ফের বিতর্কে জড়ালেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক Ben Stokes। অভিযোগ, মধ্যরাতে একটি পানশালায় মারামারির ঘটনায় জড়িয়ে বোর্ডের আচরণবিধি ভেঙেছেন তিনি। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে জোর চর্চা, আর এর জেরে কড়া শাস্তির মুখেও পড়তে পারেন ইংল্যান্ডের এই তারকা অলরাউন্ডার।
আবার বিতর্কে বেন স্টোকস! পানশালায় মারামারি, তদন্তে ইংল্যান্ড বোর্ড, শাস্তির মুখে ইংরেজ অধিনায়ক
ইংল্যান্ড ক্রিকেটের অন্যতম সফল অধিনায়ক এবং বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম জনপ্রিয় অলরাউন্ডার Ben Stokes ফের বিতর্কের কেন্দ্রে। মাঠে অসাধারণ পারফরম্যান্স, আক্রমণাত্মক নেতৃত্ব এবং ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতার জন্য তিনি যেমন প্রশংসিত, তেমনই মাঠের বাইরের কিছু কর্মকাণ্ডের জন্য অতীতেও একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হল না।
লর্ডসে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট জয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন স্টোকস। অভিযোগ, মধ্যরাতে একটি পানশালায় গিয়ে সতীর্থ পেসার Gus Atkinson-কে সঙ্গে নিয়ে এক রাগবি খেলোয়াড়ের সঙ্গে বিবাদে জড়ান তিনি। সেই বিবাদ পরে হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছায়। ঘটনাটি সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে England and Wales Cricket Board।
বোর্ড ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টের দল ঘোষণাও স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—আবার কি কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে চলেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক?
জয়ের উল্লাসের মধ্যেই নতুন বিতর্ক
লর্ডস টেস্টে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ইংল্যান্ড শিবিরে ছিল উৎসবের আবহ। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দৌড়ে টিকে থাকতে এই জয় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলের নেতৃত্বে ছিলেন স্টোকস, আর মাঠে তাঁর সিদ্ধান্ত ও ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশংসা হচ্ছিল সর্বত্র।
কিন্তু ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, গভীর রাতে স্টোকস এবং অ্যাটকিনসন একটি জনপ্রিয় পানশালায় যান। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন রাগবি খেলোয়াড়ও। কোনও একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনার জেরে ইংল্যান্ড ক্রিকেট মহলে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। কারণ, এটি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ঝামেলার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বোর্ডের নির্দিষ্ট আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগও।
ইংল্যান্ড বোর্ডের নিয়ম ভাঙার অভিযোগ
গত কয়েক বছরে একাধিক ইংরেজ ক্রিকেটার পানশালা-কেন্দ্রিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে দলের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সেই কারণেই সম্প্রতি কঠোর নিয়ম চালু করেছিল ইংল্যান্ড বোর্ড। সিরিজ চলাকালীন ক্রিকেটারদের রাতের বেলায় পানশালায় যাওয়া বা এমন কোনও পরিস্থিতিতে জড়ানো থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এই নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল দুইটি—একদিকে ক্রিকেটারদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা, অন্যদিকে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করা।
কিন্তু অভিযোগ সত্যি হলে স্টোকস এবং অ্যাটকিনসন সরাসরি সেই নিয়ম ভেঙেছেন। আর এখানেই বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে।
তদন্তে নেমেছে ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড
ঘটনার পর আনুষ্ঠানিক বিবৃতি জারি করেছে ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড।
বোর্ড জানিয়েছে যে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু হয়েছে। সমস্ত তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্ত সম্পূর্ণ হওয়ার পর বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়া হবে।
বোর্ডের বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, স্টোকস এবং অ্যাটকিনসন গভীর রাত পর্যন্ত পানশালায় উপস্থিত ছিলেন এবং সেই সময়েই এই ঘটনা ঘটে। ফলে তদন্তের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপ।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, বোর্ডের এই অবস্থান দেখিয়ে দিচ্ছে যে তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
দ্বিতীয় টেস্টে খেলবেন তো স্টোকস?
বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—দ্বিতীয় টেস্টে আদৌ খেলতে পারবেন কি স্টোকস?
তদন্তে যদি নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হতে পারে। একইসঙ্গে অ্যাটকিনসনের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
কিছু রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে, দু'জনকেই দ্বিতীয় টেস্টের দল থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা।
বোর্ডের সামনে কঠিন সমীকরণ
স্টোকস বর্তমানে ইংল্যান্ড টেস্ট দলের প্রাণভোমরা। অধিনায়ক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি শুধু নেতৃত্বের ক্ষেত্রেই নয়, দলের মনোবল এবং কৌশলগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে অ্যাটকিনসন সাম্প্রতিক সময়ে ইংল্যান্ডের অন্যতম কার্যকর পেসার হিসেবে উঠে এসেছেন।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই দুই ক্রিকেটারকে বাইরে রাখলে দলের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
ফলে ইংল্যান্ড বোর্ড এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
একদিকে নিয়ম ভাঙার অভিযোগে শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে দলের মধ্যে ভুল বার্তা না যায়। অন্যদিকে দলের স্বার্থও বিবেচনা করতে হবে।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বোর্ডের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০১৭ সালের বিতর্কের স্মৃতি ফিরল
এই ঘটনার পর অনেকেরই মনে পড়ে যাচ্ছে ২০১৭ সালের সেই বহুচর্চিত ঘটনার কথা।
সেবারও একটি পানশালার বাইরে মারামারির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন স্টোকস। ঘটনাটি এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যে তাঁকে গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকেও দূরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে।
সেই বিতর্ক স্টোকসের ক্যারিয়ারে বড় ধাক্কা দিয়েছিল।
যদিও পরে তিনি দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেন এবং ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ ও অ্যাশেজের মতো বড় সাফল্য এনে দেন, তবুও সেই অধ্যায় এখনও ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে।
ফলে নতুন এই বিতর্ক সামনে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই পুরনো ঘটনার সঙ্গে তুলনা শুরু হয়েছে।
ইংল্যান্ড ক্রিকেটে শৃঙ্খলার প্রশ্ন
স্টোকস একা নন। অতীতে আরও কয়েকজন ইংরেজ ক্রিকেটার পানশালা-কেন্দ্রিক বিতর্কে জড়িয়েছেন।
তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে রাতের জীবনযাপন, পার্টি সংস্কৃতি এবং মাঠের বাইরের আচরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে।
ইংল্যান্ড বোর্ড বারবার শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তা দিলেও মাঝে মধ্যেই এমন ঘটনা সামনে আসছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, বোর্ডের কঠোর নির্দেশিকা আদৌ কতটা কার্যকর?
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র নিয়ম তৈরি করলেই হবে না; তার কঠোর প্রয়োগও জরুরি।
নিরাপত্তারক্ষী আহত, ঘটনাকে ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল একজন নিরাপত্তারক্ষীর আহত হওয়া।
জানা গিয়েছে, হাতাহাতির সময় এক রাগবি খেলোয়াড় অ্যাটকিনসনকে লক্ষ্য করে ঘুষি মারতে যান। কিন্তু সেই ঘুষি গিয়ে লাগে স্টোকসদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তির মুখে।
আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে তাঁর মুখে সেলাই করতে হয়েছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর ঘটনাটি শুধুমাত্র ক্রিকেটারদের মধ্যে বচসার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই বলেই মনে করা হচ্ছে।
বরং এটি এমন একটি ঘটনা, যেখানে শারীরিক আঘাতের বিষয়ও জড়িত। তাই তদন্ত আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
কী হতে পারে শাস্তি?
ক্রিকেট প্রশাসকদের মতে, সম্ভাব্য কয়েকটি শাস্তির মধ্যে থাকতে পারে—
সতর্কবার্তা
জরিমানা
নির্দিষ্ট সংখ্যক ম্যাচে নিষেধাজ্ঞা
দ্বিতীয় টেস্ট থেকে বাদ
আচরণবিধি সংক্রান্ত পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ
তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে তদন্ত রিপোর্টের উপর নির্ভর করবে।
স্টোকসের ভাবমূর্তিতে নতুন ধাক্কা
গত কয়েক বছরে স্টোকস নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মাঠে তাঁর নেতৃত্ব, দায়িত্ববোধ এবং সাহসী সিদ্ধান্ত তাঁকে আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা অধিনায়কে পরিণত করেছে।
কিন্তু এমন বিতর্ক বারবার তাঁর ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।
বিশেষত একজন অধিনায়ক হিসেবে তাঁর কাছ থেকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা হয়।
ফলে এই ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নয়, নেতৃত্বের প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে।
লর্ডসে ঐতিহাসিক জয় দিয়ে যে সপ্তাহটি শুরু হয়েছিল, তা এখন ইংল্যান্ড ক্রিকেটের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। বেন স্টোকস ও গাস অ্যাটকিনসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ কতটা সত্য, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে ঘটনাটি ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
তদন্তের ফলাফলই ঠিক করবে স্টোকসের ভবিষ্যৎ কী হবে, দ্বিতীয় টেস্টে তিনি খেলতে পারবেন কি না এবং ইংল্যান্ড বোর্ড শৃঙ্খলার প্রশ্নে কতটা কঠোর অবস্থান নেয়। আপাতত গোটা ক্রিকেট বিশ্বের নজর সেই রিপোর্টের দিকেই।