Lenspedia Bangla Logo
  • কলকাতা
  • 30℃ Purba Bardhaman

আমি রানির বুম্বজ় বিয়ে করতে চেয়েছিল চাইব ছোট্ট পুতুল যেন

২১ মার্চ অভিনেত্রী রানি মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন। অভিনেত্রীর বিশেষ দিনে তাঁর ছোটবেলায় ফিরে গেলেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

‘জানকি কুটীর’— নামটার মধ্যেই যেন এক ধরনের পুরনো দিনের মায়া লুকিয়ে আছে। সেই মায়ার ভেতরেই গড়ে উঠেছিল কত সম্পর্ক, কত স্মৃতি, কত গল্প। সেই গল্পেরই এক কোমল, উষ্ণ অংশ জুড়ে আছে ছোট্ট রানি— যাকে প্রথম দেখার মুহূর্ত আজও যেন চোখের সামনে ভাসে।

তখন সে একেবারে শিশু— বয়স দুই বা আড়াইয়ের বেশি নয়। গোলগাল মুখ, বড় বড় চোখ, আর একরাশ নির্ভেজাল হাসি— যেন ঠিক পুতুলের মতো। যে কাউকে দেখলেই হাসত, আর সেই হাসিতে এমন এক টান ছিল যে, অচেনা মানুষও মুহূর্তে আপন হয়ে যেত। শিশুমন তখনও কোনও হিসেব শেখেনি, কোনও দূরত্ব বোঝেনি— শুধু ছিল সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত ভালবাসা।

সেই সময় আমার বাবা, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, নিয়মিত আড্ডা দিতেন বন্ধুদের সঙ্গে। সেই আড্ডার অন্যতম সঙ্গী ছিলেন রাম মুখোপাধ্যায়— রানির বাবা। শুধু পেশাগত সম্পর্ক নয়, তাদের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। ইন্ডাস্ট্রির আরও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মানুষকে নিয়ে সপ্তাহের শেষে বসত সেই আড্ডা— কখনও গল্প, কখনও সিনেমা নিয়ে আলোচনা, কখনও বা নিছক হাসি-ঠাট্টা।

এই আড্ডাগুলো শুধুই বড়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। অনেক সময়ই আমরা ছোটরাও সেখানে যেতাম। আর সেখানেই প্রথম দেখা ছোট্ট রানি মুখার্জি-র সঙ্গে। তখনও কে জানত, এই ছোট্ট মেয়েটাই একদিন ভারতীয় সিনেমার অন্যতম বড় নাম হয়ে উঠবে!

রানির সঙ্গে প্রথম আলাপটা ছিল খুবই স্বাভাবিক, খুবই সহজ। ও তখন ঠিক করে কথা বলতেও শেখেনি, কিন্তু তার চোখে-মুখে ছিল একরাশ কৌতূহল। চারপাশে কী হচ্ছে, কে কী বলছে— সবকিছুই সে নিজের মতো করে লক্ষ্য করত। কখনও বাবার কোলে, কখনও মেঝেতে বসে খেলনায় মগ্ন— কিন্তু মাঝেমধ্যেই হেসে তাকাত সবার দিকে।

এইসব আড্ডা থেকেই ধীরে ধীরে দুই পরিবারের মধ্যে গড়ে ওঠে এক আন্তরিক সম্পর্ক। কাজের বাইরেও একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে ওঠা— সেই সময়কার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল। সম্পর্কগুলো ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিগত, অনেক বেশি উষ্ণ।

ছুটি পেলেই রানি আর তার পরিবার কলকাতায় আসত। তখনও মুম্বই আর কলকাতার মধ্যে এই যাতায়াত ছিল বেশ নিয়মিত। সেই সময় যদি একটু ফাঁক পাওয়া যেত, ওরা আমাদের বাড়িতেও চলে আসত। কোনও আনুষ্ঠানিকতা ছিল না— যেন নিজের বাড়িতেই এসেছে।

রানির দাদা, রাজা মুখার্জি, তখন কিছুটা বড়। ফলে খেলাধুলার নেতৃত্বটা সে-ই নিত। আমাদের বাড়িটা তখন যেন ওদের ‘ডেন’ হয়ে উঠেছিল— একটা নিরাপদ, আনন্দময় জায়গা, যেখানে ওরা নিজেদের মতো করে খেলতে পারত।

