Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

পুজোয় পোলাওয়ের সঙ্গে জমবে চিংড়ির রেজালা! বাড়িতেই বানান রেস্তোরাঁর স্বাদের ঝাল-মিষ্টি পদ

পুজোর ভোজে পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন ঝাল-মিষ্টি চিংড়ির রেজালা। সহজ প্রণালীতে বাড়িতেই বানিয়ে ফেলুন রেস্তোরাঁর স্বাদের এই সুস্বাদু পদ।

পুজোয় পোলাওয়ের সঙ্গে জমবে চিংড়ির রেজালা! বাড়িতেই বানান রেস্তোরাঁর স্বাদের ঝাল-মিষ্টি পদ

দুর্গাপুজো মানেই নতুন পোশাক, ঠাকুর দেখা, আড্ডা আর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া। পুজোর কয়েকটা দিন বাঙালির রান্নাঘরেও চলে বিশেষ আয়োজন। ষষ্ঠী থেকে দশমী, বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা হোক কিংবা বন্ধুদের নিয়ে জমিয়ে খাওয়ার পরিকল্পনা, পাতে একটু অন্য রকম পদ থাকলে উৎসবের আনন্দ যেন আরও বেড়ে যায়। আর বাঙালির ভোজে সুগন্ধি পোলাওয়ের সঙ্গে যদি পরিবেশন করা যায় চিংড়ির রেজালা, তা হলে জমে যেতে বাধ্য পুজোর দুপুর কিংবা রাতের খাওয়াদাওয়া।

চিংড়ি মাছ বাঙালির অত্যন্ত প্রিয়। মালাইকারি, সর্ষে চিংড়ি কিংবা চিংড়ির পাতুরি—বাঙালি রান্নায় এই মাছের নানা রকম পদ রয়েছে। তবে চেনা স্বাদের বাইরে একটু নতুন কিছু খেতে চাইলে বানিয়ে দেখতে পারেন ঝাল-মিষ্টি স্বাদের চিংড়ির রেজালা। মশলার সুগন্ধ, পেঁয়াজের মিষ্টত্ব, দইয়ের হালকা টক ভাব এবং কাজুবাদামের মসৃণ গ্রেভি—সব মিলিয়ে এই পদ হয়ে উঠতে পারে পুজোর ভোজের অন্যতম আকর্ষণ।

রেস্তোরাঁয় গিয়ে এমন পদ খেতে ভাল লাগে ঠিকই, কিন্তু বাড়িতেও সামান্য যত্ন নিয়ে তৈরি করা যায় সুস্বাদু চিংড়ির রেজালা। খুব জটিল উপকরণের প্রয়োজন নেই। রান্নার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ মাথায় রাখলেই চিংড়ির স্বাদ ও গ্রেভির ঘনত্ব সুন্দর ভাবে বজায় রাখা সম্ভব। রইল বাড়িতে চিংড়ির রেজালা তৈরির সহজ প্রণালী।

চিংড়ির রেজালা বানাতে কী কী উপকরণ লাগবে?

রান্না শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় উপকরণগুলি হাতের কাছে সাজিয়ে নিন। তাতে রান্নার সময় তাড়াহুড়ো করতে হবে না।

উপকরণ:

  • বড় চিংড়ি মাছ: ৫০০ গ্রাম

  • টক দই: আধ কাপ

  • পেঁয়াজ: ২টি মাঝারি আকারের

  • আদা বাটা: ১ চা চামচ

  • রসুন বাটা: ১ চা চামচ

  • কাজুবাদাম: ১০-১২টি

  • পোস্ত: ১ টেবিল চামচ

  • কাঁচালঙ্কা: ৩-৪টি, স্বাদ অনুযায়ী

  • গোটা গরম মশলা: ছোট এলাচ, দারচিনি ও লবঙ্গ

  • তেজপাতা: ১-২টি

  • সাদা তেল বা ঘি: প্রয়োজনমতো

  • চিনি: আধ চা চামচ বা স্বাদ অনুযায়ী

  • নুন: স্বাদমতো

  • গোলমরিচ গুঁড়ো: সামান্য

  • গরম জল: প্রয়োজনমতো

  • কেওড়া জল: কয়েক ফোঁটা, ইচ্ছেমতো

চাইলে গ্রেভির স্বাদ আরও মসৃণ করতে সামান্য দুধও ব্যবহার করতে পারেন। তবে দই ও কাজুবাদামের সঠিক মিশ্রণেই সুন্দর ঘনত্ব পাওয়া সম্ভব।

