ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকলেও তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং গোটা ডিমে থাকা প্রোটিন, ভালো ফ্যাট ও জরুরি পুষ্টিগুণ হৃদ্‌স্বাস্থ্য ও সার্বিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই কারণেই চিকিৎসকেরা কুসুম বাদ না দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
কোলেস্টেরলের ভয়ে বহু মানুষই ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশ খান। দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে কুসুমে কোলেস্টেরল বেশি থাকায় তা হৃদ্যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও চিকিৎসকদের সাম্প্রতিক মতামত বলছে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং সুস্থ শরীরের জন্য গোটা ডিম খাওয়াই বেশি উপকারী।
ডিমের কুসুমে সত্যিই কোলেস্টেরল থাকে। একটি মাঝারি আকারের ডিমে প্রায় ১৮০ ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকতে পারে। এক সময় মনে করা হতো, খাবারের মাধ্যমে কোলেস্টেরল বেশি গ্রহণ করলে সরাসরি রক্তের কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। কিন্তু পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের কোলেস্টেরলের বেশিরভাগ অংশই তৈরি হয় লিভারে। খাবার থেকে আসা কোলেস্টেরল তার তুলনায় অনেক কম প্রভাব ফেলে।
আসলে শরীরের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নির্ভর করে
সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
জেনেটিক ফ্যাক্টর
শুধু কুসুম খাওয়াই যে কোলেস্টেরল বাড়ার মূল কারণ, তা আজ আর চিকিৎসকেরা মানেন না।
ডিমের কুসুম শুধু কোলেস্টেরল নয়, পুষ্টির ভাণ্ডারও বটে। কুসুমে রয়েছে
ভিটামিন A, D, E ও K এই ফ্যাট সলিউবল ভিটামিনগুলো চোখ, হাড়, ত্বক ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
কোলিন: মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য, স্মৃতিশক্তি ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। গর্ভবতী নারীদের জন্য কোলিন বিশেষভাবে দরকারি।
ভালো ফ্যাট HDL বাড়াতে সহায়ক কুসুমে থাকা কিছু ফ্যাট শরীরের “ভালো কোলেস্টেরল” বাড়াতে সাহায্য করে।
লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করে, বিশেষ করে বয়সজনিত দৃষ্টিশক্তি দুর্বলতা কমাতে সহায়ক।
এই সব উপাদান শুধু ডিমের সাদা অংশে নেই। কুসুম বাদ দিলে আপনি এই গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণগুলোর বড় অংশ থেকেই বঞ্চিত হন।
ডিমের সাদা অংশে মূলত প্রোটিন থাকে এতে কোনো সন্দেহ নেই। যারা খুব কড়া ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণে আছেন বা বডিবিল্ডিং করেন, তারা অনেক সময় শুধু সাদা অংশ খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে শুধু সাদা অংশ খাওয়া মানেই সম্পূর্ণ পুষ্টি পাওয়া নয়।
গোটা ডিমে থাকা প্রোটিনের বায়োলজিক্যাল ভ্যালু বেশি, অর্থাৎ শরীর তা আরও ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, গোটা ডিম খেলে পেশি গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড শরীর বেশি কার্যকরভাবে শোষণ করে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ১টি গোটা ডিম খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে ডিম খেলে ভালো কোলেস্টেরল HDLবাড়ে, যা হৃদ্যন্ত্রকে সুরক্ষা দেয়।
তবে এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ
ডিম কীভাবে খাওয়া হচ্ছে।
তেলে ভাজা ডিম
মাখন বা অতিরিক্ত চিজ দিয়ে রান্না করা ডিম
ডিমের সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাবার সসেজ, বেকন ইত্যাদি
এসব অভ্যাসই আসলে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বেশি ক্ষতিকর, ডিম নিজে নয়।
যদিও অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য গোটা ডিম নিরাপদ ও উপকারী, তবুও কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
যাদের খুব বেশি কোলেস্টেরল রয়েছে
যাদের ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত
যাদের পারিবারিক হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া আছে
এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে ডিমের পরিমাণ ও নিয়ম ঠিক করে দেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
সাধারণভাবে চিকিৎসকেরা বলেন
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা সপ্তাহে ৫ ৭টি গোটা ডিম নিরাপদে খেতে পারেন।
সক্রিয় জীবনযাপন বা নিয়মিত শরীরচর্চা করলে অনেক সময় প্রতিদিন ১টি ডিমও সমস্যা করে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডিম যেন থাকে সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে সবজি, ফল, শস্য ও ভালো ফ্যাটের সঙ্গে।
কোলেস্টেরলের ভয়ে কুসুম বাদ দেওয়ার অভ্যাস আজ আর বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়। গোটা ডিমে রয়েছে এমন বহু পুষ্টিগুণ, যা শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পরিমাণে ও স্বাস্থ্যকরভাবে রান্না করে ডিম খেলে তা ক্ষতির চেয়ে উপকারই বেশি দেয়।
