Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে শুরু সিবিএসই র দশম ও দ্বাদশের পরীক্ষা পড়ুয়াদের কী কী নিয়ম মাথায় রাখা জরুরি

১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সিবিএসই-র দশম এবং দ্বাদশের পরীক্ষা শুরু হতে চলেছে। দশমের পরীক্ষা ১১ মার্চ পর্যন্ত এবং দ্বাদশের পরীক্ষা ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।

দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা ঘিরে পড়ুয়া, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের মধ্যে বরাবরই এক বিশেষ উত্তেজনা ও উদ্বেগ কাজ করে। ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে এই পরীক্ষার ফলের উপর। সেই কারণেই পরীক্ষার কাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা নিয়মে সামান্য পরিবর্তনও বিশেষ গুরুত্ব পায়। আসন্ন পরীক্ষার আগে সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে, তা ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতি এবং মানসিক অবস্থার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রথমেই উল্লেখযোগ্য বিষয় হল—দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা বছরে দু’বার নেওয়ার সিদ্ধান্ত। ২০২৬ সাল থেকে এই নিয়ম কার্যকর করতে চলেছে সিবিএসই। শিক্ষাব্যবস্থায় এটি একটি বড় পরিবর্তন, কারণ এতদিন দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষা বছরে একবারই হত। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রথম পর্বের পরীক্ষা সকল ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ বোর্ড পরীক্ষার মূল কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলেও, দ্বিতীয় একটি সুযোগ রাখা হচ্ছে নির্দিষ্ট শর্তে।

এই দ্বিতীয় পর্বের পরীক্ষাকে বলা হচ্ছে ‘ইম্প্রুভমেন্ট এগ্‌জ়াম’। এর উদ্দেশ্য হল, প্রথম পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পেলে পড়ুয়ারা যাতে নিজেদের নম্বর উন্নত করার সুযোগ পায়। বহু সময় দেখা যায়, কোনও একটি বা দুটি বিষয়ে প্রত্যাশিত নম্বর না পেলে সামগ্রিক ফলাফলে তার প্রভাব পড়ে। উচ্চমাধ্যমিকে বিষয় নির্বাচন বা ভবিষ্যতের কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে এই নম্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এই ‘ইম্প্রুভমেন্ট’ ব্যবস্থা ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক বড় স্বস্তি।

তবে এই সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। প্রথম পর্বের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরাই দ্বিতীয় পর্বে বসতে পারবে। তাও যে কোনও তিনটি বিষয়ে। অর্থাৎ কেউ যদি প্রথম পরীক্ষায় চার বা পাঁচটি বিষয়ে ভাল ফল করে, কিন্তু দু’একটি বিষয়ে নম্বর বাড়াতে চায়, তবে সে তিনটি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে পরীক্ষা দিতে পারবে। অন্যদিকে, যদি কোনও পড়ুয়া প্রথম পর্বে তিনটি বা তার বেশি বিষয়ে পরীক্ষা না দেয় বা অনুপস্থিত থাকে, তবে সে দ্বিতীয় পর্বে বসার অনুমতি পাবে না। ফলে প্রথম পরীক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এই নতুন নিয়মের পেছনে শিক্ষাবিদদের একটি বড় যুক্তি রয়েছে। একবারের পরীক্ষার উপর সম্পূর্ণ মূল্যায়ন নির্ভর করলে অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের উপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হয়। পরীক্ষার দিন অসুস্থতা, মানসিক উদ্বেগ বা অন্য কোনও কারণে যদি পারফরম্যান্স খারাপ হয়, তবে তার প্রভাব সারাজীবনের ফলাফলে পড়ে। বছরে দু’বার পরীক্ষা নেওয়ার ফলে সেই চাপ কিছুটা হলেও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা জানবে, প্রয়োজনে নিজেদের সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।

এছাড়া প্রশ্নপত্রের কাঠামোতেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে। দশম শ্রেণির বিজ্ঞান প্রশ্নপত্রকে তিনটি পৃথক বিভাগে সাজানো হবে। প্রথম বিভাগে জীববিজ্ঞান, দ্বিতীয় বিভাগে রসায়ন এবং তৃতীয় বিভাগে পদার্থবিদ্যার প্রশ্ন থাকবে। এর ফলে প্রতিটি বিষয়ের স্বতন্ত্র গুরুত্ব বজায় থাকবে এবং ছাত্রছাত্রীরা প্রস্তুতির সময় স্পষ্ট ধারণা পাবে কোন অংশ থেকে কী ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে।

