হেয়ার ট্রিটমেন্টে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানগুলি সাময়িক সৌন্দর্য প্রদান করলেও দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এই রাসায়নিকগুলির মধ্যে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বিশেষ করে ক্যানসার এবং ত্বক সংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
চুল স্ট্রেট করার রাসায়নিক থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি: দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং তার প্রভাব
আজকাল মসৃণ, জটহীন, কোমল চুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেড়েছে। সবাই চাইছেন তাদের চুল যেন সুন্দর, ঝরঝরে এবং ঝলমলে হয়। এর জন্য নানা ধরনের হেয়ার ট্রিটমেন্ট, যেমন চুল স্ট্রেটিং, ডি-ফ্রিজিং, অথবা কেমিক্যাল ট্রিটমেন্টের উপর অনেকেই নির্ভর করেন। তবে এই প্রক্রিয়াগুলির পেছনে যে রাসায়নিক উপাদানগুলি ব্যবহৃত হয়, তা যে শুধু সাময়িক সৌন্দর্যই প্রদান করে না, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা অনেকেই জানেন না।
হেয়ার স্ট্রেটিং বা চুল স্ট্রেট করার প্রক্রিয়া প্রাথমিকভাবে চুলের কোষের গঠন পরিবর্তন করে। চুলে ব্যবহৃত রাসায়নিকগুলি চুলের প্রাকৃতিক কোষের ভেতর প্রবেশ করে এবং তার স্ট্রাকচার পরিবর্তন করে, যার ফলে চুল মসৃণ এবং একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটানা হয়ে ওঠে। তবে, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে রাসায়নিকভাবে প্রভাবিত হওয়ায়, এতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানগুলি শরীরের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
চুল স্ট্রেট করার ট্রিটমেন্টে ব্যবহৃত বেশ কিছু রাসায়নিকের মধ্যে প্যারাবিন, ফর্মালডিহাইড, থ্যালেটস, গুয়ানিডিন কার্বোনেট এবং অ্যামোনিয়াম থায়োগ্লাইকোলেট উল্লেখযোগ্য। এগুলি সাধারণত শক্তিশালী রাসায়নিক পদার্থ যা চুলকে নরম এবং মসৃণ করতে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু এটি শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর হতে পারে।
হেয়ার ট্রিটমেন্টে ব্যবহৃত রাসায়নিকগুলি শরীরে কীভাবে ক্ষতি করতে পারে, তা একাধিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা হলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া এবং একাধিক শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হওয়া।
১. হরমোনাল ডিস্টার্ব্যান্স:
ফর্মালডিহাইড, প্যারাবিন, থ্যালেটস এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানগুলি শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে নষ্ট করতে পারে। এগুলি বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন হরমোনের গঠন বা কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত, যার ফলে হরমোনের অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। যখন শরীরে এই রাসায়নিকগুলি প্রবাহিত হয়, তখন তা হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায় এবং বিশেষত নারীদের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে।
২. ক্যানসারের ঝুঁকি:
চুল স্ট্রেট করার কেমিক্যাল ট্রিটমেন্টের প্রধান সমস্যা হলো ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ানো। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার করলে, এই রাসায়নিকগুলি কোষের গঠন পরিবর্তন করতে পারে এবং কোষের বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। বিশেষত, জরায়ু এবং স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এই রাসায়নিকগুলি শরীরে গিয়ে জমে থাকতে পারে এবং তাদের সঞ্চিত অবস্থা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ানোর কারণ হতে পারে।
৩. ত্বকের সমস্যা:
চুল স্ট্রেটিং বা অন্য যে কোনও হেয়ার ট্রিটমেন্টের সময় মাথার ত্বক সরাসরি রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসে। মাথার ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায়, রাসায়নিকগুলি খুব দ্রুত ত্বকের মধ্যে প্রবাহিত হতে পারে। মাথার ত্বকে ক্ষত, চুলকানি, কিংবা জ্বালা-ব্যথা থাকলে, এই ঝুঁকি আরো বৃদ্ধি পায়। মাথার ত্বকে রাসায়নিকের প্রভাব ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
৪. অ্যালার্জি এবং ত্বক সংক্রান্ত সমস্যা:
অনেক সময় কেমিক্যাল স্ট্রেটিং প্রক্রিয়ার ফলে ত্বক বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্জি, র্যাশ, এবং ত্বকের সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের অ্যালার্জি এবং সংক্রমণ অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়, যা চিকিৎসা ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ড. সন্দীপ গঙ্গোপাধ্যায় জানান, ‘‘এই রাসায়নিকগুলি শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে, এটি কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নয় যে, এই রাসায়নিকগুলি সরাসরি ক্যানসারের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যদিও সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, এই রাসায়নিকগুলির দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।’’
চিকিৎসকরা আরো বলেন, ‘‘আগের দিনে স্তন ও জরায়ু ক্যানসার ঘটত, তবে তখন এই ধরনের কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট ছিল না। কিন্তু কৃত্রিম রাসায়নিক উপাদানগুলি ব্যবহারে ক্যানসারের ঝুঁকি যে বাড়তে পারে, তা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’’ তাই তারা পরামর্শ দেন, রাসায়নিক কেমিক্যালের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করার চেষ্টা করা উচিত, কারণ এসব প্রাকৃতিক উপাদানগুলি শরীরের উপর কম ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
