বাইরে যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, তখন ঘরে বসে কেবল চা আর মুড়ি খাওয়ার প্রয়োজন নেই। ঘরোয়া এবং সহজলভ্য কিছু উপকরণ দিয়েই বানিয়ে নিতে পারেন কাঁচকলা ও শ্যামা চালের টিক্কি। রইল বানানোর পদ্ধতি
বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। জানলার কাচে টুপটাপ জলের শব্দ। এমন দিনে গরম এক কাপ চায়ের সঙ্গে মুখরোচক কিছু খেতে ইচ্ছে করাটাই স্বাভাবিক। বাঙালির ঘরে এমন আবহাওয়ায় চপ, মুড়ি, পকোড়া কিংবা নানা ধরনের ভাজাভুজির আয়োজন নতুন কিছু নয়। তবে প্রতিদিন একই ধরনের জলখাবার খেতে খেতে যদি একঘেয়েমি এসে যায়, তা হলে একটু অন্যরকম কিছু বানিয়ে দেখতে পারেন। ঘরেই থাকা কয়েকটি সহজ উপকরণ দিয়ে তৈরি করা যায় কাঁচকলা ও শ্যামা চালের টিক্কি।
কাঁচকলা সাধারণত তরকারি, কোপ্তা কিংবা নানা ধরনের ঘরোয়া রান্নায় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই সবুজ সবজিটি দিয়েই যে মজাদার টিক্কি তৈরি করা যায়, তা অনেকেরই জানা নেই। তার সঙ্গে থাকছে শ্যামা চালের আবরণ। ফলে সাধারণ আলুর চপ বা টিক্কির থেকে এই পদটির স্বাদ এবং গঠন দু’টোই বেশ আলাদা হতে পারে।
এই রেসিপিতে কাঁচকলার সঙ্গে সেদ্ধ আলু এবং ভাজা চিনেবাদাম মেশানো হয়েছে। আমচুর ও কাঁচালঙ্কা যোগ করায় টিক্কিতে আসবে হালকা টক ও ঝাল স্বাদ। অন্য দিকে, শ্যামা চাল টিক্কির বাইরের অংশে সুন্দর একটি আবরণ তৈরি করতে সাহায্য করবে। মাঝারি আঁচে ভেজে নিলে বাইরে হালকা মুচমুচে এবং ভিতরে নরম টিক্কি পাওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে ভাল বিষয় হল, এই রেসিপির জন্য খুব বেশি জটিল উপকরণের প্রয়োজন নেই। বাড়িতে থাকা কয়েকটি পরিচিত উপকরণ দিয়েই তৈরি করা যায়। তাই হঠাৎ বিকেলের চায়ের সঙ্গে নতুন কিছু খেতে ইচ্ছে করলে এই রেসিপিটি চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
কী কী লাগবে?
এই টিক্কি তৈরি করতে প্রথমেই লাগবে প্রায় ৪০০ গ্রাম কাঁচকলা। কাঁচকলাগুলি খুব বেশি পেকে যাওয়া নয়, বরং রান্নার উপযোগী কাঁচকলা হলে টিক্কির জন্য ভাল হবে। এর সঙ্গে লাগবে ৪০ গ্রাম শ্যামা চাল। টিক্কির বাইরের আবরণ তৈরির জন্য এই চাল ব্যবহার করা হবে।
এ ছাড়াও প্রয়োজন হবে ১০০ গ্রাম আলু। আলু টিক্কির মিশ্রণকে বাঁধতে সাহায্য করবে এবং ভেতরের অংশটিকে নরম রাখতে পারে। স্বাদ বাড়ানোর জন্য থাকছে ২০ গ্রাম চিনেবাদাম এবং ২টি কাঁচালঙ্কা। টক স্বাদের জন্য ৪ গ্রাম আমচুর ব্যবহার করা হয়েছে।
