Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

বঙ্গোপসাগরে তৈরি হচ্ছে ঘূর্ণিঝড় রাজ্যে কমতে পারে রাতের তাপমাত্রা

আগামী ৩–৪ দিনের মধ্যে রাজ্যে সকালের দিকে কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের উপকূলীয় ও পার্বত্য এলাকায়

বঙ্গোপসাগরের আবহাওয়া আবারও অস্থির হয়ে উঠছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। দক্ষিণ আন্দামান সাগর ও তার সংলগ্ন অঞ্চলে যে নিম্নচাপের অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল কয়েকদিন আগেই, সেটি ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে আগামী দিনে ঘনীভূত হয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে সেটি একটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেবে বলেই বিশেষজ্ঞদের অনুমান। যদিও এই ঘূর্ণিঝড়ের চূড়ান্ত গতিপথ কী হবে বা ভারতের উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের উপর কোনও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে কিনা তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত মন্তব্য করতে নারাজ আবহবিদেরা, তবুও সাগরের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা, বায়ুর আচরণ এবং মৌসুমি গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে অনুমান করা হচ্ছে যে এই সিস্টেমটি দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। সেই অবস্থান বদলের সঙ্গে সঙ্গে সাগরে ঢেউয়ের উচ্চতা, আর্দ্রতার পরিমাণ এবং বায়ুর দিকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা দিতে পারে যা পূর্ব ভারতের আবহাওয়াকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করতে পারে।

আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে যে বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে সরাসরি ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত হানার কোনও আশঙ্কা নেই। তবে সাগরে তৈরি হওয়া যেকোনও ঘূর্ণাবর্ত সিস্টেমই রাজ্যের আবহাওয়ার উপর পরোক্ষ প্রভাব ফেলে থাকে। সেই কারণেই তাপমাত্রার ওঠানামা, রাতের ঠাণ্ডার পরিমাণ বৃদ্ধি, সকালে কুয়াশা জমা, বাতাসে আর্দ্রতার পরিবর্তন ইত্যাদির মতো স্বাভাবিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আগামী কয়েকদিন রাজ্যে অনুভূত হতে পারে। কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় গত কয়েকদিন ধরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় খানিকটা কম রেকর্ড করা হচ্ছে। কলকাতায় আজকের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে প্রায় ষোলো ডিগ্রির দোরগোড়ায় যা এই সময়ের নিরিখে স্বাভাবিকের থেকে প্রায় দুই ডিগ্রি নিচে। এর ফলে সকাল ও রাতে শীতের অনুভূতি কিছুটা বাড়লেও দিনের বেলায় রোদ উঠলে আবহাওয়া আরামদায়ক থাকছে। যদিও শীতের এই আগমন ধীর গতির, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে শীতের আমেজ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আবহবিদেরা বলছেন যে উত্তর ভারতের দিকে ক্রমাগত পশ্চিমী ঝঞ্ঝা প্রবেশ করছে যা হাওয়া বদলের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই পশ্চিমী ঝঞ্ঝাগুলো যখন হিমালয়ের অঞ্চল অতিক্রম করে পূর্বদিকে সরে আসে, তখন পূর্ব ভারতের আবহাওয়াতেও তার প্রভাব অনিবার্য। মেঘলা আকাশ, মাঝেমধ্যে ঠান্ডা হাওয়া প্রবাহ, আবার হঠাৎ শুকনো বায়ু ঢুকে পড়া—এই সবই এই মৌসুমে পশ্চিমী ঝঞ্ঝার স্বাভাবিক লক্ষণ। তার সঙ্গে যদি সমুদ্রের দিক থেকে কোনও নিম্নচাপ তৈরি হয়, তাহলে দুই দিকের পরিস্থিতি মিলেমিশে আরও জটিলতা তৈরি করে। যদিও এবারের সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের মূলভূমিতে আঘাত হানবে না বলে মনে করা হচ্ছে, তবুও এটি সমুদ্রের বায়ুচক্রে পরিবর্তন আনে যা রাজ্যে শীতের গতিপথকে সাময়িকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

উত্তরবঙ্গের কিছু অংশে কুয়াশার প্রকোপ ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আলিপুরদুয়ার, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলার নীচু অঞ্চলে ভোরের দিকে ঘন কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে আসছে। সকালবেলায় যান চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে এবং স্থানীয় মানুষদের সকালবেলায় কাজে বেরোতে কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে যে আগামী তিন থেকে চার দিন এই কুয়াশা চলবে এবং রাতে তাপমাত্রা আরও এক ডিগ্রি পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তবে দিনের আবহাওয়া মোটামুটি পরিষ্কার ও মনোরম থাকবে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে দক্ষিণবঙ্গেও তাপমাত্রা ক্রমশ কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। হাওড়া, হুগলি, কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ—সব জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ধীরে ধীরে নেমে আসছে। যদিও শীতের প্রকৃত দাপট এখনও শুরু হয়নি, কিন্তু আবহাওয়ার এই পরিবর্তন বোঝাচ্ছে যে মৌসুমি পরিবেশ শীতের দিকে এগোচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরের ওপর গঠিত একটি সক্রিয় সিস্টেম অনেক সময় শীতের আগমনে সামান্য দেরি ঘটায়। কারণ, সেই সিস্টেম থেকে আর্দ্রতা পূর্ব ভারতের ওপর ছড়িয়ে পড়ে যা তাপমাত্রাকে কিছুটা উঁচুতে ধরে রাখে। তবে এবারের ক্ষেত্রে সেই আশঙ্কা কম। কারণ সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেকটাই দূরে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই রাজ্যের আবহাওয়ায় আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়লেও তা সাময়িক হবে এবং শীতের অগ্রযাত্রা থেমে যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

