ওজেম্পিক, উইগোভি, মাউনজারো ও সাকসেন্ডা মূলত ডায়াবেটিস ও হরমোন নিয়ন্ত্রণের ওষুধ হলেও দ্রুত চর্বি ঝরানোর জন্যই এখন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ওজন কমানোর জাদু ওষুধ হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সেলিব্রিটিদের কথাবার্তায় বারবার উঠে আসছে কিছু নাম—ওজেম্পিক, উইগোভি, মাউনজারো ও সাকসেন্ডা। দ্রুত চর্বি ঝরানোর ক্ষমতার জন্য এই ওষুধগুলিকে অনেকে ‘মিরাকল ড্রাগ’ বলেও ডাকছেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এগুলি আদৌ সৌন্দর্যচর্চা বা কসমেটিক ওষুধ নয়। এগুলি মূলত মধুমেহ বা টাইপ ২ ডায়াবিটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, যা বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থূলত্বের চিকিৎসাতেও কাজে লাগে।
তবে এই ওষুধগুলির জনপ্রিয়তা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে অপব্যবহার ও ভুল ধারণার ঝুঁকি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমানোর শর্টকাট হিসেবে এই ওষুধ নেওয়া হলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞেরা।
এই প্রতিবেদনে মধুমেহ চিকিৎসক ডা. আশিস মিত্র-র ব্যাখ্যা অনুযায়ী জানানো হল—এই ওষুধগুলি কীভাবে কাজ করে, কারা নিতে পারবেন, কারা নয়, কী ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা দরকার, কত দিন খেতে হয়, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী এবং কেন এই ওষুধ নিয়ে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
ওজেম্পিক, উইগোভি, মাউনজারো, সাকসেন্ডা—এই ওষুধগুলি আসলে কী?
অনেকে মনে করেন, এগুলি ওজন কমানোর ওষুধ। বাস্তবে তা নয়। এই ওষুধগুলি মূলত টাইপ ২ ডায়াবিটিস এবং হরমোনজনিত বিপাক সমস্যার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। পরে গবেষণায় দেখা যায়, এগুলি শরীরের চর্বি কমাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সেই কারণেই এখন স্থূলত্বের চিকিৎসাতেও এগুলির ব্যবহার হচ্ছে।
এই ওষুধগুলি কাজ করে শরীরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোনের ওপর—
GLP-1 (Glucagon-Like Peptide-1)
GIP (Glucose-Dependent Insulinotropic Polypeptide)
এই হরমোন দুটি আমাদের খিদে, ইনসুলিন নিঃসরণ, খাবার হজমের গতি ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ওজেম্পিক ও সাকসেন্ডা মূলত GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট হিসেবে কাজ করে, আর মাউনজারো কাজ করে GLP-1 ও GIP—দু’টির ওপরই। উইগোভি মূলত স্থূলত্বের চিকিৎসার জন্য অনুমোদিত একটি সংস্করণ হলেও তার মূল কার্যপ্রণালি একই।
এই ওষুধগুলি শরীরে কীভাবে কাজ করে?
ডা. আশিস মিত্রের কথায়, ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করার পর এই ওষুধগুলি চারটি প্রধান কাজ করে—
১. ইনসুলিনের ক্ষরণ বাড়ায় ও কার্যক্ষমতা উন্নত করে
এই ওষুধগুলি রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে অগ্ন্যাশয়কে বেশি পরিমাণে ইনসুলিন নিঃসরণে সাহায্য করে। ফলে গ্লুকোজ দ্রুত কোষে ঢুকে শক্তিতে রূপান্তরিত হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
২. গ্লুকাগন হরমোনের কার্যকারিতা কমায়
গ্লুকাগন এমন একটি হরমোন যা লিভারকে রক্তে গ্লুকোজ ছাড়তে উদ্দীপিত করে। এই ওষুধগুলি গ্লুকাগনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
৩. পাকস্থলী খালি হওয়ার গতি ধীর করে দেয়
সুস্থ শরীরে খাবার পাকস্থলীতে প্রায় ৪ ঘণ্টা থাকে, তার পর অন্ত্রে চলে যায়। এই ওষুধগুলির ফলে খাবার পাকস্থলীতে আরও বেশি সময় থাকে। ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভূতি হয় এবং বারবার খিদে পায় না। এর ফলেই ক্যালোরি গ্রহণ কমে যায়।
৪. মস্তিষ্কে খিদে ও তৃপ্তির সংকেত পরিবর্তন করে
মস্তিষ্কের একটি অংশ খিদে লাগার সংকেত দেয়, অন্য অংশ তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে। এই ওষুধগুলির ফলে খিদে লাগার অনুভূতি কমে যায় এবং তৃপ্তির অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই খাবারের পরিমাণ কমে আসে।
এই চারটি প্রভাব একসঙ্গে কাজ করে শরীরের ক্যালোরি গ্রহণ কমায় এবং ধীরে ধীরে চর্বি ঝরাতে সাহায্য করে।
কেন এত দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়ছে এই ওষুধগুলির?