ভাজার জন্য প্রয়োজন মতো তেল নিতে হবে। আর টিক্কির সঙ্গে পরিবেশনের জন্য তৈরি করা হবে একটি সহজ দইয়ের সস। সেই সসের জন্য প্রয়োজন হবে ১২০ গ্রাম দই, ২০ গ্রাম চিনি, ১০ গ্রাম গুঁড়ো করা চিনেবাদাম এবং ১৫ গ্রাম কুচোনো শসা।
প্রথম ধাপ: কাঁচকলা সেদ্ধ
রেসিপির শুরুতেই কাঁচকলাগুলি ভাল করে ধুয়ে খোসাসহ সেদ্ধ করে নিতে হবে। প্রায় ১০-১৫ মিনিট সেদ্ধ করলে সাধারণত কাঁচকলা নরম হয়ে আসে। তবে কাঁচকলার আকার ও ধরন অনুযায়ী সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে। খুব বেশি সেদ্ধ করে একেবারে জলে গলে যাওয়ার মতো করে ফেলবেন না। কাঁচকলা এমনভাবে সেদ্ধ করতে হবে যাতে সহজে গ্রেট করা যায়।
সেদ্ধ হয়ে গেলে কাঁচকলাগুলি কিছুটা ঠান্ডা হতে দিন। গরম অবস্থায় খোসা ছাড়াতে গেলে হাতে সমস্যা হতে পারে। ঠান্ডা হয়ে গেলে খোসা ছাড়িয়ে কাঁচকলাগুলি গ্রেট করে নিন। গ্রেট করে রাখলে পরবর্তী সময়ে অন্যান্য উপকরণের সঙ্গে মেশানো সহজ হবে।
চিনেবাদাম ভেজে নিন
এ বার একটি শুকনো কড়াই গরম করে তাতে চিনেবাদাম দিয়ে হালকা ভেজে নিন। চিনেবাদাম ভাজার সময় আলাদা করে তেল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আঁচ খুব বেশি রাখবেন না। মাঝারি বা কম আঁচে নাড়াচাড়া করে ভাজলে চিনেবাদাম পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
চিনেবাদাম হালকা ভাজা হয়ে গেলে নামিয়ে কিছুটা ঠান্ডা করুন। তার পর খোসা ছাড়িয়ে নিন। এবার মিক্সার গ্রাইন্ডারে চিনেবাদাম একেবারে মিহি গুঁড়ো না করে ১-২ বার ঘুরিয়ে নিন। সামান্য দানা দানা অবস্থায় থাকলে টিক্কির মধ্যে চিনেবাদামের আলাদা একটা টেক্সচার পাওয়া যাবে। এতে কামড় দিলে বাদামের স্বাদও ভাল ভাবে বোঝা যাবে।
আলু তৈরি করে রাখুন
অন্য দিকে আলু আগে থেকেই সেদ্ধ করে নিতে পারেন। আলু সেদ্ধ হয়ে গেলে খোসা ছাড়িয়ে খুব ভাল করে গ্রেট করে রাখুন। আলুর বড় বড় টুকরো যেন না থাকে। মিহি করে গ্রেট করলে কাঁচকলার সঙ্গে মিশিয়ে টিক্কির মিশ্রণ তৈরি করা সহজ হবে।
এখানে আলুর পরিমাণ খুব বেশি না রাখাই ভাল। কারণ এই রেসিপিতে কাঁচকলাই প্রধান উপকরণ। আলু মূলত মিশ্রণটিকে বাঁধতে সাহায্য করবে।
তৈরি করুন টিক্কির মিশ্রণ
এ বার মিক্সারে গ্রেট করা কাঁচকলা, সেদ্ধ আলু, কাঁচালঙ্কা, ভাজা চিনেবাদাম, প্রয়োজন মতো নুন এবং আমচুর দিয়ে মিশিয়ে নিন। খুব বেশি সময় ধরে মিহি পেস্ট করার প্রয়োজন নেই। উপকরণগুলি ভাল ভাবে মিশে গেলেই যথেষ্ট।
আমচুরের পরিমাণ নিজের স্বাদ অনুযায়ী সামান্য কম-বেশি করা যেতে পারে। কাঁচালঙ্কাও ঝাল খাওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবহার করুন। তবে খুব বেশি ঝাল দিলে কাঁচকলা ও চিনেবাদামের স্বাদ চাপা পড়ে যেতে পারে।
