Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ঘি নিয়ে সমাজমাধ্যমে চর্চা বাঙালির জন্য কি সত্যিই দরকার স্বাস্থ্যকর ফ্যাট

পুষ্টিবিদ থেকে বলিউড তারকা—ঘি নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। কিন্তু বাঙালির শরীরে ঘিয়ের ভূমিকা কতটুকু? জানাচ্ছেন পুষ্টিবিদ রেশমী রায়চৌধুরী।

আজকাল সমাজমাধ্যমে, বিশেষত খাদ্য এবং জীবনযাপনের বিষয়গুলো নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও সুস্থ জীবনযাপনের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে, আর সেই সঙ্গে বিভিন্ন খাদ্যকে সুপারফুড হিসেবে প্রমোট করার চেষ্টা চলছে। ঘি (clarified butter) বা গি-ও সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এবং এখন এটি একটি জনপ্রিয় সুপারফুড হিসেবে পরিচিত। তবে, এই জনপ্রিয়তা শুধু সমাজমাধ্যমে নয়, বলিউডের বিভিন্ন তারকা এবং পুষ্টিবিদদের পরামর্শেও স্থান পেয়েছে।

বিশেষত বলিউডের পুষ্টিবিদ ঋজুতা দিবেকর, যিনি করিনা কপূরের পুষ্টিবিদ হিসেবেও পরিচিত, ঘি-কে সুপারফুড হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলছেন, ঘি শুধু একটি তেল নয়, এটি শরীরের জন্য উপকারী ফ্যাট সরবরাহ করে, যা শরীরের সঠিক পরিমাণে শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। তিনি তার পরামর্শে বলেছেন যে, যদি শরীরের কোনও নির্দিষ্ট সমস্যা থাকে, যেমন—ওজন বেড়ে যাওয়া, থাইরয়েডের সমস্যা, ত্বকে পিগমেন্টেশন বা কোষ্ঠকাঠিন্য, তাহলে দুপুরের খাবারে অন্তত এক চা চামচ ঘি যোগ করা যেতে পারে। এই পরিমাণ ঘি শরীরের জন্য উপকারী এবং ফ্যাট পরিপাক প্রক্রিয়া সহজতর করতে সাহায্য করে।

এছাড়া, ঘি-কে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট হিসেবে অভিহিত করার পক্ষে আরও অনেক পুষ্টিবিদ রয়েছেন। তারা জানান, ঘি কোষ থেকে ফ্যাট সলিউবল টক্সিন বের করে দেয় এবং শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এতে করে, শরীরের দ্রুত ওজন কমানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।

কিন্তু, এর বিপরীতে বাঙালি খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ঘি-র ভূমিকা নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। বাঙালি খাদ্যতালিকায় প্রচুর মাছ, ভাত, এবং অন্যান্য ফ্যাট-সমৃদ্ধ খাবার রয়েছে, যা শরীরের প্রয়োজনীয় ফ্যাট সরবরাহ করে। বাঙালি পুষ্টিবিদ রেশমী রায়চৌধুরি বলেছেন, “ভাতে-মাছে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁদের জন্য ঘি অপরিহার্য নয়। মাছ খেয়েই তাদের স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের অভাব হয় না।” তার মতে, ঘি অতিরিক্ত খাওয়া শরীরে অপ্রয়োজনীয় চর্বি জমাতে পারে এবং সেটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, বাঙালির খাবারে প্রচুর প্রাকৃতিক উৎস থেকে পুষ্টি পাওয়া যায়, তাই অতিরিক্ত ঘি খাওয়ার প্রয়োজন নেই।

তবে, ঘি সম্পর্কে অনেক বলিউড তারকা এবং তাদের পুষ্টিবিদরা আরও ব্যাপকভাবে প্রচার করছেন। করিনা কপূর বলেন, “ঘি ছাড়া খাবার অসম্পূর্ণ। আমি এটি নিজের প্রতিদিনের ডায়েটে রাখি।” ভূমি পেডনেকরও ঘি খাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী, কিন্তু তিনি ঘি কাঁচা খাওয়ার পক্ষে। তিনি বলেন, “এটি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। রুটি বা ইডলিতে ঘি মাখিয়ে খাই।” রাজকুমার রাওয়েরও ঘি সম্পর্কিত ধারণা রয়েছে। তিনি জানান, ঘি ভেজানো রুটি তাঁর কাছে বিলাসিতা এবং তিনি পরিবারের জন্য দেশি ঘি কিনে থাকেন।

বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে ঘি বেশিরভাগ সময়ই থাকে না। এখানে মাছ, ডাল, মুরগি ইত্যাদি খাবারেই যথেষ্ট ফ্যাট পাওয়া যায়। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কেউ নিরামিষাশী হন, তবে তার জন্য ঘি উপকারী হতে পারে, কিন্তু যারা মাছ, মাংস খেয়ে থাকেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত ঘি খাওয়া তেমন প্রয়োজন নেই।

