Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

কলকাতাতেও কোটির ক্লাবে বর্ডার ২ সানি দেওলের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী কি প্রসেনজিৎ

এ বারের সরস্বতীপুজোয় তিনটি বাংলা ছবি মুক্তি পেয়েছে। ঘাড়ের কাছে শ্বাস ফেলেছেন সানি দেওল। বাংলা ছবি কি টক্কর দিতে পারল?

২০২৬ সালের সরস্বতীপুজো বাঙালি সংস্কৃতি, সিনেমা এবং বক্সঅফিস রাজনীতির এক অদ্ভুত ও ঘটনাবহুল মুহূর্ত হয়ে উঠেছে। সাধারণত সরস্বতীপুজো মানেই প্রেমের দিন, তারুণ্যের আবেগ, কলেজ ক্যাম্পাসের রঙিন স্মৃতি, আর সেই আবহে মুক্তি পাওয়া রোমান্টিক ছবি। কিন্তু এ বছর সেই চেনা ছবিটা পুরোপুরি উলটে গেছে। প্রেমদিবসের দিন বাঙালি দর্শক পেলেন না কোনও নতুন ভালোবাসার ছবি। বরং প্রেক্ষাগৃহ দখল করে নিল এক দেশপ্রেমের হাই-ভোল্টেজ অ্যাকশন ছবি—‘বর্ডার ২’। এই ঘটনাই এ বছরের সরস্বতীপুজোর বক্সঅফিস ও প্রদর্শনী রাজনীতিকে নিয়ে এসেছে তীব্র আলোচনার কেন্দ্রে।

সরস্বতীপুজো ও বাঙালি সিনেমার ঐতিহ্য

বাঙালি সংস্কৃতিতে সরস্বতীপুজো কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়—এটি এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এটি প্রেমের প্রতীকী উৎসব হিসেবেও পরিচিত। এই সময়টাকে লক্ষ্য করে বহু বছর ধরেই বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প রোমান্টিক বা যুবকেন্দ্রিক ছবি মুক্তি দিয়ে এসেছে। দর্শকরা এই সময়ে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে নতুন বাংলা ছবি দেখবেন—এটাই ছিল দীর্ঘদিনের নিয়ম।

২০২৬-এর ব্যতিক্রমী মুক্তি তালিকা

এ বছর সরস্বতীপুজোয় মুক্তি পেয়েছে তিনটি বাংলা ছবি—

  • ‘বিজয়নগরের হীরে’ (চন্দ্রাশিস রায় পরিচালিত)

  • ‘হোক কলরব’ (রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত)

  • ‘ভানুপ্রিয়া ভূতের হোটেল’ (অরিত্র মুখোপাধ্যায় পরিচালিত)

এই তিনটি ছবির মধ্যে রহস্য-অ্যাডভেঞ্চার, সামাজিক নাটক এবং কমেডি-হরর ঘরানার উপাদান থাকলেও কোনওটিই সরাসরি প্রেমকেন্দ্রিক ছবি নয়। প্রেমদিবসের দিনে বাঙালি দর্শকের কাছে এটি ছিল এক বড় শূন্যতা।

স্ক্রিনিং কমিটির নিয়ম ও বাস্তব চিত্র

বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে দীর্ঘদিন ধরে একটি অনানুষ্ঠানিক অথচ কার্যকর নিয়ম চালু আছে—স্ক্রিনিং কমিটির নির্দেশ। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনও উৎসবের সময় মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবিগুলিকে প্রথমে প্রেক্ষাগৃহে জায়গা দিতে হবে। তার পরেই জায়গা পাবে হিন্দি বা অন্যান্য ভাষার বড় বাজেটের ছবি।
এই নিয়মের উদ্দেশ্য ছিল বাংলা ছবিকে প্রাধান্য দেওয়া এবং স্থানীয় শিল্পকে রক্ষা করা।

কিন্তু ২০২৬ সালের সরস্বতীপুজোয় সেই নিয়ম কার্যত ভেঙে পড়েছে।

‘বর্ডার ২’-এর প্রেক্ষাগৃহ দখল

খবর অনুযায়ী, কলকাতার একাধিক প্রেক্ষাগৃহে স্ক্রিনিং কমিটির নির্দেশ মানা হয়নি। বরং তারকাখচিত দেশপ্রেমের ছবি ‘বর্ডার ২’ একাধিক শো পেয়েছে। অনেক হলে এই হিন্দি ছবিটি পেয়েছে দুটো করে শো, যেখানে বাংলা ছবিগুলি পেয়েছে মাত্র একটি করে শো।
কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক—কিছু প্রেক্ষাগৃহে তিনটি বাংলা ছবি একেবারেই জায়গা পায়নি।

