দেব শুভশ্রীর অতীত, রুক্মিণীর বর্তমান আর বিনোদিনী চরিত্রকে ঘিরে কপি বনাম কাকতাল বিতর্কে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুঙ্গে টালিপাড়ার নীরব যুদ্ধ।
টালিগঞ্জ মানেই শুধু আলো, ক্যামেরা আর গ্ল্যামার নয়। এর আড়ালে আছে দীর্ঘশ্বাস, না বলা কথা, পুরনো সম্পর্কের ছায়া আর নতুন সমীকরণের টানাপোড়েন। এখানকার প্রতিটি গল্পের দু’টি দিক—একটা রুপোলি পর্দায় ঝকঝকে, আরেকটা নেপথ্যে নিঃশব্দ, কিন্তু তীব্র। সেই নেপথ্য গল্পই বারবার উঁকি দেয় সোশ্যাল মিডিয়ার আলোয়, জন্ম দেয় বিতর্কের, তুলনার, পক্ষ-বিপক্ষের। সাম্প্রতিক সময়ে ঠিক তেমনই এক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি নাম— ‘বিনোদিনী’।
এই ‘বিনোদিনী’ শুধু একটি চরিত্র নয়, শুধু একটি ছবির নাম নয়। ধীরে ধীরে তা হয়ে উঠেছে টালিপাড়ার দুই প্রজন্মের জনপ্রিয় নায়িকার মধ্যে অনিচ্ছাকৃত তুলনার প্রতীক। আর এই তুলনার শিকড়ে জড়িয়ে আছে অতীতের এক সুপারহিট জুটি, ভাঙা সম্পর্ক, নতুন প্রেম, আর নেটদুনিয়ার অতিসক্রিয় বিচারসভা।
একটি সাক্ষাৎকারে রুক্মিণী মৈত্র নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক পরিবেশের কথা। মায়াপুর যাওয়া, হরে কৃষ্ণ কীর্তন শোনা, চৈতন্য মহাপ্রভুর গেরুয়া বেশ—এই সব স্মৃতি তিনি ভাগ করে নিয়েছিলেন শান্ত, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
কিছুদিন পরেই শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের আরেকটি সাক্ষাৎকার সামনে আসে। সেখানেও তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি মন্দিরমুখী, বিশ্বাসী এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশে বড় হয়েছেন।
এই দুই বক্তব্য মিলিয়েই শুরু হয় নেটযুদ্ধ। কেউ বললেন “কপি”, কেউ বললেন “ইচ্ছাকৃত মিল”। আবার অন্য পক্ষ মনে করিয়ে দিলেন—শুভশ্রী বহু বছর আগেই বিভিন্ন শো ও সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশবের গল্প বলেছেন। কখনও নিজেকে টমবয় বলেছেন, কখনও স্বীকার করেছেন দুষ্টুমি আর মিথ্যে বলার কথা।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—বিশ্বাস বা আধ্যাত্মিকতা কি এক জনের একচেটিয়া সম্পত্তি? একাধিক মানুষের জীবনে কি একই রকম অভিজ্ঞতা থাকতে পারে না?
এই বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় যখন জানা যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় অভিনয় করছেন ঐতিহাসিক চরিত্র বিনোদিনী দাসী হিসেবে। বাংলা থিয়েটারের এক সাহসী, ব্যতিক্রমী নারীর গল্প পর্দায় ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে।
এখান থেকেই শুরু হয় নতুন তুলনা। কেউ কেউ অকারণেই টেনে আনেন রুক্মিণীর নাম। যদিও বাস্তবে এই চরিত্রের সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ নেই, তবুও তুলনার আগুনে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।
শুভশ্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁর বিনোদিনী আলাদা। এই চরিত্রের জন্য তিনি গবেষণা করেছেন, মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাঁর কাছে এটি একজন অভিনেত্রীর কাজ, কোনও ব্যক্তিগত লড়াই নয়।
কিন্তু নেটদুনিয়ার আদালতে যুক্তির জায়গা খুবই ছোট।
এই গোটা ঘটনার মূল চালিকাশক্তি সোশ্যাল মিডিয়া। এখানে একটি ক্লিপ, একটি লাইন, একটি ছবি—সবই যথেষ্ট বিতর্ক তৈরির জন্য। সম্পূর্ণ বক্তব্য বা প্রেক্ষাপটের তোয়াক্কা খুব কমই থাকে।
রুক্মিণী ও শুভশ্রী—দু’জনেই অনেক ক্ষেত্রে নীরব থেকেছেন। কিন্তু সেই নীরবতাও ব্যাখ্যার বাইরে যায়নি। কেউ বলেছে তা কৌশল, কেউ বলেছে পরিণত মনোভাব। বাস্তবে হয়তো তাঁরা দু’জনেই নিজেদের কাজে মন দিতে চেয়েছেন।
এই গোটা বিতর্ক আবারও সামনে আনে এক পুরনো প্রশ্ন—কেন বারবার নারী অভিনেত্রীদের তুলনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়? একজন পুরুষ তারকার জীবনে একাধিক সম্পর্ক থাকলেও, তুলনার বোঝা মূলত বইতে হয় নারীদেরই।
