ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সঠিক আটা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গম, বাজরা, জোয়ার নাকি মাল্টিগ্রেন—কোন আটা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশি সহায়ক? জেনে নিন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং স্বাস্থ্যকর আটা বেছে নেওয়ার সহজ উপায়।
ডায়াবেটিস বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্যতম পরিচিত দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসের দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। বিশেষ করে ভাত, রুটি, আলু কিংবা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। কারণ, এসব খাবার রক্তে শর্করার মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে রুটি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে রাতের খাবার পর্যন্ত অনেক পরিবারেই রুটি খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। কিন্তু ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই মনে করেন, সুস্থ থাকতে হলে রুটি খাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
পুষ্টিবিদদের মতে, এই ধারণা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। ডায়াবেটিস থাকলেও পরিমিত পরিমাণে রুটি খাওয়া সম্ভব। তবে সে ক্ষেত্রে আটার ধরন, ফাইবারের পরিমাণ, রুটির আকার এবং খাবারের অন্যান্য উপাদানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ‘জং’-এ প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের আটার পুষ্টিগুণ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
ডায়াবেটিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না অথবা তৈরি হওয়া ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
আমাদের প্রতিদিনের খাবারে থাকা কার্বোহাইড্রেট হজমের পর গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়। এই গ্লুকোজ শরীরের শক্তির প্রধান উৎস হলেও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এর মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
সাধারণত বেশি পরিশোধিত শস্যজাত খাবারে ফাইবারের পরিমাণ কম থাকে। অন্যদিকে পূর্ণশস্য বা তুষযুক্ত আটায় তুলনামূলক বেশি ফাইবার পাওয়া যায়।
ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার হজমের গতি ধীর করতে সাহায্য করে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে খাবারের পর রক্তে শর্করার দ্রুত বৃদ্ধি কম হতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, শুধু আটার ধরন পরিবর্তন করলেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে না। খাবারের মোট কার্বোহাইড্রেট, পরিমাণ, ওষুধ, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য যবের আটা একটি উপকারী বিকল্প হতে পারে। যবের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এতে থাকা বিটা-গ্লুকান নামের দ্রবণীয় ফাইবার।
এই ফাইবার পাকস্থলী ও অন্ত্রে খাবার হজম এবং গ্লুকোজ শোষণের গতি ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। ফলে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
যবের আটার সম্ভাব্য উপকারিতা:
দ্রবণীয় ফাইবারের ভালো উৎস।
খাবারের পর গ্লুকোজের দ্রুত বৃদ্ধি কমাতে সহায়ক হতে পারে।
দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে রক্তের ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।
যবের আটা দিয়ে রুটি তৈরি করা যায়। তবে এর গঠন গমের আটার তুলনায় আলাদা হওয়ায় অনেকেই স্বাদ ও নরমভাব বজায় রাখতে গমের আটার সঙ্গে যবের আটা মিশিয়ে ব্যবহার করেন।
যবের আটা খেলেও পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। কারণ, এতেও কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। পাশাপাশি যবে গ্লুটেন থাকে, তাই সিলিয়াক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি উপযুক্ত নয়।
ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকায় তুষযুক্ত পূর্ণগমের আটা বা লাল আটা রাখা যেতে পারে।
পূর্ণগমের আটায় শস্যের তুষ, অঙ্কুর ও মূল শস্যাংশ থাকে। ফলে অতিরিক্ত পরিশোধিত আটার তুলনায় এতে সাধারণত বেশি ফাইবার ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
তবে বাজারে বিক্রি হওয়া সব লাল রঙের আটাই যে প্রকৃত পূর্ণগমের আটা, তা নয়। কেনার সময় প্যাকেটের উপাদান তালিকায় 'Whole Wheat' বা '100% Whole Wheat' লেখা আছে কি না দেখে নেওয়া ভালো।
লাল আটার উপকারিতা:
পরিশোধিত ময়দার তুলনায় সাধারণত বেশি ফাইবার পাওয়া যায়।
হজম ও অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।
পেট ভরা রাখার অনুভূতি বাড়াতে পারে।
সুষম খাদ্যতালিকায় সহজে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
কিছু ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের উৎস।
তবে লাল আটার রুটিও অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে। তাই একে সম্পূর্ণ কার্বোহাইড্রেটমুক্ত বা সীমাহীনভাবে খাওয়ার উপযোগী খাবার ভাবা উচিত নয়।
জোয়ার বা Sorghum দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে জনপ্রিয় একটি শস্য। জোয়ারের আটা দিয়ে তৈরি রুটি অনেকের কাছে স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে পরিচিত।
