Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বিসর্জনহীন দুর্গা: কোথায় দেখবেন দেবীর অনন্য রূপ?

বাংলার নানা প্রান্তে দুর্গাপুজোর চেনা আখ্যানের আড়ালেই রয়েছে বিসর্জনহীন দুর্গা আরাধনার প্রাচীন ঐতিহ্য। কোথাও একাকী দেবী, কোথাও অশ্বারূঢ়া চতুর্ভুজা—কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের কোথায় দেখা মিলবে এই বারোমাস্যা দুর্গার, জেনে নিন।

বিসর্জনহীন দুর্গা: কোথায় দেখবেন দেবীর অনন্য রূপ?
Hindu Festivals, Religious Events

বিসর্জনহীন দুর্গা: কলকাতা-সহ বাংলার ১০টি স্থায়ী দুর্গামন্দিরের ইতিহাস ও অজানা কাহিনি

File:Dhakeswari Mata Idol.jpg - Wikimedia Commons

 

 

 

Adi Chitteshwari Durga Temple | Dacoit Chitte worshipped Durga as Chitteswari, known as Adi Chitteshwari Durga Temple at Cossipore dgtl - Anandabazar

 

 

 

Kanak Durga Pujo Temple History - ৫০০ বছরের পুরনো ঝাড়গ্রামের কনক দুর্গা মন্দির, এখানে অষ্টমীর ভোগ নিজেই রাঁধেন দুর্গা!

 

8

 

 

মহালয়ায় দেবীপক্ষের সূচনা, ষষ্ঠীতে বোধন, সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত পুজোর আনন্দ এবং দশমীতে বিসর্জন—বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই যেন এই পরিচিত ছবি। শরতের নীল আকাশ, কাশফুল, ঢাকের বাদ্যি, আলোর রোশনাই আর মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীদর্শনের মধ্যে দিয়েই কেটে যায় উৎসবের দিনগুলি। কিন্তু বাংলার দুর্গা-আরাধনার ইতিহাস কি শুধুই এই পাঁচ দিনের উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ? উত্তর হল, না। বাংলার নানা প্রান্তে এমন বহু মন্দির ও বাড়ি রয়েছে, যেখানে দুর্গা সারা বছর পূজিতা হন। শরতে তাঁর আগমন ঘটে না, দশমীতে বিসর্জনও হয় না। কারণ, সেখানে দেবী চিরকালীন অধিষ্ঠাত্রী।

দুর্গার এই স্থায়ী রূপকেই বলা যেতে পারে ‘বিসর্জনহীন দুর্গা’ বা ‘বারোমাস্যা দুর্গা’। কোথাও তিনি দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী, কোথাও স্বতন্ত্র দেবী, কোথাও পাথরের বিগ্রহে পূজিতা হন, আবার কোথাও দেখা মেলে অশ্বারূঢ়া চতুর্ভুজা দুর্গার। কলকাতার পুরনো মন্দির থেকে ঝাড়গ্রামের অরণ্যঘেরা দেবালয়, এমনকি শিলিগুড়ির কাছের বনাঞ্চলেও ছড়িয়ে রয়েছে এই অনন্য আরাধনার নিদর্শন।

শিল্প-ইতিহাসের অধ্যাপক দেবদত্ত গুপ্তের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বারোমাস্যা দুর্গার রূপ ও আরাধনার ধরন এক জায়গার সঙ্গে অন্য জায়গায় মেলে না। এই মন্দিরগুলিতে দুর্গাপুজো কেবল দেবীর আগমনকে ঘিরে নয়, বরং সারা বছর তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যের খোঁজেই কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে দেখা যেতে পারে বিসর্জনহীন দুর্গার মন্দিরগুলি।

১. ঢাকেশ্বরী মাতা মন্দির, কুমোরটুলি

যেভাবে ঢাকার ‘ঢাকেশ্বরী’ কলকাতায়

 

 

 

কলকাতার কুমোরটুলির দুর্গাচরণ স্ট্রিটে অবস্থিত ঢাকেশ্বরী মাতা মন্দির বিসর্জনহীন দুর্গা আরাধনার অন্যতম পরিচিত নিদর্শন। এই মন্দিরে নিত্যপূজিতা হন দেবী দুর্গা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, রাজা বল্লাল সেন স্বপ্নাদেশ পেয়ে দেবীর মূর্তি খুঁজে পেয়েছিলেন। মূর্তিটি ঢাকা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল বলেই দেবীর নাম হয় ঢাকেশ্বরী।