তাঁদের বিশ্বাস, বক্তব্য, পোশাক, এমনকি শৈশবের স্মৃতিও তুলনার বিষয় হয়ে ওঠে। অথচ তাঁরা আলাদা মানুষ, আলাদা জীবন নিয়ে এগোচ্ছেন।
এক সময় দেব আর শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন টালিগঞ্জের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনস্ক্রিন ও অফস্ক্রিন জুটি। একের পর এক হিট ছবি, প্রকাশ্যে বন্ধুত্ব, একসঙ্গে অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে অনুরাগীদের কাছে তাঁরা ছিলেন প্রায় রূপকথার নায়ক-নায়িকা। তাঁদের সম্পর্ক শুধু সিনেমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাস্তব জীবনেও সেই ঘনিষ্ঠতা ছিল স্পষ্ট।
কিন্তু সময়ের নিয়মে সেই সম্পর্ক ভেঙেছে। কেন ভেঙেছে, কী কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছে—সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর কোনওদিনই প্রকাশ্যে আসেনি। দু’জনেই নিজেদের মতো করে এগিয়ে গিয়েছেন জীবনে। শুভশ্রী আজ সুখী দাম্পত্যে, সন্তানসহ এক নতুন জীবনের অধ্যায় শুরু করেছেন। দেবের জীবনেও এসেছে নতুন সঙ্গী—রুক্মিণী মৈত্র।
তবু বাস্তবতা হল, দেব–শুভশ্রী অধ্যায় শেষ হলেও, অনুরাগীদের মনে সেই অধ্যায় আজও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আর সেই অসমাপ্ত আবেগই বারবার নতুন পরিস্থিতিতে পুরনো তুলনার আগুনে ঘি ঢালে।
রুক্মিণী মৈত্র যখন দেবের জীবনে এলেন, তখন থেকেই তুলনা অবধারিত হয়ে উঠেছিল। একদিকে দেবের প্রাক্তন প্রেমিকা, প্রতিষ্ঠিত নায়িকা শুভশ্রী; অন্যদিকে নতুন মুখ হলেও ফ্যাশন, ব্যক্তিত্ব আর আত্মবিশ্বাসে আলাদা করে নজর কাড়া রুক্মিণী। স্বাভাবিকভাবেই নেটদুনিয়া ভাগ হয়ে গেল—এক পক্ষ শুভশ্রীর, অন্য পক্ষ রুক্মিণীর।
কখনও পোশাক নিয়ে তুলনা, কখনও সাক্ষাৎকারের বক্তব্য, কখনও সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট—সবকিছুই যেন কাঁটাছেঁড়া হয়ে উঠল। অনেক ক্ষেত্রেই দুই নায়িকার কোনও সরাসরি মন্তব্য না থাকলেও, অনুরাগীদের ব্যাখ্যায় তৈরি হয়েছে কাল্পনিক দ্বন্দ্ব। নীরবতাকেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে ইঙ্গিত হিসেবে।
এই আবহেই ‘বিনোদিনী’ বিতর্কের বীজ রোপিত হয়।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রুক্মিণী মৈত্র নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছিলেন তাঁর আধ্যাত্মিক পরিবেশের কথা। মায়াপুর যাওয়া, হরে কৃষ্ণ কীর্তন শোনা, চৈতন্য মহাপ্রভুর গেরুয়া বেশের প্রতি আকর্ষণ—এই সব স্মৃতি তিনি ভাগ করে নিয়েছিলেন অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তাঁর বক্তব্যে ছিল আত্মঅন্বেষার ছাপ, শৈশবের সংস্কারের কথা।
এই সাক্ষাৎকার প্রকাশের কিছুদিন পরেই শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি আলাদা সাক্ষাৎকার সামনে আসে, যেখানে তিনিও নিজের ছোটবেলার গল্প বলতে গিয়ে জানান, তিনি ছোট থেকেই মন্দিরমুখী ছিলেন, বিশ্বাসী ছিলেন এবং আধ্যাত্মিক পরিবেশে বড় হয়েছেন।
ব্যস, এতেই শুরু বিতর্ক।
নেটদুনিয়ার একাংশ দাবি করল, রুক্মিণীর বক্তব্যের “প্রতিধ্বনি” শোনা যাচ্ছে শুভশ্রীর কথায়। শুরু হল “কপি” বনাম “কাকতাল” যুদ্ধ। কেউ কেউ তুলনা টানলেন শব্দচয়ন, কেউ কেউ সময়ের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন তুললেন।
অন্যদিকে, শুভশ্রীর সমর্থকেরা পাল্টা যুক্তি দিলেন—শুভশ্রী বহু বছর ধরেই নানা রিয়্যালিটি শো ও সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশবের গল্প বলেছেন। কখনও নিজেকে টমবয় হিসেবে তুলে ধরেছেন, কখনও স্বীকার করেছেন ছোটবেলায় দুষ্টুমি আর মিথ্যে বলার কথা। এমনকি তাঁর মাও একাধিকবার প্রকাশ্যে মেয়ের শৈশবের নানা গল্প বলেছেন।
তাহলে প্রশ্ন উঠল—বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা, মন্দিরে যাওয়া—এই অভিজ্ঞতা কি শুধুই একজনের হতে পারে? দুই মানুষের জীবনে কি মিল থাকতে পারে না?