মিশ্রণটি তৈরি হয়ে গেলে হাতে নিয়ে দেখুন সেটি টিক্কির আকার দেওয়ার মতো হয়েছে কি না। খুব বেশি নরম হলে সামান্য ভাজা চিনেবাদামের গুঁড়ো দিয়ে মিশ্রণটি কিছুটা শক্ত করা যেতে পারে।
টিক্কির আকার দিন
এ বার মিশ্রণ থেকে অল্প অল্প করে অংশ তুলে নিন। দুই হাতের তালুর মধ্যে রেখে আলতো করে চেপে গোল বা চ্যাপ্টা টিক্কির আকার দিন। খুব মোটা করে টিক্কি বানাবেন না। মাঝারি আকারের চ্যাপ্টা টিক্কি হলে তা ভাজার সময় ভিতর পর্যন্ত ভাল ভাবে গরম হবে এবং বাইরের অংশও সুন্দর করে ভাজা যাবে।
সব টিক্কি একসঙ্গে তৈরি করে একটি প্লেটে সাজিয়ে রাখতে পারেন। এতে ভাজার সময় তাড়াহুড়ো করতে হবে না।
শ্যামা চালের আবরণ
এ বার আসবে রেসিপির বিশেষ অংশ। শ্যামা চাল আগে থেকে তৈরি করে রাখতে হবে। টিক্কিগুলিকে শ্যামা চালের মিশ্রণে এক বার ডুবিয়ে নিন। এর ফলে টিক্কির বাইরের দিকে শ্যামা চালের একটি স্তর তৈরি হবে।
শ্যামা চালের আবরণ খুব মোটা না করাই ভাল। পাতলা ও সমান আবরণ হলে ভাজার পর বাইরের অংশ সুন্দরভাবে ক্রিসপি হতে পারে। টিক্কির চারদিকে শ্যামা চাল যেন সমানভাবে লেগে থাকে, সে দিকে খেয়াল রাখুন।
এবার ভেজে নিন
কড়াইয়ে প্রয়োজন মতো তেল দিয়ে মাঝারি আঁচে গরম করুন। তেল খুব বেশি গরম করে ফেলবেন না। তেল যথেষ্ট গরম হলে একে একে টিক্কিগুলি কড়াইয়ে দিয়ে দিন।
একসঙ্গে খুব বেশি টিক্কি কড়াইয়ে দেবেন না। এতে তেলের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যেতে পারে এবং টিক্কিগুলি ঠিকমতো ভাজা নাও হতে পারে। মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে ভাজুন।
এক দিক সোনালি ও মুচমুচে হয়ে এলে সাবধানে উল্টে অন্য দিকটিও ভেজে নিন। টিক্কির বাইরের অংশ সুন্দর করে ভাজা এবং ক্রিসপি হয়ে এলে তেল থেকে তুলে নিন। অতিরিক্ত তেল ঝরিয়ে একটি প্লেটে রাখুন।
শুধু টিক্কি নয়, সঙ্গে থাকুক দইয়ের সস
টিক্কি তৈরি হয়ে গেলেও রেসিপির মজা এখানেই শেষ নয়। ভাজা টিক্কির সঙ্গে পরিবেশনের জন্য খুব সহজেই তৈরি করে নিতে পারেন একটি দইয়ের সস। এর জন্য আলাদা করে রান্না করার প্রয়োজন নেই।
একটি বাটিতে ১২০ গ্রাম দই নিন। তার সঙ্গে ২০ গ্রাম চিনি মেশান। এরপর ১০ গ্রাম গুঁড়ো করা চিনেবাদাম এবং ১৫ গ্রাম কুচোনো শসা দিয়ে সব উপকরণ ভাল করে মিশিয়ে নিন।
দইয়ের হালকা টকভাব, চিনির মিষ্টি স্বাদ, চিনেবাদামের বাদামি গন্ধ এবং শসার সতেজতা—সব মিলিয়ে এই সসটি ভাজা টিক্কির সঙ্গে বেশ মানানসই হতে পারে। চাইলে নিজের স্বাদ অনুযায়ী সামান্য নুন বা অন্য মশলাও ব্যবহার করতে পারেন।
পরিবেশনের সময় কী করবেন?