শেষে বলা যায়, ঘি নিয়ে মতামত ভিন্ন হলেও, এটি শরীরের জন্য একটি প্রাকৃতিক ফ্যাট সরবরাহকারী খাদ্য উপাদান, তবে অতিরিক্ত খাওয়ার দরকার নেই। যদি এটি সঠিক পরিমাণে খাওয়া হয়, তবে তা শরীরের উপকারে আসবে, বিশেষ করে যাদের নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যা রয়েছে। তবে বাঙালিদের জন্য অতিরিক্ত ঘি খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরও গবেষণা ও আলোচনা প্রয়োজন।

করিনা কপূরের পুষ্টিবিদ ঋজুতা দিবেকর বলেন, ঘি হল স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, যা ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে। তিনি এমন কিছু শারীরিক অবস্থার মধ্যে ঘি খাওয়ার পরামর্শ দেন, যেমন—ওজন বেড়ে যাওয়ার সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা, ত্বকে পিগমেন্টেশন, বা কোষ্ঠকাঠিন্য। তাঁর মতে, এই সমস্যা গুলির সমাধানে দুপুরের খাবারে অন্তত এক চা চামচ ঘি যোগ করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে। তিনি এটিকে পরিমিত পরিমাণে ব্যবহারের পরামর্শ দেন, যাতে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণ পাওয়া যায় এবং অবাঞ্ছিত চর্বি জমা না হয়।

এছাড়া, অন্যান্য পুষ্টিবিদদের মতে, পরিমিত পরিমাণে ঘি খাওয়া কোষ থেকে ফ্যাট সলিউবল টক্সিন বের করে দেয় এবং এটি ফ্যাট পরিপাকে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। ফলে, শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট সহজেই শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে দ্রুত ওজন কমাতে সাহায্য করে।

বলিউড তারকারা এবং ঘি: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

এখন, চলুন বলিউড তারকাদের কথায় আসি। করিনা কপূর যেমন রোজ নিজের খাওয়ার পাতে ঘি চাই-ই চাই। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, “ঘি না হলে তো খাবারই ঠিক থাকে না।” ভূমি পেডনেকরও বলছেন, “খাবারে চিরকাল ঘি থাকবে। আমি ঘি দিয়ে রান্না করি না, কাঁচা ঘি খাই। রুটি বা ইডলিতে ঘি মাখিয়ে খাই বেশির ভাগ সময়ে। এটা স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ভাল।”

রাজকুমার রাওয়ের উদাহরণ দিলে দেখা যায়, ঘিতে ভেজানো রুটি তাঁর কাছে একটি বিলাসিতা। তিনি নিজেই তাঁর প্রথম মাইনে খরচ করে পরিবারকে দেশি ঘি এবং সব্জি কিনে দেন। সোহা আলি খানও তাঁর সন্তান ইনায়াকে ঘি খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন, কারণ এটি শরীরের স্বাস্থ্য মজবুত করে।

বাঙালি খাদ্যাভ্যাস এবং ঘি: পুষ্টিবিদের দৃষ্টিকোণ

news image
আরও খবর

এবার আসা যাক, শিকাগো নিবাসী পুষ্টিবিদ রেশমী রায়চৌধুরীর মতামতের দিকে। পুষ্টিবিদ রেশমী রায়চৌধুরি বলছেন, ঘি সম্পর্কে তাঁর মত খানিকটা ভিন্ন। তিনি দাবি করেন, ঘি পুরোপুরি প্রয়োজনীয় নয়, বিশেষ করে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে এটি অতিরিক্ত হতে পারে। তাঁর মতে, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে যথেষ্ট ভারসাম্য রয়েছে। এতে মাছ, ভাত এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া হয়, যেখানে ইতিমধ্যে সঠিক ফ্যাট পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, “ভাতে-মাছে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁদের জন্য ঘি অত্যাবশ্যক নয়। মাছ খেয়েই স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের যোগান মেলে। ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ মাছ খেলে পুষ্টিগুণের অভাব হবে না। তাই অকারণে ঘি বেশি খেয়ে শরীরে চর্বি জমাতে হবে না।”

রেশমী আরও বলেন, “উত্তর ভারত এবং পূর্ব ভারতের খাদ্যাভ্যাসে পার্থক্য রয়েছে। বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে ঘি এবং মিলেটের চল ছিল না। সুতরাং, ঘি শুধু নিরামিষাশীদের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে মাছ ও অন্যান্য খাদ্য সঠিক পরিমাণে ফ্যাট সরবরাহ করে, তাই ঘি অতিরিক্ত নয়।”

পুষ্টিবিদের যুক্তি

পুষ্টিবিদ রেশমী রায়চৌধুরী আরও বলেছেন, “আপনার পেট ছোট থেকে যে খাবার খেয়ে অভ্যস্ত, সেটা খেলেই আপনি সবচেয়ে বেশি সুস্থ থাকবেন। নিজের শিকড় থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন নতুন খাবার খাওয়ার দরকার নেই। বিশেষ করে বাঙালিদের জন্য, যাদের অভ্যস্ত খাদ্যাভ্যাসে ঘি, মিলেট এবং অন্যান্য উপাদান ছিল না।”