এই তালিকায় উঠে এসেছে কলকাতার বেশ কয়েকটি পরিচিত প্রেক্ষাগৃহের নাম—নবীনা, প্রাচী, মিনার, বিজলি, গ্লোব, অশোকা প্রভৃতি। এই হলগুলিতে ‘বর্ডার ২’কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, ফলে বাংলা ছবির প্রদর্শন সীমিত হয়ে পড়েছে।

ব্যতিক্রম বিনোদিনী

এই পরিস্থিতির মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বিনোদিনী প্রেক্ষাগৃহ (সাবেক স্টার থিয়েটার)। এখানে তিনটি বাংলা ছবিই জায়গা পেয়েছে। এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে—যেখানে স্থানীয় চলচ্চিত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

বক্সঅফিস ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা

প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণত বাণিজ্যিক। বড় বাজেটের হিন্দি ছবির ক্ষেত্রে দর্শকের ভিড়, প্রচার, তারকাখ্যাতি—সবকিছুই বেশি থাকে। ফলে প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা অনেক সময় বাংলা ছবির তুলনায় হিন্দি ছবিকে বেশি শো দিতে আগ্রহী হন।
‘বর্ডার ২’ একটি দেশপ্রেমমূলক অ্যাকশন ফিল্ম হওয়ায় সারাদেশে বড় প্রচার পেয়েছে। ফলে মাল্টিপ্লেক্স এবং সিঙ্গল স্ক্রিন উভয় ক্ষেত্রেই এটি বেশি শো পাওয়ার যোগ্য বলে মনে করা হয়েছে।

news image
আরও খবর

বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের উদ্বেগ

এই ঘটনা বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি সতর্কবার্তা। স্ক্রিনিং কমিটির নিয়ম ভেঙে যদি ধারাবাহিকভাবে হিন্দি ছবিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে বাংলা ছবির বক্সঅফিস ভবিষ্যৎ আরও সংকটে পড়তে পারে।
বাংলা ছবির নির্মাতারা ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছেন যে পর্যাপ্ত শো না পাওয়ায় তাঁদের ছবির ব্যবসায়িক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একটি ছবি মুক্তির সময় প্রথম কয়েকদিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময়ে কম শো মানে কম দর্শক, কম আয়, এবং দীর্ঘমেয়াদে ছবির বাজার ক্ষতি।

সংস্কৃতি বনাম বাজার

এই ঘটনা আসলে সংস্কৃতি বনাম বাজারের দ্বন্দ্বকে সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে রয়েছে বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার দায়, অন্যদিকে রয়েছে বাজার অর্থনীতির কঠোর বাস্তবতা।
সরস্বতীপুজোর মতো একটি প্রতীকী বাঙালি উৎসবে যদি বাংলা ছবির জায়গা সংকুচিত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমার সাংস্কৃতিক প্রভাব কতটা টিকে থাকবে?

দর্শকের ভূমিকা

এই পরিস্থিতিতে দর্শকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ছবি যদি দর্শক না পায়, তাহলে প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা স্বাভাবিকভাবেই অন্য ভাষার ছবিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন। দর্শকের পছন্দই শেষ পর্যন্ত বাজারের দিক নির্ধারণ করে।
তবে বাংলা ছবির ক্ষেত্রে প্রচার, কনটেন্টের মান, এবং তারকাখ্যাতি—সবকিছুর সমন্বয় জরুরি। শুধুমাত্র ভাষার আবেগ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাজার ধরে রাখা সম্ভব নয়।

ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

২০২৬ সালের সরস্বতীপুজো তাই শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়—এটি বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্টের মতো।
প্রেক্ষাগৃহে বাংলা ছবির জায়গা কমে যাওয়া, স্ক্রিনিং কমিটির নির্দেশ অমান্য হওয়া, এবং হিন্দি ছবির আধিপত্য—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ভবিষ্যতের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।
যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী দিনে উৎসবকালেও বাংলা ছবির প্রাধান্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে

উপসংহার

২০২৬ সালের সরস্বতীপুজো বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এক স্মরণীয় এবং বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। বাঙালির সংস্কৃতি, ভাষা ও আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই উৎসবের সময় যে বাংলা ছবির জায়গা সংকুচিত হয়ে যাবে, তা অনেকেই কল্পনা করতে পারেননি। প্রেমদিবসের দিনে যখন কলেজ ক্যাম্পাস, রাস্তাঘাট, সামাজিক মাধ্যম ভরে উঠেছে ভালোবাসার গল্পে, তখন প্রেক্ষাগৃহে ভালোবাসার গল্প অনুপস্থিত—এই চিত্র নিজেই এক গভীর সাংস্কৃতিক শূন্যতার ইঙ্গিত দেয়।