লুকোচুরি ছিল ওদের সবচেয়ে প্রিয় খেলা। বাড়ির প্রতিটা কোণ, প্রতিটা ঘর, এমনকি আলমারির আড়াল পর্যন্ত— সব জায়গাই ওদের কাছে ছিল লুকোনোর জায়গা। রানির ছোট্ট পা দিয়ে দৌড়নো, লুকিয়ে পড়ে আবার উঁকি মারা— সেই দৃশ্যগুলো আজও মনে পড়লে মুখে হাসি চলে আসে।

শিশুদের খেলা কখনও শুধুই খেলা থাকে না— তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে সম্পর্কের বীজ। সেই খেলাধুলোর মধ্য দিয়েই ওদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে উঠেছিল। আমরা বড়রা যেমন নিজেদের মধ্যে গল্প করতাম, তেমনই ছোটরা নিজেদের এক আলাদা জগৎ তৈরি করে নিয়েছিল।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবাই বড় হয়েছে। জীবনের পথ আলাদা হয়েছে, ব্যস্ততা বেড়েছে, দায়িত্ব এসেছে। কিন্তু সেই ছোটবেলার দিনগুলো— সেগুলো যেন সময়ের কোথাও থমকে আছে।

রানিকে চোখের সামনে বড় হতে দেখা— সেটা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। যে মেয়েটাকে একসময় কোলে নেওয়া যেত, তাকে একদিন বড় পর্দায় দেখা— সেই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তার সাফল্য, তার পরিশ্রম, তার নিজের জায়গা তৈরি করে নেওয়া— সবকিছুই গর্বের, কিন্তু তার থেকেও বড় হল সেই স্মৃতি— যে সে একসময় আমাদের বাড়ির উঠোনে লুকোচুরি খেলত।

আজ যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন মনে হয়— সেই সময়টা কত সহজ ছিল! সম্পর্কগুলো কত নির্ভেজাল ছিল! কোনও সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না, কোনও ভার্চুয়াল যোগাযোগ ছিল না— ছিল শুধু মুখোমুখি কথা, হাসি, আর সময় কাটানোর আনন্দ।

news image
আরও খবর

‘জানকি কুটীর’-এর সেই আড্ডা, বাবাদের বন্ধুত্ব, আর ছোট্ট রানির হাসি— সব মিলিয়ে এক টুকরো সময়, যা আজও মনকে নরম করে দেয়। জীবনের অনেক কিছুই বদলে যায়, কিন্তু এই স্মৃতিগুলো থেকে যায়— একেবারে হৃদয়ের গভীরে, অমলিন হয়ে।

উপসংহার—

সময়ের স্রোত কখনও থেমে থাকে না। মানুষ বড় হয়, সম্পর্কের রূপ বদলায়, জীবনের গতি পাল্টায়— কিন্তু কিছু মুহূর্ত, কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভূতি চিরকাল একই রকম থেকে যায়। ‘জানকি কুটীর’-এর সেই দিনগুলোও ঠিক তেমনই— সময়ের অনেকটা পথ পেরিয়েও যেগুলো আজও মনে একই রকম উজ্জ্বল, একই রকম প্রাণবন্ত।

ছোট্ট রানিকে প্রথম দেখার সেই মুহূর্ত, তার নিষ্পাপ হাসি, দৌড়ে বেড়ানো, লুকোচুরি খেলার উচ্ছ্বাস— সবকিছু যেন এক টুকরো রোদ্দুরের মতো, যা জীবনের নানা ব্যস্ততা আর ক্লান্তির মাঝেও মনকে উষ্ণ করে দেয়। তখন কে ভেবেছিল, এই ছোট্ট মেয়েটাই একদিন নিজের প্রতিভা, পরিশ্রম আর দৃঢ়তায় এত বড় জায়গা তৈরি করবে! কিন্তু সেই সাফল্যের বাইরেও, স্মৃতির ভাঁজে সে আজও সেই একই পুতুলের মতো শিশু— যে নির্ভয়ে, নির্ভার মনে হাসতে পারত।