এই মন্দিরের দেবীমূর্তির বিশেষত্ব হল, তিনি সপরিবারে বিরাজমান। দশভুজা দুর্গার সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। পাশাপাশি রয়েছে সিংহ ও মহিষাসুরের উপস্থিতিও। ফলে পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপের সঙ্গে এই স্থায়ী বিগ্রহের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

তবে দেবীমূর্তির গঠনে রয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। দেবীর সামনের দুটি হাত পিছনের আটটি হাতের তুলনায় বড়। এই গঠন মূর্তিটিকে অন্য অনেক প্রচলিত দুর্গাবিগ্রহের থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

মন্দিরে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় পুজো হয়। দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে দেবীর আরাধনায় বিশেষ আয়োজন করা হয় এবং অন্নভোগের ব্যবস্থাও থাকে। শরতের উৎসব শেষ হয়ে গেলেও দেবীর নিত্যপুজো বন্ধ হয় না। তাই কলকাতায় বিসর্জনহীন দুর্গা দর্শনের পরিকল্পনা করলে ঢাকেশ্বরী মাতা মন্দির হতে পারে অন্যতম গন্তব্য।

২. আদি চিত্তেশ্বরী বা জয়চণ্ডী চিত্তেশ্বরী দুর্গামন্দির, চিৎপুর-কাশীপুর

Adi Chitteshwari Durga Temple | Dacoit Chitte worshipped Durga as Chitteswari, known as Adi Chitteshwari Durga Temple at Cossipore dgtl - Anandabazar

 

 

 

কলকাতার প্রাচীন দুর্গাক্ষেত্রগুলির মধ্যে আদি চিত্তেশ্বরী বা জয়চণ্ডী চিত্তেশ্বরী দুর্গামন্দিরের নাম উল্লেখযোগ্য। চিৎপুর-কাশীপুর অঞ্চলে অবস্থিত এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ১৬১০ খ্রিস্টাব্দ বলে প্রচলিত। মন্দিরটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে চিতে ডাকাতের কাহিনি।

জনশ্রুতি অনুসারে, একসময় জঙ্গলাকীর্ণ চিৎপুর অঞ্চলে চিতে ডাকাতের দাপট ছিল। ডাকাতির আগে তিনি দেবীর পুজো করতেন বলে কথিত রয়েছে। সেই কাহিনির সূত্র ধরেই দেবীর নামের সঙ্গে চিত্তেশ্বরী পরিচিতি জুড়ে যায়। বর্তমানে দেবী জয়চণ্ডী চিত্তেশ্বরী নামে পূজিতা হন।

এই মন্দিরের দেবীমূর্তি নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। বাংলার প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমার সঙ্গে এই বিগ্রহের পরিচয় থাকলেও দেবীর নিজস্ব উপাসনাপদ্ধতি এবং স্থানীয় ইতিহাস তাঁকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।

দেবীর পায়ের কাছে সিংহের পরিবর্তে বাঘের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। প্রচলিত মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তির পরিচিত রূপ থেকে এই বৈশিষ্ট্য দেবীকে আলাদা করে চেনায়। মন্দিরে প্রতিদিন পুজো হয়। দুর্গোৎসবের সময় বিশেষ আয়োজন এবং ভক্তসমাগম দেখা যায়।

দেবী এখানে কেবল শরতের অতিথি নন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস এবং দীর্ঘদিনের ধর্মীয় পরম্পরার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন তিনি। তাই বিসর্জনহীন দুর্গার রূপ ও বাংলার প্রাচীন মন্দির-সংস্কৃতি বুঝতে আদি চিত্তেশ্বরী মন্দির গুরুত্বপূর্ণ।

৩. জগৎরাম মুখোপাধ্যায় বাড়ির দুর্গা, বেহালা

For Some Kolkata Pujas, Homestay Trumps Homecoming For Bengal’s Deity No. 1 | Kolkata News - Times of India

 

 

 

কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাসে বেহালার ৫৬, ব্রাহ্মসমাজ রোডের জগৎরাম মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজো বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৭৭০ সালে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল বলে জানা যায়। বর্তমান স্থায়ী দুর্গাবিগ্রহটি তৈরি করান জগৎরাম মুখোপাধ্যায়ের পৌত্র যদুনাথ মুখোপাধ্যায়, ১৮৫৮ সালে।

