বিশ্বের অন্যতম প্রখ্যাত জার্মান বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা সংস্থা মার্সিডিজ-বেন্জ আবারও আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল গাড়ির অতিরিক্ত দূষণ সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে সংস্থাটি প্রায় ১.৪৯৬ বিলিয়ন ডলারের একটি বড়সড় আইনি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি রাজ্য, ডিস্ট্রিক্ট অফ কলাম্বিয়া এবং পুয়ের্তো রিকোর সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগের মূল বিষয় ছিল মার্সিডিজ-বেন্জের কিছু ডিজেল গাড়িতে এমন সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, যা সরকারি নির্গমন পরীক্ষার সময় কম দূষণ দেখালেও বাস্তব রাস্তায় চলার সময় নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত করত। এই ধরনের প্রযুক্তিকে পরিবেশ আইনের ভাষায় ডিফিট ডিভাইস বলা হয়।
বিশ্বের অন্যতম নামী জার্মান গাড়ি নির্মাতা সংস্থা মার্সিডিজ-বেন্জ (Mercedes-Benz) আবারও বড়সড় আইনি বিতর্কের কেন্দ্রে। ডিজেল গাড়ির নির্গমন (emission) সংক্রান্ত অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক রাজ্য সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটাতে সংস্থাটি সম্মত হয়েছে প্রায় ১.৪৯৬ বিলিয়ন ডলার (১৪৯.৬ মিলিয়ন ডলার নয়, প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার) মূল্যের এক বিশাল নিষ্পত্তি চুক্তিতে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ আনুমানিক ১৮ হাজার কোটি টাকা।
এই নিষ্পত্তি শুধু একটি কর্পোরেট চুক্তি নয়, বরং এটি পরিবেশ সুরক্ষা, ভোক্তা অধিকার এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলির নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।? কী নিয়ে এই মামলা?
যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি রাজ্য, সঙ্গে ডিস্ট্রিক্ট অফ কলাম্বিয়া ও পুয়ের্তো রিকো—মোট ৫০টিরও বেশি প্রশাসনিক ইউনিট অভিযোগ তোলে যে মার্সিডিজ-বেন্জ তাদের কিছু ডিজেল গাড়িতে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে, যা সরকারি পরীক্ষার সময় গাড়ির দূষণ মাত্রা কম দেখালেও বাস্তব রাস্তায় চলার সময় অনেক বেশি ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত করে।
এই প্রযুক্তিকে বলা হয়
“Defeat Device”
অর্থাৎ এমন সফটওয়্যার বা যান্ত্রিক ব্যবস্থা, যা পরীক্ষার পরিবেশ চিনে নিয়ে নিজেকে বদলে ফেলে।
মার্কিন প্রশাসনের তদন্তে উঠে আসে যে, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিক্রি হওয়া একাধিক মার্সিডিজ ডিজেল মডেল এই অভিযোগের আওতায় পড়েছে। এসব গাড়ি পরীক্ষাগারে নির্গমন মান বজায় রাখলেও সাধারণ ড্রাইভিং অবস্থায় পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নাইট্রোজেন অক্সাইড নির্গত করত। পরিবেশবিদদের মতে, এই গ্যাস মানুষের শ্বাসযন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগ, ফুসফুসের সমস্যা ও শিশুদের স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে বিষয়টি শুধু আইন লঙ্ঘনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
এই নিষ্পত্তি চুক্তির আওতায় মার্সিডিজ-বেন্জকে বড় অঙ্কের অর্থ প্রদান করতে হবে এবং একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকদের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও প্রযুক্তিগত সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট গাড়িগুলিতে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আপডেট করা হবে এবং গ্রাহকদের অতিরিক্ত ওয়ারেন্টি সুবিধাও দেওয়া হবে। যদিও সংস্থাটি প্রকাশ্যে কোনও প্রতারণার অভিযোগ স্বীকার করেনি, তবে দীর্ঘ আইনি লড়াই এড়াতে এবং ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কমানোর লক্ষ্যেই এই নিষ্পত্তিতে পৌঁছানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা আবারও ২০১৫ সালের ভক্সওয়াগেন ডিজেল কেলেঙ্কারির স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যখন একই ধরনের অভিযোগে জার্মান অটো শিল্প বড় ধাক্কা খেয়েছিল। সেই সময় ভক্সওয়াগেনকে কয়েক হাজার কোটি ডলার জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছিল। মার্সিডিজ-বেন্জের বিরুদ্ধে ওঠা বর্তমান অভিযোগ প্রমাণ করে যে, সেই কেলেঙ্কারির পরেও ডিজেল প্রযুক্তি ঘিরে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন পুরোপুরি মিটে যায়নি। পরিবেশ সংগঠনগুলির দাবি, বড় গাড়ি নির্মাতারা লাভের স্বার্থে বারবার পরিবেশগত দায়িত্বকে উপেক্ষা করছে।
মার্সিডিজ-বেন্জের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই নিষ্পত্তির আর্থিক প্রভাব তাদের সামগ্রিক ব্যবসার উপর বড় কোনও চাপ সৃষ্টি করবে না, কারণ আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য অর্থ সংরক্ষণ করা ছিল। পাশাপাশি সংস্থা ভবিষ্যতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইতিমধ্যেই মার্সিডিজ ঘোষণা করেছে যে, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে তারা ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন নির্ভরতা কমিয়ে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে এগোতে চায়।
