Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আর্জেন্টিনার জয়ে রেফারির পক্ষপাত? বিতর্কের জবাব দিলেন মেসি

মিশরের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও দুরন্ত প্রত্যাবর্তনে জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের পর রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠতেই বিতর্কে মুখ খুললেন লিয়োনেল মেসি

মঙ্গলবার মিশরের বিরুদ্ধে পিছিয়ে পড়েও নাটকীয় জয় তুলে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ফলাফল আর্জেন্টিনা শিবিরে স্বস্তি আনলেও শেষ বাঁশি বাজার পর থেকেই শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। মিশর শিবিরের অভিযোগ, ম্যাচে রেফারির একাধিক সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার পক্ষে গিয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে VAR এবং মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মিশরের সমর্থক থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের একাংশ। এই বিতর্কের আবহেই এ বার মুখ খুললেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিয়োনেল মেসি।

ম্যাচের পর মেসি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, রেফারির কোনও সিদ্ধান্তেই তিনি আপত্তির কারণ দেখছেন না। তাঁর মতে, ম্যাচটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও রেফারি পরিস্থিতি সামলেছেন যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে। মেসির কথায়, “সত্যি বলতে, অসাধারণ রেফারিং হয়েছে। প্রত্যেকটা সিদ্ধান্তই প্রায় নিখুঁত ছিল। আপনারাই বলুন কোন সিদ্ধান্ত রেফারি ভুল নিয়েছেন। প্রতিটা সিদ্ধান্ত নিয়েই আমি খুশি।” আর্জেন্টিনার অধিনায়কের এই মন্তব্যের পর বিতর্ক আরও চর্চায় উঠে এসেছে। কারণ, মিশর শিবির যেখানে রেফারিং নিয়ে সরব, সেখানে মেসি সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন।

মিশরের বিরুদ্ধে ম্যাচটি শুরু থেকেই সহজ ছিল না আর্জেন্টিনার জন্য। প্রতিপক্ষের গতিময় ফুটবল, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং শরীরী ফুটবলের সামনে প্রথম দিকে কিছুটা চাপে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। মিশর নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে চাপ তৈরি করে এবং সুযোগ বুঝে আক্রমণে যায়। ম্যাচের এক পর্যায়ে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের লড়াই করার মানসিকতা আবারও দেখা যায়। ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরে তারা। শেষ পর্যন্ত চাপ সামলে জয় ছিনিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা।

তবে এই জয়ের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে রেফারি বিতর্ক। মিশরের অভিযোগ, আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে বক্সের মধ্যে মহম্মদ সালাহকে ফাউল করা হয়েছিল। তাঁদের দাবি, সেই ঘটনায় পেনাল্টি পাওয়া উচিত ছিল মিশরের। কিন্তু রেফারি খেলা চালিয়ে যান। এরপরই আর্জেন্টিনা পাল্টা আক্রমণ গড়ে তোলে এবং গোল করে। এই ঘটনাকেই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করছেন মিশরের সমর্থকেরা। তাঁদের মতে, যদি ওই মুহূর্তে পেনাল্টি দেওয়া হত, ম্যাচের ফল সম্পূর্ণ অন্যরকম হতে পারত।

যদিও অন্য দিক থেকে দাবি করা হচ্ছে, রিপ্লেতে দেখা গিয়েছে নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকোর পা সালাহের পায়ে লাগার আগে বল স্পর্শ করেছিল। অর্থাৎ সেটি সরাসরি ফাউল হিসেবে গণ্য করা কঠিন। এই যুক্তিতেই রেফারি খেলা থামাননি বলে মনে করছেন আর্জেন্টিনা সমর্থকেরা। VAR-ও সেই ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেনি। ফুটবলে এমন সিদ্ধান্ত প্রায়ই বিতর্ক তৈরি করে, কারণ স্লো-মোশন রিপ্লেতে একটি ঘটনা যেমন দেখা যায়, মাঠের বাস্তব গতিতে তা অনেক সময় অন্যরকম মনে হতে পারে। কিন্তু এই ধরনের নকআউট ম্যাচে প্রতিটি সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অনেক বেশি। ফলে বিতর্ক হওয়াই স্বাভাবিক।