এই বাড়ির দুর্গামূর্তির গঠনে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। সাধারণত বাংলার একচালা দুর্গাপ্রতিমায় দেবীর পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে দেখা যায়। কিন্তু এখানে তাঁরা মূল বিগ্রহের পাশে অবস্থান করেন না; তাঁদের দেখা যায় চালচিত্রে।

এই বিন্যাসের ফলে দেবীর মূর্তি ও তার চারপাশের শিল্পরূপ আলাদা মাত্রা পেয়েছে। স্থায়ী বিগ্রহকে কেন্দ্র করে বাড়িতে প্রতিদিন দুর্গাপুজো হয়। আরও একটি আকর্ষণীয় রীতি হল, দেবীকে মাছ নিবেদন করা হয়।

এই বাড়ির ধর্মীয় পরম্পরা শুধু দুর্গাপুজোতেই সীমাবদ্ধ নয়। একই স্থায়ী বিগ্রহে জগদ্ধাত্রী ও অন্নপূর্ণার পুজোও সম্পন্ন হয়। ফলে একটি বিগ্রহকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেবীর আরাধনার ধারাবাহিকতা এখানে লক্ষ করা যায়।

শহরের বনেদি বাড়ির ইতিহাস, পারিবারিক পুজোর ঐতিহ্য এবং বিসর্জনহীন দুর্গার বিশেষত্ব জানতে বেহালার এই বাড়ি দর্শনীয়। তবে বাড়িতে প্রবেশ ও পুজো দেখার সুযোগের বিষয়ে আগে খোঁজ নেওয়া ভালো।

৪. বিজয়গড় ঠাকুরবাড়ির দুর্গা, দক্ষিণ কলকাতা

Durga idol made of ‘Ashtadhatu’ stands 12 feet tall in Kolkata, to be worshipped whole year - Kolkata News | India Today

 

 

 

দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর সেন্ট্রাল রোডে অবস্থিত বিজয়গড় ঠাকুরবাড়ির দুর্গাও বিসর্জনহীন আরাধনার একটি উদাহরণ। ঠাকুরবাড়িটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৫০ সালের জানুয়ারিতে। প্রথম দিকে সেখানে মাটির প্রতিমায় দুর্গাপুজো হত। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে নির্মিত হয় বর্তমান অষ্টধাতুর স্থায়ী দুর্গাবিগ্রহ।

অষ্টধাতুর মূর্তিতে দেবী দশভুজা এবং সপরিবারে বিরাজমান। অর্থাৎ লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশকে সঙ্গে নিয়ে দেবীর পরিচিত পারিবারিক রূপ এখানে বজায় রয়েছে। তবে মাটির প্রতিমার পরিবর্তে স্থায়ী ধাতব বিগ্রহে পুজো হওয়ার ফলে এই আরাধনার ধরন আলাদা।

মন্দির সকাল ও সন্ধ্যায় খোলা থাকে বলে জানা যায়। দুপুরে মন্দির বন্ধ রাখা হয়। তাই দর্শনের পরিকল্পনা করলে যাওয়ার আগে খোলার সময় নিশ্চিত করে নেওয়া উচিত।

বিজয়গড় ঠাকুরবাড়ির উদাহরণ দেখায়, বিসর্জনহীন দুর্গার ঐতিহ্য শুধু কয়েক শতাব্দী পুরনো মন্দিরে সীমাবদ্ধ নয়। তুলনায় সাম্প্রতিক সময়েও স্থায়ী দুর্গাবিগ্রহ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেবীর নিত্যপুজোর ধারা বজায় রাখা হয়েছে।

৫. অভয়া মন্দির, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট

temple | 23 Palli Temple is where Ma Durga resides permanently - Telegraph India

 

 

 

কলকাতার ৬৩/৩এ, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অবস্থিত অভয়া মন্দিরে সারা বছর পূজিতা হন অভয়া দুর্গা। পুরোহিতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মন্দিরটি ৭০ বছরেরও বেশি পুরনো।

আগে এখানে মাটির প্রতিমা ছিল। পরবর্তী সময়ে বর্তমান স্থায়ী প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মন্দিরে দেবীর নিত্যপুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।

