ইংলিশবাজারের বসাকবাড়ির পুজোয় আজও অটুট প্রাচীন ঐতিহ্য। ঢাকের বাদ্যির সঙ্গে সানাইয়ের সুরে মণ্ডপে আসেন মা দুর্গা। বেদিতে ওঠার আগে দুধ দিয়ে ধুয়ে পবিত্র করা হয় মণ্ডপ।
মালদহের ইংলিশবাজারে দুর্গাপুজো মানেই শুধু উৎসব নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু বছরের ঐতিহ্য, পারিবারিক রীতি এবং আবেগ। শহরের ঐতিহ্যবাহী বসাকবাড়ির দুর্গাপুজো সেই পুরনো পরম্পরারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সময় বদলেছে, বদলেছে পুজোর আয়োজনের ধরন, কিন্তু বসাকবাড়ির দুর্গাপুজোয় এখনও অটুট রয়েছে পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া একাধিক নিয়ম ও রীতি। ঢাকের বাদ্যের পাশাপাশি সানাইয়ের সুরে দেবীর আগমন, বেদিতে ওঠার আগে দুধ দিয়ে মণ্ডপ ধুয়ে নেওয়া, পুজোর দিনগুলিতে নিরামিষ ভোগ নিবেদন এবং দশমীর বিসর্জনের পর ইলিশ দিয়ে বিজয়ার ভোজ—সব মিলিয়ে এই পুজো আজও স্বতন্ত্র।
ইংলিশবাজারের বসাকবাড়িতে মা দুর্গার আগমনকে ঘিরে রয়েছে এক বিশেষ প্রথা। অন্যান্য জায়গায় যেখানে ঢাক, কাঁসর, শঙ্খধ্বনি এবং উলুধ্বনিতে পুজোর আবহ তৈরি হয়, সেখানে বসাকবাড়িতে সানাইয়ের সুরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সানাইয়ের মিষ্টি সুরে যেন দেবীকে বরণ করে নেয় গোটা পরিবার। পুজোর প্রস্তুতি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে তৈরি হয় এক অন্যরকম পরিবেশ। পুরনো ঐতিহ্যকে সামনে রেখেই চলে প্রতিমা, মণ্ডপ এবং পুজোর অন্যান্য আয়োজন।
এই পুজোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য রীতি হল বেদিতে প্রতিমা ওঠার আগে দুধ দিয়ে মণ্ডপ ধুয়ে নেওয়া। ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পারিবারিক পরম্পরার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই নিয়ম আজও একইভাবে পালন করা হয়। মণ্ডপকে পবিত্র করে তোলার পরই সেখানে দেবী দুর্গাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতির মধ্যে রয়েছে পরিবারের পুরনো স্মৃতি এবং বিশ্বাসের ছাপ। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও এই নিয়মে কোনও পরিবর্তন আসেনি।
বসাকবাড়ির দুর্গাপুজোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল দেবীর ভোগ। পুজোর ক’দিন মা দুর্গাকে নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। পুজোর প্রতিটি দিন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ভোগ প্রস্তুত করা হয় এবং দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করা হয়। এই ভোগের মধ্যেও রয়েছে বহু পুরনো পারিবারিক রীতি। বাড়ির সদস্যরা নিজেদের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে পুজোর বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করেন। ফলে দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়ে থাকে না, তা হয়ে ওঠে পরিবারের সকলের একসঙ্গে মিলিত হওয়ার উপলক্ষ।
তবে বসাকবাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলির একটি দেখা যায় দশমীর দিনে। দেবী দুর্গার বিসর্জন শেষ হওয়ার পরই বদলে যায় উৎসবের আবহ। শুরু হয় বিজয়ার পর্ব। আর সেই বিজয়ার ভোজে জায়গা করে নেয় বাঙালির অন্যতম প্রিয় মাছ ইলিশ। পাত পেড়ে ইলিশ খাওয়ার এই রীতি বসাকবাড়ির পুজোর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে নিরামিষ ভোগের পর দশমীর বিসর্জন শেষে ইলিশের আয়োজন যেন বিজয়ার আনন্দকে আরও পূর্ণ করে তোলে।
বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে ইলিশের গুরুত্ব আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আর দুর্গাপুজোর সঙ্গে যখন ইলিশের মতো বাঙালির প্রিয় খাবার জড়িয়ে যায়, তখন সেই আয়োজন হয়ে ওঠে আরও স্মরণীয়। বসাকবাড়ির ক্ষেত্রেও ইলিশ শুধু একটি খাবার নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পারিবারিক রীতির অংশ। বিজয়ার দিনে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে পাত পেড়ে খাওয়ার মধ্য দিয়ে পুজোর আনুষ্ঠানিকতার পর আনন্দ ভাগ করে নেন।
জানা যায়, প্রায় ন’দশক ধরে বসাকবাড়িতে এই নিয়ম চলে আসছে। এত বছর ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্যেও পুজোর এই রীতি অক্ষুণ্ণ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সমাজের জীবনযাত্রা বদলেছে, পরিবারের সদস্যদের ব্যস্ততা বেড়েছে, পুজোর আয়োজনের ধরনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু বসাকবাড়ির দুর্গাপুজোর মূল ঐতিহ্যকে ধরে রাখার ক্ষেত্রে কোনও আপস করা হয়নি। সানাইয়ের সুর, দুধ দিয়ে মণ্ডপ ধোয়া, নিরামিষ ভোগ এবং বিজয়ার ইলিশ—প্রতিটি রীতিই এখনও একইভাবে পালন করা হয়।
পুরনো বনেদি বাড়ির পুজোগুলির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধরে রাখা। আধুনিকতার ছোঁয়া এলেও বহু পরিবার এখনও পূর্বপুরুষদের নিয়ম মেনে দুর্গাপুজো করে আসছে। বসাকবাড়ির পুজোও সেই ধারারই অংশ। এখানে পুজোর জাঁকজমকের পাশাপাশি গুরুত্ব পায় নিয়ম-নীতি এবং পারিবারিক সংস্কৃতি। তাই এই পুজোকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যেমন আবেগ রয়েছে, তেমনই স্থানীয় মানুষের মধ্যেও রয়েছে আগ্রহ।
ইংলিশবাজারের বসাকবাড়িতে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। প্রতিমা থেকে মণ্ডপ, ভোগ থেকে পুজোর উপকরণ—সবকিছু নিয়েই ব্যস্ততা বাড়ে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা যেমন পুরনো নিয়মগুলির দিকে নজর রাখেন, তেমনই নতুন প্রজন্মও সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখে। এভাবেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে যাচ্ছে বসাকবাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প।
এই পুজোর সঙ্গে সানাইয়ের সম্পর্কও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দেবীর আগমনের মুহূর্তে সানাইয়ের সুর যেন বাড়ির পরিবেশকে আরও আবেগঘন করে তোলে। ঢাকের তালে পুজোর উৎসবমুখরতা তৈরি হলেও সানাইয়ের সুরে রয়েছে এক অন্যরকম ঐতিহ্যের অনুভূতি। সেই সুরের সঙ্গে মিশে যায় পুরনো দিনের স্মৃতি। ফলে বসাকবাড়ির পুজোয় দেবীর আগমন কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, পরিবারের কাছে এটি একটি আবেগের মুহূর্ত।
দুধ দিয়ে মণ্ডপ ধোয়ার রীতিটিও পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। দেবীকে বেদিতে প্রতিষ্ঠার আগে মণ্ডপ পরিষ্কার ও পবিত্র করার এই প্রথা বহু পুরনো। পরিবারের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এই নিয়ম এখনও একইভাবে পালন করা হয়। নতুন প্রজন্মও এই রীতির গুরুত্ব বুঝে তা বজায় রাখছে। এর ফলে পুরনো দিনের সংস্কৃতি আজও বর্তমান সময়ের সঙ্গে সমানভাবে টিকে রয়েছে।
পুজোর ক’দিন বসাকবাড়িতে নিরামিষ ভোগের আয়োজনও বিশেষ গুরুত্ব পায়। দেবীর উদ্দেশে ভোগ নিবেদন করার পর পরিবারের সদস্য এবং ভক্তদের মধ্যে তা বিতরণ করা হয়। ভোগের আয়োজন ঘিরে বাড়িতে ব্যস্ততা থাকে। রান্না থেকে পরিবেশন—সবকিছুতেই থাকে নিয়মের ছাপ। পুজোর পরিবেশের সঙ্গে এই ভোগের আয়োজনও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