এই বিভাগীয় বিন্যাসের একটি বড় সুবিধা হল—সমতা ও স্বচ্ছতা। আগে অনেক সময় অভিযোগ উঠত যে কোনও একটি অংশ থেকে তুলনামূলক বেশি কঠিন প্রশ্ন এসেছে বা ভারসাম্য বজায় থাকেনি। এখন পৃথক বিভাগে ভাগ করে দেওয়ায় প্রত্যেক শাখার নির্দিষ্ট নম্বর ও গুরুত্ব স্পষ্ট থাকবে। ফলে ছাত্রছাত্রীরা সময় ব্যবস্থাপনায় আরও সচেতন হতে পারবে।

সমাজবিজ্ঞান প্রশ্নপত্রেও একই ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখানে মোট চারটি বিভাগ থাকবে—ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং অর্থনীতি। এই বিভাজন ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতি আরও সুসংগঠিত করতে সাহায্য করবে। সমাজবিজ্ঞান একটি বিস্তৃত বিষয়; চারটি আলাদা শাখার সমন্বয়ে গঠিত। অনেক সময় পড়ুয়ারা একটি অংশে বেশি গুরুত্ব দিয়ে অন্য অংশ উপেক্ষা করে ফেলে। নতুন বিন্যাস সেই প্রবণতা কমাতে সাহায্য করবে।

মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কেও বোর্ড সতর্কতা জারি করেছে। প্রশ্নপত্রে ধারণাভিত্তিক প্রশ্ন, বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্ন এবং প্রয়োগমূলক প্রশ্নের সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে। শুধুমাত্র মুখস্থনির্ভর উত্তরের উপর নির্ভর না করে, ছাত্রছাত্রীদের বোধগম্যতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা যাচাই করা হবে। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও দক্ষতাভিত্তিক ও বাস্তবমুখী করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ।

দ্বাদশ শ্রেণির ক্ষেত্রেও বোর্ড একাধিক সতর্কতা জারি করেছে। পরীক্ষার সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখা, প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত ভুয়ো খবর থেকে দূরে থাকা, এবং নির্ধারিত নিয়ম কঠোরভাবে মানার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের গুজব ছড়িয়ে পড়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। বোর্ড জানিয়েছে, এমন কোনও ভুয়ো তথ্যের উপর নির্ভর না করে অফিসিয়াল নোটিস ও ওয়েবসাইটের ঘোষণাকেই গুরুত্ব দিতে হবে।

ছাত্রছাত্রীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথাও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরীক্ষার আগে অযথা চাপ না নিয়ে সুষম রুটিন মেনে পড়াশোনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত পুনরাবৃত্তি, মক টেস্ট দেওয়া, সময় বণ্টনের অনুশীলন—এই বিষয়গুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে। অভিভাবকদেরও অনুরোধ করা হয়েছে সন্তানদের উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে না দিতে।

news image
আরও খবর

সব মিলিয়ে বলা যায়, সিবিএসই-র এই নতুন উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও নমনীয় ও ছাত্রবান্ধব করার দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। বছরে দু’বার পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছাত্রছাত্রীদের জন্য দ্বিতীয় সুযোগের দরজা খুলে দিচ্ছে। প্রশ্নপত্রের কাঠামোগত পরিবর্তন স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য আনছে। আর মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ শিক্ষাকে মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে দক্ষতাভিত্তিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে পরিবর্তনের সঙ্গে দায়িত্বও বাড়ে। ছাত্রছাত্রীদের প্রথম পরীক্ষাকেই প্রধান লক্ষ্য ধরে প্রস্তুতি নিতে হবে। ‘ইম্প্রুভমেন্ট’ সুযোগ থাকলেও সেটিকে বিকল্প ভরসা হিসেবে দেখা উচিত নয়। নিয়মিত অধ্যবসায়, সময়মতো সিলেবাস শেষ করা, পূর্ববর্তী বছরের প্রশ্নপত্র অনুশীলন—এসবই সাফল্যের চাবিকাঠি।

আসন্ন দশম ও দ্বাদশ বোর্ড পরীক্ষা শুধু একটি শিক্ষাগত ধাপ নয়, এটি আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের পরীক্ষাও বটে। নতুন নিয়ম, নতুন কাঠামো এবং নতুন সুযোগ—সব মিলিয়ে এই বছরটি শিক্ষাক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সঠিক প্রস্তুতি ও ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে এই পরিবর্তন ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করে তুলতে পারে।

উপসংহার

সিবিএসই–র নতুন সিদ্ধান্ত ও পরীক্ষার কাঠামোগত পরিবর্তন শুধু একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়, বরং ভারতের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দশম শ্রেণিতে বছরে দু’বার বোর্ড পরীক্ষা চালুর পরিকল্পনা এবং প্রশ্নপত্রে বিষয়ভিত্তিক সুস্পষ্ট বিভাগ—এই দুই পরিবর্তনই প্রমাণ করে যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও নমনীয়, স্বচ্ছ ও ছাত্রবান্ধব করার চেষ্টা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে বোর্ড পরীক্ষাকে ঘিরে যে একমাত্র সুযোগের চাপ তৈরি হত, তা কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।

প্রথম পর্বের পরীক্ষা বাধ্যতামূলক রেখে দ্বিতীয় পর্বকে ‘ইমপ্রুভমেন্ট’ সুযোগ হিসেবে রাখা একদিকে যেমন পড়ুয়াদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে, তেমনি অন্যদিকে তাদের দায়িত্ববোধও বাড়াবে। কারণ প্রথম পরীক্ষাকেই গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি—দ্বিতীয় সুযোগকে কখনওই অবহেলার কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটিকে আত্মসমালোচনা ও আত্মউন্নয়নের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। জীবনের বড় শিক্ষা এখানেই—ভুল থেকে শেখা এবং নিজেকে আরও উন্নত করে তোলা।

বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্রে আলাদা বিভাগ চালু হওয়া শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিকে আরও সুসংগঠিত করবে। প্রতিটি শাখার নির্দিষ্ট গুরুত্ব স্পষ্ট থাকলে পড়ুয়ারা সময় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হতে পারবে। একই সঙ্গে ধারণাভিত্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের উপর জোর দেওয়া নতুন শিক্ষানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনার বদলে বিষয় বোঝার প্রবণতা বাড়বে, যা ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বিশেষ সহায়ক হবে।

দ্বাদশ শ্রেণির ক্ষেত্রেও বোর্ডের সতর্কবার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গুজব, ভুয়ো প্রশ্নফাঁসের খবর বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের থেকে দূরে থেকে শুধুমাত্র সরকারি নির্দেশিকায় ভরসা করা উচিত। ডিজিটাল যুগে তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সব তথ্যই সত্য নয়। তাই সচেতনতা ও সতর্কতা আজকের দিনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে বড় বিষয় হল মানসিক প্রস্তুতি। বোর্ড পরীক্ষা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও সেটিই জীবনের শেষ কথা নয়। নম্বর গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম ও ধারাবাহিকতা। পরিবার ও শিক্ষকদের উচিত পড়ুয়াদের পাশে থাকা, তাদের উপর অযথা চাপ না সৃষ্টি করা। একটি সুস্থ মানসিক পরিবেশই সাফল্যের আসল ভিত্তি।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই পরিবর্তনগুলো শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও মানবিক ও বাস্তবমুখী করে তুলবে। বছরে দু’বার পরীক্ষার সুযোগ পড়ুয়াদের সামনে নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে, আর প্রশ্নপত্রের নতুন কাঠামো তাদের প্রস্তুতিকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করবে। তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্যের চাবিকাঠি রয়ে যায় নিয়মিত অধ্যবসায়, সঠিক পরিকল্পনা এবং ইতিবাচক মনোভাব।

পরীক্ষা আসবে, যাবে—কিন্তু শেখার প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। এই নতুন নিয়ম সেই চলমান শিক্ষাযাত্রাকেই আরও মজবুত ও অর্থবহ করে তুলবে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে চলাই হোক আগামী দিনের মূলমন্ত্র।

Preview image