টিক্কি ভাজার পর গরম গরম পরিবেশন করলেই স্বাদ সবচেয়ে ভাল পাওয়া যেতে পারে। একটি প্লেটে কয়েকটি টিক্কি সাজিয়ে পাশে দইয়ের সস দিন। চাইলে উপর থেকে সামান্য কুচোনো শসা বা ভাজা চিনেবাদাম ছড়িয়ে পরিবেশন করতে পারেন।
আর বাইরে যদি তখনও বৃষ্টি নামে, তা হলে এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে এই টিক্কির জুড়ি বেশ জমতে পারে। বিকেলের আড্ডায় পরিবারের সদস্যদের জন্যও এটি পরিবেশন করা যায়। অতিথি এলে সাধারণ চপ বা পকোড়ার বদলে এই টিক্কি দিয়েও জলখাবারের আয়োজন করতে পারেন।
টিক্কি তৈরির সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখুন
কাঁচকলা সেদ্ধ করার সময় খুব বেশি জল ব্যবহার না করাই ভাল। সেদ্ধ করার পর যদি কাঁচকলায় অতিরিক্ত জল থেকে যায়, তা হলে টিক্কির মিশ্রণ নরম হয়ে যেতে পারে।
চিনেবাদাম ভাজার সময় আঁচের দিকে খেয়াল রাখুন। বাদাম পুড়ে গেলে পুরো মিশ্রণে তেতো স্বাদ চলে আসতে পারে। তাই হালকা আঁচে নাড়াচাড়া করে ভাজাই ভাল।
টিক্কির মিশ্রণ তৈরি করার সময় একেবারে মিহি পেস্ট না করলেও চলবে। সামান্য দানা দানা থাকলে খাওয়ার সময় আলাদা টেক্সচার পাওয়া যায়।
টিক্কি খুব বড় বা খুব মোটা করে বানালে ভাজার সময় বাইরের অংশ দ্রুত বাদামি হয়ে গেলেও ভিতরটা ঠিকমতো গরম নাও হতে পারে। তাই মাঝারি আকারের চ্যাপ্টা টিক্কি তৈরি করা সুবিধাজনক।
তেল গরম করার সময়ও সতর্ক থাকতে হবে। খুব বেশি আঁচে তেল গরম করে টিক্কি দিয়ে দিলে বাইরের অংশ দ্রুত ভাজা হয়ে যেতে পারে, কিন্তু ভিতরের অংশের সঙ্গে ভারসাম্য থাকবে না। তাই মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে ভাজাই ভাল।
বৃষ্টির দিনে কেন এই রেসিপি চেষ্টা করতে পারেন?
বর্ষার দিনে গরম গরম কিছু খাওয়ার ইচ্ছা প্রায় সকলেরই হয়। কিন্তু প্রতিবার একই ধরনের চপ, পকোড়া বা সিঙাড়া খাওয়ার বদলে রান্নাঘরে থাকা পরিচিত উপকরণ দিয়েই একটু অন্যরকম কিছু তৈরি করা যায়। কাঁচকলা, আলু, চিনেবাদাম এবং শ্যামা চাল—এই উপকরণগুলির সমন্বয়ে তৈরি টিক্কি সেই তালিকায় রাখতে পারেন।
এই রেসিপিটির আর একটি সুবিধা হল, স্বাদ অনুযায়ী কিছু উপকরণ কম-বেশি করার সুযোগ রয়েছে। ঝাল বেশি পছন্দ করলে কাঁচালঙ্কার পরিমাণ বাড়ানো যায়। আমচুরের পরিমাণ সামান্য বাড়িয়ে টক স্বাদও বাড়ানো যায়। আবার দইয়ের সসে চিনির পরিমাণ নিজের পছন্দ অনুযায়ী সামঞ্জস্য করা সম্ভব।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি ঘরোয়া রেসিপি; কোনও খাবারকে শুধুমাত্র উপকরণের ভিত্তিতে চিকিৎসাগতভাবে ‘স্বাস্থ্যকর’ বা রোগ প্রতিরোধকারী বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। ভাজা খাবার হওয়ায় পরিমাণ বুঝে খাওয়াই ভাল।
সব মিলিয়ে, বাইরে যখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি, তখন শুধু চা আর মুড়িতে আটকে না থেকে রান্নাঘরের সাধারণ কিছু উপকরণ দিয়েই তৈরি করে ফেলতে পারেন কাঁচকলা ও শ্যামা চালের টিক্কি। বাইরে মুচমুচে, ভিতরে নরম টিক্কির সঙ্গে ঠান্ডা দইয়ের সস এবং এক কাপ গরম চা—বৃষ্টির বিকেলের জলখাবারে এই আয়োজন হতে পারে একেবারেই অন্যরকম।