা বৈষম্যের শিকার হতে হওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে তাঁদের কাজের পরিবেশ, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং শোষণ থেকে সুরক্ষার বিষয়গুলিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
সোনাগাছির ঘটনাকে ঘিরে তাই শুধু দুর্গাপুজোর মাটি সংগ্রহের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রাখলে চলবে না। বরং যে প্রশ্নগুলি উঠে এসেছে, সেগুলির উত্তর খোঁজা দরকার—যৌনকর্মীরা তাঁদের প্রাপ্য সামাজিক সম্মান পাচ্ছেন কি না, সরকারি পরিষেবা তাঁদের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না, তাঁদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং তাঁদের মতামতকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
যৌনকর্মীদের বক্তব্যে প্রশাসনিক অবহেলার অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে কোন নির্দিষ্ট পরিষেবা, ঘটনা বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের আপত্তি, তা বিস্তারিতভাবে জানা প্রয়োজন। অভিযোগের নির্দিষ্ট দিকগুলি স্পষ্ট হলে প্রশাসনের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কে আরও নির্ভুলভাবে আলোচনা করা সম্ভব হবে।
সাধারণভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা নয়। স্বাস্থ্য পরিষেবা, সামাজিক সুরক্ষা, পরিচয়পত্র, শিক্ষা, নিরাপত্তা এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে তাঁদের কাছে পৌঁছয়, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনও অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিত তা গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ করা। একই সঙ্গে অভিযোগের বাস্তবতা যাচাই, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া জানা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও জরুরি।
সোনাগাছির যৌনকর্মীদের মাটি দান নিয়ে আপত্তির বিষয়টি যদি বৃহত্তর অবহেলার অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সেই অভিজ্ঞতাগুলির প্রতি প্রশাসনের মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উল্লেখ করা উচিত।
ধর্মীয় রীতি ও লোকাচার বহু প্রজন্ম ধরে সমাজে প্রচলিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রীতির ব্যাখ্যা ও পালনের পদ্ধতিও বদলাতে পারে। কোনও রীতির প্রতীকী গুরুত্ব থাকলেও তা পালন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মানুষের সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যৌনপল্লির মাটি নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কোনও পুজো কমিটি যদি এই মাটি সংগ্রহ করতে চায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলা দরকার। তাঁরা মাটি দিতে সম্মত কি না, তাঁদের আপত্তির কারণ কী এবং তাঁরা কী ধরনের সামাজিক বার্তা দিতে চাইছেন—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত।
কেউ মাটি দিতে অস্বীকার করলে সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করা জরুরি। ধর্মীয় রীতির নামে কারও ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত সিদ্ধান্তের উপর চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। বরং এই পরিস্থিতি সমাজকে ভাবার সুযোগ দিতে পারে—কীভাবে ধর্মীয় ঐতিহ্য পালন করার পাশাপাশি মানুষের অধিকার ও মর্যাদাকেও সম্মান জানানো যায়।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে প্রতীকী স্বীকৃতির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু শুধু প্রতীকী স্বীকৃতি দিয়ে বৈষম্য দূর করা যায় না। প্রান্তিক মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে তাঁদের দৈনন্দিন সমস্যাগুলির সমাধান জরুরি।
যৌনকর্মীদের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি সমানভাবে প্রযোজ্য। তাঁদের সঙ্গে সামাজিক আচরণ, স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার সুযোগ, নিরাপদ জীবনযাপন, সন্তানদের শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা—সব ক্ষেত্রেই মর্যাদা ও সমানাধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার।
দুর্গাপুজোর সময় তাঁদের বসতির মাটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সেই আলোচনার পাশাপাশি তাঁদের জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলিও যেন গুরুত্ব পায়। তাঁদের সম্মতি ছাড়া কোনও রীতি পালনের চেষ্টা না করে, তাঁদের মতামতকে সম্মান করে সামাজিক সংলাপ তৈরি করাই হতে পারে ইতিবাচক পথ।
সোনাগাছির এই অবস্থান তাই উৎসবের বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূত্র তৈরি করেছে। সমাজ কি প্রান্তিক মানুষের প্রতীকী গুরুত্ব স্বীকার করার পাশাপাশি তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে সম্মান দিতে প্রস্তুত? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
