Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

মাটিতে মিশতেই চায় না সিগারেটের ফিল্টার ১০ বছর পরেও বিষ ছড়ায় পরিবেশে জানা গেল নতুন গবেষণায়

পোড়া সিগারেটের ফিল্টারগুলিতে প্রাথমিক পর্যায়ের পচন দ্রুতই ঘটে। প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাইরের স্তরগুলি ভাঙতে শুরু করে। মাটিতে মিশে যেতে শুরু করে ওই অংশগুলি। এর পরে পচনের গতি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে কিংবা পার্কের বেঞ্চের পাশে— প্রায় সর্বত্রই চোখে পড়ে পোড়া সিগারেটের ফিল্টার। ক্ষুদ্র, তুচ্ছ বলে মনে হলেও এই ছোট্ট বর্জ্যটি যে পরিবেশের উপর কতটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, তা অনেকেরই অজানা। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই অভ্যাসগত অবহেলাই ধীরে ধীরে এক ভয়াবহ পরিবেশগত সমস্যার রূপ নিচ্ছে।

সিগারেটের ফিল্টার মূলত তৈরি হয় সেলুলোজ় অ্যাসিটেট নামক এক ধরনের প্লাস্টিকজাত পলিমার দিয়ে। অনেকেই ভুল করে মনে করেন এটি কাগজ বা তুলোর মতো সহজে পচনশীল। কিন্তু বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেলুলোজ় অ্যাসিটেট এমন এক উপাদান যা প্রাকৃতিক পরিবেশে খুব ধীরে ভাঙে, এবং সেই ভাঙনও সম্পূর্ণ হয় না। ফলে এটি দীর্ঘদিন ধরে মাটি, জল ও বায়ুর মধ্যে থেকে যায় এবং ধীরে ধীরে ক্ষতিকর রাসায়নিক ছড়াতে থাকে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, সিগারেটের ফিল্টার মাটিতে পড়ে থাকার পর ১০ বছর কেটে গেলেও তা পুরোপুরি পচে যায় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকের রূপ নেয়। এই মাইক্রোপ্লাস্টিক মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে, জলধারণ ক্ষমতা কমায় এবং মাটির জৈবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত করে। ফলে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে।

শুধু তাই নয়, সিগারেটের ফিল্টারের মধ্যে থাকা নিকোটিন, ভারী ধাতু এবং অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক ধীরে ধীরে মাটিতে মিশে যায়। এই বিষাক্ত উপাদানগুলি বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে ভূগর্ভস্থ জলেও পৌঁছাতে পারে। এর ফলে পানীয় জল দূষিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বিভিন্ন পরিবেশে সিগারেটের ফিল্টারের ক্ষয়ের হার ভিন্ন। শহুরে এলাকায় যেখানে দূষণ বেশি এবং জৈবিক কার্যকলাপ তুলনামূলক কম, সেখানে ফিল্টারের পচন আরও ধীর গতিতে ঘটে। অন্যদিকে, জৈবিক পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটিতে কিছুটা দ্রুত পরিবর্তন হলেও তা সম্পূর্ণ ক্ষয় হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বেলে মাটিতেও একই চিত্র দেখা যায়— ফিল্টার কিছুটা ভেঙে গেলেও তার মূল কাঠামো দীর্ঘদিন অটুট থাকে।

এই দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির কারণে সিগারেটের ফিল্টার পরিবেশে এক ধরনের “ধীর বিষ” হিসেবে কাজ করে। এটি একদিকে যেমন মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে, অন্যদিকে জীবজগতের উপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে। পোকামাকড়, কেঁচো বা অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণী এই ফিল্টারের সংস্পর্শে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি পাখি বা ছোট প্রাণীরা ভুল করে এগুলি খাদ্য ভেবে খেয়ে ফেলতে পারে, যা তাদের মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

জলাশয়ের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা ভয়াবহ রূপ নেয়। নদী, পুকুর বা সমুদ্রে ফেলে দেওয়া সিগারেটের ফিল্টার জলের মধ্যে থাকা প্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সিগারেটের ফিল্টার থেকেই নির্গত বিষাক্ত পদার্থ অল্প পরিমাণ জলে থাকা মাছ বা অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। ফলে জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

এছাড়া, সিগারেটের ফিল্টার থেকে নির্গত মাইক্রোপ্লাস্টিক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। ছোট জীব থেকে বড় জীব— ধাপে ধাপে এই প্লাস্টিক কণা মানুষের খাদ্যতালিকায়ও পৌঁছে যেতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনও সম্পূর্ণভাবে জানা না গেলেও, এটি যে মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

এই সমস্যার আরেকটি দিক হল এর ব্যাপকতা। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর ট্রিলিয়ন সংখ্যক সিগারেট ব্যবহার করা হয়, যার অধিকাংশের ফিল্টারই পরিবেশে ফেলে দেওয়া হয়। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য জমে গিয়ে এক বিশাল দূষণের উৎস তৈরি করছে। অথচ এই বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার জন্য কোনও কার্যকর ব্যবস্থা অধিকাংশ জায়গাতেই নেই।