আসলে সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর দিকটাই হল এই— সময়ের সঙ্গে তার বাহ্যিক রূপ বদলালেও, তার ভিতরের টানটা কখনও ফিকে হয় না। বাবাদের বন্ধুত্ব, সেই আড্ডা, সেই পারিবারিক মেলামেশা— সব মিলিয়ে যে বন্ধন তৈরি হয়েছিল, তা শুধুই পরিচয়ের ছিল না, ছিল আত্মীয়তার। আর সেই আত্মীয়তার রঙেই রাঙানো ছিল আমাদের ছোটবেলার দিনগুলো।

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন চারপাশে সম্পর্কগুলো অনেকটাই আনুষ্ঠানিক, ব্যস্ততার চাপে অনেকটাই সীমাবদ্ধ, তখন সেই পুরনো দিনের সহজতা আরও বেশি করে মনে পড়ে। তখন না ছিল কোনও তাড়া, না ছিল কোনও হিসেব— ছিল শুধু সময় কাটানোর আনন্দ, একসঙ্গে থাকার সুখ। সেই সময়গুলোই যেন আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে, সম্পর্কের আসল শক্তি কোথায়— সেটা কথায় নয়, উপস্থিতিতে; সেটা বড় বড় ঘটনায় নয়, ছোট ছোট মুহূর্তে।

আমাদের বাড়িটা যে একসময় রানিদের ‘ডেন’ হয়ে উঠেছিল, সেটাও এক অদ্ভুত মধুর স্মৃতি। সেই বাড়ির দেওয়াল, ঘরের কোণ, বারান্দা— সব যেন এখনও বহন করে সেই হাসি, সেই দৌড়ঝাঁপের প্রতিধ্বনি। লুকোচুরি খেলতে গিয়ে রানির হঠাৎ উঁকি মারা, আবার ধরা পড়ে হেসে ফেলা— এইসব ছোট ছোট দৃশ্যই আজ এত বড় হয়ে মনে জায়গা করে নিয়েছে।

জীবনের একটা বড় সত্যি হল— আমরা যত বড় হই, ততই বুঝতে পারি ছোটবেলার মুহূর্তগুলোর মূল্য। তখন যেগুলোকে খুব সাধারণ বলে মনে হত, আজ সেগুলোই হয়ে উঠেছে অমূল্য। কারণ সেই সময়টায় কোনও ভান ছিল না, কোনও কৃত্রিমতা ছিল না— ছিল শুধু খাঁটি অনুভূতি।

রানির সাফল্য আজ সবার কাছে গর্বের বিষয়, কিন্তু তার থেকেও বড় কথা হল, সে সেই শিকড়কে কখনও ভুলে যায়নি— সেই পরিবার, সেই সম্পর্ক, সেই ছোটবেলার স্মৃতি। আর সেই কারণেই হয়তো তার যাত্রাপথটা এত সুন্দর, এত পরিপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত, এই স্মৃতিগুলোই আমাদের জীবনের আসল সম্পদ। অর্থ, সাফল্য, পরিচিতি— সবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দিনের শেষে মানুষ ফিরে আসে সেই জায়গাগুলোতেই, যেখানে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা পেয়েছে, সবচেয়ে বেশি হাসিখুশি মুহূর্ত কাটিয়েছে। ‘জানকি কুটীর’-এর সেই আড্ডা, সেই বন্ধুত্ব, আর ছোট্ট রানির সেই নিষ্পাপ উপস্থিতি— সব মিলিয়ে এক এমন স্মৃতি, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

হয়তো আজ আমরা সবাই নিজের নিজের জীবনে ব্যস্ত, দূরত্ব বেড়েছে, দেখা-সাক্ষাৎ কমেছে— তবুও সেই অতীত আমাদের ভেতরে কোথাও বেঁচে আছে। মাঝে মাঝে সেই স্মৃতিগুলো ফিরে এলে মনে হয়, জীবন যতই এগিয়ে যাক, আমাদের এক অংশ চিরকাল সেই ছোটবেলার উঠোনেই রয়ে গেছে— যেখানে কোনও চিন্তা নেই, কোনও চাপ নেই, আছে শুধু খেলা, হাসি আর একরাশ নির্মল আনন্দ।

এই কারণেই হয়তো বলা যায়— জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো লেখা হয় ছোট ছোট মুহূর্তে। আর সেই গল্পগুলোর শেষ হয় না কখনও; তারা থেকে যায়, মনে, অনুভূতিতে, আর স্মৃতির গভীরে— ঠিক যেমন থেকে গেছে ছোট্ট রানিকে প্রথম দেখার সেই দিনটি।

Preview image