দুর্গাপুজোর সময় শহরজুড়ে আলোকসজ্জা, মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমা দর্শন এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। পুজো কমিটিগুলি দর্শকদের আকর্ষণ করতে নতুন নতুন থিম নিয়ে আসে। কিন্তু এই উৎসবের সামাজিক তাৎপর্য শুধু শিল্পকর্ম বা দর্শনার্থীর সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।
উৎসব মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা তৈরি করতে পারে, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে পারে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে পারে। সেই অর্থে সোনাগাছির যৌনকর্মীদের মাটি দান নিয়ে আপত্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
পুজোর উদ্যোক্তারা যদি সত্যিই সর্বজনীনতার বার্তা দিতে চান, তাহলে প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আলোচনা, অভিযোগ শোনা এবং সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
কোনও পুজোর সাফল্য শুধু কত বড় মণ্ডপ তৈরি হল বা কত মানুষ তা দেখতে এলেন, তার উপর নির্ভর করে না। সমাজের মানুষের মধ্যে কতটা মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সম্মানের বার্তা ছড়িয়ে পড়ল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সোনাগাছির যৌনকর্মীদের মাটি না দেওয়ার অবস্থানকে তাঁদের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁদের অভিযোগ, বছরের অন্য সময়ে যে সমাজ তাঁদের যথাযথ সম্মান দেয় না, সেই সমাজের উৎসবের প্রয়োজনে তাঁদের বসতির মাটির গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বৈপরীত্যের বিরুদ্ধে তাঁদের আপত্তি সামাজিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তবে এই অবস্থানের পেছনে সংশ্লিষ্ট সকলের অভিজ্ঞতা এক কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যৌনকর্মীদের বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তিরা এবং এলাকার বাসিন্দারা ভিন্ন ভিন্ন মতও পোষণ করতে পারেন। তাই বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির সময় তাঁদের নির্দিষ্ট বক্তব্য ও অবস্থান যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে পুজো উদ্যোক্তাদের বক্তব্যও জানা দরকার। তাঁরা আদৌ সোনাগাছি থেকে মাটি সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছেন কি না, কোনও আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়েছে কি না এবং এই বিষয়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া কী—এসব তথ্য ঘটনাটির সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে সাহায্য করবে।
সোনাগাছির ঘটনাটি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে—মানুষকে কি তাঁর পেশা বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত, নাকি তাঁর মানবিক মর্যাদাকে সর্বাগ্রে রাখা উচিত?
সমাজের কোনও গোষ্ঠীকে বছরের পর বছর অবজ্ঞা করা হলে, শুধু বিশেষ কোনও অনুষ্ঠানে তাঁদের সঙ্গে প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি করলেই সেই বৈষম্য দূর হয় না। সামাজিক সম্মান প্রতিদিনের আচরণে প্রকাশ পায়। মানুষের কথা শোনা, তাঁদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করা, তাঁদের অধিকার রক্ষা করা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়েই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি সম্ভব।
দুর্গাপুজো সেই ভাবনাকে সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে পারে। দেবী দুর্গার আরাধনার সঙ্গে শক্তি, সাহস ও অশুভের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে সাংস্কৃতিক তাৎপর্য জড়িয়ে রয়েছে, তা সমাজের অন্যায় ও বৈষম্য নিয়ে ভাবারও সুযোগ করে দেয়।
সোনাগাছির যৌনকর্মীদের বক্তব্য সেই আলোচনাকে আরও জরুরি করে তুলেছে। তাঁদের আপত্তির কারণকে শুধু একটি রীতির বিরোধিতা হিসেবে না দেখে, তার পিছনে থাকা সামাজিক অভিজ্ঞতা ও মর্যাদার দাবিকে বোঝার চেষ্টা করা দরকার।
সোনাগাছির যৌনকর্মীদের দুর্গাপুজোর মাটি দিতে অনিচ্ছা প্রকাশের ঘটনা ধর্মীয় রীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নকে একই সঙ্গে সামনে এনেছে। তাঁদের অভিযোগ, বছরের অন্য সময়ে অবহেলা ও অসম্মানের অভিজ্ঞতা থাকলেও উৎসবের সময় তাঁদের বসতির মাটির বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বৈপরীত্যের প্রতিবাদেই তাঁদের আপত্তি।
ঘটনার সব দিক সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সংশ্লিষ্ট যৌনকর্মী, তাঁদের সংগঠন, পুজো উদ্যোক্তা এবং প্রশাসনের বক্তব্য জানা প্রয়োজন। তবে এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে আলোচনায় এসেছে—সামাজিক সম্মান কোনও নির্দিষ্ট দিন বা উৎসবের জন্য সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
দুর্গাপুজো যদি সত্যিই সবার উৎসব হয়, তাহলে সেই উৎসবের আনন্দ ও মর্যাদার পরিসরে প্রান্তিক মানুষের অধিকার, সম্মতি এবং মানবিক পরিচয়ও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রতীকী রীতির পাশাপাশি বাস্তব জীবনে সম্মান ও সমানাধিকারের নিশ্চয়তাই হতে পারে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।