শুধু সালাহকে ঘিরে পেনাল্টির দাবি নয়, মিশরের একটি গোল বাতিল হওয়াও বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। মিশর শিবিরের দাবি, সেই গোল বৈধ ছিল। কিন্তু রেফারি এবং VAR-এর মতে, আক্রমণ শুরুর সময় লিসান্দ্রো মার্তিনেজ়কে ফাউল করা হয়েছিল। সেই কারণেই গোলটি বাতিল করা হয়। আর্জেন্টিনা শিবিরের দাবি, সিদ্ধান্তটি নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়েছে। মিশরের অভিযোগ, একই ধরনের ঘটনায় একবার VAR কঠোর হয়েছে, আরেকবার নীরব থেকেছে। এখান থেকেই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।

ম্যাচের পর সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় প্রবল আলোচনা। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা দাবি করেন, জয় সম্পূর্ণ প্রাপ্য। তাঁদের মতে, পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত জেতা আর্জেন্টিনার চরিত্রের প্রমাণ। অন্যদিকে মিশরের সমর্থকেরা বলেন, ম্যাচে তাঁদের দলকে ন্যায্য সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে বড় দলের বিরুদ্ধে ছোট বা তুলনামূলক কম আলোচিত দলের ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেই বিতর্ক আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই ম্যাচেও তাই হয়েছে।

মেসির মন্তব্য এই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সাধারণত রেফারি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে ফুটবলাররা সতর্ক থাকেন। কিন্তু মেসি এই ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভাষায় রেফারির প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রেফারি ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো খুব ভালভাবে সামলেছেন। তিনি কোনও সিদ্ধান্তে অন্যায় দেখেননি। মেসির এই মন্তব্য আর্জেন্টিনা সমর্থকদের কাছে আত্মবিশ্বাসের বার্তা হলেও মিশর শিবিরের ক্ষোভ কমার সম্ভাবনা কম।

এই ধরনের ম্যাচে রেফারির ভূমিকা সব সময়ই নজরে থাকে। বিশেষ করে VAR চালুর পর ফুটবলে বিতর্ক কমার বদলে অনেক সময় আরও বেড়েছে। কারণ, দর্শকরা এখন প্রতিটি ঘটনার একাধিক রিপ্লে দেখেন। একটি ফাউল, একটি অফসাইড, একটি হ্যান্ডবল বা একটি সংঘর্ষ—সব কিছুই বিভিন্ন কোণ থেকে বিচার করা হয়। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হয় মাঠের রেফারি ও VAR টিমকে। সেই সিদ্ধান্ত যদি কারও পক্ষে যায়, অন্য পক্ষের কাছে তা অন্যায় মনে হতে পারে। মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচও সেই পুরনো বিতর্কের নতুন অধ্যায় হয়ে উঠল।

আর্জেন্টিনার জন্য এই জয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পিছিয়ে পড়ে জেতা শুধু স্কোরলাইনের বিষয় নয়, এটি মানসিক শক্তিরও প্রমাণ। বড় প্রতিযোগিতায় এমন ম্যাচ জেতা দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে নকআউট পর্বে একবার হারলেই বিদায়। সেখানে চাপ সামলে ম্যাচে ফেরা সহজ নয়। আর্জেন্টিনা সেটাই করেছে। মেসি নিজেও জানেন, এই ধরনের জয় দলের ভিত আরও শক্ত করে।

news image
আরও খবর

তবে মিশরের দিক থেকেও ম্যাচটি সম্মানের। তারা আর্জেন্টিনাকে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। ম্যাচের বড় অংশে তারা লড়াই করেছে সমানে সমানে। দ্রুত আক্রমণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং সাহসী ফুটবলের মাধ্যমে আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলেছিল মিশর। শেষ পর্যন্ত ফল তাদের পক্ষে না গেলেও পারফরম্যান্স নিয়ে তারা গর্ব করতেই পারে। কিন্তু রেফারিং বিতর্ক সেই পারফরম্যান্সের আলোচনাকে অনেকটাই ছাপিয়ে দিয়েছে।

