ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইরানে অস্থিরতা বাড়াতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে গোপনে অস্ত্র ও সহায়তা দেওয়ার ছক কষছে সিআইএ যার জেরে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা ঘনাচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির অন্দরে আবারও তীব্র চাঞ্চল্য। মধ্যপ্রাচ্যের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ইরান। আন্তর্জাতিক মহলের একাংশের দাবি, ইরানে সরাসরি সামরিক হামলার বদলে এবার আরও গভীর ও বিপজ্জনক পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে দেশের ভিতর থেকেই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার কৌশল। আর সেই ছকের নেপথ্যে উঠে আসছে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর নাম। অভিযোগ, ইরানে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে বিদ্রোহী ও সরকার-বিরোধী গোষ্ঠীগুলিকে গোপনে অস্ত্র ও রসদ জোগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকার কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলের কেন্দ্রে। পারমাণবিক কর্মসূচি, পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার, ইজরায়েল-বিরোধী অবস্থান সব মিলিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বরাবরই বৈরিতায় ভরা। অতীতে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, শুধুমাত্র নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না। ফলে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর পুরনো তত্ত্ব আবারও সামনে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি যুদ্ধের পথে হাঁটলে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে পারে আমেরিকা। সেই কারণেই বিকল্প পথ ইরানের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে উসকে দেওয়া। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, নারী অধিকার ইস্যু, সংখ্যালঘু সমস্যা ইরানের সমাজে এমনিতেই বহু ক্ষোভ জমে রয়েছে। এই ক্ষোভকে সংগঠিত বিদ্রোহে রূপান্তরিত করাই হতে পারে নতুন কৌশলের মূল লক্ষ্য।
ইরানের ভিতরে ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে একাধিক সরকার-বিরোধী গোষ্ঠী সক্রিয়। কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, বালুচ বিদ্রোহী গোষ্ঠী, প্রবাসী ইরানি বিরোধী সংগঠন এরা দীর্ঘদিন ধরেই তেহরানের শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠছে, এই সব গোষ্ঠীকেই নতুন করে সংগঠিত ও সশস্ত্র করার পরিকল্পনা চলছে। অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা বাড়ানো হলে পরিস্থিতি দ্রুত গৃহযুদ্ধের দিকে যেতে পারে।
গোপন অপারেশন চালানোর ক্ষেত্রে সিআইএ-র ভূমিকা নতুন কিছু নয়। লাতিন আমেরিকা থেকে শুরু করে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশে অতীতে সরকার পরিবর্তনের অভিযানে এই সংস্থার নাম জড়িয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রেও একই ছক প্রয়োগ করা হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা। যদিও সরকারি ভাবে কোনও স্বীকারোক্তি নেই, তবে বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি ইরান সংলগ্ন অঞ্চলে ইতিমধ্যেই নড়াচড়া বেড়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বরাবরই আগ্রাসী বিদেশনীতি ও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির জন্য পরিচিত। তাঁর আমলে ইরানের উপর সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল এবং পারমাণবিক চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এখন ফের রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় ট্রাম্পের জন্য ইরান ইস্যু একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি নিজের সমর্থক ঘাঁটি আরও মজবুত করতে চাইছেন বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
ইরানে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে তার প্রভাব শুধু একটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন সব জায়গাতেই ইরানের প্রভাব রয়েছে। সেখানে সক্রিয় বিভিন্ন মিলিশিয়া ও গোষ্ঠীর উপর এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থির হয়ে উঠার আশঙ্কা প্রবল।
গৃহযুদ্ধ মানেই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি সাধারণ মানুষের। খাদ্য সংকট, শরণার্থী সমস্যা, স্বাস্থ্য পরিষেবার ভাঙন ইরানেও সেই একই চিত্র দেখা যেতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির আশঙ্কা, যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে সংঘাত উসকে দেওয়া হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হবে।
রাশিয়া ও চিন ইতিমধ্যেই ইরানের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলিও প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। তারা চাইছে কূটনৈতিক সমাধান, সংঘাত নয়। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার কোনও গোপন পদক্ষেপ ধরা পড়লে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বড়সড় কূটনৈতিক সংকট তৈরি হতে পারে।
