একঘেয়ে চিকেনের স্বাদে আনুন নতুনত্ব। রন্ধনশিল্পী সঞ্জীব কপূরের রেসিপিতে সহজেই বানিয়ে ফেলুন সুস্বাদু ও ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে চিকেন কারি।
চিকেনের ঝোল, কষা মাংস, চিকেন কারি—মুরগির মাংস দিয়ে বাঙালি বাড়িতে নানা ধরনের পদ রান্না হয়। কিন্তু একই ধরনের রান্না বারবার খেতে খেতে অনেক সময় স্বাদে একঘেয়েমি চলে আসে। তখন চেনা উপকরণেই যদি একটু অন্যরকম স্বাদ পাওয়া যায়, তা হলে মন্দ কী! মুরগির মাংসের সেই চেনা স্বাদে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে রন্ধনশিল্পী সঞ্জীব কপূরের শেখানো রেলওয়ে চিকেন কারি। লালচে, ঘন ঝোল, মশলার সুন্দর ভারসাম্য এবং সর্ষের তেলের নিজস্ব গন্ধ—সব মিলিয়ে এই চিকেন কারি হয়ে উঠতে পারে বাড়ির দুপুর বা রাতের জমাটি আয়োজন।
সঞ্জীব কপূরের মতে, প্রতিটি চিকেন রান্নার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে। আর রেলওয়ে চিকেন কারির বিশেষত্ব মূলত তার স্বাদ ও গন্ধে। সাধারণ চিকেন কারির তুলনায় এই রান্নায় মশলার ব্যবহার কিছুটা আলাদা। মাংস রান্নার আগে টকদই, আদা-রসুনবাটা, হলুদ, লঙ্কাগুঁড়ো ও নুন দিয়ে মেরিনেট করে রাখা হয়। ফলে মশলার স্বাদ মাংসের ভিতর পর্যন্ত ঢুকে যায়। এরপর গোটা মশলা হালকা ভেজে আদা-রসুনের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ মশলার মিশ্রণ। সর্ষের তেলে পেঁয়াজ ভেজে সেই মশলা ও টম্যাটোর ক্বাথ দিয়ে ভালো করে কষিয়ে তার মধ্যে দেওয়া হয় মেরিনেট করা মুরগি ও আলু।
এই রান্নার অন্যতম আকর্ষণ হল এর লাল, ঘন এবং মশলাদার ঝোল। ঝোল একেবারে পাতলা নয়, আবার অতিরিক্ত ঘনও নয়। টম্যাটোর ক্বাথের সঙ্গে বিভিন্ন গোটা মশলা, ধনেগুঁড়ো ও লঙ্কাগুঁড়োর মিশেলে তৈরি হয় এর বিশেষ স্বাদ। সর্ষের তেলের ব্যবহার রান্নাটিকে আরও পরিচিত ভারতীয় ঘরানার স্বাদ দেয়। শেষে জায়ফলগুঁড়ো ও ধনেপাতাকুচি ছড়িয়ে দিলে গন্ধ আরও মনমাতানো হয়ে ওঠে।
নাম থেকেই বোঝা যায়, এই পদটির সঙ্গে রেলযাত্রার একটি ঐতিহ্যবাহী যোগ রয়েছে। ভারতীয় রান্নার জগতে রেলওয়ে কারি নামে বিভিন্ন ধরনের রান্নার উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সঞ্জীব কপূরের দেখানো এই রেলওয়ে চিকেন কারির মূল আকর্ষণ হল মশলার ভারসাম্য, লালচে ঝোল এবং মাংসের সঙ্গে আলুর সুন্দর মেলবন্ধন।
চিকেনের সঙ্গে আলু ব্যবহার এই রান্নাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। আলু মশলার ঝোল শুষে নিয়ে নরম হয়ে যায় এবং মাংসের সঙ্গে খেতে দারুণ লাগে। তাই বাড়িতে যদি নিয়মিত চিকেন রান্নার স্বাদে একটু পরিবর্তন আনতে চান, তা হলে এই রেসিপি চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
এই রেসিপিটি তৈরি করতে লাগবে—