তাই পরের বার ডিম খাওয়ার সময় শুধু সাদা অংশ নয়চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে গোটা ডিমকেই জায়গা দিন আপনার দৈনন্দিন খাবারের তালিকায়।
কোলেস্টেরলের ভয়ে ডিমের কুসুম বাদ দিয়ে দেওয়ার অভ্যাস বহুদিন ধরেই আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ঢুকে পড়েছে। বিশেষ করে যাঁরা হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ওজন বাড়া নিয়ে চিন্তিত, তাঁদের মধ্যে এই প্রবণতা আরও বেশি দেখা যায়। কিন্তু আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণা বলছে এই ধারণা আর পুরোপুরি বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিযুক্ত নয়। বরং গোটা ডিম খেলে শরীর যে উপকার পায়, তা কেবল সাদা অংশ খেলে সম্ভব হয় না।
ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল আছে এ কথা সত্য। তবে কোলেস্টেরল মানেই ক্ষতিকর, এমন ধারণা আজ আর চিকিৎসকেরা মানেন না। আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের বড় অংশই তৈরি হয় লিভারে। খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল তার তুলনায় অনেক কম প্রভাব ফেলে। বরং অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্স ফ্যাট, ভাজাভুজি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি দায়ী।
গোটা ডিমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সম্পূর্ণ পুষ্টিগুণ। ডিমের কুসুমে রয়েছে ভিটামিন A, D, E ও K যেগুলো চোখের স্বাস্থ্য, হাড় মজবুত রাখা, ত্বকের সুরক্ষা এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়াও কুসুমে থাকা কোলিন মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মৃতিশক্তি এবং স্নায়ুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি উপাদান। গর্ভবতী নারী ও বয়স্কদের জন্য কোলিন বিশেষভাবে উপকারী বলে চিকিৎসকেরা মনে করেন।
শুধু তাই নয়, ডিমের কুসুমে থাকা ভালো ফ্যাট শরীরে ভালো কোলেস্টেরল HDL বাড়াতে সাহায্য করে, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পাশাপাশি লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করতে এবং বয়সজনিত চোখের সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এই সব পুষ্টিগুণ ডিমের সাদা অংশে একেবারেই নেই বা খুব সামান্য পরিমাণে থাকে।
ডিমের সাদা অংশ অবশ্যই প্রোটিনের ভালো উৎস। কিন্তু শুধু সাদা অংশ খেলে শরীর সম্পূর্ণ পুষ্টি পায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, গোটা ডিম খেলে প্রোটিন শরীর আরও ভালোভাবে শোষণ করতে পারে। অর্থাৎ পেশি গঠন, শক্তি বৃদ্ধি ও দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখার ক্ষেত্রে গোটা ডিম অনেক বেশি কার্যকর।
হৃদ্স্বাস্থ্য নিয়ে যাঁরা চিন্তিত, তাঁদের জন্যও সুখবর রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে যে, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে গোটা ডিম খাওয়ার সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধির সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। বরং ডিম খেলে শরীরে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তবে এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ডিম কীভাবে রান্না করা হচ্ছে। অতিরিক্ত তেলে ভাজা ডিম, মাখন বা চিজ দিয়ে রান্না করা ডিম আসল ক্ষতির কারণ হতে পারে।
চিকিৎসকেরা সাধারণত বলেন, ডিম সেদ্ধ করে, অল্প তেলে অমলেট বা পোচ করে খাওয়াই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। এইভাবে রান্না করলে ডিমের পুষ্টিগুণ অটুট থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় ফ্যাট শরীরে ঢোকে না।
তবে কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকা জরুরি। যাঁদের কোলেস্টেরল খুব বেশি, যাঁরা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ভুগছেন বা যাঁদের বংশগত কোলেস্টেরলের সমস্যা রয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রে ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত। কিন্তু সাধারণ সুস্থ মানুষের জন্য সপ্তাহে ৫–৭টি গোটা ডিম নিরাপদ বলেই ধরা হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কোলেস্টেরলের ভয়ে কুসুম বাদ দেওয়ার অভ্যাস আজ আর সময়োপযোগী নয়। গোটা ডিমে রয়েছে এমন বহু পুষ্টিগুণ, যা শরীর, মস্তিষ্ক ও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পরিমাণে ও স্বাস্থ্যকরভাবে রান্না করে ডিম খেলে তা ক্ষতির চেয়ে উপকারই বেশি দেয়।
তাই পরের বার ডিম খাওয়ার সময় শুধু সাদা অংশে থেমে না থেকে, চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে গোটা ডিমকেই জায়গা দিন আপনার দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় কারণ সুস্থ থাকার জন্য সম্পূর্ণ পুষ্টির কোনও বিকল্প নেই।