Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

ফাইনালে হারলেও ২০৩০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার টিকিট নিশ্চিত! নেপথ্যে ফিফার বড় সিদ্ধান্ত

চার বছর পরের বিশ্বকাপে আগেভাগেই জায়গা নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা। ফিফার বিশেষ সিদ্ধান্তের সুবাদে বাছাইপর্বের আগেই টিকিট পেয়ে গেল বর্তমান রানার্সআপরা।

ফাইনালে হারলেও ২০৩০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার টিকিট নিশ্চিত! নেপথ্যে ফিফার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ পর্যন্ত শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙেছে লিয়োনেল মেসিদের। অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের জয়সূচক গোল আর্জেন্টিনার সমর্থকদের স্তব্ধ করে দিলেও, প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর সামনে এসেছে এমন একটি খবর, যা তাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারে। চার বছর পরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই জায়গা নিশ্চিত করে ফেলেছে আর্জেন্টিনা।

তবে এই যোগ্যতা আর্জেন্টিনা মাঠে নেমে কোনও বাছাইপর্বের ম্যাচ জিতে অর্জন করেনি। বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে ফিফার নেওয়া একটি বিশেষ এবং ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কারণেই দক্ষিণ আমেরিকার এই ফুটবল শক্তির সামনে সরাসরি খুলে গিয়েছে ২০৩০ বিশ্বকাপের দরজা।

ফিফার সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেন ২০৩০ বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক। অন্যদিকে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্‌যাপনের অংশ হিসেবে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়েতে একটি করে বিশেষ ম্যাচ আয়োজন করা হবে। আয়োজক ও শতবর্ষ উদ্‌যাপনের ম্যাচের স্বাগতিক হিসেবে এই ছয়টি দেশই নিজ নিজ মহাদেশের বরাদ্দ থেকে সরাসরি ২০৩০ বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করেছে।

ফাইনালের হতাশার মধ্যেই সুখবর

একটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয়ের যন্ত্রণা যে কোনও দলের কাছেই গভীর। বিশেষ করে যখন সেই দলটি আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন এবং টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বসেরা হওয়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেই হতাশার মাত্রা আরও বেশি হয়।

আর্জেন্টিনা এবারও বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল, দলটি আবারও ট্রফি জিতবে এবং বিশ্ব ফুটবলে নতুন ইতিহাস গড়বে। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ম্যাচের নির্ধারিত সময়ে কোনও দল গোল করতে না পারলেও অতিরিক্ত সময়ে স্পেন ম্যাচের একমাত্র গোলটি করে। ফলে শেষ পর্যন্ত রানার্স-আপ হয় আর্জেন্টিনা।

এই পরাজয়ের কারণে আর্জেন্টিনার ফুটবলার, কোচিং স্টাফ এবং কোটি কোটি সমর্থকের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিযোগিতা শেষ হতেই আলোচনায় উঠে এসেছে ২০৩০ বিশ্বকাপ। সেখানেই রয়েছে আর্জেন্টিনার জন্য বড় স্বস্তি।

সাধারণভাবে একটি বিশ্বকাপে খেলার জন্য সংশ্লিষ্ট মহাদেশের বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসতে হয়। দক্ষিণ আমেরিকার দলগুলিকে কনমেবলের দীর্ঘ এবং অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাছাইপর্বে অংশ নিতে হয়। ব্রাজিল, উরুগুয়ে, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, চিলি, প্যারাগুয়ের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হোম ও অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলার পর বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয়।

কিন্তু ২০৩০ সালের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার জন্য সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হবে না। ফিফার সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার বহু আগেই তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে।

কেন সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পেল আর্জেন্টিনা?

আর্জেন্টিনার সরাসরি যোগ্যতা অর্জনের প্রধান কারণ বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদ্‌যাপন।

ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম আসর অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে। সেই ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতার আয়োজক ছিল উরুগুয়ে। প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উরুগুয়ে।

২০৩০ সালে সেই প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের ১০০ বছর পূর্ণ হবে। ফলে প্রতিযোগিতাটিকে কেবল আরেকটি সাধারণ বিশ্বকাপ হিসেবে আয়োজন না করে শতবর্ষের ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে ফিফা।

এই কারণেই মূল প্রতিযোগিতার আয়োজক মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেন হলেও শতবর্ষ উদ্‌যাপনের বিশেষ ম্যাচ দক্ষিণ আমেরিকায় আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ে একটি করে ম্যাচ আয়োজন করবে। ফিফা জানিয়েছে, উরুগুয়ের মন্টেভিডিয়োয় শতবর্ষ উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠান এবং একটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। আর্জেন্টিনায়ও একটি ম্যাচ হবে—১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে দেশটির ফাইনালিস্ট হওয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে।

অর্থাৎ আর্জেন্টিনাকে ২০৩০ বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক বলা সম্পূর্ণ সঠিক হবে না। মূল আয়োজক মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেন। তবে শতবর্ষ উদ্‌যাপনের ম্যাচের স্বাগতিক হিসেবে আর্জেন্টিনা বিশেষ আয়োজক দেশের মর্যাদা পাচ্ছে। আর সেই কারণেই তারা সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার অধিকার অর্জন করেছে।

ছয় দেশে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ

২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হতে চলেছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজনগুলির একটি। প্রতিযোগিতার ম্যাচ ছড়িয়ে থাকবে ছয়টি দেশে এবং তিনটি মহাদেশে।

মূল প্রতিযোগিতার আয়োজক দেশ হল—

স্পেন
পর্তুগাল
মরক্কো

এর পাশাপাশি শতবর্ষ উদ্‌যাপনের একটি করে ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে—

