প্রণমিয়া পাটনি কহিছে জোড় হাতে, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’—ঈশ্বরী পাটনির সেই অমর কাহিনিকে এবার মণ্ডপসজ্জায় তুলে ধরছে এ কে ব্লক। 1600 বর্গফুটের বিশাল অন্নপূর্ণা হাঁড়িতে ফুটে উঠবে বাঙালির অন্ন, আশা ও লোককথার আবেগ।
‘প্রণমিয়া পাটনি কহিছে জোড় হাতে, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় পঙ্ক্তি। এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন ধরা পড়ে এক দরিদ্র পিতার সমস্ত স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা এবং সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। অভাবের সংসারে যেখানে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে নিজের জন্য কিছু না চেয়ে সন্তানের মুখে দু’বেলা অন্নের নিশ্চয়তাই হয়ে ওঠে তাঁর একমাত্র প্রার্থনা। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের ‘অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনি’ কাহিনির সেই মানবিক আবেগকেই এ বছরের দুর্গাপুজোর ভাবনায় তুলে ধরছে সল্টলেকের এ কে ব্লক।
এবারের পুজোয় শুধুমাত্র দেবী দুর্গার আরাধনা নয়, বরং বাংলার সাহিত্য, লোকজ জীবন, অভাবের সংসার এবং মায়ের অন্নদাত্রী রূপ—সবকিছুকেই এক সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করেছে পুজো কমিটি। আর সেই ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক বিশাল প্রতীক—১৬০০ বর্গফুটের অন্নপূর্ণা হাঁড়ি।
মণ্ডপে ঢুকলেই দর্শকদের সামনে উঠে আসবে সেই বিশাল হাঁড়ি, যা নিছক একটি মণ্ডপসজ্জার উপকরণ নয়। বরং তার মধ্য দিয়েই ফুটিয়ে তোলা হবে অন্নের গুরুত্ব, ক্ষুধার যন্ত্রণা, সংসারের টানাপোড়েন এবং সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য একজন পিতার নিরন্তর লড়াইয়ের গল্প। ‘অন্নপূর্ণা’ নামের মধ্যেই যেমন রয়েছে অন্নের নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি, তেমনই ঈশ্বরী পাটনির চরিত্রে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তব ছবি।
ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের সৃষ্ট ঈশ্বরী পাটনি কোনও রাজা-মহারাজা নন। তিনি এক সাধারণ মানুষ। তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দারিদ্র্য, পরিশ্রম এবং প্রতিদিন বেঁচে থাকার সংগ্রাম। নৌকা চালিয়ে সংসার চালানো সেই মানুষটির কাছে জীবন মানেই ছিল প্রতিদিনের লড়াই। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তবু সেই অভাব তাঁর মনকে ছোট করেনি। বরং দেবী অন্নপূর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে যখন বর চাওয়ার সুযোগ এল, তখন নিজের জন্য কোনও প্রাচুর্য বা ঐশ্বর্য চাননি তিনি।
কাহিনির সেই মুহূর্তই এবারের পুজোর ভাবনার অন্যতম প্রধান জায়গা। দেবী অন্নপূর্ণা তাঁকে যখন বলেন, মনোনীত বর চাইতে, তখন ঈশ্বরী পাটনির সামনে খুলে যায় নিজের ভাগ্য বদলে দেওয়ার সুযোগ। চাইলে তিনি অর্থ, সম্পদ কিংবা আরাম-আয়েশ চাইতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেসব কিছুই চাননি। তাঁর চাওয়া ছিল একেবারেই সাধারণ—সন্তানের মুখে যেন দুধ-ভাত জোটে।
এই চাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এক অসাধারণ মানবিকতা। নিজের ক্ষুধার কথা নয়, নিজের কষ্টের কথা নয়—একজন বাবা ভাবছেন তাঁর সন্তানের কথা। অভাবের সংসারেও সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা যে কোনও বড় প্রাপ্তির চেয়ে বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠে। আর সেই জায়গা থেকেই ‘অন্নপূর্ণা ও ঈশ্বরী পাটনি’ আজও মানুষের কাছে এতটা পরিচিত এবং প্রাসঙ্গিক।