মিশরের দাবি অনুযায়ী, ম্যাচের কয়েকটি সিদ্ধান্ত তাদের বিপক্ষে গেছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলের আগে সালাহকে ঘিরে ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বক্সের ভিতরে সামান্য স্পর্শ, বল আগে খেলা হয়েছিল কি না, প্রতিপক্ষের পা শরীরে লেগেছিল কি না—এই সব প্রশ্ন নিয়েই তর্ক চলছে। ফুটবলে এমন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত সব সময় সাদা-কালো হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই রেফারির ব্যাখ্যা এবং VAR-এর দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আর্জেন্টিনা শিবির অবশ্য বিতর্কে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে না। তাঁদের লক্ষ্য পরবর্তী ম্যাচ। বড় প্রতিযোগিতায় এগোতে হলে দ্রুত বিতর্ক ভুলে প্রস্তুতিতে ফিরতে হয়। মেসির মন্তব্যেও সেই বার্তাই স্পষ্ট। তিনি রেফারির সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট এবং দলের জয়ে খুশি। একই সঙ্গে তিনি ম্যাচের মান নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ম্যাচটি ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং উপভোগ্য।

মেসির বক্তব্য নিয়ে ফুটবল মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকে বলছেন, জয়ী দলের অধিনায়ক হিসেবে মেসি স্বাভাবিকভাবেই রেফারির সিদ্ধান্তকে সঠিক বলবেন। আবার অনেকে মনে করছেন, মেসি যেহেতু মাঠে ছিলেন, তিনি পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখেছেন। তাই তাঁর মন্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ফুটবলে এমন বিতর্কে কোনও পক্ষই সাধারণত সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হয় না। তবুও একজন অধিনায়কের দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়ের সঙ্গে সঙ্গে আবারও সামনে এসেছে বড় দলের ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রেফারির একটি সিদ্ধান্ত পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ বদলে দিয়েছে। কখনও পেনাল্টি, কখনও লাল কার্ড, কখনও অফসাইড, কখনও গোল বাতিল—এই সব মুহূর্তই পরবর্তীতে দীর্ঘদিন আলোচিত হয়েছে। মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচও হয়তো সেই তালিকায় জায়গা করে নেবে।

তবে নিয়মের দিক থেকে দেখলে, রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। VAR থাকলেও সব সিদ্ধান্ত বদলানো হয় না। VAR সাধারণত স্পষ্ট ভুল বা গুরুতর ঘটনার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে। কোনও ঘটনা যদি ব্যাখ্যাযোগ্য হয় এবং রেফারির মাঠের সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করা না যায়, সে ক্ষেত্রে VAR সিদ্ধান্ত না বদলাতেও পারে। সালাহকে ঘিরে ঘটনাটিতে ঠিক এই প্রশ্নই উঠছে—ঘটনাটি কি স্পষ্ট ফাউল ছিল, নাকি বল আগে খেলা হয়েছিল? এই ব্যাখ্যার জায়গা থেকেই বিতর্কের জন্ম।

মিশরের বাতিল হওয়া গোল নিয়েও একইরকম প্রশ্ন। যদি আক্রমণের শুরুতে ফাউল হয়ে থাকে, তবে গোল বাতিল হওয়া নিয়মসঙ্গত। কিন্তু মিশর শিবির মনে করছে, সেই ফাউলটি এতটা গুরুতর ছিল না যে গোল বাতিল করতে হবে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা শিবিরের মতে, ফাউল হলে আক্রমণ অবৈধ, তাই গোল বাতিল সঠিক। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমাধান পাওয়া কঠিন।

ম্যাচের আবেগও বিতর্ককে বাড়িয়ে দিয়েছে। নকআউট ম্যাচে হার মানে বিদায়। তাই হেরে যাওয়া দলের কাছে প্রতিটি সিদ্ধান্ত আরও বেদনাদায়ক মনে হয়। মিশর যদি ওই পেনাল্টি পেত এবং গোল করত, তাহলে ম্যাচের স্কোরলাইন বদলে যেতে পারত। আবার আর্জেন্টিনা সমর্থকদের যুক্তি, ফুটবল শুধু এক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হয় না; পুরো ৯০ মিনিটের খেলাই গুরুত্বপূর্ণ। তারা মনে করেন, আর্জেন্টিনা লড়াই করে জয় পেয়েছে।

 

Preview image