উরুগুয়ে
আর্জেন্টিনা
প্যারাগুয়ে

news image
আরও খবর

এর ফলে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকা—তিনটি মহাদেশের ছয়টি দেশ ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন আয়োজন আগে কখনও দেখা যায়নি।

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে প্রতিযোগিতার সূচনাপর্ব দক্ষিণ আমেরিকায় রাখা হবে। তারপর মূল প্রতিযোগিতার বাকি ম্যাচগুলি মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেনে অনুষ্ঠিত হবে। ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, দক্ষিণ আমেরিকায় শতবর্ষ উদ্‌যাপনের ম্যাচগুলির পর খেলোয়াড়দের যাত্রা, বিশ্রাম এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় রাখা হবে।

এই আয়োজন একদিকে যেমন বিশ্বকাপের ঐতিহ্যকে সম্মান জানাবে, অন্যদিকে ফুটবলকে সত্যিকারের বৈশ্বিক উৎসব হিসেবে তুলে ধরবে।

ছয় দেশই সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করেছে

বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত আয়োজক দেশকে বাছাইপর্ব খেলতে হয় না। আয়োজক দেশ সরাসরি মূলপর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।

২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। ফলে তিন দেশই আয়োজক হিসেবে সরাসরি মূলপর্বে জায়গা পেয়েছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে একাধিক দেশের যৌথভাবে প্রতিযোগিতা আয়োজনের নজির আগেও থাকলেও ২০৩০ সালে সংখ্যাটি আরও বড় হচ্ছে।

২০৩০ সালের ক্ষেত্রে প্রধান আয়োজক হিসেবে মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেন সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করেছে। একই সঙ্গে শতবর্ষ উদ্‌যাপনের ম্যাচের স্বাগতিক হিসেবে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়েকেও সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার অধিকার দেওয়া হয়েছে।

ফিফার সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ছয়টি দেশের সরাসরি যোগ্যতা তাদের নিজ নিজ মহাদেশের বরাদ্দ করা আসনের মধ্যেই গণনা করা হবে। অর্থাৎ তাদের জায়গা সম্পূর্ণ অতিরিক্ত আসন হিসেবে যুক্ত হচ্ছে না। ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার জন্য বিশ্বকাপে যতগুলি আসন বরাদ্দ থাকবে, তার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট আয়োজক দেশের জায়গা অন্তর্ভুক্ত হবে।

এই সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পাশাপাশি উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্ব সাধারণত খুব কঠিন হয়। সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স করতে হয়। কিন্তু এবার এই তিন দেশ আগে থেকেই নিজেদের বিশ্বকাপের জায়গা নিশ্চিত করে ফেলেছে।

আর্জেন্টিনার জন্য সিদ্ধান্তটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

আর্জেন্টিনার মতো ফুটবল শক্তির পক্ষে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন সাধারণত প্রত্যাশিত বিষয়। দেশটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সফল দল। তবুও কোনও বাছাইপর্বকে কখনও হালকাভাবে নেওয়া যায় না।

দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে প্রতিটি ম্যাচ কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে খেলতে হয়, কখনও অত্যন্ত গরম আবহাওয়া, কখনও দীর্ঘ যাত্রা এবং কখনও প্রতিপক্ষের প্রবল সমর্থনের মুখে পড়তে হয়। শক্তিশালী দলগুলিও এই বাছাইপর্বে নিয়মিত পয়েন্ট হারায়।

এ অবস্থায় আগে থেকেই বিশ্বকাপের জায়গা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

প্রথমত, দল গঠনের ক্ষেত্রে তাদের হাতে বেশি সময় থাকবে। কোচ নতুন ফুটবলারদের পরীক্ষা করতে পারবেন। ভবিষ্যতের তারকাদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভ্যস্ত করার সুযোগ পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের উপর অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব হবে। বাছাইপর্বের প্রতিটি ম্যাচে ফল পাওয়ার বাধ্যবাধকতা না থাকলে খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও ক্লাব ফুটবলের ব্যস্ততা বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা সহজ হবে।

তৃতীয়ত, আর্জেন্টিনা চাইলে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক দলের বিরুদ্ধে বেশি প্রস্তুতি ম্যাচ আয়োজন করতে পারবে। বিশ্বকাপের আগে ইউরোপ, আফ্রিকা বা এশিয়ার বিভিন্ন ধরনের ফুটবল সংস্কৃতির দলের বিরুদ্ধে খেলে নিজেদের প্রস্তুত করার সুযোগ থাকবে।

চতুর্থত, ২০৩০ সালের জন্য একটি নতুন প্রজন্ম তৈরি করার প্রক্রিয়া আরও পরিকল্পিতভাবে করা যাবে। বর্তমান দলের অনেক অভিজ্ঞ ফুটবলারের জায়গায় ধীরে ধীরে নতুনদের নিয়ে আসতে হবে। সরাসরি যোগ্যতা নিশ্চিত হওয়ায় এই পরিবর্তন করতে গিয়ে বাছাইপর্ব থেকে ছিটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে না।

মেসি কি ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলবেন?

আর্জেন্টিনার জায়গা নিশ্চিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—লিয়োনেল মেসি কি ২০৩০ বিশ্বকাপে খেলবেন?

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আর্জেন্টিনার যোগ্যতা নিশ্চিত হয়েছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে মেসির অংশগ্রহণও নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে।

২০৩০ বিশ্বকাপের সময় মেসি ফুটবলার হিসেবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে থাকবেন কি না, তা নির্ভর করবে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা, ফর্ম, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপর।

Preview image