এই ওষুধগুলির জনপ্রিয়তার কয়েকটি বড় কারণ—
দ্রুত ফল দেখা যায়:
অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওজন ও কোমরের মাপ কমতে শুরু করে।
খিদে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়:
ডায়েট করার সময় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় খিদে ও লোভ। এই ওষুধগুলি সেই সমস্যাটাকেই অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।
সেলিব্রিটি ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাব:
বিদেশি সেলিব্রিটি ও ইনফ্লুয়েন্সারদের মধ্যে এই ওষুধ ব্যবহারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ বেড়েছে।
ডায়েট ও ব্যায়াম ব্যর্থ হলে বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে:
যাঁরা বহু চেষ্টা করেও ওজন কমাতে পারেননি, তাঁদের কাছে এই ওষুধগুলি এক ধরনের শেষ ভরসা হয়ে উঠেছে।
কিন্তু চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন—এই জনপ্রিয়তা যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে ভুল ব্যবহার ও বিপজ্জনক ঝুঁকিও।
এই ওষুধগুলি কি সবাই নিতে পারেন?
সংক্ষিপ্ত উত্তর—না। এই ওষুধগুলি নির্দিষ্ট রোগী ও নির্দিষ্ট শারীরিক অবস্থার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা উচিত।
ডা. আশিস মিত্র জানাচ্ছেন, সাধারণত এই ওষুধগুলি দেওয়া হয়—
টাইপ ২ ডায়াবিটিসে আক্রান্ত রোগীদের, বিশেষ করে যাঁদের ওজন বেশি এবং ডায়েট-ব্যায়ামে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
স্থূলত্বে আক্রান্ত রোগীদের, যাঁদের BMI ৩৫-এর বেশি।
যাঁদের BMI ২৭-এর বেশি এবং সঙ্গে ডায়াবিটিস, হৃদরোগ, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা অন্য কো-মর্বিডিটি রয়েছে।
এই ক্ষেত্রগুলিতে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে এই ওষুধগুলি দেওয়া যেতে পারে।
কারা এই ওষুধ নিতে পারবেন না?
যত কার্যকরই হোক না কেন, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
ডা. আশিস মিত্র জানাচ্ছেন, যাঁদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ সাধারণত দেওয়া হয় না—
প্যানক্রিয়াটাইটিসের ইতিহাস আছে যাঁদের
গলব্লাডারে পাথর রয়েছে বা ছিল যাঁদের
পরিবারে থাইরয়েড ক্যানসার বা এমইএন-২ সিনড্রোমের ইতিহাস রয়েছে যাঁদের
গর্ভবতী বা স্তন্যদানকারী মহিলারা
খুব কম ওজনের মানুষ বা যাঁদের খাওয়াদাওয়ার সমস্যা রয়েছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণীর ওপর গবেষণায় দেখা গিয়েছে—এই ধরনের ওষুধ থাইরয়েডের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও মানুষের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তবুও সতর্কতা হিসেবে এই ওষুধগুলি নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা হয়।
ক্যানসারের ঝুঁকি—কতটা বাস্তব?
এই ওষুধগুলিকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে থাইরয়েড ক্যানসার নিয়ে। প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট জাতীয় ওষুধ থাইরয়েডের নির্দিষ্ট কোষে টিউমার তৈরি করতে পারে।
ডা. আশিস মিত্র বলছেন,
“মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি এই ঝুঁকি প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু যাঁদের পরিবারে থাইরয়েড ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে বা যাঁরা ইতিমধ্যেই থাইরয়েড সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ এড়িয়ে চলাই ভালো।”
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে প্যানক্রিয়াস সংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
এই ওষুধ নেওয়ার আগে কী কী পরীক্ষা দরকার?
