দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাংলার বাজারে বাড়ে কেনাকাটা ও লেনদেন। পোশাক, জুতো, গয়না থেকে পুজোর সামগ্রী—বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ঘিরে ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের আয়ের আশা।
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো শুধু আনন্দ, উৎসব আর মিলনমেলার উপলক্ষ নয়, বাংলার অর্থনীতির ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুজোকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই বাজারে বাড়ে কেনাকাটার ব্যস্ততা। নতুন জামাকাপড়, জুতো, গয়না, প্রসাধনী থেকে শুরু করে পুজোর বিভিন্ন সামগ্রী—বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ঘিরে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়। বড় শপিং মল, নামী বিপণি কিংবা পাড়ার ছোট দোকানের পাশাপাশি অনলাইন বাজারেও এই সময়ে কেনাকাটার পরিমাণ বাড়ে।
এবারের দুর্গাপুজোতেও সেই প্রবণতা দেখা গিয়েছে বলে দাবি করেছে একটি নামজাদা ই-কমার্স সংস্থার রিপোর্ট। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো সংক্রান্ত পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অর্ডার প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ, পুজোর কেনাকাটায় অনলাইন বাজারে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে।
যদিও মোট কত টাকার ব্যবসা হয়েছে, তার নির্দিষ্ট হিসাব রিপোর্টে দেওয়া হয়নি, তবু অর্ডার বৃদ্ধির পরিসংখ্যান থেকে পুজোকেন্দ্রিক কেনাকাটার প্রবণতা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। পোশাকের পাশাপাশি সিঁদুর, ধুনুচি এবং অন্যান্য পুজোর সামগ্রীর চাহিদাও বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই কেনাকাটার প্রবণতা শুধু কলকাতা বা বড় শহরগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্ধমান, হাওড়া, শিলিগুড়ির মতো শহরেও অর্ডার বেড়েছে। একই সঙ্গে তুলনামূলক ছোট শহর ও আধা শহরের ক্রেতাদের অংশগ্রহণ পোশাকের বাজারে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে নতুন পোশাকের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। পুজোর আগে পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা বাঙালির পরিচিত ঐতিহ্য। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিদিন আলাদা পোশাক পরার পরিকল্পনাও করেন অনেকে। সেই কারণে পুজোর আগে থেকেই পোশাকের দোকান এবং অনলাইন বিপণিগুলিতে বাড়তে থাকে ক্রেতাদের আনাগোনা।
ই-কমার্স সংস্থাটির রিপোর্ট অনুযায়ী, এবারও ক্রেতাদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল পুজোর নতুন জামাকাপড়। পাশাপাশি প্যান্ডেল ঘোরার জন্য আরামদায়ক জুতোর চাহিদাও ছিল উল্লেখযোগ্য।
পুজোর দিনগুলিতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঠাকুর দেখতে বেরোন বহু মানুষ। দীর্ঘক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে হয় বলে আরামদায়ক জুতো কেনার দিকে নজর দেন ক্রেতারা। পোশাকের সঙ্গে মানানসই জুতো বেছে নেওয়ার প্রবণতাও কেনাকাটার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে।
অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা এই প্রবণতাকে আরও সহজ করে তুলেছে। বাড়িতে বসেই বিভিন্ন পণ্যের নকশা, দাম ও বৈশিষ্ট্য তুলনা করা যায়। একাধিক বিকল্প থেকে নিজের পছন্দ ও বাজেট অনুযায়ী পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় অনেকেই অনলাইন বিপণির উপর নির্ভর করছেন।
তবে অনলাইনে অর্ডার বৃদ্ধি মানেই একই অনুপাতে মোট বিক্রির অর্থমূল্য বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। অর্ডারের সংখ্যা, পণ্যের গড় দাম, বাতিল হওয়া অর্ডার এবং ফেরতের পরিমাণের মতো বিষয়ও মোট ব্যবসার হিসাবকে প্রভাবিত করে।
ই-কমার্স সংস্থার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার পশ্চিমবঙ্গের একাধিক শহরে দুর্গাপুজো সংক্রান্ত পণ্যের অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্ধমানে অর্ডার বৃদ্ধির হার প্রায় ৫৭ শতাংশ। হাওড়ায় তা ৫৫ শতাংশ, কলকাতায় ৫২ শতাংশ এবং শিলিগুড়িতে ৫০ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা শুধু রাজ্যের রাজধানী বা বড় বিপণিকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন শহরের ক্রেতারাও উৎসবের কেনাকাটায় অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করছেন।
