Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

“শীর্ষ মাওবাদী কমান্ডার মাদভি হিদমা নিহত; মিয়া ও তাঁর স্ত্রীসহ ৬ জন এনকাউন্টারে মৃত্যু”

শীর্ষ মাওবাদী কমান্ডার মাদভি হিদমা এনকাউন্টারে নিহত হয়েছেন। আন্দ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও তেলেঙ্গানা সীমান্তের জঙ্গলে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হিদমা, তাঁর স্ত্রীসহ মোট ৬ জন মাওবাদীর মৃত্যু হয়েছে। বহু নাশকতার মূল চক্র বলে পরিচিত হিদমার নিহত হওয়াকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে নিরাপত্তা বাহিনী।

আন্দ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং ছত্তিশগড়—এই তিন রাজ্যের সীমান্তবর্তী গভীর অরণ্যে বহু বছর ধরে সক্রিয় ছিল ভারতের অন্যতম কুখ্যাত ও বিপজ্জনক মাওবাদী নেতা মাদভি হিদমা। তাঁর নাম উচ্চারিত হলেই নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে তৈরি হত আতঙ্ক, কারণ তাঁর নেতৃত্বে দশকের পর দশক ধরে ঘটে গিয়েছে একের পর এক জওয়ান-নিহতের নাশকতা, বিস্ফোরণ ও অ্যাম্বুশ। লাল ছায়ায় আবৃত এই অঞ্চলের জঙ্গলে হিদমার দাপট এতটাই প্রবল ছিল যে, গোয়েন্দা মহলের একাংশ তাঁকে ‘ঘোস্ট কমান্ডার’ বলে অভিহিত করত। বহুবার তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য মিললেও, প্রতিবারই কিছু না কিছু কারণে তিনি ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতেন। এমনকি মাঝে মাঝে খবর উঠত তিনি নাকি অন্য দেশে পালিয়ে গেছেন। আবার কখনও বলা হত তিনি অসুস্থ। কিন্তু বাস্তবে তিনি ছিলেন নিতান্তই সক্রিয়, এবং নতুন করে সেল পুনর্গঠন এবং অস্ত্র জোগাড়ের কাজে মগ্ন। সেই হিদমাই অবশেষে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে এনকাউন্টারে নিহত হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী এবং সংগঠনের আরও কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারিয়েছেন। এই ঘটনার পর গোটা লালঘেরা অঞ্চলে নতুনভাবে আলোচনার ঝড় উঠেছে—হিদমার মৃত্যু কি তবে মাওবাদী নেটওয়ার্কের ভাঙনের সূচনা, নাকি এটি শুধুই একটি বড় অভিঘাত, যার পরে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে মাওবাদীরা?

এই ঘটনার পটভূমি বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে হিদমার অতীত এবং তাঁর সন্ত্রাসের কাহিনি। দক্ষিণ বস্তারের দুর্গম অরণ্যে জন্মানো মাদভি হিদমা খুব অল্প বয়সেই মাওবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তাঁর বুদ্ধি, শৃঙ্খলা এবং অরণ্যভূমিতে নিখুঁতভাবে চলাফেরা করার ক্ষমতা দেখে শীর্ষ নেতারা তাঁকে দ্রুত ‘PLGA’—অর্থাৎ পিপলস লিবারেশন গেরিলা আর্মির গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে উন্নীত করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন দণ্ডকারণ্য অঞ্চলের স্পেশাল জোনাল কমিটির অন্যতম কাণ্ডারী। তাঁর পরিকল্পনায় বহু ভয়ঙ্কর আক্রমণ হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০১০ সালের চত্তিশগড়ের তাদমেটলার হামলা, যেখানে ৭৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান শহিদ হন। একইভাবে ২০১৩ সালের ঝিরমা ভ্যালির হামলায় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে নিশানা করা হয়। এসব হামলার নেপথ্যে বারবার উঠে আসে একটাই নাম—মাদভি হিদমা।

এইভাবে বছরের পর বছর ধরে হিদমাকে ধরার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু তাঁর চারপাশের তথ্য সুরক্ষিত রাখার কৌশল, স্পট পরিবর্তনের দক্ষতা এবং সংগঠনের শক্তিশালী স্থানীয় সাপোর্ট সিস্টেম তাঁকে ধরতে দেয়নি। তাঁর সমর্থন পাওয়া গোষ্ঠী ছিল পাহাড়ি জনজাতির তরুণরা, যাদের একটি অংশ মূল স্রোতের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। স্থানীয় দাবি, সরকারি সুবিধার অভাব, বনজীবী জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা—এসব অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে মাওবাদীরা তাদের ঘাঁটি আরও মজবুত করেছিল। হিদমা ছিল সেই নেটওয়ার্কের মাঝখানে এক ভয়ঙ্কর দিকনির্দেশক।

ঘটনার দিনও বলা হচ্ছে, গোয়েন্দারা কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। হিদমার অবস্থান নিয়ে টহলদারি বাড়ানো হয়েছিল। নিরাপত্তা বাহিনী বিশেষ করে গ্রে-হাউন্ডস, ছত্তিশগড় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর একটি বিশেষ যৌথ টিম অরণ্যের এক প্রান্ত জুড়ে ঘেরাও কৌশল গ্রহণ করে। এই বিশেষ অভিযানকে বলা হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে সূক্ষ্ম, পরিকল্পিত এবং নিখুঁত মাওবাদবিরোধী অভিযান। ভোরবেলা যখন যৌথ বাহিনী অরণ্যে ঢোকে, তখন তারা দুটি আলাদা দলে ভাগ হয়। প্রথম দল তথ্যসূত্রে পাওয়া হিদমার থাকার জায়গার দিকে এগোয় এবং দ্বিতীয় দল অপেক্ষায় থাকে পেছনের দিকের নিরাপত্তা জাল শক্ত করতে।

তদন্তকারীদের দাবি, ঠিক সেই সময় হিদমা, তাঁর স্ত্রী এবং আরও কয়েকজন মাওবাদী সদস্য একটি বৈঠক করছিলেন। সম্ভবত দল পুনর্গঠন, নতুন রিক্রুটমেন্ট বা আসন্ন সন্ত্রাসী পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছিল। নিরাপত্তা বাহিনী ঘেরাটোপে ফেললে একসময় গুলি চলতে শুরু হয়। অরণ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গোলাগুলির শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। শেষ পর্যন্ত যখন গুলির লড়াই থামে, তখন নিরাপত্তা বাহিনী এলাকা তল্লাশি করে দেখতে পায় বেশ কয়েকটি দেহ পড়ে আছে। তাদের মধ্যে ছিল হিদমা এবং তাঁর স্ত্রীও। উদ্ধার হয় একাধিক একে-৪৭ রাইফেল, বিস্ফোরক, চার্জার, রেডিও ডিভাইস এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি। এই নথিগুলির সূত্র ধরে মাওবাদীদের আরও কিছু গোপন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে আশঙ্কা ও প্রত্যাশা দুই-ই করছেন গোয়েন্দারা।

হিদমার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই একদিকে যেমন নিরাপত্তা মহলে স্বস্তির সুর শোনা গিয়েছে, অন্যদিকে বহু মানুষ প্রশ্ন তুলছেন—এই মৃত্যু কি সত্যিই মাওবাদী সন্ত্রাসের সমাপ্তি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিদমার মৃত্যু নিঃসন্দেহে একটা বড় ধাক্কা। তিনি শুধু নেতা নন, ছিলেন অপারেশনাল ব্রেন। তাঁর মতো অভিজ্ঞ এবং প্রভাবশালী কমান্ডার হারানো মানে সংগঠনের মনোবল অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়বে। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁরা সতর্কও করছেন, কারণ মাওবাদী সংগঠনগুলো কখনও একজন ব্যক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে না। তাদের রয়েছে বহুস্তরীয় নেতৃত্ব কাঠামো, বিকল্প কমান্ডার এবং প্রশিক্ষিত গেরিলা ইউনিট। তাই এই ধাক্কা কাটিয়ে তারা আবার regroup করার চেষ্টা করবে।