এই ওষুধ শুরু করার আগে সাধারণত চিকিৎসকেরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করিয়ে থাকেন—
রক্তে শর্করার মাত্রা (ফাস্টিং ও পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল)
HbA1c
থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট
লিপিড প্রোফাইল
লিভার ও কিডনি ফাংশন টেস্ট
প্রয়োজন অনুযায়ী অল্ট্রাসোনোগ্রাফি (বিশেষ করে গলব্লাডার ও প্যানক্রিয়াস পরীক্ষা করার জন্য)
এই পরীক্ষাগুলির মাধ্যমে বোঝা যায়, রোগীর শরীর এই ওষুধ নেওয়ার জন্য উপযুক্ত কি না এবং কোনও গোপন ঝুঁকি রয়েছে কি না।
কেন শারীরিক প্রস্তুতি জরুরি?
এই ওষুধগুলির একটি বড় সমস্যা হল—এগুলি শুধু চর্বিই কমায় না, পাশাপাশি পেশির ভরও কমাতে পারে।
ডা. আশিস মিত্র জানাচ্ছেন,
“গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ধরনের ওষুধে প্রায় ৬১ শতাংশ চর্বি ঝরে, কিন্তু একই সঙ্গে ৩৯ শতাংশ পেশিও কমে যেতে পারে। এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।”
এই কারণে চিকিৎসকেরা বলেন—
ওষুধ শুরু করার আগে নিয়মিত স্ট্রেংথ ট্রেনিং বা রেজ়িস্ট্যান্স এক্সারসাইজ করা জরুরি।
পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে।
খুব কম ক্যালোরি ডায়েট করলে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, তাই তা এড়ানো উচিত।
শুধু ইনজেকশন নিয়ে বসে থাকলে শরীর ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
কত দিন খেতে হয় এই ওষুধ?
এই ওষুধগুলি সাধারণত সপ্তাহে এক বার ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়। কত দিন খেতে হবে, তা নির্ভর করে রোগীর ওজন, শারীরিক অবস্থা, ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের মাত্রা এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ওপর।
অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ওষুধ চলতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের মতো করে শুরু বা বন্ধ করা একেবারেই উচিত নয়।
ওষুধ বন্ধ করলে কি আবার ওজন বাড়ে?
এটি এই ওষুধগুলির আরেকটি বড় বাস্তবতা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়—ওষুধ বন্ধ করার পর ধীরে ধীরে আবার ওজন বাড়তে শুরু করে, বিশেষ করে যদি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় স্থায়ী পরিবর্তন না আনা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওষুধগুলি লাইফস্টাইল পরিবর্তনের বিকল্প নয়, বরং সহায়ক মাত্র। ডায়েট, ব্যায়াম ও আচরণগত পরিবর্তন ছাড়া শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ফল পাওয়া কঠিন।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী হতে পারে?
এই ওষুধগুলির কিছু সাধারণ ও কিছু বিরল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে।
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—
বমি ভাব
অম্বল
ঢেকুর
গ্যাস
বমি
ডায়ারিয়া
ক্ষুধামান্দ্য
কম হলেও গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া—
প্যানক্রিয়াটাইটিস
তীব্র পেটব্যথা
গলব্লাডারের সমস্যা
থাইরয়েড সংক্রান্ত জটিলতা (বিরল)
এই লক্ষণগুলির কোনওটি দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি।
ডায়াবিটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এই ওষুধের গুরুত্ব
টাইপ ২ ডায়াবিটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলির একটি বড় সুবিধা হল—এগুলি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ওজন কমাতেও সাহায্য করে। ডায়াবিটিস রোগীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ওজন অনেক সময় ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স বাড়িয়ে দেয় এবং হৃদরোগ, কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপের মতো ঝুঁকি বাড়ায়।
এই ওষুধগুলি ওজন কমিয়ে সেই ঝুঁকিগুলিও কিছুটা কমাতে পারে। তবে আবারও বলা দরকার—সব ডায়াবিটিস রোগীর জন্য এই ওষুধ উপযুক্ত নয়। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিচার করেই চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নেন।
কেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ বিপজ্জনক?