অভয়া মন্দিরের আর একটি বৈশিষ্ট্য হল, দুর্গাপুজো ছাড়াও জগদ্ধাত্রীপুজো ও অন্নপূর্ণাপুজোর সময় বিশেষ আরাধনার আয়োজন হয়। অর্থাৎ দেবীর বিভিন্ন রূপকে কেন্দ্র করে বছরের নানা সময়ে এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হয়।

শরতের পাঁচ দিনের বাইরে দুর্গা-আরাধনার যে বিস্তৃত জগৎ রয়েছে, অভয়া মন্দির তারই একটি পরিচিত উদাহরণ। এখানে দেবীকে দেখতে যাওয়ার অর্থ শুধু একটি বিগ্রহ দর্শন নয়, বরং শহরের স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়াও।

৬. দয়াময়ী দুর্গা মন্দির, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট

Daily worshipped Durga idols of Kolkata – Part 1 – Blog of Kinjal Bose

 

 

 

কলকাতার সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে অবস্থিত দয়াময়ী দুর্গা মন্দিরও স্থায়ী দুর্গা-আরাধনার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মন্দিরের ফলকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ১৮৫০ সালে এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এখানে দেবী দয়াময়ী দুর্গা নামে পরিচিত।

news image

গবেষকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেবীমূর্তিটি কষ্টিপাথরের তৈরি। বাংলার মন্দির-সংস্কৃতিতে পাথরের বিগ্রহের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। মাটির প্রতিমার মতো প্রতি বছর নতুন করে নির্মাণ করার প্রয়োজন হয় না; স্থায়ী মূর্তিকে কেন্দ্র করেই চলতে থাকে নিয়মিত পুজো।

দয়াময়ী দুর্গা মন্দিরে সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত পুজোর ব্যবস্থা রয়েছে। দেবীর এই রূপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার পুরনো বসতি, মন্দির-পরম্পরা এবং দীর্ঘদিনের স্থানীয় উপাসনা।

শহরের ব্যস্ত রাস্তা ও পরিচিত পুজোর আবহের বাইরে এই ধরনের মন্দিরে গিয়ে বোঝা যায়, দুর্গা কেবল উৎসবের দেবী নন। বহু মানুষের কাছে তিনি নিত্যদিনের আরাধ্য, যাঁর সামনে প্রার্থনা জানাতে শরতের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না।

৭. পতিতপাবনী দুর্গা মন্দির, ভূকৈলাস রাজবাড়ি, খিদিরপুর

Visit | Kidderpore’s historic Bhukailash Temple: Hidden in plain sight - Telegraph India

 

 

 

খিদিরপুরের ভূকৈলাস রাজবাড়ি কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মন্দির-সমষ্টির জন্য পরিচিত। সেই মন্দির-সমষ্টির মধ্যেই রয়েছে পতিতপাবনী দুর্গা মন্দির। এখানে দেবীর অষ্টধাতুর বিগ্রহ পূজিতা হন।

এই দুর্গামূর্তির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, দেবীর সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ নেই। ফলে বাঙালির প্রচলিত সপরিবার দুর্গার ছবির সঙ্গে এই মূর্তির গঠনে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়।

দেবীর সিংহের মুখাবয়বেও রয়েছে বিশেষত্ব। সাধারণত দুর্গার বাহন সিংহকে যে পরিচিত রূপে দেখা যায়, এখানে তার মুখাবয়বে ঘোড়ার আদল লক্ষণীয়। এই বৈশিষ্ট্য বিগ্রহটিকে আরও স্বতন্ত্র করে তুলেছে।

জয়নারায়ণ ঘোষাল এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন বলে জানা যায়। ভূকৈলাস রাজবাড়ির ঐতিহাসিক পরিবেশের মধ্যে পতিতপাবনী দুর্গা মন্দির দেখতে গেলে বাংলার দেবীমূর্তির বৈচিত্র্য সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

এখানে দেবীর রূপ পরিচিত দশভুজা দুর্গার ধারণাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। বিসর্জনহীন দুর্গার ক্ষেত্রে একটিমাত্র নির্দিষ্ট প্রতিমারীতি নেই—এই মন্দির তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

৮. হালদারবাড়ির মহিষাসুরমর্দিনী, বাগবাজার

Kolkata Heritage Puja | Top 10 Oldest Heritage Durga Puja Celebrations in Kolkata dgtl - Anandabazar

 

 

 