গ্রামাঞ্চলে ইতিমধ্যেই শীতের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। গ্রামবাসীরা সকালবেলা আগুন জ্বালিয়ে গা-গরম করছেন। গ্রামে গ্রামের ধানের খড় শুকোতে দেওয়া হচ্ছে, যেহেতু শীতের সময় পশুদের খাদ্যের জন্য খড়ের প্রয়োজন হয় বেশি। কৃষকেরাও এই আবহাওয়ার পরিবর্তন লক্ষ্য করে ফসলের পরিচর্যায় পরিবর্তন আনছেন। ধান কাটার কাজ প্রায় শেষ এবং এখন আলু, মটর, সর্ষে, ফুলকপি, বাঁধাকপি—এইসব শীতকালীন ফসলের যত্ন নেওয়ার সময়। যে কোনও সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় কৃষিকাজে প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এবারের সিস্টেমটি কলকাতা বা দক্ষিণবঙ্গের কৃষিজমিতে কোনও বড় ক্ষতি করবে বলে মনে করা হচ্ছে না কিন্তু সাগরের প্রভাব সামান্য বৃষ্টি বা বাতাসের গতিবৃদ্ধি আনতে পারে যার কারণে কয়েকটি ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই কৃষকেরা এখনো আবহাওয়ার প্রতিটি আপডেট নজরে রাখছেন।

news image
আরও খবর

শহরাঞ্চলে মানুষজন শীতের পোশাক বের করে রাখছেন। কলকাতার দোকানপাটে উলের জামা, চাদর, মাফলার, টুপি ইত্যাদির চাহিদা আগের তুলনায় বেড়েছে। অফিসযাত্রীদের মধ্যে অনেকে ভোরের দিকে বেরোনোর সময় শীতের আমেজ অনুভব করছেন। আবার দিনের বেলায় রোদ উঠলে আবহাওয়া উষ্ণ ও আরামদায়ক হওয়ায় শহরের উদ্যান, নদীর ধারের ঘাট, বইমেলার মতো জনবহুল জায়গাগুলিতে মানুষের ভিড়ও বাড়ছে। শীতের এই মনোরম আবহাওয়া বাঙালির রুচি অনুযায়ী প্রকৃতিকে পুরোপুরি উপভোগ করার সুযোগ এনে দেয়।

আবহাওয়াবিদেরা জানাচ্ছেন যে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির গড়নের প্রক্রিয়া এখনও প্রথম ধাপে রয়েছে। সাগরে শক্তি সঞ্চয়, বায়ুর চাপের পার্থক্য, দিক পরিবর্তন, সাগরের উপরের স্তরের তাপমাত্রা—এই সমস্ত উপাদানের ওপর ওই ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি নির্ভর করবে। যদি সাগরের তাপমাত্রা কম থাকে বা পর্যাপ্ত আর্দ্রতা তৈরি না হয়, তাহলে সিস্টেমটি ঘূর্ণিঝড়ে না-ও পরিণত হতে পারে। আবার যদি অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়, তাহলে সেটি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে একটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় হয়ে উঠতে পারে। তাই আগামী ৪৮ ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আবহবিদেরা মনে করছেন।

এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্যতার পাশাপাশি রাজ্যের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। যদিও কোনও বড় বিপদের আশঙ্কা নেই, তবুও সমুদ্রমুখী জেলাগুলির জেলেদের সাময়িকভাবে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে নিষেধ করা হতে পারে যদি সাগর আরও উত্তাল হয়। আপাতত বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি কিন্তু সাগরের পরিবর্তনশীল পরিবেশের কারণে পরবর্তী নির্দেশের জন্য সবাইকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।

এই সময়টায় যাতায়াত, কৃষিকাজ, স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা এবং দিনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনেও কিছু প্রভাব পড়তে পারে। শীতের শুরুতে ঠান্ডা-সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়ার মতো রোগের প্রকোপ বাড়ে। তাই চিকিৎসকেরা শিশু, বয়স্ক এবং শারীরিক দুর্বলতার শিকার মানুষদের সতর্ক থাকতে বলছেন। অপরদিকে হঠাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় গৃহহীন মানুষরাও সমস্যায় পড়েন। প্রশাসন সাধারণত এই সময়ে রাত্রিকালীন শেল্টার হোম খুলে দেয় এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত শীতবস্ত্রের ব্যবস্থাও করে। তাই সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের পাশাপাশি এই মৌসুমি পরিবর্তনের জন্যও প্রশাসন প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলতে গেলে বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া এই নতুন নিম্নচাপ এবং সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড় পশ্চিমবঙ্গে তেমন কোনও বিধ্বংসী প্রভাব ফেলবে না বলেই ধারণা। তবে তার পরোক্ষ প্রভাবে আবহাওয়ার কিছু পরিবর্তন—যেমন রাতের ঠান্ডা বাড়া, কুয়াশা জমা, বাতাসের আর্দ্রতা পরিবর্তন, শীতের তীব্রতার ওঠানামা—এইসব ঘটনা রাজ্যে অনুভূত হবে। আগামী কয়েকদিন এই পরিবর্তন অব্যাহত থাকবে এবং শীতের আগমন আরও পরিষ্কারভাবে অনুভূত হতে পারে। সাধারণ মানুষের উচিত আবহাওয়া দফতরের আপডেট নিয়মিত নজরে রাখা এবং প্রয়োজনে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। প্রকৃতি কখন কতটা পরিবর্তন আনবে তা বলা কঠিন, কিন্তু আগাম সতর্কতা সবসময়ই বিপদ কমাতে সাহায্য করে।

Preview image