ইরানে গৃহযুদ্ধ বাধানোর অভিযোগ শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি গোটা বিশ্বের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। সত্যিই যদি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে অস্ত্র ও মদত দেওয়ার ছক কষা হয়ে থাকে, তবে তার পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। ইতিহাস সাক্ষী, বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপে খুব কম দেশই শান্তি পেয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কাই ক্রমশ ঘনাচ্ছে।
বিশ্ব এখন তাকিয়ে এই সংকট কূটনীতির পথে মেটে, নাকি আরেকটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যায় মধ্যপ্রাচ্য।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার বোর্ডে আবারও নতুন করে উত্তেজনার চাল। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র ইরানকে ঘিরে ফের অশান্তির ঘনঘটা। কূটনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, সরাসরি যুদ্ধের পথে না গিয়ে ইরানের ভিতর থেকেই আগুন জ্বালাতে চাইছে আমেরিকার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী। আর সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রে উঠে আসছে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর নাম। অভিযোগ অনুযায়ী, ইরানে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করতে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে গোপনে অস্ত্র, অর্থ ও কৌশলগত সহায়তা দেওয়ার ছক কষা হচ্ছে, যার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ক কার্যত শত্রুতার পর্যায়ে। মার্কিন দূতাবাস দখল, নিষেধাজ্ঞা, তেল রাজনীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি একটির পর একটি ইস্যু দুই দেশের দূরত্ব বাড়িয়েছে। ট্রাম্পের শাসনামলে এই বৈরিতা আরও তীব্র হয়, বিশেষ করে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল ও ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির মাধ্যমে।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি চাপে থাকলেও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। বরং অভ্যন্তরীণভাবে রাষ্ট্র আরও কঠোর হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখানেই নীতিগত ব্যর্থতা বুঝে কৌশল বদল। সামরিক হামলা মানেই আন্তর্জাতিক সমালোচনা, তেলের দাম বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক যুদ্ধ এই ঝুঁকি এড়াতেই ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা পরোক্ষ যুদ্ধের পথ।
ইরানের সমাজে নানা স্তরে অসন্তোষ রয়েছে
অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বনারী অধিকার ও সামাজিক স্বাধীনতাজাতিগত সংখ্যালঘুদের অভিযোগরাজনৈতিক বিরোধীদের দমন
এই ক্ষোভ স্বতঃস্ফূর্ত হলেও, বাইরের শক্তির মদতে তা সংঘঠিত বিদ্রোহে রূপ নিতে পারে এই আশঙ্কাই এখন বড়।
ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকায় সক্রিয় কুর্দি, বালুচ ও আরব বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলি অতীতেও সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। বহু গোষ্ঠী বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় থাকলেও, আধুনিক অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পেলে তারা ফের শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অভিযোগ, এই গোষ্ঠীগুলির মধ্যেই কিছু নির্বাচিত সংগঠনকে ‘কৌশলগত সহযোগী’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্ব ইতিহাসে বহু সরকার পতনের পিছনে গোপন অভিযানের ছাপ রয়েছে। ইরান নিজেও এর ব্যতিক্রম নয় ১৯৫৩ সালে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেকের পতনে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান বরাবরই বাইরের হস্তক্ষেপ নিয়ে সতর্ক। বর্তমান অভিযোগ সেই পুরনো ক্ষতকেই নতুন করে উসকে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের কাছে ইরান ইস্যু শুধু বিদেশনীতি নয়, ঘরোয়া রাজনীতির হাতিয়ারও। কঠোর অবস্থান, শক্তিশালী শত্রু, ন্যাশনাল সিকিউরিটি এই বয়ান তাঁর সমর্থকদের মধ্যে বরাবরই জনপ্রিয়। ফলে ইরানকে ঘিরে আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও নীতির সম্ভাবনা অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
ইরান শুধুমাত্র একটি দেশ নয়, বরং একটি আঞ্চলিক শক্তি। লেবাননের হেজবোল্লা, ইয়েমেনের হুথি, ইরাক ও সিরিয়ার মিলিশিয়াদের সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরান অস্থির হলে এই সব ফ্রন্টেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একসঙ্গে জ্বালিয়ে দিতে সক্ষম।
গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। খাদ্যাভাব, চিকিৎসার অভাব, বাস্তুচ্যুতি, শরণার্থী সংকট ইরানেও সেই চিত্রই ফুটে উঠতে পারে। মানবাধিকার সংগঠনগুলি আগেই সতর্ক করেছে, ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত উসকে দেওয়া হলে তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শামিল।
রাশিয়া ও চিন ইরানের পাশে দাঁড়ালে বিশ্ব রাজনীতি আরও মেরুকৃত হতে পারে। ইউরোপ দ্বিধায় একদিকে আমেরিকার সঙ্গে জোট, অন্যদিকে যুদ্ধবিরোধী অবস্থান। এই টানাপড়েন নতুন ঠান্ডা যুদ্ধের আবহ তৈরি করতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।