এই শূন্যতার মাঝেই বড় করে সামনে এসেছে বাজারের বাস্তবতা। ‘বর্ডার ২’-এর মতো একটি বড় বাজেটের দেশপ্রেমমূলক ছবি যেভাবে বাংলার প্রেক্ষাগৃহ দখল করে নিয়েছে, তা শুধু একটি চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক সাফল্যের গল্প নয়; এটি স্থানীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কঠিন চ্যালেঞ্জের প্রতীক। স্ক্রিনিং কমিটির নিয়ম, যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলা ছবিকে রক্ষা করার একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে, সেই নিয়মের প্রকাশ্য অমান্য এক গভীর সংকেত বহন করে—এটি বোঝায় যে প্রেক্ষাগৃহের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে সম্পূর্ণভাবে বাজার অর্থনীতির হাতে চলে যাচ্ছে।

বাংলা ছবির নির্মাতাদের জন্য এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। একটি ছবির ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করে মুক্তির প্রথম কয়েকদিনের উপর। সেই সময় যদি পর্যাপ্ত শো না পাওয়া যায়, তাহলে দর্শকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগও কমে যায়। ফলে কেবল বক্সঅফিস আয় নয়, দীর্ঘমেয়াদে বাংলা ছবির ব্যবসায়িক সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে ভবিষ্যতে বাংলা ছবির নির্মাতারা উৎসবকেন্দ্রিক বড় বাজেটের প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ হারাতে পারেন।

এখানে আরও একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে—বাংলা চলচ্চিত্র কি কেবল ভাষার আবেগের উপর দাঁড়িয়ে টিকে থাকতে পারবে? দর্শকের পছন্দ দ্রুত বদলাচ্ছে, মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি বাড়ছে, এবং বিশ্বায়নের যুগে দর্শক এক ক্লিকে নানা ভাষার কনটেন্ট পাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা সিনেমাকে শুধু স্থানীয়তার আবেগে নয়, কনটেন্টের মান, প্রযুক্তি, গল্প বলার নতুনত্ব এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রোডাকশন ভ্যালুর মাধ্যমে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে হবে।

তবে একই সঙ্গে দায়িত্ব দর্শকেরও। বাঙালি দর্শক যদি নিজের ভাষার সিনেমাকে সমর্থন না করেন, তাহলে কোনও স্ক্রিনিং কমিটি বা নীতিই দীর্ঘদিন বাংলা ছবিকে রক্ষা করতে পারবে না। প্রেক্ষাগৃহ মালিকরা শেষ পর্যন্ত দর্শকের টিকিটের সংখ্যার দিকেই তাকান। তাই বাংলা ছবিকে বাঁচাতে হলে আবেগের পাশাপাশি সক্রিয় দর্শক সমর্থন জরুরি।

বিনোদিনী প্রেক্ষাগৃহের ব্যতিক্রমী অবস্থান এই প্রসঙ্গে একটি আশার আলো দেখায়। যেখানে তিনটি বাংলা ছবিই জায়গা পেয়েছে, সেখানে প্রেক্ষাগৃহ কর্তৃপক্ষ একটি সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার বার্তা দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে ব্যবসায়িক চাপের মধ্যেও সাংস্কৃতিক অবস্থান নেওয়া সম্ভব। যদি আরও প্রেক্ষাগৃহ এমন অবস্থান নেয়, তবে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রদর্শন কাঠামো কিছুটা হলেও ভারসাম্য ফিরে পেতে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের সরস্বতীপুজো বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য এক ধরনের সতর্ক ঘণ্টা। এটি দেখিয়ে দিল যে ভাষা ও সংস্কৃতির জায়গা বাজারের কাছে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, এবং যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমার প্রেক্ষাগৃহ উপস্থিতি আরও দুর্বল হতে পারে।

সরস্বতীপুজো মানে জ্ঞান, শিল্প ও সৃষ্টিশীলতার পূজা। এই উৎসবের প্রেক্ষাপটে যদি বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে—বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে—তবে এই সংকটই ভবিষ্যতের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। অন্যথায়, এই বছরটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক অশনিসংকেত হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

Preview image