জোয়ারে ফাইবার, প্রোটিন এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। এটি প্রাকৃতিকভাবে গ্লুটেনমুক্তও।
জোয়ারের পূর্ণশস্যের আটা খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনতে পারে। তবে জোয়ারের তৈরি সব খাবারের গ্লাইসেমিক প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। আটা কতটা মিহি, কীভাবে রান্না করা হচ্ছে এবং কতটা খাওয়া হচ্ছে, তার ওপর প্রভাব নির্ভর করে।
জোয়ারের রুটির সঙ্গে ডাল, শাকসবজি বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা ভালো।
বাজরা বা Pearl Millet দিয়ে তৈরি আটা ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকায় আরেকটি বিকল্প হতে পারে।
বাজরায় ফাইবারের পাশাপাশি ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।
ম্যাগনেশিয়াম শরীরের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। তবে বাজরা খাওয়ার মাধ্যমে একাই ইনসুলিনের সমস্যা দূর হবে, এমন দাবি করার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
বাজরার আটা দিয়ে রুটি, চিলা বা অন্যান্য খাবার তৈরি করা যায়। বিশেষ করে পরিশোধিত ময়দার বদলে পূর্ণশস্যের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে বাজরার রুটিতেও যথেষ্ট কার্বোহাইড্রেট থাকে। তাই শুধু স্বাস্থ্যকর মনে করে অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়।
রাগি বা Finger Millet ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বহুল ব্যবহৃত একটি শস্য।
রাগির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। পাশাপাশি এতে কিছু ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
অনেকেই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রাগিকে আদর্শ খাবার মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে রাগির আটা দিয়ে তৈরি খাবারের গ্লাইসেমিক প্রভাব রান্নার পদ্ধতি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।
বিশেষ করে খুব মিহি রাগির আটা দিয়ে তৈরি কিছু খাবার দ্রুত হজম হতে পারে। তাই রাগি খেলেই রক্তে শর্করা কম থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
রাগির রুটি বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে শাকসবজি ও প্রোটিন রাখা উপকারী।
ছোলার আটা বা বেসনও ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
গমের আটার তুলনায় বেসনে সাধারণত বেশি প্রোটিন থাকে। এতে ফাইবারও রয়েছে, যা খাবারকে আরও পুষ্টিকর করতে সাহায্য করে।
বেসন দিয়ে চিলা, সবজিযুক্ত প্যানকেক বা মিশ্র আটার রুটি তৈরি করা সম্ভব।
তবে বেসন দিয়ে তৈরি সব খাবার সমান স্বাস্থ্যকর নয়। প্রচুর তেলে ভাজা পাকোড়া বা অন্যান্য ভাজাভুজিতে অতিরিক্ত ক্যালরি ও চর্বি থাকতে পারে।
তাই বেসনের খাবার তৈরির সময় কম তেল ব্যবহার করা এবং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট আটাকে সবার সেরা বলা কঠিন। প্রতিটি আটার আলাদা পুষ্টিগুণ রয়েছে।
যবের আটা: বিটা-গ্লুকান ফাইবারের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
পূর্ণগমের লাল আটা: প্রতিদিনের রুটির জন্য সহজলভ্য ও ফাইবারসমৃদ্ধ বিকল্প।
জোয়ারের আটা: পূর্ণশস্যের পুষ্টি উপাদান এবং গ্লুটেনমুক্ত বৈশিষ্ট্যের জন্য পরিচিত।
বাজরার আটা: ফাইবার ও খনিজ উপাদানের উৎস।
রাগির আটা: ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ, তবে রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব রান্না ও পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল।
ছোলার আটা: তুলনামূলক বেশি প্রোটিন ও ফাইবারের জন্য উপযোগী বিকল্প।
কোনটি কার জন্য ভালো হবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া, খাদ্যাভ্যাস, হজমের সমস্যা, পুষ্টির চাহিদা এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থার ওপর।
অনেকেই জানতে চান, ডায়াবেটিস থাকলে দিনে কয়টি রুটি খাওয়া নিরাপদ?
এই প্রশ্নের উত্তর সবার জন্য এক নয়।
কারও জন্য একটি মাঝারি রুটি উপযুক্ত হতে পারে, আবার অন্য কারও খাদ্যপরিকল্পনায় ভিন্ন পরিমাণ রাখা হতে পারে।
রুটির সংখ্যা নির্ধারণের সময় কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন:
রুটির আকার ও ব্যবহৃত আটার পরিমাণ।
একই খাবারে ভাত, আলু বা অন্যান্য কার্বোহাইড্রেট আছে কি না।
ব্যক্তির বয়স, ওজন ও শারীরিক পরিশ্রম।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বর্তমান অবস্থা।
ইনসুলিন বা অন্যান্য ওষুধের ব্যবহার।
একটি বড় রুটিতে দুটি ছোট রুটির সমান বা তার চেয়েও বেশি কার্বোহাইড্রেট থাকতে পারে। তাই শুধু রুটির সংখ্যা নয়, মোট কার্বোহাইড্রেটের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজনে একজন রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা তৈরি করে দিতে পারেন।
শুধু রুটি খাওয়ার বদলে খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত শাকসবজি এবং প্রোটিনসমৃদ্ধ উপাদান রাখা ভালো।
উদাহরণ হিসেবে রুটির সঙ্গে ডাল, ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, পনির কিংবা অন্যান্য প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে।
একই সঙ্গে শসা, পালং শাক, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লাউ বা অন্যান্য কম স্টার্চযুক্ত সবজি খাদ্যতালিকায় রাখা উপকারী।
সুষম খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি প্রোটিন ও ফাইবার থাকলে খাবারের পর রক্তে শর্করার দ্রুত বৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
