নদিয়ার শান্তিপুর থানার উদয়পুর এলাকায় ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পড়ে থাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
নদিয়া জেলার শান্তিপুর থানার অন্তর্গত উদয়পুর এলাকায় ১২ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পড়ে থাকার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। হবিপুর ও ফুলিয়ার মাঝামাঝি জাতীয় সড়কের ধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই ওষুধের স্তূপ ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ দূষণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বেশ কয়েকদিন ধরেই রাস্তার পাশে এই ওষুধগুলি পড়ে রয়েছে। প্রথমদিকে বিষয়টি অনেকের নজরে না এলেও ধীরে ধীরে ওষুধের পরিমাণ এবং ছড়িয়ে থাকার দৃশ্য সামনে আসতেই এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ বাড়তে শুরু করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাস্তার ধারে পড়ে থাকা ওষুধগুলির বেশিরভাগই মেয়াদোত্তীর্ণ। বিভিন্ন প্যাকেট, স্ট্রিপ, সিরাপের বোতল এবং অন্যান্য ওষুধজাত সামগ্রী সেখানে ছড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে বলে অভিযোগ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ওষুধগুলির একটি অংশে আগুন লাগিয়ে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও স্থানীয়দের দাবি। তবে আগুনে সব ওষুধ নষ্ট হয়নি। এখনও প্রচুর পরিমাণ ওষুধ সেখানে খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কে বা কারা এই ওষুধগুলি এনে রাস্তার ধারে ফেলে গিয়েছে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে ঘটনাটি সামনে আসার পর থেকেই প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।
জাতীয় সড়কের ধারে এভাবে বিপুল পরিমাণ ওষুধ পড়ে থাকা শুধু দৃশ্যদূষণের বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষেত্রেও বড় বিপদের কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের বক্তব্য, এই এলাকা দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করেন। পাশাপাশি আশেপাশে বসতি এলাকা থাকায় শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং পথচারীদের মধ্যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোনও শিশু বা অসচেতন ব্যক্তি যদি কৌতূহলবশত ওই ওষুধ হাতে নেয় বা ব্যবহার করে, তা হলে বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে। এছাড়া বৃষ্টির জল বা বাতাসের মাধ্যমে ওষুধের রাসায়নিক উপাদান মাটি ও জলাশয়ে মিশে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সাধারণ বর্জ্যের মতো ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ এগুলির মধ্যে রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা মাটি, জল এবং জীবজগতের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওষুধের বর্জ্য সঠিকভাবে নিষ্পত্তি না করলে তা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। খোলা জায়গায় ওষুধ পড়ে থাকলে তা পশুপাখির সংস্পর্শেও আসতে পারে। রাস্তার কুকুর, গরু বা অন্যান্য প্রাণী যদি এসব ওষুধের সংস্পর্শে আসে বা ভুলবশত তা খেয়ে ফেলে, তা হলে তাদের জীবনও বিপন্ন হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের বক্তব্য, জাতীয় সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত রাস্তার পাশে যদি দিনের পর দিন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের স্তূপ পড়ে থাকে, তা হলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত প্রশাসন, স্বাস্থ্য দফতর এবং পরিবেশ দফতরকে ঘটনাস্থলে এসে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি যে বা যারা এই ওষুধ ফেলে গিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অনেকের মতে, এটি কোনও সাধারণ বর্জ্য ফেলার ঘটনা নয়। কারণ এত বিপুল পরিমাণ ওষুধ একসঙ্গে পড়ে থাকা থেকে অনুমান করা হচ্ছে, কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তরফে এগুলি ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। স্থানীয়রা চাইছেন, ওষুধগুলির উৎস খুঁজে বের করা হোক। কোন সংস্থা, দোকান, গুদাম বা চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই ওষুধগুলির যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখুক প্রশাসন।
ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে এই কারণে যে, ওষুধগুলির একটি অংশে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আগুনে পোড়ানো পরিবেশের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ অনেক ওষুধে থাকা রাসায়নিক উপাদান আগুনে পুড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া তৈরি করতে পারে। সেই ধোঁয়া বাতাসে মিশে মানুষের শ্বাসযন্ত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের হাঁপানি, অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য এ ধরনের ধোঁয়া আরও বিপজ্জনক হতে পারে।