প্রথম ধাপ: চিংড়ি মাছ পরিষ্কার করে মাখিয়ে নিন

চিংড়ির রেজালার স্বাদ অনেকটাই নির্ভর করে মাছ কতটা ভাল ভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে তার উপর। প্রথমে চিংড়ির খোসা ছাড়িয়ে নিন। চাইলে মাথা রেখে দিতে পারেন, আবার পছন্দ অনুযায়ী মাথা বাদও দিতে পারেন। মাছের পিঠের কালো শিরা পরিষ্কার করে জল দিয়ে ধুয়ে নিন। তার পরে একটি পাত্রে মাছ রেখে নুন ও সামান্য হলুদ মাখিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে দিন।

এ বার একটি পাত্রে টক দই, সামান্য আদা বাটা, অল্প রসুন বাটা এবং সামান্য গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণে চিংড়ি হালকা করে মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিতে পারেন। এতে মাছের মধ্যে মশলার স্বাদ ঢুকবে এবং রান্নার সময় গ্রেভির সঙ্গে ভাল ভাবে মিশে যাবে।

তবে চিংড়ি দীর্ঘক্ষণ মশলা মাখিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। মাছ খুব বেশি সময় দইয়ের মধ্যে থাকলে তার গঠন বদলে যেতে পারে। তাই অল্প সময় মাখিয়ে রাখাই যথেষ্ট।

দ্বিতীয় ধাপ: কাজুবাদাম ও পোস্তের মসৃণ পেস্ট তৈরি করুন

রেজালার গ্রেভি ঘন, মোলায়েম ও সুগন্ধি করতে কাজুবাদাম এবং পোস্ত ব্যবহার করা যায়। প্রথমে কাজুবাদাম ও পোস্ত সামান্য গরম জলে ভিজিয়ে রাখুন। কয়েক মিনিট পরে এগুলি মিক্সিতে দিয়ে অল্প জল মিশিয়ে মিহি পেস্ট তৈরি করে নিন।

news image
আরও খবর

খেয়াল রাখবেন, পেস্ট যেন খুব বেশি পাতলা না হয়। ঘন পেস্ট ব্যবহার করলে গ্রেভি সহজেই মসৃণ হবে। কাজুবাদাম গ্রেভিতে হালকা মিষ্টি স্বাদ যোগ করবে এবং পোস্ত দেবে সুন্দর ঘনত্ব।

যাঁরা পোস্ত খেতে পছন্দ করেন না, তাঁরা শুধু কাজুবাদাম দিয়েও পেস্ট তৈরি করতে পারেন। আবার আরও হালকা গ্রেভি চাইলে কাজুবাদামের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে দেওয়া যায়।

তৃতীয় ধাপ: চিংড়ি হালকা ভেজে নিন

এ বার কড়াইয়ে সামান্য তেল গরম করুন। তেল গরম হয়ে গেলে চিংড়িগুলি অল্প আঁচে হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। চিংড়ি খুব বেশি সময় ধরে ভাজবেন না। বেশি ভাজলে মাছ শক্ত হয়ে যেতে পারে এবং রান্নার পরে তার স্বাভাবিক কোমলতা নষ্ট হতে পারে।

চিংড়ি ভাজার সময় রং সামান্য বদলালেই তুলে নেওয়া যায়। পরে গ্রেভির মধ্যে আবার রান্না হবে বলে এই পর্যায়ে মাছ পুরোপুরি কষানোর প্রয়োজন নেই।

যাঁরা কম তেলে রান্না করতে চান, তাঁরা খুব অল্প তেল ব্যবহার করতে পারেন। আবার স্বাদ বাড়াতে সামান্য ঘি মেশানোও যায়। তবে ঘি বেশি ব্যবহার না করাই ভাল, কারণ চিংড়ির নিজস্ব স্বাদ ও গ্রেভির সুগন্ধ বজায় রাখাই এই পদের মূল আকর্ষণ।