এ কে ব্লকের পুজো উদ্যোক্তাদের ভাবনায় সেই মানবিক বার্তাই নতুন করে সামনে আসছে। বর্তমান সময়ে যখন পুজোর থিমে নানা ধরনের চমক, প্রযুক্তি, আলো এবং শিল্পকর্মের ব্যবহার দেখা যায়, সেখানে একটি সাহিত্যকেন্দ্রিক এবং মানবিক কাহিনিকে সামনে রেখে মণ্ডপ সাজানোর উদ্যোগ আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
তবে এবারের পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ যে ১৬০০ বর্গফুটের বিশাল অন্নপূর্ণা হাঁড়ি, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সাধারণ একটি রান্নার হাঁড়ির সঙ্গে এই হাঁড়ির কোনও তুলনাই চলে না। বিপুল আকারের এই কাঠামোই হয়ে উঠবে মণ্ডপের অন্যতম প্রধান দৃশ্যমান উপাদান। হাঁড়িকে কেন্দ্র করে অন্নপূর্ণার ভাবনা এবং ঈশ্বরী পাটনির কাহিনি কীভাবে মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে ফুটিয়ে তোলা হবে, সেটিই দর্শকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ।
বাংলার সংস্কৃতিতে হাঁড়ি শুধুমাত্র রান্নার পাত্র নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সংসারের গল্প। হাঁড়িতে অন্ন চড়ে মানেই একটি পরিবারের বেঁচে থাকার আশা। হাঁড়ি খালি থাকলে সেখানে দারিদ্র্যের ছবি। আবার সেই হাঁড়ি যখন ভরে ওঠে, তখন তা হয়ে ওঠে আনন্দ ও স্বস্তির প্রতীক। তাই অন্নপূর্ণার হাঁড়িকে এত বড় আকারে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে মণ্ডপে আসলে বাংলার সাধারণ মানুষের সংসারজীবনেরই একটি প্রতীকী ছবি তৈরি হতে চলেছে।
ঈশ্বরী পাটনির জীবনের সঙ্গে এই প্রতীকের যোগও গভীর। নৌকা চালিয়ে দিন গুজরান করা একজন দরিদ্র মানুষের কাছে অন্নই ছিল সবচেয়ে বড় সত্য। তাঁর সংসারের সমস্ত হিসাব যেন শেষ পর্যন্ত এসে থামত খাবারের কাছে। সন্তানকে খাওয়াতে পারা, পরিবারের মুখে দু’বেলা অন্ন তুলে দিতে পারা—এই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সেই কারণেই ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’ পঙ্ক্তিটি শুধু একটি কবিতার অংশ হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে বাংলার অসংখ্য পরিবারের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। অভিভাবকের কাছে সন্তানের মুখে হাসি দেখার যে ইচ্ছা, তা সময়ের সঙ্গে বদলায় না। যুগ বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু সন্তানকে ভালো রাখার সেই সহজ আকাঙ্ক্ষা আজও একই রয়ে গিয়েছে।
এ কে ব্লকের পুজোয় সেই চিরন্তন অনুভূতিকেই দর্শকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। মণ্ডপে অন্নপূর্ণার উপস্থিতি যেমন দেবীর অন্নদাত্রী রূপকে স্মরণ করাবে, তেমনই ঈশ্বরী পাটনির কাহিনি মনে করিয়ে দেবে সমাজের সেই সমস্ত মানুষের কথা, যাঁদের কাছে প্রতিদিনের অন্নই সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।
পুজোর আবহে এই গল্প আরও অন্যরকম মাত্রা পেতে পারে। ঢাকের শব্দ, আলোর সাজ, প্রতিমার আরাধনা এবং মণ্ডপের বিশাল কাঠামোর মধ্যে যখন দর্শক সেই গল্পের সঙ্গে পরিচিত হবেন, তখন তা শুধুমাত্র চোখের দেখার বিষয় হয়ে থাকবে না। বরং একটি সাহিত্যকাহিনিকে কেন্দ্র করে মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা থাকবে।
বিশেষ করে শিশু ও তরুণ প্রজন্মের কাছে এই ধরনের থিমের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের বহু চরিত্র এবং কাহিনি সময়ের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে সেই গল্পকে চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলার ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে ঈশ্বরী পাটনির মতো চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের সাহিত্যকীর্তিও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।