বর্ধমানের মতো শহরে অর্ডার বৃদ্ধির হার কলকাতার তুলনায় বেশি হওয়া ছোট ও মাঝারি শহরের বাজারের গুরুত্বকে সামনে এনেছে। তবে এই বৃদ্ধির কারণ নির্দিষ্টভাবে জানতে হলে ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাস, পণ্যের ধরন এবং গত বছরের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
কলকাতায় পুজোর বাজার ঐতিহ্যগতভাবেই বড়। শহরের বিভিন্ন বাজার, শপিং মল এবং ব্র্যান্ডের বিপণিতে প্রতি বছরই উৎসবের আগে ভিড় বাড়ে। তার পাশাপাশি অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রেও অর্ডার বৃদ্ধির দাবি ডিজিটাল বাজারের প্রসারের ইঙ্গিত দেয়।
হাওড়া ও শিলিগুড়ির মতো শহরেও এই প্রবণতা দেখা যাওয়ায় রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইন কেনাকাটার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এবারের রিপোর্টের অন্যতম উল্লেখযোগ্য তথ্য হল, পোশাক কেনার ক্ষেত্রে ছোট শহর ও আধা শহরের ক্রেতাদের অংশগ্রহণ।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পোশাক কেনার ক্ষেত্রে প্রতি ১০ জন ক্রেতার মধ্যে প্রায় ৮ জনই ছোট শহর বা আধা শহরের বাসিন্দা ছিলেন।
এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, অনলাইন পোশাকের বাজারে ছোট শহরের ক্রেতাদের গুরুত্ব যথেষ্ট বেশি। এত দিন অনলাইন কেনাকাটার আলোচনা অনেক সময় বড় শহরের ক্রেতাদের কেন্দ্র করে হলেও বর্তমান প্রবণতায় ছোট শহরের বাজারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ছোট শহরের ক্রেতারা অনলাইন বিপণির মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পোশাক ও পণ্যের বিকল্প দেখতে পারেন। স্থানীয় বাজারে কোনও নির্দিষ্ট নকশা বা ব্র্যান্ডের পণ্য সহজে না পাওয়া গেলে অনলাইন মাধ্যম তাঁদের কাছে বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়া পণ্যের দাম তুলনা, বাড়িতে পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের পেমেন্ট ব্যবস্থার সুবিধাও অনলাইন কেনাকাটাকে আকর্ষণীয় করে তোলে।
তবে ছোট শহরের ক্রেতাদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা বৃদ্ধির পিছনে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলতে আরও বিস্তারিত সমীক্ষার প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট রিপোর্টে দেওয়া তথ্য মূলত ক্রেতাদের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্ডারের প্রবণতার উপর আলোকপাত করেছে।
তবু পুজোর বাজারে ছোট শহরের ক্রেতাদের এই উপস্থিতি ব্যবসায়ীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ভবিষ্যতে অনলাইন বিপণি এবং স্থানীয় বিক্রেতাদের জন্য এই বাজার আরও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠতে পারে।
দুর্গাপুজোর কেনাকাটায় এবার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির দাবি করা হয়েছে সিঁদুরের ক্ষেত্রে। ই-কমার্স সংস্থাটির রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে সিঁদুরের অর্ডার গত বছরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে।
রিপোর্টে আরও দাবি করা হয়েছে, গত বছর প্রতি ৪৬ সেকেন্ডে একটি সিঁদুর বিক্রি হত। এবার সেই সময় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ সেকেন্ডে।
এই তথ্য পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর চাহিদার দিকটি তুলে ধরেছে। বিজয়া দশমীতে সিঁদুর খেলা বাঙালির দুর্গাপুজোর অন্যতম পরিচিত রীতি। বিবাহিত মহিলাদের একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর এই প্রথা উৎসবের শেষ দিনে বিশেষ আবেগের সঙ্গে পালিত হয়।
সেই কারণে দুর্গাপুজোর শেষ দিকে সিঁদুরের চাহিদা বাড়া অস্বাভাবিক নয়। পুজোর প্রস্তুতির সময় অনেকেই আগে থেকে সিঁদুর কিনে রাখেন। অনলাইনে সহজে পণ্য পাওয়া যাওয়ায় সেই কেনাকাটার একটি অংশ ডিজিটাল বিপণির মাধ্যমেও হচ্ছে।
তবে অর্ডার বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে শুধু সিঁদুর খেলার প্রস্তুতিকেই দায়ী করা যায় না। পণ্যের প্রাপ্যতা, অনলাইন বিক্রির প্রসার এবং সংস্থার নিজস্ব বিক্রির পরিসরও এই পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবু রিপোর্টে দেওয়া প্রায় তিনগুণ অর্ডার বৃদ্ধির দাবি পুজোকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর অনলাইন বাজার সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করেছে।