তিনি আরও জানান, “শুধুমাত্র ঘি খেলে শরীরের জন্য এটি উপকারী নয়। বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে মাছ, মুরগি, ডাল ইত্যাদি থেকে যথেষ্ট ফ্যাট পাওয়া যায়, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ঘি খাওয়া শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত চর্বি জমিয়ে ফেলতে পারে, যা শরীরের ক্ষতি করতে পারে।”

উপসংহার: ঘি এবং বাঙালি খাদ্যাভ্যাস

ঘি নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। সমাজমাধ্যম থেকে শুরু করে পুষ্টিবিদ এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে নিয়ে নানা মতামত প্রকাশ করছেন। বলা হচ্ছে, ঘি একটি সুপারফুড হিসেবে পরিচিত, যার ব্যবহার ও উপকারিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ঘি কতটা উপকারী বা প্রয়োজনীয় তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

বিশেষত, শিকাগো নিবাসী পুষ্টিবিদ রেশমী রায়চৌধুরীর মতে, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে ঘি অতিরিক্ত এবং প্রয়োজনীয় নয়। বাঙালি খাবারের মধ্যে মাছ, ভাত, ডাল, মাংস প্রভৃতি রয়েছে, যা যথেষ্ট ফ্যাট সরবরাহ করে। ফলে বাঙালির শরীরে প্রাকৃতিকভাবে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়। রেশমী রায়চৌধুরি বলছেন, “ভাতে-মাছে যাঁরা বড় হয়েছেন, তাঁদের জন্য ঘি অত্যাবশ্যক নয়।” তার মতে, মাছের মধ্যে রয়েছে ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা শরীরের জন্য উপকারী এবং অতিরিক্ত ঘি খাওয়া শরীরে অকারণ চর্বি জমাতে পারে।

অন্যদিকে, কিছু পুষ্টিবিদ এবং বলিউড তারকারা ঘি-কে সুপারফুড হিসেবে প্রমোট করছেন। করিনা কপূরের পুষ্টিবিদ ঋজুতা দিবেকর বলেছেন, ঘি শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী, বিশেষ করে যদি কেউ ওজন বাড়ানোর সমস্যায় ভোগেন অথবা কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা থাইরয়েডের সমস্যায় আক্রান্ত হন। তিনি দুপুরের খাবারে এক চা চামচ ঘি যোগ করার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, ঘি ফ্যাট সলিউবল টক্সিনকে শরীর থেকে বের করে দেয় এবং ফ্যাট পরিপাকে সহায়তা করে, ফলে অতিরিক্ত ফ্যাট শক্তিতে পরিণত হয় এবং শরীরের ওজন কমতে থাকে।

এছাড়া, বলিউডের অনেক তারকাও ঘি খাওয়ার পক্ষে। ভূমি পেডনেকর এবং সোহা আলি খান যেমন ঘি খাওয়ার পক্ষে, তারা বলেন, ঘি শরীরের জন্য ভাল এবং এটি খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তবে, তারা জানিয়ে দেন, তারা ঘি রান্নায় ব্যবহার করেন না, বরং কাঁচা ঘি খেতে পছন্দ করেন, যা খাবারের পুষ্টিগুণ বজায় রাখে। রাজকুমার রাওও বলেন, ঘি ভেজানো রুটি তাঁর কাছে বিলাসিতা, আর তিনি তাঁর পরিবারের জন্য দেশি ঘি কেনেন। এসব পরামর্শ থেকে এটা পরিষ্কার যে, ঘি-কে একটি সুপারফুড হিসেবে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তবে এটির প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যবহার বাঙালি খাদ্যাভ্যাসে অন্যভাবে দেখা হচ্ছে।

অতএব, ঘি নিয়ে যত আলোচনা হচ্ছে, তা থেকে প্রতিটি ব্যক্তির শরীরের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে ঘি না থাকলেও তাতে সমস্যা নেই, কারণ তাদের খাবারে অন্যান্য ফ্যাট-সমৃদ্ধ খাবারের উপস্থিতি রয়েছে। যাদের নিরামিষাশী খাদ্যাভ্যাস রয়েছে, তাদের জন্য ঘি একটি ভাল উৎস হতে পারে।

সুতরাং, ঘি খাওয়ার বিষয়ে বাস্তবতা বুঝে একটি সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। পরিমিত পরিমাণে ঘি খাওয়া শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে, তবে অতিরিক্ত ঘি খেয়ে শরীরে অযথা চর্বি জমিয়ে স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং, সঠিক পরিমাণে এবং সঠিক সময়ে ঘি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললেই তার সঠিক উপকারিতা

Preview image