এই বিতর্ক আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জানা যায়, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায় অভিনয় করছেন ‘বিনোদিনী’ চরিত্রে। ঐতিহাসিক ও নাট্যজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র বিনোদিনী দাসীকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব শুভশ্রীর কাঁধে।
এখানেই তুলনা আরও তীব্র হয়। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন—এই চরিত্র কি অন্য কেউ করলে ভালো হত না? কেউ আবার ইঙ্গিতপূর্ণভাবে রুক্মিণীর নাম টেনে আনেন, যদিও বাস্তবে এই চরিত্রের সঙ্গে তাঁর কোনও সরাসরি যোগ নেই।
শুভশ্রী অবশ্য আগেই জানিয়েছিলেন, তাঁর বিনোদিনী আলাদা। এই চরিত্রের প্রস্তুতি, গবেষণা, মানসিক পরিশ্রম—সবকিছুই তিনি নিজের মতো করে করছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—এই বিনোদিনী কোনও ব্যক্তিগত প্রতিযোগিতা নয়, এটি একজন শিল্পীর কাজ।
তবুও নেটদুনিয়ার যুদ্ধ থামেনি।
এই গোটা ঘটনার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হল সোশ্যাল মিডিয়া। এখানে কোনও সাক্ষাৎকারের ৩০ সেকেন্ডের ক্লিপই যথেষ্ট আগুন জ্বালাতে। সম্পূর্ণ বক্তব্য না শুনে, প্রেক্ষাপট না বুঝে তৈরি হয় সিদ্ধান্ত। লাইক, শেয়ার আর কমেন্টের দৌড়ে হারিয়ে যায় সংবেদনশীলতা।
রুক্মিণী বা শুভশ্রী—দু’জনেই বহু ক্ষেত্রে নীরব থেকেছেন। কিন্তু সেই নীরবতাও ব্যাখ্যা পেয়েছে নিজেদের মতো করে। কেউ বলেছে “ইঙ্গিতপূর্ণ চুপ”, কেউ বলেছে “পরিণত নীরবতা”।
আসলে, এই বিতর্ক যতটা না নায়িকাদের মধ্যে, তার চেয়েও বেশি অনুরাগীদের মধ্যে। পুরনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরা একদল, নতুন সমীকরণকে স্বীকার করা আরেক দল—এই দুইয়ের সংঘর্ষেই জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিনের নতুন গল্প।
এই গোটা ঘটনায় একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে—কেন বারবার নারী অভিনেত্রীদের তুলনার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়? দেবের জীবনে দুই আলাদা সময়ে দুই আলাদা মানুষ ছিলেন। কিন্তু সেই সম্পর্কের বোঝা যেন বইতে হচ্ছে মূলত দুই নায়িকাকেই।
তাঁদের পোশাক, বক্তব্য, বিশ্বাস, অভিনয়—সবকিছুতেই তুলনা। অথচ তাঁরা দু’জনেই আলাদা মানুষ, আলাদা জীবন, আলাদা যাত্রা নিয়ে এগিয়েছেন। একজন মা ও স্ত্রী হিসেবে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন, অন্যজন নিজের কেরিয়ার ও পরিচয় গড়ে তুলছেন ধীরে ধীরে।
‘বিনোদিনী’ চরিত্রও সেই তুলনার শিকার। একটি ঐতিহাসিক চরিত্রের শিল্পীসত্তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার বদলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ছায়া।
টালিগঞ্জ বারবার প্রমাণ করেছে—এখানে গল্প কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না। পুরনো অধ্যায় নতুন প্রেক্ষাপটে ফিরে আসে, নতুন নাম পায়, নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। ‘বিনোদিনী’ আজ তেমনই এক প্রতীক—যেখানে মিশে আছে অতীতের সম্পর্ক, বর্তমানের অবস্থান আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা।
কে কাকে কপি করল, কে কাকে ছাপিয়ে যাবে—এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো কোনও সাক্ষাৎকারে পাওয়া যাবে না। সময়ই ঠিক করবে, কোন কাজ স্মরণীয় হবে, কোন বিতর্ক মিলিয়ে যাবে।
তবে একটাই সত্য—বিশ্বাস, স্মৃতি, আধ্যাত্মিকতা কিংবা শৈশবের গল্প কোনও একক মালিকানার বিষয় নয়। বহু মানুষের জীবনেই তার প্রতিধ্বনি থাকতে পারে। আর সেই সত্যটা মেনে নিতে পারলেই হয়তো টালিগঞ্জের গল্পগুলো আরও একটু মানবিক হয়ে উঠবে।