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা রীতি ও উপাচার। ধুনুচি নাচ, সন্ধিপুজো, আরতি এবং বিজয়া দশমীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পুজোর সামগ্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ই-কমার্স সংস্থাটির রিপোর্ট অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে পুজো সংক্রান্ত সামগ্রীর অর্ডার গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে, সারা দেশে ধুনুচির অর্ডার দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, দুর্গাপুজোকে ঘিরে কেনাকাটার বাজার শুধু পোশাক বা ফ্যাশন সামগ্রীতে সীমাবদ্ধ নয়। উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পণ্যেরও অনলাইন বাজার রয়েছে।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছে দুর্গাপুজোর সামগ্রী সহজে পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিভিন্ন শহরে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়। সেখানে পুজোর উপকরণ, সাজসজ্জার সামগ্রী এবং ধুনুচির মতো পণ্যের প্রয়োজন হতে পারে।
অনলাইন মাধ্যমের সাহায্যে এই পণ্যগুলি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদক ও বিক্রেতাদের সামনে নতুন বাজারে পৌঁছনোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে পুজোর সামগ্রীর অর্ডার বৃদ্ধির পাশাপাশি বিক্রেতাদের প্রকৃত লাভ কতটা বেড়েছে, তা নির্ধারণ করতে পণ্যের উৎপাদন খরচ, পরিবহণ ব্যয় এবং বিক্রির মূল্য সম্পর্কে তথ্য প্রয়োজন।
রিপোর্টের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় বিক্রেতাদের ব্যবসা রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য রাজ্যে পৌঁছনোর দাবি।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুজো সংক্রান্ত পণ্যের অর্ডার পাওয়া পশ্চিমবঙ্গের বিক্রেতার সংখ্যা প্রায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে।
এছাড়া ই-কমার্স সংস্থার মাধ্যমে পাওয়া অর্ডারের প্রতি ১০টির মধ্যে প্রায় ৬টি অর্ডারই রাজ্যের বাইরে থেকে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান স্থানীয় বিক্রেতাদের জন্য অনলাইন বাজারের সম্ভাবনা তুলে ধরে। আগে কোনও এলাকার দোকান বা উৎপাদকের পণ্য মূলত স্থানীয় ক্রেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত। কিন্তু ডিজিটাল বিপণির মাধ্যমে দেশের অন্য রাজ্যের ক্রেতাদের কাছেও সেই পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী পুজোর সামগ্রী, ধুনুচি এবং সিঁদুরের মতো পণ্যের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে ক্রেতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বসবাসকারী বাঙালি পরিবার, বিভিন্ন শহরের পুজো কমিটি কিংবা উৎসবের সামগ্রী কেনার আগ্রহী ক্রেতারা অনলাইনে পণ্য অর্ডার করতে পারেন। এর ফলে স্থানীয় বিক্রেতাদের কাছে নতুন গ্রাহক তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
তবে রাজ্যের বাইরে থেকে আসা অর্ডারের সংখ্যা বেশি হলেই সব বিক্রেতার ব্যবসা সমানভাবে বেড়েছে, এমনটা বলা যায় না। বিক্রেতাভেদে পণ্যের ধরন, দাম, সরবরাহের ক্ষমতা এবং ক্রেতাদের চাহিদার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের বিক্রেতাদের কাছ থেকে দুর্গাপুজো সংক্রান্ত পণ্যের অর্ডার সবচেয়ে বেশি এসেছে অসম, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকে।
এই রাজ্যগুলিতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপুজো পালনের প্রথা পুজোর সামগ্রীর চাহিদা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রতিটি রাজ্যে অর্ডারের বৃদ্ধির পিছনে ঠিক কোন কারণ কাজ করেছে, তা রিপোর্টের এই তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
মহারাষ্ট্রে অর্ডার বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৫৪ শতাংশ বলে দাবি করা হয়েছে। এই তথ্য বাংলার বিক্রেতাদের পণ্য অন্য রাজ্যে পৌঁছনোর সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করে।
মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। সেখানে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজনও হয়। অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে পুজোর সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হতে পারে।
একইভাবে অসম, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও পুজো সংক্রান্ত পণ্যের চাহিদা তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এই প্রবণতা বজায় থাকলে স্থানীয় বিক্রেতারা শুধু নিজেদের এলাকার ক্রেতাদের উপর নির্ভর না করে আরও বিস্তৃত বাজারে পৌঁছতে পারেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ এবং ক্রেতাদের সন্তুষ্টি বজায় রাখা জরুরি।