এই নিষ্পত্তিকে অনেকেই পরিবেশ আন্দোলনের একটি বড় জয় হিসেবে দেখছেন, যদিও অনেকে মনে করছেন যে শুধুমাত্র আর্থিক জরিমানা দিলেই পরিবেশের ক্ষতি পূরণ হয় না। তবুও এই চুক্তি বিশ্বজুড়ে অটো শিল্পের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে—পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করলে নামী ব্র্যান্ড হলেও ছাড় পাওয়া যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণ যখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে, তখন এই ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার দাবি জোরালো করবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মার্কিন তদন্তকারী সংস্থাগুলির মতে, মূলত ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তৈরি কিছু Mercedes-Benz ডিজেল মডেল এই মামলার আওতায় পড়েছে। এই গাড়িগুলি মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা আইন (Clean Air Act) লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ।
যদিও মার্সিডিজ সরাসরি প্রতারণার কথা স্বীকার করেনি, তবুও তারা আইনি ঝামেলা এড়াতে এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক ক্ষতি কমাতে এই নিষ্পত্তিতে সম্মত হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক নিষ্পত্তি চুক্তির মধ্যে রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক—
মোট নিষ্পত্তির পরিমাণ: ১.৪৯৬ বিলিয়ন ডলার
রাজ্য সরকার ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলিকে এই অর্থ প্রদান করা হবে।
প্রভাবিত গাড়ির মালিক ও লিজধারীদের
প্রতি গাড়ির জন্য সর্বোচ্চ ২,০০০ ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ
কিছু ক্ষেত্রে বিনামূল্যে সফটওয়্যার আপডেট ও সার্ভিস সুবিধা
গাড়িগুলিতে নতুন সফটওয়্যার ইনস্টল করে দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা
নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উপর বাড়তি ওয়ারেন্টি
চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত নয়
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন
ডিজেল গাড়ির অতিরিক্ত নাইট্রোজেন অক্সাইড (NOx) নির্গমন—
শ্বাসকষ্ট
অ্যাজমা
হৃদরোগ
শিশু ও বয়স্কদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রতারণা শুধু আইন ভাঙা নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের উপর সরাসরি আঘাত।
এই ঘটনা অনেককেই মনে করিয়ে দিয়েছে ২০১৫ সালের কুখ্যাত
Volkswagen Dieselgate Scandal
সেই সময় ভক্সওয়াগেনকে দিতে হয়েছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা ও ক্ষতিপূরণ।
বিশ্লেষকদের মতে, ভক্সওয়াগেন কেলেঙ্কারির পরেও যদি অন্য সংস্থাগুলি একই পথে হাঁটে, তবে তা কর্পোরেট সংস্কৃতির গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
মার্সিডিজ-বেন্জের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে—
তারা সরাসরি কোনো বেআইনি কাজের স্বীকারোক্তি করছে না
তবে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান সমস্ত ডিজেল সংক্রান্ত মামলা একসঙ্গে মেটাতেই এই নিষ্পত্তি
কোম্পানির আর্থিক স্থিতিতে এর বড় প্রভাব পড়বে না, কারণ আগেই অর্থ সংরক্ষণ করা ছিল
এই নিষ্পত্তি মার্সিডিজের জন্য একদিকে বড় আর্থিক চাপ, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা।
ব্র্যান্ড ইমেজে ধাক্কা
ডিজেল প্রযুক্তি থেকে দ্রুত সরে আসার চাপ
বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) ও হাইব্রিড প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি
মার্সিডিজ-বেন্জ ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে—
২০৩০ সালের মধ্যে অনেক বাজারে সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তরের লক্ষ্য
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নিষ্পত্তি সেই রূপান্তরকে আরও দ্রুততর করবে।
পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে—
“এই নিষ্পত্তি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—
বড় কোম্পানিও আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলি বলছে—
“এটি একটি জয়, কিন্তু পুরো ন্যায়বিচার নয়।”
বিশ্বের অন্যতম প্রখ্যাত জার্মান বিলাসবহুল গাড়ি নির্মাতা সংস্থা মার্সিডিজ-বেন্জ আবারও আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল গাড়ির অতিরিক্ত দূষণ সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে সংস্থাটি প্রায় ১.৪৯৬ বিলিয়ন ডলারের একটি বড়সড় আইনি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮টি রাজ্য, ডিস্ট্রিক্ট অফ কলাম্বিয়া এবং পুয়ের্তো রিকোর সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগের মূল বিষয় ছিল—মার্সিডিজ-বেন্জের কিছু ডিজেল গাড়িতে এমন সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, যা সরকারি নির্গমন পরীক্ষার সময় কম দূষণ দেখালেও বাস্তব রাস্তায় চলার সময় নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত করত। এই ধরনের প্রযুক্তিকে পরিবেশ আইনের ভাষায় “ডিফিট ডিভাইস” বলা হয়।
মার্সিডিজ-বেন্জের এই ১.৪৯৬ বিলিয়ন ডলারের নিষ্পত্তি শুধু একটি আইনি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়। এটি আধুনিক শিল্পসভ্যতার সামনে বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে—
পরিবেশ বনাম মুনাফা
প্রযুক্তি বনাম নৈতিকতা
উন্নয়ন বনাম মানবস্বাস্থ্য
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখন এই ধরনের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—