এমনকি হিদমার মৃত্যুর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, সেই নিয়েও জল্পনা চলছে। কিছু গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তাঁর মৃত্যুর পর গ্রাউন্ড লেভেলের দুই-তিন নেতা এখন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মাওবাদী সংগঠনে বিভাজন তৈরি করতে পারে। নেতিবাচক মনোবল, দলে মতানৈক্য এবং নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের লড়াই সংগঠনকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।

news image
আরও খবর

আরও একটি বড় বিষয় উঠে আসছে—হিদমার মতো প্রশিক্ষিত এবং প্রভাবশালী নেতার মৃত্যু কি জনজীবনে কোনও প্ৰভাব ফেলবে? বহু বছর ধরে লাল-অঞ্চলের মানুষ মাওবাদী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাতের মাঝে পড়ে ভুগছেন। হিদমার অবসান তাদের জীবনে কি একটু হলেও শান্তি আনবে? স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, ইতিমধ্যেই অনেক গ্রামবাসী খুশি। তাঁরা বলছেন, এতদিন যে ভয় এবং চাপের মধ্যে থাকতে হত, সেটি একটু হলেও কমবে। কিন্তু প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে কয়েক মাসের মধ্যে, কারণ সংগঠন প্রতিশোধের পথে গেলে উল্টে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাওবাদী দমনে পুলিশের পাশাপাশি উন্নয়নই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। যেসব অঞ্চলে শিক্ষার অভাব, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অভাব, রাস্তাঘাটের অভাব আছে, সেই সব এলাকাকে মূল স্রোতে না আনা গেলে এই ধরনের সন্ত্রাস কখনও শেষ হবে না। হিদমার মতো নেতারা সেই সব মানুষের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়েই শক্তি বাড়ান। তাই তাঁর মৃত্যু সন্ত্রাসের একটি অধ্যায়ের শেষ হলেও, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নির্ভর করবে রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের উপর।

হিদমার মৃত্যু মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একসময় সংগঠন তাঁকে ভবিষ্যতের সর্বোচ্চ সামরিক প্রধান হিসেবে দেখত। তাঁর কঠোরতা, লড়াই পরিচালনা, অরণ্যে কৌশলগত চলাফেরা এবং স্থানীয় সমর্থন সংগ্রহের ক্ষমতা তাঁকে আলাদা উচ্চতায় তুলে দিয়েছিল। তিনি বহুবার নিরাপত্তা বাহিনীকে বোকা বানিয়েছেন, পথ পরিবর্তন করেছেন, নিজের সম্পর্কে ভুল তথ্য ছড়িয়েছেন। এই মৃত্যু সেই ‘ঘোস্ট কমান্ডার’-এর যুগের সমাপ্তি।

তবে প্রশ্ন এখানেই—এটা কি সমাপ্তি, নাকি সাময়িক বিরতি? ভবিষ্যৎই উত্তর দেবে। তবে দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা এটাকেই বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন। বহু বছরের খোঁজ, বহুবার ব্যর্থতা, বহুবার পরিকল্পনা বদলের পরে অবশেষে তাঁরা এই কুখ্যাত কমান্ডারকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছেন।

বর্তমানে অরণ্যের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে গোয়েন্দারা বোঝার চেষ্টা করছেন সংগঠনের অবশিষ্ট সদস্যরা কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে। উদ্ধার হওয়া নথি বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে ভবিষ্যতে কোনও বড় নাশকতার পরিকল্পনা ছিল কি না। একইসঙ্গে মাওবাদীদের সাহায্যকারী স্থানীয় চক্রের উপরও নজর দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে মাদভি হিদমার মৃত্যু কেবল একটি এনকাউন্টারের ঘটনা নয়—এটি ভারতের দীর্ঘ দশকের সন্ত্রাস ও লাল বিদ্রোহের ইতিহাসে একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে একটি যুগের অবসান হলেও, মাওবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরও অনেক পথ বাকি। তবে অন্তত একটি বড় ছায়া সরে গেল—অরণ্যকে বহু বছর ত্রাসে রাখার অধিপতি হিদমা আর ন

Preview image