রাস্তার ধারের এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে এত ওষুধ জাতীয় সড়কের পাশে এসে পড়ল? যদি কেউ রাতের অন্ধকারে এগুলি ফেলে যায়, তা হলে নিরাপত্তা ও নজরদারির প্রশ্নও উঠছে। স্থানীয়দের দাবি, জাতীয় সড়ক সংলগ্ন এলাকায় সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো দরকার। পাশাপাশি রাতে টহলদারি এবং বর্জ্য ফেলার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ একবার এ ধরনের ঘটনা নজির হয়ে গেলে ভবিষ্যতে আরও বিপজ্জনক বর্জ্য এভাবে ফেলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিকদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কখনওই খোলা জায়গায় ফেলে রাখা উচিত নয়। এগুলি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সংগ্রহ ও ধ্বংস করতে হয়। ওষুধ ব্যবসায়ী, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, গুদাম বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত কোনও জিনিস এভাবে অবহেলায় ফেলে দেওয়া অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।
এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, জাতীয় সড়কের পাশ দিয়ে প্রতিদিন বহু গাড়ি চলাচল করে। অনেক পথচারীও ওই রাস্তা ব্যবহার করেন। ওষুধের প্যাকেট ছড়িয়ে থাকায় রাস্তার পরিবেশ নোংরা হয়ে পড়েছে। দুর্গন্ধের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। তাঁদের আশঙ্কা, বৃষ্টি হলে ওষুধের রাসায়নিক অংশ রাস্তার ধারের নালা বা জমিতে মিশে যেতে পারে। এতে শুধু মানুষের নয়, কৃষিজমি ও পশুপাখির উপরও প্রভাব পড়তে পারে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় সচেতনতার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এসেছে। অনেক সময় মানুষ মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বাড়ির আবর্জনার সঙ্গে ফেলে দেন। কিন্তু বিপুল পরিমাণ ওষুধ একসঙ্গে ফেলে দেওয়ার ঘটনা আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। সাধারণ ওষুধের প্যাকেট হোক বা বড় পরিমাণে মেডিক্যাল বর্জ্য—দুটোর ক্ষেত্রেই সঠিক নিষ্পত্তি অত্যন্ত জরুরি। পরিবেশবিদদের মতে, মেডিক্যাল বর্জ্য বা ওষুধজাত বর্জ্যের ক্ষেত্রে আলাদা সংগ্রহ ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে এগুলি সাধারণ আবর্জনার সঙ্গে মিশে না যায়।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থল দ্রুত পরিষ্কার করা দরকার। শুধু পরিষ্কার করলেই হবে না, ওষুধগুলি কীভাবে সেখানে এল, তাও জানতে হবে। কারণ উৎস চিহ্নিত না হলে ভবিষ্যতে একই ঘটনা আবার ঘটতে পারে। প্রশাসনের উচিত হবে ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করা, ওষুধের প্যাকেট বা লেবেল পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দফতরের সাহায্যে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের পাশাপাশি ভয়ও কাজ করছে। তাঁদের প্রশ্ন, যদি কোনও অসাধু চক্র মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বাজারে ফেরানোর চেষ্টা করে থাকে এবং সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কিছু ওষুধ ফেলে দেয়, তা হলে বিষয়টি আরও গুরুতর। যদিও এ বিষয়ে কোনও প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি, তবুও তদন্তের মাধ্যমে সব দিক খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মানুষের শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ওষুধের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে, আবার কিছু ক্ষেত্রে রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে তা ক্ষতিকরও হতে পারে। তাই কোনও অবস্থাতেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়। কিন্তু এই ধরনের ওষুধ যদি খোলা জায়গায় পড়ে থাকে, তা হলে অসচেতন মানুষ বা শিশুদের হাতে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় মানুষ প্রশাসনের কাছে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং আইনের প্রশ্ন। যে বা যারা এই কাজ করেছে, তাদের চিহ্নিত করা জরুরি। কারণ জনবহুল এলাকার পাশে বিপজ্জনক বর্জ্য ফেলে যাওয়া কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
নদিয়ার হবিপুর ও ফুলিয়ার মাঝামাঝি এই উদয়পুর এলাকা দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে রাস্তার ধারে ওষুধের স্তূপ পড়ে থাকায় ঘটনাটি দ্রুত আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও তুলেছেন বলেও জানা গেছে। তাঁরা চান, বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চস্তরে পৌঁছাক এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এই ঘটনার পর আরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নিষ্পত্তির সঠিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে? ওষুধ বিক্রেতা, পাইকারি ব্যবসায়ী, স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সংরক্ষণাগারগুলিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জমা হলে তা কীভাবে সরানো হয়, তার নজরদারি কি যথেষ্ট? সাধারণ মানুষ মনে করছেন, নিয়ম থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগে ঘাটতি থাকলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে পারে।