এই ওষুধগুলি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদ হল—অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই শুধুমাত্র ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে এগুলি ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ বিদেশ থেকে অনলাইনে কিনে আনছেন, আবার কেউ পরিচিত কারও প্রেসক্রিপশন দেখে নিজে থেকেই শুরু করছেন।
চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন—
ভুল ডোজে এই ওষুধ নিলে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
যাঁদের শরীরে আগে থেকেই নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ জীবনঘাতী ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
নিয়মিত ফলো-আপ ও পরীক্ষা না করলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে।
ডা. আশিস মিত্রের কথায়,
“এই ওষুধগুলি ম্যাজিক বুলেট নয়। সঠিক রোগী, সঠিক ডোজ ও সঠিক পর্যবেক্ষণ ছাড়া এগুলি ব্যবহার করা মানে নিজের শরীর নিয়ে জুয়া খেলা।”
এই ওষুধ কি সৌন্দর্যচর্চার জন্য ব্যবহার করা উচিত?
স্পষ্ট উত্তর—না। এই ওষুধগুলি কোনওভাবেই কসমেটিক বা ফিটনেস ওষুধ নয়। এগুলি মূলত রোগের চিকিৎসার জন্য তৈরি। শুধুমাত্র দেখতে রোগা হওয়ার জন্য এই ওষুধ ব্যবহার করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অনুচিত এবং বিপজ্জনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ ওজন কমানোর সেরা উপায় এখনও পর্যন্ত—
সুষম খাদ্যাভ্যাস
নিয়মিত ব্যায়াম
পর্যাপ্ত ঘুম
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
ওষুধ সেই প্রক্রিয়ার সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বিকল্প নয়।
৬১ শতাংশ চর্বি ঝরে, কিন্তু ৩৯ শতাংশ পেশিও কমে—কেন এটা বিপজ্জনক?
শরীরের পেশি শুধু শক্তির জন্য নয়—এটি বিপাকক্রিয়া, হাড়ের স্বাস্থ্য, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ ও দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশির ভর কমে গেলে—
শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে
হাঁটা-চলার ক্ষমতা কমে
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে
বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়
ভবিষ্যতে আবার ওজন বাড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়
এই কারণে চিকিৎসকেরা জোর দিয়ে বলেন—এই ওষুধ শুরু করার আগে ও চলাকালীন স্ট্রেংথ ট্রেনিং ও পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ অপরিহার্য।
এই ওষুধের খরচ ও সহজলভ্যতা
এই ওষুধগুলি তুলনামূলকভাবে বেশ দামি এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে হলে খরচ অনেক বেড়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই এগুলি নিয়মিত ফার্মেসিতে সহজে পাওয়া যায় না এবং কখনও কখনও আমদানি নির্ভরও হয়।
এই কারণে অনেকেই কম দামে অনলাইন বা অননুমোদিত উৎস থেকে কেনার চেষ্টা করেন, যা আরও বিপজ্জনক। ভেজাল বা ভুল ডোজের ওষুধ শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ—কখন এই ওষুধ বিবেচনা করবেন
ডা. আশিস মিত্রের মতে, এই ওষুধগুলি বিবেচনা করা যেতে পারে যদি—
ডায়েট ও ব্যায়াম সত্ত্বেও ওজন কমছে না
স্থূলত্বের কারণে ডায়াবিটিস, হৃদরোগ বা অন্য জটিলতা তৈরি হয়েছে
রোগী নিয়মিত চিকিৎসকের ফলো-আপে থাকতে রাজি
রোগীর মানসিক প্রস্তুতি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ইচ্ছা রয়েছে
কিন্তু শুধুমাত্র দ্রুত রোগা হওয়ার ইচ্ছায় এই ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।
ভবিষ্যতে কী বলছে গবেষণা?
এই ওষুধগুলিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তর গবেষণা চলছে। নতুন প্রজন্মের GLP-1 ও GIP রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট আরও কার্যকর ও কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত হতে পারে বলে আশা করছেন বিজ্ঞানীরা। একই সঙ্গে গবেষকেরা চেষ্টা করছেন এমন ফর্মুলা তৈরি করতে, যাতে চর্বি কমলেও পেশির ক্ষয় না হয়।
তবে যতদিন না সেই উন্নত সংস্করণ বাজারে আসছে, ততদিন এই ওষুধগুলি নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।