Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মোহনপুর ব্রিজে বড় স্বস্তি! লোড ক্যাপাসিটি বেড়ে ৩৫ টন, চাঙ্গা ব্যবসা-বাণিজ্যে খুশির হাওয়া

পশ্চিম মেদিনীপুরে ভারী যান চলাচলে বড় স্বস্তি। জেলা পরিবহণ দফতরের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, আপাতত মেদিনীপুর থেকে খড়গপুরমুখী রাস্তায় সর্বাধিক ৩৫ টন ওজনের ট্রাক ও ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের কেন্দ্র দেশপ্রাণ বীরেন্দ্র সেতু, যা সাধারণ মানুষের কাছে মোহনপুর ব্রিজ নামেই বেশি পরিচিত। মেদিনীপুর শহর ও খড়্গপুরের মধ্যে কংসাবতী নদীর উপর নির্মিত এই সেতু দীর্ঘদিন ধরেই জেলার পরিবহণ ব্যবস্থার অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার ছোট ও বড় যানবাহন এই সেতুর উপর দিয়ে যাতায়াত করে। শুধু সাধারণ যাত্রী পরিবহণ নয়, শিল্পাঞ্চল খড়্গপুর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য পরিবহণ এবং কৃষিজ সামগ্রী সরবরাহের ক্ষেত্রেও এই ব্রিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে গত কয়েক বছর ধরে সেতুর উপর ভারী যান চলাচলে একাধিক বিধিনিষেধ জারি থাকায় সমস্যায় পড়েছিলেন ব্যবসায়ী, ট্রাক মালিক, পরিবহণ সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ২৫ টনের বেশি ওজনের গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি, সময় নষ্ট এবং বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল সংশ্লিষ্ট মহলকে। অবশেষে সেই পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এল জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসন ও পরিবহণ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, দেশপ্রাণ বীরেন্দ্র সেতুর লোড ক্যাপাসিটি ২৫ টন থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকেই এই নতুন নির্দেশ কার্যকর হয়েছে। আপাতত পরীক্ষামূলক ভিত্তিতে শুধুমাত্র মেদিনীপুর থেকে খড়্গপুরমুখী ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রেই এই ছাড় কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। ফলে এখন থেকে সর্বাধিক ৩৫ টন ওজনের ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যান এই দিক দিয়ে চলাচল করতে পারবে।

এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই ব্যবসায়ী মহল, ট্রাক মালিক সংগঠন এবং পরিবহণ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা লোড ক্যাপাসিটি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, ২৫ টনের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে ঘুরপথে যেতে হচ্ছিল, যার ফলে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, সময় অপচয় এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছিল।

জেলা পরিবহণ আধিকারিক তথা আরটিও সন্দীপ সাহা জানিয়েছেন, পূর্ত দফতর, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ এবং সেতুর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও পর্যালোচনার পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেতুর বর্তমান অবস্থা, ভার বহনের ক্ষমতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেই পরীক্ষামূলকভাবে লোড ক্যাপাসিটি বাড়ানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এই পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা সফলভাবে চললে ভবিষ্যতে উভয় দিক থেকেই ৩৫ টন পর্যন্ত ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ খড়্গপুর থেকে মেদিনীপুরমুখী যানবাহনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম কার্যকর করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার আগে প্রশাসন সেতুর উপর চাপ, যান চলাচলের প্রভাব এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

মোহনপুর ব্রিজ শুধু একটি সেতু নয়, পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অর্থনৈতিক গতিপথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খড়্গপুরে একাধিক শিল্পাঞ্চল, রেল ও লজিস্টিক হাব এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্র থাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহণ হয়। এই সেতুর মাধ্যমে মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া সহ একাধিক জেলার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। ফলে ব্রিজে ভারী যান চলাচলে সীমাবদ্ধতা থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর।

গত কয়েক বছরে সেতুর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। সেতুর বিভিন্ন অংশে ক্ষয়, অতিরিক্ত চাপ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসায় প্রশাসন নিরাপত্তার স্বার্থে ভারী যান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল। যদিও সেই সিদ্ধান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেও পরিবহণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই ভারী পণ্যবাহী গাড়িগুলিকে দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহার করতে হত, যার ফলে পরিবহণ ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যেত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। কারণ একদিকে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে, অন্যদিকে পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সেতুর নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের এই ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ ভবিষ্যতে আরও বড় সিদ্ধান্তের পথ খুলে দিতে পারে।

news image
আরও খবর

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনেকেই জানিয়েছেন, নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ায় পণ্য পরিবহণে আগের তুলনায় অনেক সুবিধা হবে। বিশেষ করে নির্মাণ সামগ্রী, শিল্পপণ্য, খাদ্যশস্য এবং কৃষিজ পণ্য পরিবহণে সময় ও খরচ দুইই কমবে। খড়্গপুরের শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হবে বলেও তাঁদের মত।

ট্রাক মালিক সংগঠনের একাংশ জানিয়েছে, ২৫ টনের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ট্রাককে কম মাল নিয়ে চলাচল করতে হত, যার ফলে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছিল। এখন ৩৫ টন পর্যন্ত অনুমতি পাওয়ায় পরিবহণ খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে। তবে তাঁরা চাইছেন খুব দ্রুত উভয় দিকেই একই নিয়ম চালু করা হোক।

এদিকে সাধারণ মানুষের একাংশও এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, ভারী যানবাহনের উপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ থাকলে অনেক সময় শহরের ভেতরের ছোট রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল বাড়ত, যার ফলে যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হত। এখন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ব্রিজ দিয়ে ভারী যান চলাচল করলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রিত থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে প্রশাসন সূত্রে স্পষ্ট করা হয়েছে, নতুন এই ছাড়পত্র দেওয়া হলেও সমস্ত যানবাহনকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই চলাচল করতে হবে। অতিরিক্ত গতি, অতিরিক্ত ওজন বা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেতুর উপর নিয়মিত নজরদারি চালানো হবে বলেও জানানো হয়েছে।

পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম মেদিনীপুর ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারের জন্য শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই দিক থেকে মোহনপুর ব্রিজের লোড ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি একটি বড় পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে সেতুর আরও উন্নয়ন, আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং যান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তা বড় ভূমিকা নিতে পারে।

প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী ব্যবসায়ী ও পরিবহণ ক্ষেত্রের মানুষজন। তাঁদের আশা, পরীক্ষামূলক পর্যায় সফল হলে খুব শীঘ্রই সম্পূর্ণভাবে ভারী যান চলাচলের উপর থাকা সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কমে যাবে। এর ফলে শিল্পাঞ্চল, পাইকারি বাজার এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পণ্য সরবরাহ আরও সহজ ও দ্রুত হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশপ্রাণ বীরেন্দ্র সেতু বা মোহনপুর ব্রিজে ৩৫ টন পর্যন্ত ভারী যান চলাচলের অনুমতি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পরিবহণ ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিনের সমস্যার আংশিক সমাধান হওয়ায় স্বস্তিতে ব্যবসায়ী মহল থেকে সাধারণ মানুষ— সকলেই। এখন নজর থাকবে প্রশাসনের পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের দিকে। সেই পরীক্ষা সফল হলে ভবিষ্যতে উভয় দিকেই একই ছাড় কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা গোটা জেলার অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য আরও বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহলের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী সংগঠন, ট্রাক মালিক সমিতি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের তরফে যে দাবি তোলা হচ্ছিল, অবশেষে তারই প্রতিফলন দেখা গেল এই সিদ্ধান্তে। বিশেষ করে খড়্গপুর শিল্পাঞ্চল এবং মেদিনীপুর শহরের মধ্যে দ্রুত পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে মনে করা হচ্ছে। বহু ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, অতিরিক্ত পরিবহণ খরচের কারণে তাঁদের ব্যবসায়িক লাভ কমে যাচ্ছিল। এখন লোড ক্যাপাসিটি বাড়ায় সেই চাপ অনেকটাই কমবে বলে আশা করছেন তাঁরা।

অন্যদিকে, প্রশাসনও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে নিরাপত্তার বিষয়টি কোনওভাবেই উপেক্ষা করা হবে না। সেতুর উপর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত পর্যবেক্ষণ এবং যানবাহনের ওজন পরিমাপের ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে যদি যান চলাচলের চাপ আরও বাড়ে, তাহলে বিকল্প সেতু নির্মাণ বা আধুনিকীকরণের বিষয়েও ভাবতে হতে পারে। তবে আপাতত ৩৫ টন পর্যন্ত ভারী যান চলাচলের অনুমতি জেলার পরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন গতি আনবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Preview image