Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

রমজানে ১০০০ কেজি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ নজির গড়ল বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি

রমজান উপলক্ষে এক হাজার কেজি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে নজির গড়ল বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি  ভাতার স্টেশন ও মুরাতিপুর বাজার এলাকায় ১৫০ রোজাদারের হাতে তুলে দেওয়া হল ২১ দিনের ইফতারের সামগ্রী।

রমজান মাস আত্মসংযম, ত্যাগ, সংহতি ও মানবিকতার এক অনন্য অধ্যায়। এই পবিত্র মাসে শুধু ধর্মীয় অনুশাসনই নয়, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার বার্তাও সমান গুরুত্ব পায়। সেই মানবিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। রোজার মাসে অভাবী ও নিম্নআয়ের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রায় এক হাজার কেজি খাদ্যসামগ্রী বিতরণের মাধ্যমে সংস্থাটি এক অনন্য নজির গড়ে তুলেছে।

বর্ধমানের ভাতার স্টেশন এলাকা এবং মুরাতিপুর বাজার এলাকায় আয়োজিত এই বিশেষ উদ্যোগে মোট ১৫০ জন রোজাদারের হাতে তুলে দেওয়া হয় ২১ দিনের ইফতারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী। শুধু আনুষ্ঠানিক বিতরণ নয়, সুপরিকল্পিতভাবে পরিবারভিত্তিক চাহিদা বিবেচনা করে প্যাকেট প্রস্তুত করা হয়েছিল। সংস্থার সদস্যরা জানান, তাঁদের লক্ষ্য ছিল—প্রত্যেকটি পরিবার যেন অন্তত তিন সপ্তাহ স্বস্তিতে ইফতার করতে পারেন এবং রমজানের পবিত্র সময়টুকু খাদ্যসংকটের দুশ্চিন্তা ছাড়া কাটাতে পারেন।

প্রতিটি প্যাকেটে ছিল ২ কেজি মুড়ি, ১ কেজি সুজি, ১ কেজি চিনি, ১ কেজি ছাতু, ৫০০ গ্রাম ছোলা, ২৫০ গ্রাম আদা, ২৫০ গ্রাম খেজুর, ১ লিটার ভোজ্য তেল এবং ২০ প্যাকেট ওআরএস। এই তালিকাটি শুধু পরিমাণে বড় নয়, পুষ্টিগুণের দিক থেকেও ভারসাম্যপূর্ণ। রমজানে দীর্ঘ সময় উপবাসের পর শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি জোগাতে এই খাদ্যসামগ্রী বিশেষভাবে সহায়ক।

মুড়ি ও সুজি দ্রুত শক্তি জোগায়, ছাতু ও ছোলা প্রোটিনের উৎস হিসেবে কাজ করে, খেজুর প্রাকৃতিক শর্করা ও খনিজে সমৃদ্ধ। আদা হজমে সহায়তা করে এবং তেল রান্নার অপরিহার্য উপাদান। ওআরএস যুক্ত করার পেছনে রয়েছে স্বাস্থ্যসচেতন ভাবনা—গরমকালে রোজার সময় শরীরে জলশূন্যতা দেখা দিতে পারে, তা মোকাবিলায় ওআরএস কার্যকর ভূমিকা নেয়। অর্থাৎ, শুধুমাত্র খাদ্য নয়, সামগ্রিক সুস্থতার কথাও মাথায় রেখেছে সংস্থা।

এই উদ্যোগে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবী সানাই ফৌজদার, অশোক হাজরা ও আমির শেখ। তাঁদের উপস্থিতি কর্মসূচিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। তাঁরা প্রত্যেক রোজাদারের সঙ্গে কথা বলেন, খোঁজখবর নেন এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

বিতরণ কর্মসূচির দিন ভাতার স্টেশন চত্বর ও মুরাতিপুর বাজার এলাকায় এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজনের মুখে ছিল প্রত্যাশা, আর হাতে খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়ার সময় স্বেচ্ছাসেবকদের চোখে-মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। কোথাও কোনও বিশৃঙ্খলা নয়—সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় পুরো কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।

রোজাদারদের মধ্যে জ্যোৎস্না বিবি বলেন, “আমরা যা পেলাম, তাতে পুরো পরিবারের এক মাসের ইফতার ভালোভাবে চলে যাবে। এই সহায়তা আমাদের জন্য আশীর্বাদ।” হালিম সেখ জানান, রোজার সময় কাজের চাপ কমে যায়, আয়ও কমে। এই সাহায্য তাঁদের বড় ভরসা দিয়েছে। লিয়াকত হোসেন মল্লিকের কথায়, “সংস্থার এই উদ্যোগ আমাদের মনে সাহস জুগিয়েছে—আমরা একা নই।”

সংস্থার সম্পাদক প্রলয় মজুমদার বলেন, তাঁদের উদ্দেশ্য কেবল একদিনের প্রদর্শনীমূলক সহায়তা নয়। রমজানের প্রতিটি দিন রোজাদারদের সুষম আহার নিশ্চিত করাই তাঁদের লক্ষ্য। তিনি জানান, সংস্থার সদস্যরা মাসব্যাপী পরিকল্পনা করে তহবিল সংগ্রহ করেন এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ পরিসরে এই উদ্যোগ চালানোর ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি।

এই কর্মসূচি প্রমাণ করে, সামাজিক দায়িত্ববোধ কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছা থাকলে তা বাস্তব রূপ পেতে পারে। আজকের সময়ে যখন অনেকেই ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, তখন এমন উদ্যোগ অন্যদের অনুপ্রাণিত করে।