উত্তর কলকাতার বাগবাজারে ১৭/১, কালীপ্রসাদ চক্রবর্তী স্ট্রিটে, গৌড়ীয় মঠের বিপরীতে পূজিতা হন হালদারবাড়ির মহিষাসুরমর্দিনী। এই দেবীমূর্তি কষ্টিপাথরের তৈরি এবং তাঁর নিত্যপুজো হয়।

দেবী এখানে পদ্মের উপরে দণ্ডায়মান। প্রচলিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপের সঙ্গে এই অবস্থান মূর্তিটিকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। পাথরের বিগ্রহ হওয়ায় এটি স্থায়ীভাবে পূজিত হয়।

এই মূর্তিকে ঘিরে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, বাড়ির পূর্বপুরুষদের একজন ওড়িশার সাহেবপুরে এক জেলের ঘর থেকে দেবীমূর্তিটি পেয়েছিলেন। তবে এই কাহিনি জনশ্রুতি হিসেবেই বিবেচ্য।

হালদারবাড়ির দুর্গার ক্ষেত্রে আরও একটি উল্লেখযোগ্য রীতি রয়েছে। মহালয়া থেকে দশমী পর্যন্ত দেবীমূর্তিকে দক্ষিণমুখী করে রাখা হয়। বিজয়াদশমীর সন্ধ্যায় তাঁকে আবার পশ্চিমমুখী করা হয়। বছরের বাকি সময় দেবী পশ্চিমমুখী অবস্থাতেই থাকেন।

অর্থাৎ এখানে শরতের দুর্গোৎসব স্থায়ী দেবীমূর্তির সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ বার্ষিক রীতি। দেবীকে বিসর্জন দেওয়া হয় না; বরং নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উৎসবের বিশেষ পর্ব চিহ্নিত করা হয়।

৯. বিজয়গড়-শ্রীকলোনির বনদুর্গা

Bonedi baris hope for a peaceful start to Pujo | Events Movie News - The Times of India

 

 

 

কলকাতার বিজয়গড় ও শ্রীকলোনি অঞ্চলে বনদুর্গা আরাধনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগের ইতিহাস। বারো ভূত দ্বাদশ অবতার মন্দিরে পূজিতা হন এই দেবী। তাঁর আদি শিকড় বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকার কাছে রোহিতপুর বা রহিতপুর গ্রামে বলে জানা যায়।

দেশভাগের পর সেই গ্রামের বহু মানুষ যাদবপুর, বাঘাযতীন, বিজয়গড় ও শ্রীকলোনি অঞ্চলে বসতি গড়েন। তাঁদের সঙ্গে কলকাতায় আসে বনদুর্গা এবং বারো ভূতের পুজোর ঐতিহ্যও।

এই ইতিহাস দেখায়, দেবী-আরাধনা শুধু একটি নির্দিষ্ট মন্দির বা এলাকার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না। মানুষের স্থানান্তর, স্মৃতি, পারিবারিক বিশ্বাস এবং সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুজোর ধারাও নতুন জায়গায় পৌঁছে যায়।

বনদুর্গার আরাধনায় একটি বিশেষ ভোগের উল্লেখ পাওয়া যায়—হাঁসের কাঁচা ডিম। এই রীতি দেবীর স্থানীয় উপাসনাপদ্ধতির স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে।

বনদুর্গা নামের মধ্যেই রয়েছে অরণ্য ও প্রকৃতির সঙ্গে দেবীর সম্পর্কের ইঙ্গিত। কলকাতার এই মন্দিরে তাঁর আরাধনা সেই পুরনো লোকবিশ্বাসকে শহরের মধ্যে ধরে রেখেছে। তাই বিসর্জনহীন দুর্গা দর্শনের তালিকায় বনদুর্গার মন্দির একটি বিশেষ স্থান পায়।

১০. কনকদুর্গা মন্দির, চিল্কিগড়, ঝাড়গ্রাম

Top Places To Visit In Jhargram: Nature, Culture & Heritage - TripXL

 

 

 

কলকাতার বাইরে বিসর্জনহীন দুর্গার অন্যতম আকর্ষণীয় নিদর্শন ঝাড়গ্রামের জামবনির চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দির। অরণ্যঘেরা পরিবেশে অবস্থিত এই মন্দিরের কাছ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ডুলুং নদী। মন্দিরের স্থাপত্যেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। একরত্ন মন্দিরের শিখর ওড়িশার একদেউল স্থাপত্যরীতির কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্দিরে রয়েছে নাটমণ্ডপও।