সচেতনতার অভাবও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেকেই জানেন না যে সিগারেটের ফিল্টার প্লাস্টিকজাত এবং এটি পরিবেশের জন্য এতটা ক্ষতিকর। ফলে ধূমপানের পর ফিল্টার ফেলে দেওয়া যেন এক স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই মানসিকতা পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি।

news image
আরও খবর

সমাধানের পথ অবশ্য রয়েছে। প্রথমত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে একটি ছোট্ট ফিল্টারও পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সিগারেটের ফিল্টারের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব উপাদান ব্যবহার করার জন্য শিল্পক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে রাস্তার ধারে বর্জ্য ফেলা নিরুৎসাহিত করতে হবে।

এছাড়া, শহর ও জনবহুল এলাকায় নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার স্থান তৈরি করা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করা দরকার। ব্যক্তিগত পর্যায়েও দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি— ধূমপান করলে ফিল্টার নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলা উচিত, রাস্তার ধারে নয়।

সবশেষে বলা যায়, সিগারেটের ফিল্টার একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক পরিবেশ দূষণের উৎস। এটি চোখে পড়ার মতো বড় সমস্যা না হলেও, এর প্রভাব গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। আজ যে ফিল্টারটি আমরা অবহেলায় ফেলে দিচ্ছি, সেটিই হয়তো আগামী দশক ধরে পরিবেশে বিষ ছড়িয়ে যাবে। তাই এখনই সচেতন হওয়া এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি— নইলে এই ছোট্ট বর্জ্যই ভবিষ্যতের বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
 

উপসংহারে বলা যায়, সিগারেটের ফিল্টার—যা আমরা প্রায়ই তুচ্ছ বর্জ্য বলে উপেক্ষা করি—আসলে পরিবেশের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী ও নীরব বিপদের উৎস। একটি ক্ষুদ্র ফিল্টার হয়তো চোখে পড়ে না, কিন্তু তার প্রভাব বহু বছর ধরে জমতে জমতে প্রকৃতির উপর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। ১০ বছর পরেও যখন একটি ফিল্টার সম্পূর্ণরূপে মাটিতে মিশে যায় না এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক হিসেবে থেকে যায়, তখন সহজেই বোঝা যায় এই সমস্যার গভীরতা কতটা ভয়াবহ।

প্রকৃতির নিজস্ব একটি ভারসাম্য রয়েছে—মাটি, জল, বায়ু এবং জীবজগতের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক কাজ করে। কিন্তু সিগারেটের ফিল্টার সেই ভারসাম্যে ক্রমাগত বিঘ্ন ঘটায়। মাটির উর্বরতা কমে যায়, জল দূষিত হয়, ক্ষুদ্র জীবজন্তু থেকে শুরু করে বৃহৎ প্রাণী—সকলেই এর নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হয়। এমনকি এই বিষাক্ত উপাদান খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় স্বাস্থ্য সংকট ডেকে আনতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল—এই সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি, আবার একদিনে মিটবেও না। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অবচেতনে সিগারেটের ফিল্টার ফেলে দিচ্ছেন, আর সেই সঙ্গে অজান্তেই প্রকৃতির উপর চাপ বাড়াচ্ছেন। এই অভ্যাস যতদিন না বদলাবে, ততদিন এই দূষণ থামানো সম্ভব নয়। তাই সমস্যার সমাধান শুরু করতে হবে আমাদের নিজেদের থেকেই।

সচেতনতা এখানে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মানুষকে জানতে হবে যে সিগারেটের ফিল্টার কেবল একটি পোড়া টুকরো নয়, এটি প্লাস্টিকের মতোই ক্ষতিকর এবং দীর্ঘস্থায়ী দূষণের কারণ। ধূমপান করেন যারা, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি—নিজেদের ব্যবহৃত ফিল্টার সঠিকভাবে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, অন্যদেরও সচেতন করা এবং পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা।

একই সঙ্গে সরকার ও প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কঠোর আইন প্রয়োগ, জনবহুল স্থানে পর্যাপ্ত ডাস্টবিনের ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং পরিবেশবান্ধব বিকল্পের প্রচলন—এই সবকিছু মিলেই সমস্যার মোকাবিলা করা সম্ভব। গবেষণা ও প্রযুক্তির সাহায্যে যদি বায়োডিগ্রেডেবল ফিল্টার তৈরি করা যায়, তবে সেটি ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় আশার দিশা হতে পারে।

তবে সবশেষে মূল কথাটি হল—প্রকৃতিকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার। একটি ছোট্ট অভ্যাস পরিবর্তনই বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। আজ যদি আমরা সচেতন হই, দায়িত্বশীল আচরণ করি এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করি, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, স্বচ্ছ এবং নিরাপদ পরিবেশ রেখে যেতে পারব।

অতএব, রাস্তার ধারে পড়ে থাকা প্রতিটি সিগারেটের ফিল্টার আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা—এটি কেবল একটি বর্জ্য নয়, এটি আমাদের অবহেলার প্রতীক। সেই অবহেলাকে যদি আমরা এখনই গুরুত্ব দিয়ে সংশোধন না করি, তবে ভবিষ্যতে তার মূল্য দিতে হবে অনেক বেশি। তাই সময় এসেছে সচেতন হওয়ার, দায়িত্ব নেওয়ার এবং প্রকৃতির প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করার।

Preview image