এরপর আসে দশমী। দেবী দুর্গার বিসর্জনের সঙ্গে শেষ হয় পুজোর আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু বসাকবাড়িতে সেই মুহূর্তেই শুরু হয় আরেকটি বিশেষ পর্ব। বিজয়ার দিনে পাত পেড়ে ইলিশ খাওয়ার আয়োজন হয়ে ওঠে পরিবারের অন্যতম আকর্ষণ। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই প্রথা এখনও সমান জনপ্রিয়। পুজোর কয়েকদিনের নিরামিষ খাবারের পর বিজয়ার ইলিশ যেন উৎসবের শেষ পর্বকে আরও আনন্দময় করে তোলে।
প্রায় ন’দশকের এই ঐতিহ্য শুধু একটি পরিবারের খাবারের রীতি নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক স্মারকও বলা যায়। কারণ কোনও একটি পরিবারের পুজোর নিয়মের মধ্যেই সেই সময়ের সামাজিক জীবন, খাদ্যাভ্যাস, পারিবারিক সম্পর্ক এবং উৎসবের ধরন ফুটে ওঠে। বসাকবাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। পুজোর সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি রীতি পরিবারের ইতিহাসের একটি করে অধ্যায় বহন করে চলেছে।
বর্তমান সময়ে অনেক বনেদি বাড়ির পুজো নানা কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে কিংবা আগের জৌলুস হারিয়েছে। কিন্তু কিছু পরিবার এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে সেই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। বসাকবাড়িও সেই তালিকায় রয়েছে। পুরনো রীতিকে সম্মান জানিয়ে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে পুজো এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে এই পুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বসাকবাড়ির দুর্গাপুজোকে ঘিরে ইতিমধ্যেই জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পুরনো নিয়ম মেনেই হবে পুজোর আয়োজন। সানাইয়ের সুরে দেবীর আগমন থেকে শুরু করে দুধ দিয়ে মণ্ডপ ধোয়া, পুজোর দিনগুলিতে নিরামিষ ভোগ এবং দশমীর পর ইলিশ দিয়ে বিজয়ার ভোজ—সব রীতিই এবারও অক্ষুণ্ণ রাখার প্রস্তুতি চলছে।
মালদহের ইংলিশবাজারে বসাকবাড়ির দুর্গাপুজো তাই শুধু একটি পুজো নয়। এটি একটি পরিবারের দীর্ঘ ইতিহাস, বিশ্বাস এবং সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সময় যতই বদলাক, আধুনিকতার প্রভাব যতই বাড়ুক, ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক কখনও সহজে মুছে যায় না। সেই কারণেই আজও সানাইয়ের সুরে দেবীর আগমন, দুধে ধোয়া মণ্ডপ এবং বিজয়ার পাতের ইলিশকে ঘিরে বসাকবাড়ির পুজো হয়ে ওঠে আলাদা।
দুর্গাপুজোর উৎসব শেষ হয় দশমীর বিসর্জনে, কিন্তু স্মৃতি থেকে যায় অনেক দিন। বসাকবাড়ির ক্ষেত্রেও সেই স্মৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বিজয়ার ইলিশ। দেবীকে বিদায় জানানোর পর পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে পাত পেড়ে খাওয়ার এই আয়োজন যেন বলে দেয়—উৎসবের শেষ মানেই আনন্দের শেষ নয়। বরং পারিবারিক বন্ধন, ঐতিহ্য এবং পুরনো রীতিকে সঙ্গে নিয়ে আবারও নতুন বছরের অপেক্ষা শুরু হয়।
ইংলিশবাজারের বসাকবাড়ির প্রায় ন’দশকের দুর্গাপুজো তাই আজও স্থানীয় মানুষের কাছে আগ্রহের বিষয়। পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রেখে কীভাবে একটি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজোকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তারই উদাহরণ এই পুজো। আর সেই পুজোর সবচেয়ে মিষ্টি সমাপ্তি হয় বিজয়ার দিনে—দেবীর বিসর্জনের পর পাত পেড়ে ইলিশের আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এবারও সেই পুরনো রীতি অক্ষুণ্ণ রেখেই মা দুর্গাকে বরণ করার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বসাকবাড়ি।