এখানে দেবী কনকদুর্গা চতুর্ভুজা ও অশ্বারূঢ়া। বাংলার দুর্গাপুজোয় যে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপ সবচেয়ে বেশি পরিচিত, তার থেকে এই দেবীর রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। চারটি হাত এবং ঘোড়ার উপরে অবস্থান তাঁকে স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে।

প্রচলিত ইতিহাস অনুসারে, জামবনি পরগনার সামন্তরাজ গোপীনাথ সিংহ দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। এরপর রানির অলংকার ব্যবহার করে সোনার দেবীমূর্তি নির্মাণ করানো হয়েছিল বলে কাহিনি প্রচলিত। পরবর্তী সময়ে সেই মূর্তি চুরি যায়। বর্তমানে এখানে অষ্টধাতুর বিগ্রহ পূজিতা হন।

কনকদুর্গা মন্দিরে সারা বছর নিত্যপুজো হয়। পাশাপাশি দুর্গাপুজোর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীতে বিশেষ আরাধনার আয়োজন করা হয়।

এই মন্দিরের বিশেষত্ব কেবল দেবীর রূপেই নয়, তার প্রাকৃতিক পরিবেশেও। অরণ্য, নদী ও প্রাচীন মন্দিরের উপস্থিতি মিলিয়ে চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা দর্শন একদিকে ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও স্থাপত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।

১১. বৈকুণ্ঠপুরের বনদুর্গা, শিলিগুড়ি সংলগ্ন অরণ্য

Chants in the Dead of Night, Light and Shadow in the Forest: Vaikunthapur’s Traditional Forest Durga Puja Marks 45 Years | লেটেস্ট উত্তরবঙ্গের খবর - News18 বাংলা

 

 

 

উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি সংলগ্ন বৈকুণ্ঠপুরের অরণ্যে পূজিতা হন বনদুর্গা। এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, দেবীর আরাধনার সঙ্গে অরণ্যের নিবিড় সম্পর্ক। দিল্লিভিটা-চাঁদের খাল অঞ্চলে অবস্থিত মন্দিরে পৌঁছোতে বৈকুণ্ঠপুর অরণ্যের প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভিতরে যেতে হয়।

এখানে সারা বছর নির্দিষ্ট তিথিতে পুজো হয়। পূর্ণিমায় এবং বিশেষ করে পৌষপূর্ণিমায় দেবীর আরাধনা করা হয়। দুর্গাপুজোর সময়ও মহাড়ম্বরে পুজোর আয়োজন হয়।

স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মধ্যে দেবী প্রথমে ‘ঠুনঠুনি মা’ নামে পূজিতা হতেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বনদুর্গা নামে পরিচিতি পান। এই নামের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে স্থানীয় সমাজ ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে দেবীর সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বোঝা যায়।

বৈকুণ্ঠপুর অরণ্যকে ঘিরে ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানীর কাহিনিও প্রচলিত। কথিত আছে, এই বনাঞ্চল তাঁদের আশ্রয়স্থল ছিল এবং দেবী চৌধুরানী বনদুর্গার আরাধনা করতেন। এই কাহিনি স্থানীয় লোকস্মৃতির অংশ।

প্রকৃতির মধ্যে অবস্থিত এই মন্দিরে দেবীকে দেখতে গেলে বোঝা যায়, বাংলার ধর্মীয় ঐতিহ্য কেবল শহরের মন্দির বা জমিদারবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অরণ্য, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং লোকাচারের মধ্যেও দুর্গা-আরাধনার স্বতন্ত্র ধারা আজও প্রবাহিত।

তবে অরণ্যের ভিতরে যাতায়াতের জন্য আগে থেকে পথ, মন্দিরের সময় এবং স্থানীয় অনুমতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া ভালো।

বিসর্জনহীন দুর্গা কেন বাংলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ?

দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে আবেগ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মিলনের অন্যতম উৎসব। কিন্তু বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দুর্গার আরাধনা শুধু বার্ষিক উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থায়ী মন্দির, পাথরের বিগ্রহ, ধাতব মূর্তি এবং পারিবারিক দেবালয়ের মাধ্যমে দেবীর নিত্যপুজোর ঐতিহ্য বহু জায়গায় বজায় রয়েছে।

এই মন্দিরগুলির মধ্যে কোথাও সপরিবার দশভুজা দুর্গা, কোথাও একক দেবীমূর্তি, কোথাও চতুর্ভুজা অশ্বারূঢ়া কনকদুর্গা, আবার কোথাও অরণ্যের সঙ্গে যুক্ত বনদুর্গা পূজিতা হন। দেবীর বাহন, মূর্তির উপাদান, হাতের সংখ্যা, অবস্থান এবং ভোগের রীতিতেও দেখা যায় বৈচিত্র্য।

বিসর্জনহীন দুর্গার ধারণা তাই শুধু একটি স্থায়ী মূর্তির উপস্থিতি বোঝায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্থানীয় ইতিহাস, লোককথা, পারিবারিক স্মৃতি, দেশভাগের অভিজ্ঞতা, মন্দির স্থাপত্য এবং মানুষের দৈনন্দিন ধর্মাচরণ।

শরতের দুর্গোৎসবে মৃন্ময়ী প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে একটি উৎসবপর্ব শেষ হয়। কিন্তু স্থায়ী দুর্গাবিগ্রহের ক্ষেত্রে সেই সমাপ্তির ধারণা নেই। দেবী থেকে যান মন্দিরে, বাড়িতে কিংবা অরণ্যের মাঝে। ভক্তেরা বছরের বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে আসেন, প্রার্থনা করেন এবং নিত্যপুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।

বিসর্জনহীন দুর্গা দর্শনে যাওয়ার আগে কী জানবেন?

কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা এই মন্দিরগুলি দেখতে গেলে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি।

  • মন্দিরের সময়: সব মন্দিরের খোলার সময় এক নয়। কিছু মন্দির সকাল ও সন্ধ্যায় খোলা থাকে, আবার দুপুরে বন্ধ থাকতে পারে।

  • পুজোর নিয়ম: নিত্যপুজো চলাকালীন দর্শনার্থীদের মন্দিরের নিজস্ব নিয়ম মেনে চলা উচিত।

  • ছবি তোলা: সব মন্দিরে ছবি তোলার অনুমতি থাকে না। আগে অনুমতি নেওয়া ভালো।

  • দূরবর্তী মন্দির: চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দির কিংবা বৈকুণ্ঠপুরের বনদুর্গা দর্শনে যাওয়ার আগে যাতায়াতের ব্যবস্থা ও স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে জেনে নিন।

  • বিশেষ পুজো: দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে অনেক মন্দিরে বিশেষ আয়োজন হয়। ভিড় এড়াতে সম্ভব হলে সময় সম্পর্কে আগে খোঁজ নিন।

মন্দিরের ইতিহাস ও জনশ্রুতির ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, সব তথ্য সমানভাবে নথিভুক্ত নয়। কোনও কোনও কাহিনি স্থানীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত কিংবদন্তির উপর নির্ভরশীল। তাই ঐতিহাসিক তথ্য এবং জনশ্রুতির মধ্যে পার্থক্য রেখে এই ঐতিহ্যকে জানা উচিত।

শেষ কথা

বাংলার দুর্গাপুজো মানেই শুধু শরতের পাঁচ দিনের আনন্দ নয়। কলকাতার ঢাকেশ্বরী মাতা মন্দির, চিত্তেশ্বরী দুর্গামন্দির, বেহালার জগৎরাম মুখোপাধ্যায় বাড়ি, ভূকৈলাস রাজবাড়ির পতিতপাবনী দুর্গা কিংবা ঝাড়গ্রামের চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা—প্রতিটি স্থানেই দেবী-আরাধনার আলাদা ইতিহাস রয়েছে।

কোথাও তিনি পাথরের মহিষাসুরমর্দিনী, কোথাও অষ্টধাতুর সপরিবার দুর্গা, কোথাও অশ্বারূঢ়া চতুর্ভুজা, আবার কোথাও অরণ্যের অধিষ্ঠাত্রী বনদুর্গা। রূপ আলাদা, কাহিনি আলাদা, পুজোর রীতিও আলাদা। কিন্তু সব কিছুর মধ্যেই রয়েছে দেবীর চিরস্থায়ী উপস্থিতির ভাবনা।

তাই পুজোর ছুটিতে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরার পাশাপাশি সময় করে দেখে আসতে পারেন বাংলার এই বিসর্জনহীন দুর্গামন্দিরগুলি। শরতের উৎসবের বাইরে দেবীকে চেনার এই যাত্রা আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য, আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং দুর্গা-আরাধনার বহু অজানা অধ্যায়ের সঙ্গে।

Preview image