তবে অতিরিক্ত তেল, ঘি বা মাখন দিয়ে রুটি তৈরি করলে খাবারের ক্যালরি বেড়ে যেতে পারে। তাই রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরনের মাল্টিগ্রেন আটা পাওয়া যায়। অনেক প্যাকেটে লেখা থাকে 'Diabetes Friendly', 'Healthy Atta' অথবা 'High Fibre'।
কিন্তু শুধু এই ধরনের লেখা দেখেই কোনো আটা কেনা উচিত নয়।
মাল্টিগ্রেন বলতে একাধিক শস্যের মিশ্রণ বোঝায়। এতে পূর্ণশস্য থাকতে পারে, আবার পরিশোধিত শস্যও থাকতে পারে।
কোনো মাল্টিগ্রেন আটায় যদি পরিশোধিত ময়দার পরিমাণ বেশি থাকে, তাহলে সেটি সব সময় পূর্ণগমের আটার চেয়ে ভালো হবে না।
তাই প্যাকেটের উপাদান তালিকা, প্রতি ১০০ গ্রামে ফাইবারের পরিমাণ এবং মোট কার্বোহাইড্রেটের তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা GI হলো কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ কোনো খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা কত দ্রুত বাড়াতে পারে, তার একটি পরিমাপ।
সাধারণভাবে কম GI-যুক্ত খাবার তুলনামূলক ধীরে রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে। তবে শুধু GI দেখেই কোনো খাবার নির্বাচন করা যথেষ্ট নয়।
কারণ, একটি খাবার কতটা খাওয়া হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই গ্লাইসেমিক লোড বা GL-এর ধারণা প্রাসঙ্গিক। এটি খাবারের GI-এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিমাণ খাবারে থাকা কার্বোহাইড্রেটকেও বিবেচনায় নেয়।
এ ছাড়া একই আটার রুটি বিভিন্নভাবে তৈরি করলে তার গ্লাইসেমিক প্রতিক্রিয়া আলাদা হতে পারে।
তাই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য শুধু কম GI লেখা পণ্য কেনার বদলে সম্পূর্ণ খাদ্যতালিকার ভারসাম্যের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার পরেও কিছু সাধারণ ভুলের কারণে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
প্রথমত, অনেকে মনে করেন যব, বাজরা বা রাগির রুটি যত খুশি খাওয়া যায়। বাস্তবে এসব খাবারেও কার্বোহাইড্রেট রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, শুধু রুটি পরিবর্তন করলেও অনেকে মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত চিনি বা অন্যান্য পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমান না।
তৃতীয়ত, বাজারে পাওয়া ডায়াবেটিস-ফ্রেন্ডলি লেখা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেন।
চতুর্থত, অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করে শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
এই ধরনের সিদ্ধান্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন চিকিৎসার সহায়ক হলেও প্রয়োজনীয় ওষুধের বিকল্প নয়।
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে একই খাবারের প্রতিক্রিয়া ব্যক্তি অনুযায়ী আলাদা হতে পারে।
কোনো নতুন আটার রুটি খাওয়া শুরু করলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী খাবারের আগে এবং খাবারের পর রক্তে শর্করা পরীক্ষা করে পরিবর্তন বোঝা যেতে পারে।
একই সঙ্গে রুটির পরিমাণ ও খাবারের অন্যান্য উপাদান প্রায় একই রাখলে তুলনা করা সহজ হয়।
যাঁরা ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করেন, তাঁদের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। কারণ, খাবারের কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে কিছু ক্ষেত্রে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিনের খাবারে পূর্ণশস্য, শাকসবজি, পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।
নিয়মিত হাঁটা বা শরীরের উপযোগী ব্যায়াম ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে রক্তে শর্করা ও HbA1c পরীক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস কতটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা বোঝা যায়।
ডায়াবেটিস মানেই প্রিয় রুটি চিরতরে বাদ দিতে হবে, এমন নয়। বরং সঠিক আটা নির্বাচন, পরিমিত পরিমাণ এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে রুটিকে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখা সম্ভব।
যবের আটা বিটা-গ্লুকান ফাইবারের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। পূর্ণগমের লাল আটা সহজলভ্য একটি ভালো বিকল্প। পাশাপাশি জোয়ার, বাজরা, রাগি ও ছোলার আটাও খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনতে পারে।
তবে কোনো একটি আটা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী খাবারের পরিমাণ নির্ধারণ করা এবং রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা।
মনে রাখবেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি শুধু কোন আটা খাচ্ছেন তা নয়, বরং কতটা খাচ্ছেন, কীসের সঙ্গে খাচ্ছেন এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রা কেমন—তার ওপর নির্ভর করে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এই প্রতিবেদনটি সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা বা ডায়েট চার্টের বিকল্প নয়। ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা অন্য কোনো জটিল স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে খাদ্যতালিকা পরিবর্তনের আগে চিকিৎসক বা রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শ নিন।