এবারের পুজোয় তাই অন্নপূর্ণার হাঁড়ি শুধু ‘বড়’ হওয়ার জন্য বড় নয়। এর আকারের মধ্যেও রয়েছে একটি বক্তব্য। অন্নের গুরুত্ব কতটা, মানুষের জীবনে খাবারের জায়গা কতটা গভীর—সেই বিষয়টিকে দৃশ্যমান করে তোলাই যেন এই বিশাল আয়োজনের উদ্দেশ্য।
পুজোর মণ্ডপে সাধারণত দর্শকদের চোখ আটকে যায় বিশাল কাঠামো, শিল্পকর্ম কিংবা আলোর কারুকাজে। কিন্তু এ কে ব্লকের মণ্ডপে সেই চমকের পাশাপাশি গল্প বলার চেষ্টাও থাকবে। একটি হাঁড়িকে কেন্দ্র করে কীভাবে একটি সম্পূর্ণ সামাজিক ও সাহিত্যিক আখ্যান তৈরি করা যায়, সেই ভাবনাই এখানে বিশেষ হয়ে উঠছে।
অন্নপূর্ণা দেবী বাংলার ঘরে ঘরে অন্নের দেবী হিসেবে পূজিত। তাঁর হাতে অন্নের প্রতীক এবং তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মাতৃত্বের ভাবনা বাঙালির সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। অন্যদিকে ঈশ্বরী পাটনি সেই অন্নের জন্য সংগ্রাম করা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। এই দুই দিককে পাশাপাশি রেখে পুজোর থিম তৈরি করার ফলে দেবী ও মানুষের সম্পর্কটিও নতুনভাবে সামনে আসে।
একদিকে দেবী অন্নপূর্ণা—যিনি অন্নের প্রতীক। অন্যদিকে ঈশ্বরী পাটনি—যিনি সেই অন্নের জন্য লড়াই করেন। মাঝখানে রয়েছে একটি সংসার, সন্তান এবং একজন বাবার স্বপ্ন। এই ত্রিভুজের মধ্যেই এবারের থিমের মূল বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়।
আজকের সময়ে খাদ্য এবং জীবিকার প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শহরের ঝলমলে জীবনযাত্রার আড়ালে এখনও বহু মানুষের প্রতিদিনের লড়াই চলছে। সেই বাস্তবতাকে কোনও রাজনৈতিক বা সামাজিক স্লোগানের মাধ্যমে নয়, বরং একটি পরিচিত সাহিত্যকাহিনির আবেগ দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এ কে ব্লক।
পুজোর কয়েকটি দিন মণ্ডপে ভিড় করবেন দর্শকরা। কেউ আসবেন প্রতিমা দেখতে, কেউ থিম দেখতে, কেউ ছবি তুলতে। কিন্তু ১৬০০ বর্গফুটের অন্নপূর্ণা হাঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হয়তো অনেকেরই মনে পড়বে সেই বহু পরিচিত পঙ্ক্তি—‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ আর তখনই মণ্ডপসজ্জার আসল উদ্দেশ্যটি পূর্ণতা পাবে।
কারণ, বড় থিমের চমক শেষ পর্যন্ত আলো-ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তার প্রভাবও সাময়িক। কিন্তু কোনও থিম যদি দর্শকের মনে একটি গল্প, একটি প্রশ্ন কিংবা একটি অনুভূতি রেখে যেতে পারে, তবে সেই থিমের আবেদন অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ কে ব্লকের এবারের আয়োজন সেই জায়গাতেই আলাদা হয়ে উঠতে চাইছে।
সব মিলিয়ে সল্টলেক এ কে ব্লকের দুর্গাপুজোয় এবার অন্নপূর্ণার হাঁড়িই যে মূল চমক হতে চলেছে, তা বলাই যায়। তবে ১৬০০ বর্গফুটের সেই বিশাল কাঠামোর আসল গুরুত্ব তার আকারে নয়, বরং যে গল্পটি সেটি বহন করছে তার মধ্যে। অভাবের সংসার, নৌকা চালিয়ে জীবনধারণ, সন্তানের জন্য বাবার নিঃস্বার্থ প্রার্থনা এবং অন্নদাত্রী দেবীর আশীর্বাদ—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক মানবিক আখ্যান।
‘প্রণমিয়া পাটনি কহিছে জোড় হাতে’—শতাব্দী পেরিয়েও যে আকুতি বাঙালির মনে জায়গা করে আছে, এবারের পুজোয় সেই আকুতিই যেন নতুন করে ফিরে আসছে। আর তারই প্রতীক হয়ে মণ্ডপে দাঁড়িয়ে থাকবে ১৬০০ বর্গফুটের বিশাল অন্নপূর্ণা হাঁড়ি।