রেলওয়ে চিকেন কারির স্বাদ ভালো করার ক্ষেত্রে মেরিনেশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমে একটি পাত্রে মুরগির মাংস নিন। এর মধ্যে আধ কাপ টকদই, আদা-রসুনবাটা, হলুদগুঁড়ো, লঙ্কাগুঁড়ো এবং স্বাদমতো নুন দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে নিতে হবে।
মাংসের প্রতিটি টুকরোর গায়ে যাতে মশলার প্রলেপ ভালো ভাবে লাগে, সে দিকে নজর দিতে হবে। মেরিনেট করা মাংস কিছুক্ষণ রেখে দিলে টকদই ও মশলার স্বাদ মাংসের মধ্যে ভালো ভাবে ঢুকে যায়। এতে রান্নার পর মাংসের স্বাদ আরও গভীর হয়।
এই রেসিপির স্বাদ অনেকটাই নির্ভর করছে গোটা মশলার ব্যবহারের উপর। একটি কড়াইয়ে মৌরি, জিরে, দারচিনি, শুকনো লাল লঙ্কা, গোলমরিচ, এলাচ এবং লবঙ্গ নিয়ে হালকা আঁচে নাড়াচাড়া করে নিতে হবে। মশলা ভাজার সময় আঁচ খুব বেশি রাখা উচিত নয়। গোটা মশলা পুড়ে গেলে রান্নায় তেতো স্বাদ চলে আসতে পারে।
মশলা থেকে হালকা সুগন্ধ বেরোলে তার মধ্যে রসুন কোয়া ও আদা কুচি দিয়ে আরও কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করতে হবে। এরপর পুরো মিশ্রণটি মিক্সারে দিয়ে ঘুরিয়ে নিতে হবে। এই মশলাই পরে চিকেন কারির মূল স্বাদ তৈরি করবে।
এ বার কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করতে হবে। তেলের কাঁচা গন্ধ চলে গেলে তাতে তেজপাতা দিয়ে ফোড়ন দিতে পারেন। এরপর মিহি করে কুচোনো পেঁয়াজ দিয়ে ভালো করে ভেজে নিতে হবে। পেঁয়াজের রং হালকা বাদামি হয়ে এলে স্বাদমতো নুন দিতে হবে।
এর পর মিক্সারে তৈরি করে রাখা গোটা মশলার মিশ্রণটি কড়াইয়ে দিয়ে ভালো ভাবে কষাতে হবে। এর সঙ্গে ধনেগুঁড়ো ও লঙ্কাগুঁড়ো যোগ করতে হবে। মশলা যাতে কড়াইয়ের তলায় লেগে না যায়, তার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী নাড়াচাড়া করতে হবে।
মশলা ভালো ভাবে কষানো হয়ে গেলে দেড় কাপ টম্যাটোর ক্বাথ বা পিউরি দিতে হবে। টম্যাটো দেওয়ার পর রান্নাটি আরও কিছুক্ষণ কষাতে হবে। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে বুঝতে হবে কষানোর পর্ব অনেকটাই সম্পূর্ণ হয়েছে।
এ বার আগে থেকে মশলা মাখিয়ে রাখা মুরগির মাংস কড়াইয়ে দিয়ে দিতে হবে। সঙ্গে ডুমো করে কাটা আলুও যোগ করতে হবে। মাংস ও আলু মশলার সঙ্গে ভালো ভাবে মিশিয়ে কিছুক্ষণ কষিয়ে নিতে হবে।
এর পর আঁচ কমিয়ে কড়াই ঢেকে দিতে হবে। মুরগির মাংস থেকেই কিছুটা জল বেরোবে। সেই জলেই প্রথমে মাংস ও আলু রান্না হতে শুরু করবে। মাংস আধসেদ্ধ হয়ে এলে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও কিছুটা গরম জল দিতে হবে।
এর পর মাঝারি আঁচে রান্না করতে হবে যতক্ষণ না মুরগির মাংস এবং আলু পুরোপুরি সেদ্ধ হয়ে যায়। রান্নার সময় ঝোলের ঘনত্ব নিজের পছন্দ অনুযায়ী ঠিক করা যায়। তবে এই রেসিপির বৈশিষ্ট্য হল লালচে ও ঘন ঝোল। তাই অতিরিক্ত জল না দেওয়াই ভালো।