রাজ্যের বাইরে থেকে অর্ডার আসার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের ভিতরেও পুজোর সামগ্রীর অর্ডার বেড়েছে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ভিতরে অর্ডার বৃদ্ধির হার প্রায় ৫৯ শতাংশ।
অর্থাৎ, পুজোকেন্দ্রিক অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে স্থানীয় ক্রেতাদের চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও ছোট শহরে বসবাসকারী ক্রেতারা অনলাইন মাধ্যমে পোশাক এবং পুজোর সামগ্রী কিনেছেন বলে এই পরিসংখ্যান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বড় শহরের পাশাপাশি ছোট শহরের ক্রেতাদের অংশগ্রহণ অনলাইন বাজারের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয় বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও এই প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ। একই রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য সরবরাহ করতে পারলে তাঁরা নিজেদের পরিচিত বাজারের বাইরে নতুন ক্রেতাদের কাছে পৌঁছতে পারেন।
তবে অর্ডার বৃদ্ধির হারকে মোট বিক্রির অর্থমূল্যের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। অর্ডারের সংখ্যা বাড়লেও পণ্যের গড় মূল্য কমবেশি হলে মোট বিক্রির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। একই সঙ্গে বাতিল বা ফেরত হওয়া অর্ডারের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্গাপুজো শেষ হলেও উৎসবের মরশুম এখানেই শেষ হচ্ছে না। এরপর রয়েছে লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো এবং দীপাবলি। এই উৎসবগুলিকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন পণ্য ও সামগ্রীর চাহিদা বাড়তে পারে।
লক্ষ্মীপুজোর সময় পুজোর উপকরণ, প্রদীপ, সাজসজ্জার সামগ্রী এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা থাকে। কালীপুজো ও দীপাবলির সময়ও আলো, প্রদীপ এবং উৎসবের বিভিন্ন সামগ্রী কেনেন মানুষ।
ফলে দুর্গাপুজোর পরেও অনলাইন ও অফলাইন বাজারে কেনাকাটার গতি বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় বিক্রেতাদের কাছে এটি ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার আরও একটি সুযোগ।
তবে পরবর্তী উৎসবগুলিতে বিক্রি কতটা বাড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ক্রেতাদের ব্যয় করার ক্ষমতা, পণ্যের দাম, বাজারের পরিস্থিতি এবং অনলাইন অর্ডারের প্রবণতার উপর সেই হিসাব নির্ভর করবে।
ব্যবসায়ীদের কাছে তাই উৎসবের মরশুমে ক্রেতাদের চাহিদা বোঝা এবং সেই অনুযায়ী পণ্যের জোগান বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে ই-কমার্স সংস্থাটির রিপোর্ট পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজোকেন্দ্রিক অনলাইন কেনাকাটার একটি ইতিবাচক ছবি তুলে ধরেছে। সংস্থার দাবি অনুযায়ী, পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অর্ডার প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। সিঁদুরের অর্ডার প্রায় তিনগুণ এবং পুজোর সামগ্রীর অর্ডার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
একই সঙ্গে ছোট শহর ও আধা শহরের ক্রেতাদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় বিক্রেতাদের অন্য রাজ্যে পণ্য সরবরাহের প্রবণতাও নজর কেড়েছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দুর্গাপুজোর মতো সাংস্কৃতিক উৎসবকে কেন্দ্র করে অনলাইন বাজারে ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পণ্য থেকে আধুনিক পোশাক—বিভিন্ন ধরনের সামগ্রীই ডিজিটাল বিপণির মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছচ্ছে।
তবে রিপোর্টে মোট ব্যবসার অর্থমূল্য দেওয়া হয়নি। তাই অর্ডার বৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে সরাসরি বাংলার সামগ্রিক পুজো-অর্থনীতির বৃদ্ধির হার হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। অনলাইন বিক্রির পাশাপাশি অফলাইন বাজারের বিক্রি, পণ্যের দাম এবং ব্যবসায়ীদের প্রকৃত লাভের তথ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তা সত্ত্বেও, দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে অনলাইন অর্ডার বৃদ্ধি, ছোট শহরের ক্রেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং রাজ্যের বাইরে বাংলার পণ্যের চাহিদা—এই তিনটি প্রবণতা উৎসবের বাজারের পরিবর্তনশীল চরিত্রকে সামনে এনেছে।
আগামী দিনে লক্ষ্মীপুজো, কালীপুজো ও দীপাবলির বাজারেও এই প্রবণতা বজায় থাকে কি না, সেদিকেই এখন নজর থাকবে ব্যবসায়ীদের।