চতুর্থ ধাপ: তৈরি করুন রেজালার সুগন্ধি গ্রেভি

চিংড়ি ভাজার পরে একই কড়াইয়ে প্রয়োজনমতো তেল বা সামান্য ঘি দিন। তাতে তেজপাতা, ছোট এলাচ, দারচিনি ও লবঙ্গ দিয়ে হালকা করে ফোড়ন দিন। গোটা গরম মশলার সুগন্ধ বেরিয়ে এলে পেঁয়াজ বাটা বা খুব মিহি করে কুচিয়ে নেওয়া পেঁয়াজ দিয়ে দিন।

পেঁয়াজ খুব বেশি লাল করে ভাজার প্রয়োজন নেই। হালকা নরম হয়ে এলে আদা ও রসুন বাটা যোগ করুন। অল্প আঁচে নাড়তে থাকুন, যাতে মশলা পুড়ে না যায়। কাঁচালঙ্কাও এই পর্যায়ে যোগ করতে পারেন।

এ বার আঁচ কমিয়ে দইয়ের মিশ্রণটি ধীরে ধীরে কড়াইয়ে দিন। দই দেওয়ার আগে ভাল করে ফেটিয়ে নিন। কড়াইয়ে দেওয়ার পরে ক্রমাগত নাড়তে থাকুন, যাতে দই কেটে না যায়। দইয়ের সঙ্গে মশলা ভাল ভাবে মিশে গেলে কাজুবাদাম ও পোস্তের পেস্ট দিয়ে দিন।

সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে কয়েক মিনিট অল্প আঁচে কষান। গ্রেভি খুব বেশি ঘন হয়ে গেলে সামান্য গরম জল মেশাতে পারেন। নুন ও চিনি দিয়ে স্বাদ ঠিক করে নিন। রেজালার স্বাদ হবে মৃদু ঝাল, হালকা মিষ্টি এবং মশলার সুগন্ধে ভরপুর। অতিরিক্ত ঝাল বা মিষ্টি করলে পদের নিজস্ব স্বাদ ঢাকা পড়ে যেতে পারে।

পঞ্চম ধাপ: গ্রেভিতে চিংড়ি দিয়ে রান্না শেষ করুন

গ্রেভি তৈরি হয়ে গেলে আগে থেকে হালকা ভেজে রাখা চিংড়িগুলি কড়াইয়ে দিয়ে দিন। অল্প আঁচে কয়েক মিনিট রান্না হতে দিন, যাতে মাছের মধ্যে গ্রেভির স্বাদ ঢুকে যায়। প্রয়োজনে সামান্য গরম জল যোগ করুন। তবে গ্রেভি খুব পাতলা করবেন না। পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করার জন্য মাঝারি ঘনত্বের গ্রেভি বেশ মানানসই।

শেষের দিকে কয়েক ফোঁটা কেওড়া জল দিতে পারেন। এতে রেজালায় সুন্দর সুগন্ধ আসবে। তবে কেওড়া জল বেশি দিলে তার গন্ধ অন্য উপাদানের স্বাদকে ঢেকে দিতে পারে। তাই অল্প ব্যবহার করাই ভাল।

চিংড়ি সেদ্ধ হয়ে গেলে আঁচ বন্ধ করে কড়াই ঢেকে কয়েক মিনিট রেখে দিন। এতে গ্রেভির স্বাদ আরও ভাল ভাবে মিশে যাবে। রান্নার সময় চিংড়ি অতিরিক্ত সেদ্ধ করবেন না। মাছের আকার অনুযায়ী রান্নার সময় কমবেশি হতে পারে, তাই মাছের গঠন ও সেদ্ধ হওয়ার দিকে নজর রাখুন।

পোলাওয়ের সঙ্গে কী ভাবে পরিবেশন করবেন?

চিংড়ির রেজালার সঙ্গে সুগন্ধি বাসন্তী পোলাও, সাদা পোলাও কিংবা জিরা পোলাও পরিবেশন করা যায়। পোলাওয়ের হালকা মিষ্টি স্বাদ ও সুগন্ধি ভাতের সঙ্গে রেজালার মশলাদার, মোলায়েম গ্রেভির দারুণ সমন্বয় তৈরি হয়।

পুজোর দুপুরে অতিথিদের জন্য বিশেষ মেনু সাজাতে চাইলে প্রথমে পরিবেশন করতে পারেন স্যালাড বা হালকা কোনও স্টার্টার। তার পরে গরম পোলাওয়ের সঙ্গে চিংড়ির রেজালা। পাশে লেবুর টুকরো ও সামান্য স্যালাড রাখলে পরিবেশন আরও আকর্ষণীয় হবে।