মাংস ও আলু সেদ্ধ হয়ে গেলে রান্নার একেবারে শেষ দিকে অল্প জায়ফলগুঁড়ো দিতে হবে। জায়ফলের পরিমাণ বেশি দেওয়া উচিত নয়, কারণ এর গন্ধ খুব তীব্র। অল্প পরিমাণ জায়ফল পুরো রান্নায় একটি আলাদা সুগন্ধ যোগ করবে।
সবশেষে একমুঠো ধনেপাতাকুচি ছড়িয়ে দিতে পারেন। গরম গরম রেলওয়ে চিকেন কারি পরিবেশন করার আগে কয়েক মিনিট ঢাকা দিয়ে রাখলে মশলার গন্ধ আরও ভালো ভাবে মিশে যাবে।
লাল ঘন ঝোলের এই চিকেন কারি গরম ভাতের সঙ্গে যেমন ভালো লাগে, তেমনই রুটি, পরোটা বা পোলাওয়ের সঙ্গেও পরিবেশন করা যায়। আলু ও মাংসের সঙ্গে মশলাদার ঝোল ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে স্বাদ আরও জমে ওঠে।
দুপুরের জমাটি খাবার হিসেবে ভাত ও রেলওয়ে চিকেন কারির জুটি হতে পারে দুর্দান্ত। আবার রাতের অতিথি আপ্যায়নেও এই পদটি রাখা যেতে পারে। সাধারণ চিকেন কারির পরিবর্তে একটু অন্য ধরনের পদ পরিবেশন করতে চাইলে রেলওয়ে চিকেন কারি হতে পারে ভালো বিকল্প।
রেলওয়ে চিকেন কারি তৈরি করার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখলে রান্নার স্বাদ আরও ভালো হতে পারে। প্রথমত, মাংস ভালো ভাবে মেরিনেট করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, গোটা মশলা ভাজার সময় আঁচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মশলা পুড়ে গেলে পুরো রান্নার স্বাদ নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, টম্যাটোর ক্বাথ দেওয়ার পর মশলা ভালো ভাবে কষাতে হবে। মশলা থেকে তেল ছাড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা এই রান্নার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মাংস দেওয়ার পরও কিছুক্ষণ কষিয়ে নিলে মশলা মাংসের সঙ্গে ভালো ভাবে মিশে যায়।
সর্ষের তেল ব্যবহার করার কারণে রান্নায় একটি ঝাঁঝালো এবং পরিচিত ভারতীয় স্বাদ আসে। তবে সর্ষের তেল ভালো ভাবে গরম করে ব্যবহার করা উচিত। রান্নার ঝোল একেবারে পাতলা করে ফেললে রেলওয়ে চিকেন কারির মূল বৈশিষ্ট্য কিছুটা কমে যেতে পারে।
চিকেনের প্রচলিত রান্নাগুলির বাইরে নতুন কোনও স্বাদ খুঁজছেন? তা হলে রেলওয়ে চিকেন কারি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। একই মুরগির মাংস, আলু এবং পরিচিত মশলা দিয়েই তৈরি হলেও রান্নার পদ্ধতি ও মশলার ব্যবহারে এর স্বাদ আলাদা।
সঞ্জীব কপূরের এই রেসিপিতে টকদইয়ের হালকা টকভাব, টম্যাটোর স্বাদ, সর্ষের তেলের ঝাঁঝ এবং গোটা মশলার সুগন্ধ একসঙ্গে মিশে যায়। লালচে ঝোলের সঙ্গে নরম মুরগির মাংস এবং আলু এই পদকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
তাই প্রতিদিনের চিকেনের রান্নায় যদি একঘেয়েমি চলে আসে, তা হলে ছুটির দিন বা বিশেষ কোনও দিনে বাড়িতেই বানিয়ে ফেলতে পারেন সঞ্জীব কপূরের রেলওয়ে চিকেন কারি। রান্নার প্রতিটি ধাপ ঠিক ভাবে মেনে চললে ঘরেই তৈরি হবে সুগন্ধি, মশলাদার এবং ঘন ঝোলের এই বিশেষ চিকেন পদ।