রমজান মাস মানেই আত্মশুদ্ধি, সংযম ও সহমর্মিতার এক অনন্য সাধনা। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দীর্ঘ উপবাসের পর ইফতার কেবল খাবার গ্রহণের সময় নয়; এটি পরিবারকে ঘিরে বসার মুহূর্ত, প্রতিবেশীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ, আর সমাজের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক পবিত্র উপলক্ষ। তাই ইফতারকে ঘিরে যে কোনও মানবিক উদ্যোগ শুধু খাদ্যসামগ্রী বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা হয়ে ওঠে সামাজিক বন্ধনের এক দৃঢ় প্রকাশ। এই ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটি।

সংস্থার পক্ষ থেকে প্রায় এক হাজার কেজি খাদ্যসামগ্রী বিতরণের এই কর্মসূচি নিছক সংখ্যার নিরিখে বড় নয়; এর গুরুত্ব নিহিত রয়েছে তার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে। ভাতার স্টেশন এলাকা ও মুরাতিপুর বাজার অঞ্চলের ১৫০ জন রোজাদারের হাতে ২১ দিনের ইফতারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সংস্থাটি যে বার্তা দিয়েছে, তা হল—সমাজের কোনও মানুষ যেন অভাবের কারণে রমজানের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন।

news image
আরও খবর

প্রতিটি প্যাকেট সুচিন্তিতভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল। মুড়ি, সুজি, চিনি, ছাতু, ছোলা, খেজুর, আদা, তেল ও ওআরএস—এই সমস্ত উপকরণ শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যও প্রয়োজনীয়। দীর্ঘ সময় উপবাসের পর শরীরের যে শক্তি ও পুষ্টির প্রয়োজন হয়, তা মাথায় রেখেই এই সামগ্রী নির্বাচন করা হয়েছে। বিশেষ করে গরমের দিনে রোজার সময় শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকি থাকে, তাই ওআরএস যুক্ত করার সিদ্ধান্ত সংস্থার দূরদর্শিতার পরিচায়ক।

ইফতার বিতরণের দিন দুই এলাকায় ছিল এক আবেগঘন পরিবেশ। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখেমুখে ছিল প্রত্যাশা ও কৃতজ্ঞতার ছাপ। স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যস্ততা, প্যাকেট সাজানো, তালিকা মিলিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে সামগ্রী তুলে দেওয়া—সব মিলিয়ে এক সুন্দর সমন্বয়ের ছবি ফুটে ওঠে। বিশিষ্ট সমাজসেবী সানাই ফৌজদার, অশোক হাজরা ও আমির শেখ উপস্থিত থেকে রোজাদারদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন।

রোজাদারদের প্রতিক্রিয়াও ছিল আবেগপূর্ণ। জ্যোৎস্না বিবি জানান, এই সহায়তা তাঁদের পরিবারের জন্য বিরাট স্বস্তি এনে দিয়েছে। হালিম সেখ বলেন, রোজার মাসে আয় কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে সমস্যায় পড়তে হয়, কিন্তু এই খাদ্যসামগ্রী তাঁদের বড় ভরসা দিয়েছে। লিয়াকত হোসেন মল্লিকের কথায়, “এতে শুধু খাবার নয়, সাহসও পেলাম—সমাজ আমাদের পাশে আছে।”

সংস্থার সম্পাদক প্রলয় মজুমদার স্পষ্ট করে জানান, তাঁদের লক্ষ্য কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়। রমজানের প্রতিটি দিন রোজাদারদের সুষম আহার নিশ্চিত করাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সহযোগিতায় এই উদ্যোগ সফল হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও আরও বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দিক হল—এটি স্থানীয় সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অনেকেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, কেউ কেউ আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। ফলে এই উদ্যোগ কেবল একবারের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্যও এক দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে।

সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন ব্যক্তি, সংগঠন এবং স্থানীয় মানুষ একসঙ্গে হাত মেলান। একা কোনও প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনতে পারে না—কিন্তু সম্মিলিত উদ্যোগ সমাজকে নতুন দিশা দেখাতে সক্ষম। রমজানের মতো পবিত্র ও আত্মশুদ্ধির মাসে সেই সম্মিলিত চেতনারই এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছে বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির এই মানবিক কর্মসূচি।

রমজান শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের সময় নয়; এটি সংযম, ত্যাগ ও সহমর্মিতার চর্চার সময়। দীর্ঘ উপবাসের শেষে ইফতার যখন পরিবারের সবাইকে একত্র করে, তখন সেই মুহূর্তে অভাব যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—এই ভাবনাকেই গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। এক হাজার কেজি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ তাই কেবল একটি বড় অঙ্কের পরিসংখ্যান নয়; এটি ১৫০টি পরিবারের নিরাপত্তা ও স্বস্তির প্রতীক। প্রতিটি প্যাকেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক একটি সংসারের হাসি, এক একটি শিশুর নিশ্চিন্ত মুখ, এক একটি বৃদ্ধের আশ্বাসভরা দৃষ্টি।

এই উদ্যোগ সমাজে সহমর্মিতা ও সংহতির শক্ত বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। স্থানীয় মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন—সংগঠিত সদিচ্ছা থাকলে কীভাবে বাস্তব পরিবর্তন আনা যায়। অনেকেই এই কর্মসূচি দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ফলে এই প্রচেষ্টা শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বর্ধমান সদর প্যায়ারা নিউট্রিশন ওয়েলফেয়ার সোসাইটির এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। রমজানের পবিত্র আবহে এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে—মানবিকতার শক্তি এখনও অটুট, আর একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি এখনও জীবন্ত। ভবিষ্যতে এই ধারাই আরও বিস্তৃত হোক, আরও বেশি মানুষ উপকৃত হোক—এমন প্রত্যাশাই রাখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা  

 

Preview image