চাইলে মেনুতে আলুর দম, মাছের অন্য কোনও পদ কিংবা চাটনিও রাখা যায়। তবে চিংড়ির রেজালা যদি মূল আকর্ষণ হয়, তা হলে সঙ্গে খুব বেশি ঝাল বা মশলাদার পদ না রাখলেও চলে।

রেস্তোরাঁর স্বাদ পেতে কয়েকটি জরুরি টিপস

চিংড়ির রেজালা তৈরি করার সময় কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে স্বাদ আরও ভাল হবে।

১. টাটকা চিংড়ি ব্যবহার করুন: মাছ যত টাটকা হবে, রান্নার স্বাদও তত ভাল হবে। মাছ পরিষ্কার করার সময় পিঠের শিরা অবশ্যই বাদ দিন।

২. দই ফেটিয়ে ব্যবহার করুন: দই সরাসরি কড়াইয়ে না দিয়ে আগে ভাল করে ফেটিয়ে নিন। আঁচ কমিয়ে দিয়ে ক্রমাগত নাড়লে দই কেটে যাওয়ার আশঙ্কা কমবে।

৩. মশলা মিহি করে বাটুন: কাজুবাদাম ও পোস্তের পেস্ট যত মসৃণ হবে, গ্রেভিও তত সুন্দর হবে।

৪. চিংড়ি বেশি ভাজবেন না: অতিরিক্ত ভাজলে মাছ শক্ত হয়ে যেতে পারে। হালকা ভেজে পরে গ্রেভিতে রান্না করাই ভাল।

৫. ঝাল-মিষ্টির ভারসাম্য রাখুন: কাঁচালঙ্কা, চিনি ও নুন নিজের স্বাদ অনুযায়ী ব্যবহার করুন। রেজালার স্বাদ যেন খুব ঝাল বা অতিরিক্ত মিষ্টি না হয়ে যায়।

৬. গরম গরম পরিবেশন করুন: রান্নার পরে কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে পোলাওয়ের সঙ্গে গরম অবস্থায় পরিবেশন করলে স্বাদ ও সুগন্ধ উপভোগ করা যায়।

পাশাপাশি, চিংড়ি বা কাজুবাদামে অ্যালার্জি থাকলে এই পদ এড়িয়ে চলুন। মাছ পরিষ্কার করা থেকে রান্না পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন এবং চিংড়ি সম্পূর্ণ সেদ্ধ হয়েছে কি না নিশ্চিত করুন।

এ বার পুজোর মেনুতে থাকুক চিংড়ির রেজালা

পুজোর খাওয়াদাওয়ায় প্রতি বছর একই ধরনের পদ রাখতে রাখতে অনেক সময় একঘেয়েমি চলে আসে। তাই এ বার পরিচিত চিংড়ি মাছকে একটু অন্য ভাবে রান্না করে পরিবারের সদস্য ও অতিথিদের চমকে দিতে পারেন। কাজুবাদাম, পোস্ত, দই ও গোটা গরম মশলার মিশ্রণে তৈরি এই রেজালা স্বাদে যেমন আলাদা, তেমনই সুগন্ধি পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করলেও বেশ মানিয়ে যায়।

বাড়িতে রান্না করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, নিজের পছন্দ অনুযায়ী ঝাল, মিষ্টি, গ্রেভির ঘনত্ব ও মশলার পরিমাণ ঠিক করে নেওয়া যায়। ফলে রেস্তোরাঁয় যাওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই উৎসবের দিনে বাড়ির রান্নাঘরেই তৈরি করা সম্ভব বিশেষ পদ।

তা হলে এ বার পুজোর ভোজে শুধু চেনা মালাইকারি বা সর্ষে চিংড়ি নয়, পোলাওয়ের সঙ্গে রাখুন ঝাল-মিষ্টি চিংড়ির রেজালা। সঠিক উপকরণ, অল্প যত্ন এবং কয়েকটি সহজ ধাপ মেনে রান্না করলেই পুজোর মেনুতে যোগ হবে নতুন স্বাদ। পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্য এর চেয়ে ভাল আয়োজন আর কী হতে পারে!

Preview image