উপসংহার: চুল স্ট্রেট করার রাসায়নিক উপাদান এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি
চুল স্ট্রেট করার জন্য ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানগুলি আধুনিক সৌন্দর্যচর্চায় অন্যতম জনপ্রিয় পদ্ধতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এই প্রক্রিয়াগুলি শরীরের উপর তাত্ক্ষণিকভাবে ভাল ফলাফল দেয়, দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সংশয় রয়েছে। চুল স্ট্রেটিং ট্রিটমেন্টে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানগুলি সাময়িক সৌন্দর্য প্রদান করলেও, দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে শরীরের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষত হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, ত্বক এবং চুলের সমস্যা সৃষ্টি হওয়া, এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ানো। যদিও এই সমস্যাগুলি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তবে এর সরাসরি সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রথমত, এই রাসায়নিক উপাদানগুলি দীর্ঘ সময় ব্যবহৃত হলে, শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, বিশেষ করে ইস্ট্রোজেন হরমোনের সংক্রমণ। ইস্ট্রোজেন হরমোনের সাথে সম্পর্কিত রাসায়নিক উপাদানগুলি শরীরে প্রবাহিত হয়ে হরমোনাল ডিস্টার্ব্যান্স সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে জরায়ু এবং স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। এই ঝুঁকি বাড়ানোর একটি কারণ হলো রাসায়নিকগুলির গঠন এমনভাবে হয়, যা শরীরের স্বাভাবিক হরমোনের মতো। ফলে এই রাসায়নিক উপাদানগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হলে শরীরের কোষের স্বাভাবিক গঠন পরিবর্তিত হতে পারে, যা ক্যানসারের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দ্বিতীয়ত, চুল স্ট্রেটিং প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদানগুলি ত্বকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে। মাথার ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এই রাসায়নিকগুলি সহজেই ত্বকের ভিতর প্রবাহিত হতে পারে এবং ত্বকের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, যেমন র্যাশ, চুলকানি, ত্বকের জ্বালা, বা অ্যালার্জি। এই রাসায়নিকগুলি ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবাহিত হলে, তা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ত্বকের উপর তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে যদি চুল স্ট্রেটিং প্রক্রিয়া নিয়মিত করা হয়, বিশেষত মাথার ত্বক যদি ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত থাকে বা প্রদাহগ্রস্ত থাকে।
তৃতীয়ত, এই ধরনের রাসায়নিক ট্রিটমেন্টগুলির ব্যবহারের ফলে চুলেরও সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে চুল দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, চুল পড়া বৃদ্ধি পেতে পারে, অথবা চুলের প্রাকৃতিক গঠন বদলে যেতে পারে। ফলে, অনেকেই চুল স্ট্রেটিং করানোর পর আবার চুলের ট্রিটমেন্ট করাতে বাধ্য হন। এর ফলে চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, যা শুধুমাত্র সৌন্দর্য নয়, বরং শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে, চিকিৎসকরা একমত যে, এই রাসায়নিক উপাদানগুলির দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এর সঙ্গে সরাসরি ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন। কিছু প্রাথমিক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, রাসায়নিক ট্রিটমেন্টের ফলে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে, কিন্তু এটি এখনও প্রমাণিত হয়নি। আগের দিনে স্তন এবং জরায়ু ক্যানসার ঘটলেও, তখন এই ধরনের রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট ছিল না। তবে চিকিৎসকরা সাধারণত পরামর্শ দেন যে, রাসায়নিক পণ্যগুলির ব্যবহার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত এবং প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করা নিরাপদ।
এর পরিপ্রেক্ষিতে, আজকের সময়ে প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। প্রাকৃতিক উপাদান যেমন অলিভ অয়েল, আমলা, হেনা, আর্গান অয়েল ইত্যাদি চুল এবং ত্বকের জন্য অনেক নিরাপদ এবং কার্যকর। এগুলি চুলের স্বাস্থ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক এবং ত্বককে খারাপ রাসায়নিক উপাদান থেকে দূরে রাখে। প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করলে চুলের স্বাভাবিক গঠন বজায় থাকে এবং শরীরের উপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দেন, যদি চুল স্ট্রেটিং বা অন্য কোনো রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট করা হয়, তবে তা অবশ্যই কোনও প্রমাণিত ব্র্যান্ডের পণ্য হতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে করা উচিত। সাধারণভাবে, দীর্ঘমেয়াদী রাসায়নিক ট্রিটমেন্টের পরিবর্তে প্রাকৃতিক চুলের যত্নের উপকরণ ব্যবহার করা উচিত, যা চুলের গঠন এবং শারীরিক সুস্থতা উভয়কেই বজায় রাখবে।
এক কথায়, চুলের সৌন্দর্য নিশ্চিত করার জন্য রাসায়নিক ট্রিটমেন্টের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারই সবচেয়ে নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প। কারণ, শরীরের ওপর দীর্ঘমেয়াদী রাসায়নিক উপাদানগুলির প্রভাব কতটা ক্ষতিকর হতে পারে, তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তাই যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করা এবং রাসায়নিক মুক্ত পণ্য ব্যবহার করা আমাদের শরীরের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী।